নতুন দিনের অগ্রদূত কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন
গাজী গিয়াস উদ্দিন
কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এর ‘ বিচ্ছেদের বর্ণমালা ‘ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করছি।
“কাল সারারাত জেগে বিচ্ছেদের বেদনা লিখেছি
ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ পরস্পর ক্ষোভে ও ঘৃণায়,
কে জানতো মুহূর্তের মরীচিকা কেড়ে নেবে আলো
…………………………………………………………….
জোছনার টার্মিনালে অন্তহীন অপেক্ষা করবো
মাইক্রোওয়েভ থেকে আমাদের ধ্বনিপুঞ্জগুলি
শুনবে পৃথিবীবাসী, আমরা থাকবো বহুদূরে
আরণ্যক স্তব্ধতায়, ফরেস্ট বাঙলোর কোনো রুমে
কথা ছিলো বাঙলোর সংলগ্ন সড়কে যদি হর্ন
দেয় মার্সিডিজ বেঞ্জ, আমরা ছুটবো ভিন্নগ্রহে
আমাদের সব ইচ্ছা স্বপ্নসাধ মুহূর্তের ভুলে
ভেঙে গেছে, যার ফলে মর্মন্তুদ বিচ্ছেদের নদী
আমাদের দেখা আর কখনো হবে না কোনোদিন
এমনকি কবিতারা টেলিফোনে হবে না মুদ্রিত
নীরব নায়িকা এসে বলে যাবে, শোনাও তো দেখি
নিদ্রাহীন লাল চোখে লিখেছো যে, কষ্টের কবিতা”
কবি স্টালিন সব সময় নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাই নিরন্তর নিজের সঙ্গে তাঁর নিজেরই লড়াই। প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙেন, গড়েন, নতুন করে নির্মাণ করেন। তিনি জীবনবাদী কবি। তাঁর কবিতায় রয়েছে মানব মুক্তির কথা এবং গভীরতর সমাজ বিপ্লবের সংকেত। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর অপার সৃজনশীলতা শুধু একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করেন না। তাই কবিতা ছাড়াও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন সাহিত্যের আরও বিষয়ে নিজেকে যুক্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে “রবীন্দ্রনাথের আরোগ্য” নামে একটি প্রবন্ধের বই।‘ হাঁটতে থাকো’ প্রথম ছড়ার বই। আছে উপন্যাস “সম্পর্কেরা ভাঙে” । এ ছাড়াও সিলেক্টটেড পয়েমস শিরোনামে তাঁর কবিতার একটি ইংরেজি অনুবাদের বই রয়েছে। হিন্দি, উর্দু, চীনা, জাপানী, ফরাসী, রুশ ও জার্মানসহ নান ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। আছে তিনটি সাক্ষাৎকারের বই।
রেজাউদ্দিন স্টালিন এর জন্ম ১৯৬২ সালের ২২ নভেম্বর। পিতা- শেখ বোরহানউদ্দিন আহমেদ। মাতা- রেবেকা সুলতানা।জন্মস্থান- বৃহত্তর যশোর। গ্রাম- নলভাঙা। অর্থনীতিতে স্নাতক সম্মান। রাষ্টবিজ্ঞানে এম এ। নজরুল ইন্সটিটিউটের সাবেক উপ পরিচালক। কৈশোরেই লেখালেখি শুরু। ১৯৭০সালে যশোর থেকে প্রকাশিত শতদল পত্রিকায় প্রথম ‘শপথ’ নামে কবিতা প্রকাশ।
মোট গ্রন্থ ১০১ কাব্যগ্রন্থ ৬৫।
উল্লেখ্যোগ্য- ফিরিনি অবাধ্য আমি, ভেঙে আনো ভেতরে অন্তরে, সেইসব ছদ্মবেশ, আঙুলের জন্য দ্বৈরথ, হিংস্র নৈশভোজ, ভাঙা দালানের স্বরলিপি, সবজন্মে শত্রু ছিলো যে, জ্যামিতি বাক্সের গল্প, তদন্তরিপোর্ট, অবুঝ যাদুঘর প্রতিবিদ্যা, অস্ত্র ভাঙার মুহূর্ত।
ছড়াগ্রন্থ- হাঁটতে থাকো শৈশব, চিরশিশু।
প্রবন্ধ-নজরুলের আত্ম নৈরাত্ম,
গদ্য বই- রবীন্দ্রনাথ আরোগ্য, নির্বাসিত তারুণ্য, কাঠ কয়লায় লেখা
কবিতা অনূদিত হয়েছে-
ইংরেজি, উর্দু, হিন্দী, উড়িয়া, স্প্যানিশ, গ্রিক, রোমানিয়ান, ফরাসী, জাপানি, নাইজেরিয়ান, নেপালি, সুইডিশ, জার্মান, চিনা, আজারবাইজানী, ভিয়েতনামী, পর্তুগিজ, সার্বিয়ান, রুশ, কাজাক, কোরিয়ান, তাইওয়ানীয়, ইন্দোনেশিয়ান, আলবেনীয়, বুলগেরিয়ান, পোল, ইতালীয়, আরবি, আফ্রিকান, তার্কিশ, ফার্সি, সহ ৪১টি ভাষায়।
ভিডিও সিডি১০টা। আবৃত্তি এ্যালবাম- ৬টা। প্রদীপ ঘোষের কন্ঠে আবৃত্তি এ্যালবাম-আবার একদিন বৃষ্টি হবে।
পুরস্কার-
বাংলাএকাডেমি মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, দার্জিলিং নাট্যচক্র পুরস্কার, ভারতের সব্যসাচী পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গের সেন্টার ফর স্টেজ সম্মাননা সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, খুলনা রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার, ধারা সাহিত্য আসর পুরস্কার, তরঙ্গ অফ ক্যালিফোর্নিয়া সম্মাননা, লস এঞ্জেলস বাদাম সম্মাননা, লস এঞ্জেলস রাইটার্স ক্লাব সম্মাননা, ইংল্যান্ড জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন সম্মাননা, গান্ধী শান্তি পুরস্কার, ভারত নিকোলাই গোগোল ট্রায়াম্ফ আন্তরিক পুরস্কার সহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। সম্পাদিত পত্রিকা- রৌদ্রদিন।পদাবলি।
মঞ্চ ও টিভি উপস্থাপক।
ভ্রমণ -ভারত, নেপাল, দুবাই, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও চীন।
মোট কাব্যগ্রন্থ -৬০ টি
ক)ফিরিনি অবাধ্য আমি- ১৯৮৬ খ) ভেঙে আনো ভেতরে অন্তরে- ১৯৮৭ গ) সেইসব ছদ্মবেশ- ১৯৮৮ ঘ) আশ্চর্য আয়নাগুলো- ১৯৮৯ ঙ) আঙুলের জন্য দ্বৈরথ- ১৯৯০ চ) ওরা আমাকে খুঁজছিলো সম্ভাবনার নিচে- ১৯৯১ ছ) পৃথিবীতে ভোর হতে দেখিনি কখনো- ১৯৯৭ জ) পদশব্দ শোনো আমার কণ্ঠস্বর- ২০০৩ ঝ) পুনরুত্থান পর্ব- ২০০৪ ঞ) অভিশ্রুত বর্তমান- ২০০৫ ট) ভাঙা দালানের স্বরলিপি- ২০০৬ ঠ) চেয়েছি আলাদা হতে- ২০১০ ড) সব জন্মে শত্রু ছিলো যে- ২০১১ ঢ) স্তব্ধতার শোকবহি- ২০১৩ ঢ়) বায়োডাটা- ২০১৪ ণ) ও প্রভু ওঁম শান্তি নেই- ২০১৫ ত) জ্যামিতি বাক্সের গল্প- ২০১৬ থ) তদন্ত রিপোর্ট- ২০১৭ দ)অবুঝ জদুঘর- ২০১৮ ধ) সরলার সংক্ষিপ্ত জীবনী- ২০১৯ ন) প্রতিবিদ্যা- ২০২০ প) অস্ত্র ভাঙার মুহূর্ত- ২০২১ ফ) ডায়োজিনিসের লণ্ঠন- ২০২২
হাঁটতে থাকো (ছড়াগ্রন্থ) -২০০৮ ক) শৈশব (ছড়াগ্রন্থ) -২০১৪ খ) জলচাষী (ছড়াগ্রন্থ) -২০১৭ গ) রবীন্দ্রনাথ আরোগ্য(প্রবন্ধ) -২০১২ ঘ) নজরুলের আত্ম-নৈরাত্ম- ২০০৯ ঙ) নির্বাসিত তারুণ্য -১৯৯৬ চ)কাঠকয়লায় লেখা -২০১৭ ছ)দিব্যচোখে দেখছি -২০১৭ জ) একুশ প্রশ্ন এক উত্তর (সাক্ষাৎকার) -২০১৩ ঝ) প্রশ্নের পুরাণ(সাক্ষাৎকার) -২০১৪ ঞ) দু:সময়ের ইউলিসিস -২০১৭ রৌদ্রদিন, স্বরবর্ণ, পদাবলী। নৈঃশব্দের গান।
কাব্য সমালোচক ও পর্যালোচকরা মনে করেন, রেজাউদ্দিন স্টালিন তার সময় থেকে বেরিয়ে নতুন সময়কে আলিঙ্গন করতে উদগ্রীব।পুরাতনকে, প্রচল সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে নতুন দিন আবাহনের অগ্রদূত হতে চান।দরোজা কবিতায় স্পষ্ট করে বলেন-“আমাদের এখন বাইরে যেতে হবে,দরোজাটা ভেঙে হোক কিংবা ঘরটা।” আমাদের এখন বাইরে যেতে হবে, অবশ্যই যেতে হবে।
রেজাউদ্দিন স্টালিনের ‘সব জন্মে শত্রু ছিল যে”
কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে নির্মোহভাবে বললে বলা বায়—একটি সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত দর্শন-অভিমুখী নয় তার জীবনের অন্তর্গত সত্যের অন্বেষণ। একধরনের আপাতবিক্ষিপ্ত দার্শনিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি কাব্যের ‘আমিত্ব’ দাঁড়িয়েছে সেটা অনুধাবন করা যায়। তবে সুখের কথা হচ্ছে, কী বলা হচ্ছে তার চেয়ে কীভাবে বলা হচ্ছে-র ওপর শিল্প নির্ভরকরে বেশি। ফলে অনেকেই বলতে চান, শিল্প হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা, অবিশ্বাসযোগ্য সত্য নয়। সম্ভবত এই কারণেই কবিতার ইতিহাসের একটি বড় অংশ তার প্রকরণের ইতিহাস। এসব বিবেচনায় রেখেই পর্যালোচকজন স্টালিনের কাব্য বিশ্লেষণে সচকিত হয়েছেন।
কবিতা একটি ‘ব্যক্তিগত মানবিক জ্ঞান’। তবে এই ‘ব্যক্তিকতার’ মধ্যেও একধরনের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ থাকে। এই নৈর্ব্যক্তিকতা যদিও ব্যক্তি নির্ধারণ করে, তবুও সুনির্দিষ্ট কিছু নৈর্ব্যক্তিক গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়েই কিছু কবিতা কাল থেকে মহাকালে পাড়ি দেয়।
‘ সব জন্মে শত্রু ছিল যে’ কাব্যের নাম ভূমিকার কবিতাটি এমনই একটি কবিতা-—
প্রথম জন্মে যে কথা তা’ সিংহের স্বরে তারপর প্রতিটি জন্যে নৈরঞ্জনা নদী পার হওয়া অশথের তলে অন্বেষণ অনুশাসনের জগতের কর্তৃত্ব নিয়ে মুখোমুখি ধনুর্ধরদের ছিলা ছিঁড়ে যায় প্রমত্ত শুকিয়ে নদী শীর্ণ সহসা ঝলসে যায় পূর্ব পশ্চিম অধঃ ও ঊর্ধ্ব অদৃশ্য অক্ষশক্তি তার বাম হাতি হিংসবাহিনী বাণ ছোড়ে এলোমেলো লক্ষ্যভ্রষ্ট বল্লমের গতি চন্দ্রাতপ শিরদেশে অস্ত্রের আঘাত থেকে পুষ্প ঝরে পড়ে সূর্যাস্তের আগে স্বর্গ থেকে পথ নেমে আসে এক অগ্নিঝালর টাঙিয়ে রক্ষাব্যুহ হয় চেনা যায় সব জন্মে শত্রু ছিলো যে [পৃ. ২৬]
কিংবা, ‘চম্কে ওঠা কবিতা’র শেষাংশ—
জিজ্ঞাসারহিত আড়ষ্ট জিহ্বা দেখে চম্কে উঠেছি, অন্ধ ও খঞ্জের শাসন, আস্তিক ও অবিশ্বাসীর যুগল সংসার; গ্লানি-গৌরব একই মাতৃক্রোড়ে। মৃত্যু রক্ত পাপ ও পতন দেখে চমকে উঠি না প্রতিটি জন্ম দেখে চমকে উঠি নির্ভয়ে নীরবে। [পৃ. ২৮] অথবা, ‘কলম’ কবিতার এই অংশটুকু—
কলমতো জানে, আত্মার-অন্ধত্ব ভালো দৃষ্টিমানের চেয়ে; ভাল বিবেকের চেয়ে বোধের অঙ্কুর। যে অন্ধ সে অতৃপ্ত আর যে তৃপ্ত সে মৃত। [পৃ. ৩৪]
তবে নির্মোহভাবে দেখলে মনে হয়, রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতায় বক্তব্য প্রকরণের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে, প্রকরণ বক্তব্যের ওপর নয়।
কবিতার যে-কোনো আলোচনায় নন্দনের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবেই চলে আসে। পাঠশেষে মনে হয়, রেজাউদ্দিন স্টালিন ফুল ফোটার সৌন্দর্য যেমন অবলোকন করেন ঠিক তেমনি উপভোগ করেন কল চলার, সুড়কি ভাঙার সৌন্দর্যও ।
তাঁর ‘বাংলার বৃষ্টিনামে’, ‘বঙ্গভাষা’, ‘তবুও ফিরতে হবে’ ইত্যাদি কবিতাতে যেমন চিরায়ত সহজাত-উপমহাদেশীয় নন্দনের খোঁজ পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি ‘অসংগতি’, ‘রক্ত-পদচ্ছাপ’, ‘সৌন্দর্যতত্ত্ব’ ইত্যাদি কবিতাতে মতাদর্শনির্ভর নন্দনও বিরল নয়।
তাঁর কবিতায় বিষয়বস্তু হিসেবে কবি, কবিতা, সৌন্দর্যতত্ত্ব, ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্যের রাজনীতি, উন্নয়ন ভাবনা, অতীত-ঐতিহ্য, প্রকৃতি, সামগ্রিক মানবিক অর্জন, ধর্মতত্ত্বসহ সমকালীন বিভিন্ন অনুষঙ্গকে পাওয়া যায়। উপস্থাপিত বক্তব্য থেকে তাঁর সমাজ, ইতিহাস ও রাজনীতি-সচেতনতা এমনকি বিজ্ঞান- সচেতনতা ইত্যাদি গোচরীভূত হয়।
এইসব বিষয়বস্তুর কোনো কোনো অনুষঙ্গের ওপর তাঁর গভীর কিছু বলার অভিপ্রায় আছে বলেও মনে হয়। এই বলাবলি কল্পে কোথাও কোথাও তিনি অনেক কথা বলেও তেমন কিছু বলেননি, আবার কোথাও কোথাও তেমন কিছু না বলেই অনেক কিছু বলতে চেয়েছেন। যেমন ‘হয়ে ওঠে না’ কবিতাটিতে তেমন কিছু না বলেই গভীর কিছু বলার ইঙ্গিত প্রস্ফুটিত-—
পরীক্ষাগারে ভাইরাসের পর ভাইরাস তাদের পতন হয় না চিরন্তন সব প্রতিপদার্থ দৃশ্যমান হয় বাতাস ধরা দেয় খালি চোখে চুম্বক রাস্তায় টেনে আনে সব আকাঙ্ক্ষা কিন্তু হয়ে ওঠে না কিছুই জন্ম কিংবা মৃত্যু [পৃ. ১৪]
কিংবা, ‘প্রতিচ্ছেদ বিন্দু’ কবিতাটির শেষাংশতেও বিন্দুতে সিন্ধুর গভীরতা আছে বলেই মনে হয়-—
পৃথিবী ঘোরানোর অপরাধে যে পাদ্রী আহ্নিক গতির মুখে আগুন দিয়েছিলো সে এখন ইউরোপের সব জাদুঘরের কিউরেটর অগ্নিমঞ্চের ওপর বসে পাহারা দিচ্ছে ব্রুনোর দেহভস্ম [পৃ. ১৬]
নারী তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে তেমনভাবে আসেনি, এমনকি প্রকৃতিও। অনেক কবি নারী ও প্রকৃতির ভেতর দিয়েই জীবন ও জগৎকে দেখতে চান। এদিক থেকে তিনি স্বকীয় ও প্রশংসার্হ। তবে তাঁর নির্বাচিত বিষয়বস্তুর মধ্য দিয়ে দেশ, সমাজ, মানব ও নিজ সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রকটিত হয়েছে সেখানে কল্পনার তেমন কোনো অভিনবত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে বলে মনে হয়নি।
তাঁর বিজ্ঞান-চেতনাও ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে ফেরানো ঘটনা থেকে আহরিত। কিন্তু তাঁর কিছু কিছু কবিতার পংক্তি আমাদেরকে বেশকিছু কালোত্তীর্ণ কবিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন—‘পথের নির্বাচন’ কবিতাটি শামসুর রাহমানের ‘সুন্দরের গাথা’ কিংবা ‘খাদ’ কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিংবা ‘অসংগতি’ কবিতাটির দু’টি লাইন—
বক্তৃতা দেন অন্ধ তিনি আলোর কেমন বর্ণ, এসব শুনে লজ্জা পেলেন সূর্যছেলে কর্ণ ।
আমাদেরকে জীবনানন্দ দাশের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতাটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়!
এইরকম আরো উদাহরণ হয়তো দেওয়া যাবে। মানবের যে কোনো সৃষ্টি দুধরনের—মৌমাছির মতো ও মাকড়শার মতো। মৌমাছির মতো ফুলে ফুলে বিহার করে মৌচাকে মধু জমালে তাতে সৃষ্টি ও নির্মাণ দুই-ই থাকে। আর মাকড়শার মতো নিজের বুকের রসের সৃষ্টিতে যন্ত্রণা থাকে অত্যধিক কিন্তু এতে মৌলিকত্বের মাত্রা যায় বেড়ে।
কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন সমসাময়িক বাংলাদেশ অন্যতম উজ্জ্বল ও জনপ্রিয় মুখ। পরিশ্রমী এই কবি এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পেরেছেন তার কবিতায়। আল মাহমুদের মুখে শুনেছি। তিনি বলেছেন, ষাটের দশকে নির্মলেন্দু গুণ,সত্তুরের দশকে আবিদ আজাদ এবং আশির দশকে রেজাউদ্দিন স্টালিনকে কবি স্বীকৃতি দিয়ে তিনি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।এভাবে মহৎ কবিদের স্বীকৃতি পেয়েছেন স্টালিন।
কবি স্টালিনের অনেক কবিতায় এসেছে মিথ। ব্যবহার করেছেন যথার্থ ভাবে, যা কবিতার বক্তব্য কে দৃঢ় করেছে। কোন কোন কবিতা তিনি গ্রীক, রোমান, ভারতীয় ও অন্যান্য মিথ একসাথে গেঁথেছেন কবিতায়। তাতে কবিতা আরো বেশী অর্থময় হয়ে উঠেছে—
জীবনের নিজস্ব নদী আছে বালি ও শামুক প্রতিটি ঢেউয়ের বাঁকে ভাঙনের স্বর তাকে চিনি প্রথা ছেঁড়া আগুনের পাখি প্রবাল দুঃখ থেকে জেগে ওঠা দারুচিনি দ্বীপ সর্বনাশ চোখে নিয়ে বসে থাকা দগ্ধ একিলিস (দগ্ধ একিলিস)
‘কতদূর ইথাকা’ কবিতায় তিনি বললেন—
অনেকদূর হেঁটে এসে পেছনে তাকালে আর বাড়ি দেখা যায় না দৃষ্টির সূর্যপথ উঠে যায় মেঘবৃক্ষে পেছনে কার বাড়ি চণ্ডীদাসের নাকি কাহ্নপার জ্ঞানদাস একবার বিদ্যাপতির নিমন্ত্রণে এসে পথ হারিয়ে বহুদিন আলাউলের অতিথি ছিলেন আর কালিদাসের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও যেতে পারেননি মোহাম্মাদ সগীর……।
মানব জীবনের প্রেম,স্বপ্ন, আশা, সুখ দুঃখ তিনি সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর কবিতায়—
“জীবন এক পুড়ে যাওয়া প্রতিবিম্ব আর মৃত্যু চা-পাতার ঘোড়া টগবগ করছে দরোজার ডেকচিতে প্রেম-এক প্রযুক্তি যা উৎপাদন করে অদৃশ্য জানালা স্মৃতি-অদ্ভুত পাঠাগার যার বই পড়ে দীর্ঘশ্বাস স্বপ্ন-ফেলে আসা জাদুঘর যেখানে হাওয়ার হামলায় লুকিয়ে থাকে বর্ষাতি আশারা-ময়ূর পালকে স্থাপিত আর্গাসের শত শত-চোখ ।”
প্রেরক:
গাজী গিয়াস উদ্দিন
পোর্ট অবদি পয়েট, দেওয়ান বাড়ি রোড
বাগবাড়ি, লক্ষ্মীপুর ৩৭০০।
০১৬১২৯৪২২৯৬
৫ ডিসেম্বর ২০২৫

