জোয়ান ক্রফোর্ড: দারিদ্র্য জয় করে হলিউডের অমর তারকা হয়ে ওঠার গল্প
জোয়ান ক্রফোর্ডের জীবন ছিল ঠিক কোনো রূপকথার মতো। তবে এই রূপকথা কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তৈরি হয়নি; এটি তৈরি হয়েছিল তাঁর গায়ের ঘাম, অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ‘লুসিল ফে ল্যসুয়ার’ নামে জন্ম নেওয়া এই মেয়েটি কেবল নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে নিজেকে রূপালী পর্দার অন্যতম সেরা প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে তিনি কখনো সাধারণ নৃত্যশিল্পী হিসেবে, কখনো নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকদের মন জয় করেছেন। তিনি অস্কার জিতেছেন, বড় কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা হয়েছেন, এবং এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যা আজও মানুষকে মুগ্ধ করে। তাঁর এই জীবনকাহিনী হলো ঘুরে দাঁড়ানো, নিজেকে নতুন করে চেনা এবং নিখুঁত হওয়ার জন্য লড়াই করার এক অনন্য গল্প।
দশটি অধ্যায়ের মাধ্যমে তাঁর এই অসাধারণ জীবনকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিচে এর প্রথম তিনটি অধ্যায় দেওয়া হলো:
অধ্যায় ১: কঠিন শৈশব – লুসিল ল্যসুয়ার-এর লড়াই
১৯০৪ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে কোনো এক বছরের ২৩শে মার্চ (যদিও তিনি নিজে দাবি করতেন ১৯০৮ সাল) টেক্সাসের স্যান অ্যান্টোনিওতে লুসিল ফে ল্যসুয়ারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা থমাস ল্যসুয়ার ছিলেন একজন সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক। লুসিলের জন্মের পরপরই তিনি পরিবার ছেড়ে চলে যান। মা অ্যানা বেল এবং বড় ভাই হ্যাল-এর সাথে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হতে থাকেন লুসিল।
পরবর্তীতে তাঁর মা হেনরি ক্যাসিন নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন, যিনি ওকলাহোমার একটি থিয়েটার বা নাট্যশালা চালাতেন। থিয়েটারের পরিবেশে বড় হতে হতে ছোট লুসিল (যার ডাকনাম ছিল “বিলি”) নাচ এবং সিনেমার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু এর মধ্যেই এক দুর্ঘটনা ঘটে। পিয়ানো শেখা এড়াতে গিয়ে বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে তিনি পায়ে মারাত্মক চোট পান। বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার এবং ১৮ মাসের দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে তাঁর স্কুল এবং নাচ দুটোই বন্ধ হয়ে যায়।
১৯১৭ সালের মধ্যে আর্থিক ও আইনি সমস্যার কারণে এই পরিবারটি মিজৌরির কানসাস সিটিতে চলে আসে। সেখানে সেন্ট অ্যাগনেস অ্যাকাডেমি এবং পরে রকিংহাম অ্যাকাডেমিতে লুসিলকে “কাজের বিনিময়ে পড়াশোনা” করার সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, পড়াশোনার চেয়ে রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার আর মোছার কাজই তাঁকে বেশি করতে হতো। সংসারের অভাব মেটাতে তিনি মায়ের সাথে কাপড় কাচার কাজ করেন (পরবর্তীতে এই অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি লোহার কাপড়ের হ্যাঙ্গার একদম সহ্য করতে পারতেন না), রেস্তোরাঁয় পরিবেশিকার কাজ করেন এবং আরও নানা কঠোর পরিশ্রম করেন। দারিদ্র্য তাঁর কাছে শুধু একটি শব্দ ছিল না, ছিল প্রতিদিনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব আর অনবরত খাটুনি তাঁর মনে এই নরক থেকে মুক্তি পাওয়ার এক তীব্র জেদ তৈরি করে দেয়।
শৈশবের এই কঠিন দিনগুলোই তাঁকে জীবনের নিয়মকানুন এবং সফল হওয়ার ক্ষুধা শিখিয়েছিল। মেঝে মোছার বদলে তিনি স্টেজে দাঁড়িয়ে নাচার স্বপ্ন দেখতেন। আর সেই স্বপ্নই একদিন তাঁকে কানসাস সিটি থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।
অধ্যায় ২: ভাগ্যের সন্ধানে নাচ – থিয়েটার থেকে ব্রডওয়ের স্বপ্ন
নাচই ছিল লুসিলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার। তিনি স্থানীয় বিভিন্ন নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন এবং ভ্রাম্যমাণ নাচ-গানের দলে যোগ দেন। তাঁর এই প্রতিভা জাস্টিন শুবার্ট নামের এক নামী প্রযোজকের চোখে পড়ে। তিনি ১৯২৪ সালে নিউইয়র্কের বিখ্যাত ব্রডওয়ে থিয়েটারের একটি মিউজিক্যাল শো ‘ইনোসেন্ট আইজ’-এ লুসিলকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন।
নিউইয়র্কের সেই জাঁকজমকপূর্ণ সময়ে তিনি নিজের নাচকে আরও নিখুঁত করে তোলেন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিনোদন দুনিয়ায় টিকে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি তিনি শহরের আধুনিক সংস্কৃতিকে আপন করে নেন। এই সময়েই জেমস ওয়েলটন নামে এক স্যাক্সোফোন বাদকের সাথে তাঁর একটি সংক্ষিপ্ত বিয়ে হয়েছিল বলে শোনা যায়, তবে পরবর্তীতে তিনি কখনোই জনসমক্ষে এই বিষয়ে মুখ খোলেননি।
মঞ্চে নয়, বরং তাঁর জীবনের আসল সুযোগটি আসে ক্যামেরার সামনে একটি পরীক্ষার (স্ক্রিন টেস্ট) মাধ্যমে। ১৯২৪ সালের শেষের দিকে বিখ্যাত মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (MGM) স্টুডিও তাঁকে সপ্তাহে ৭৫ ডলার বেতনে একটি চুক্তির প্রস্তাব দেয়। ট্রেনের টিকিট কাটার মতো টাকাও তাঁর ছিল না, তাই ধার করে টাকা নিয়ে ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণী পাড়ি জমান পশ্চিমের শহর হলিউডে। হলিউড তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল, তবে তার আগে প্রয়োজন ছিল একটি নতুন পরিচয়ের।
অধ্যায় ৩: জোয়ান ক্রফোর্ডের জন্ম – নাম বদল এবং নিজেকে চেনার লড়াই
এমজিএম (MGM) স্টুডিওর কর্তাদের ‘লুসিল ল্যসুয়ার’ নামটা পছন্দ হয়নি (তাদের মনে হয়েছিল নামটা শুনতে নর্দমার মতো শোনায়)। তাই একটি সিনেমা পত্রিকার মাধ্যমে দর্শকদের কাছ থেকে নতুন নামের পরামর্শ চাওয়া হয়। প্রথমে ‘জোয়ান আর্ডেন’ নামটি চূড়ান্ত হলেও, সেই নামে অন্য একজন থাকায় শেষ পর্যন্ত ‘জোয়ান ক্রফোর্ড’ নামটি বেছে নেওয়া হয়। শুরুতে লুসিলের নিজেরই এই নামটা পছন্দ ছিল না, কিন্তু নিজের অতীত ভুলে এক নতুন জীবন শুরু করার জন্য তিনি এই নামটিকেই আপন করে নেন।
হলিউডের শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। তাঁকে খুব ছোট বা নামহীন চরিত্রে অভিনয় করতে হতো। এমনকি অন্য বড় অভিনেত্রীদের বডি ডাবল (প্রধান অভিনেত্রীর বদলে দূর থেকে শট দেওয়া) হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে। কাজের ধীর গতিতে হতাশ না হয়ে তিনি নিজেই নিজের ভাগ্য বদলাতে নেমে পড়েন। হলিউডের বিভিন্ন হোটেল ও সমুদ্র সৈকতে আয়োজিত নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি বিজয়ী হতে থাকেন। এর ফলে খবরের কাগজে তাঁর নাম আসতে শুরু করে এবং স্টুডিওর বড় বড় মালিকদের নজরে পড়েন তিনি।
অবশেষে ১৯২৫ সালে ‘স্যালি, আইরিন অ্যান্ড মেরি’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি বড় ধরনের সাফল্য পান। ১৯২৬ সালে তিনি ‘ওয়াম্পাস বেবি স্টার’ (ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় তারকা) হিসেবে স্বীকৃতি পান। এরপর তিনি আরও বেশ কিছু সিনেমায় সুযোগ পান। এই সময়ে তিনি পর্দার বড় বড় অভিনেতাদের, বিশেষ করে লন চ্যানির অভিনয় খুব মন দিয়ে দেখতেন। কীভাবে ক্যামেরার সামনে নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে হয় এবং আবেগকে জীবন্ত করতে হয়, তা তিনি এই সিনেমাগুলো দেখেই শিখেছিলেন—যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাঁকে হলিউডের শীর্ষে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
অধ্যায় ৪: আধুনিক যুগের প্রতীক ও নির্বাক সিনেমার তারকা – ‘আওয়ার ড্যান্সিং ডটার্স’ এবং খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ
জোয়ান ক্রফোর্ড হয়ে উঠেছিলেন জ্যাজ যুগের (Jazz Age) আধুনিক ও স্বাধীনচেতা নারীদের এক জীবন্ত প্রতীক। ১৯২৮ সালে ‘আওয়ার ড্যান্সিং ডটার্স’ (Our Dancing Daughters) সিনেমায় তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় তাঁকে একজন সাহসী, প্রাণবন্ত এবং গ্ল্যামারাস নারী হিসেবে দর্শকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করে। বিখ্যাত লেখক এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের মতে, জোয়ান ছিলেন সেই যুগের আধুনিক তরুণীদের একদম নিখুঁত উদাহরণ।
তিনি বেশ কিছু বিখ্যাত নির্বাক (কথাছাড়া) সিনেমায় অভিনয় করেন। এর মধ্যে ১৯২৭ সালের ‘দ্য আননোন’ (The Unknown) সিনেমায় তিনি লন চ্যানির বিপরীতে এক সার্কাস কর্মীর চরিত্রে অভিনয় করেন। “হাজার মুখের মানুষ” নামে পরিচিত এই মহান অভিনেতার কাছ থেকে জোয়ান অভিনয়ের অনেক মূল্যবান কৌশল শিখেছিলেন। এছাড়া তাঁর অন্যান্য নির্বাক সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘স্প্রিং ফিভার’ (১৯২৭) এবং ‘অ্যাক্রস টু সিঙ্গাপুর’ (১৯২৮)। এই সময়ে র্যামন নভারো এবং জন গিলবার্টের মতো বড় তারকাদের সাথেও তিনি জুটি বাঁধেন।
১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি এমজিএম (MGM) স্টুডিওর অন্যতম প্রধান সম্পদে পরিণত হন। তাঁর সুন্দর ধনুকের মতো বাঁকানো ভ্রু, আবেগভরা চোখ এবং একজন নৃত্যশিল্পীর মতো সুগঠিত শরীর পর্দায় এক জাদুকরী আলো তৈরি করত। জনসমক্ষে তিনি নিজেকে একজন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও গ্ল্যামারাস নারী হিসেবে তুলে ধরলেও, মনের গভীরে শৈশবের সেই দারিদ্র্যের দিনগুলোর ভয় তাঁকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত। নির্বাক সিনেমা তাঁকে খ্যাতির মঞ্চ এনে দিয়েছিল, তবে আসল পরীক্ষাটি আসতে চলেছিল সিনেমার জগতে শব্দের আগমনের সাথে সাথে।
অধ্যায় ৫: শব্দের বিপ্লব এবং এমজিএম-এর স্বর্ণযুগ – ‘গ্র্যান্ড হোটেল’ এবং ক্লার্ক গেবলের সাথে জুটি
সিনেমায় যখন প্রথম কথা বলা বা শব্দের (Talkies) ব্যবহার শুরু হলো, তখন অনেক নির্বাক যুগের তারকা ভয়ে পিছিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু জোয়ান ক্রফোর্ড নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিলেন। নিজের উচ্চারণের ত্রুটি দূর করতে তিনি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলেন। অভিধান দেখে দেখে জোরে জোরে পড়া এবং ভয়েস কোচের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করলেন। ১৯২৯ সালের ‘দ্য হলিউড রিভিউ’ সিনেমায় তাঁর প্রথম সবাক অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়।
১৯৩০-এর দশকের শুরুতে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। সেই সময়ের মহানায়ক ক্লার্ক গেবলের সাথে জুটি বেঁধে তিনি উপহার দেন একের পর এক সুপারহিট সিনেমা, যেমন— ‘ড্যান্স, ফুলস, ড্যান্স’ (১৯৩১), ‘লাফিং সিনার্স’ (১৯৩১) এবং ‘পজেসড’ (১৯৩১)। ১৯৩২ সালের বিখ্যাত সিনেমা ‘গ্র্যান্ড হোটেল’-এ (যা সে বছর সেরা চলচ্চিত্রের অস্কার জিতেছিল) গ্রেটা গার্বোর মতো কিংবদন্তি তারকাদের পাশে তিনি একজন সাধারণ স্টেনোগ্রাফারের চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন।
এই পুরো দশক জুড়ে তিনি ‘রেইন’ (১৯৩২), ফ্রেড অ্যাস্টেয়ারের সাথে ‘ড্যান্সিং লেডি’ (১৯৩৩), ‘স্যাডি ম্যাককি’ (১৯৩৪) এবং ‘দ্য উইমেন’ (১৯৩৯) এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তিনি মূলত এমন সব মধ্যবিত্ত বা খেটে খাওয়া নারীর চরিত্রে অভিনয় করতেন, যারা কঠোর পরিশ্রম করে জীবনে ওপরে উঠতে চায়। সেই সময়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দার (Great Depression) বাজারে সাধারণ মানুষ তাঁর এই চরিত্রগুলোর সাথে নিজেদের খুব সহজে মেলাতে পারত।
১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি হলিউডের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন হন। যদিও ১৯৩৮ সালে একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপনে তাঁকে এবং গ্রেটা গার্বোকে “বক্স অফিস পয়জন” (যাদের সিনেমা লস করছে) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, কিন্তু কাজের প্রতি জোয়ানের নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। সিনেমার লাইটিং, পোশাক এবং অভিনয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে তিনি সবসময় খুঁতখুঁতে থাকতেন।
অধ্যায় ৬: প্রেম, বিয়ে এবং সংসারের খোঁজ – গ্ল্যামারের আড়ালে ব্যক্তিগত লড়াই
জোয়ান ক্রফোর্ডের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর সিনেমার চেয়ে কম নাটকীয় ছিল না। তিনি মোট চারবার বিয়ে করেছিলেন:
ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস জুনিয়র (১৯২৯–১৯৩৩): হলিউডের এক ঐতিহ্যবাহী রাজপরিবারের ছেলের সাথে এই বিয়েটি জোয়ানকে অনেক সামাজিক মর্যাদা দিলেও, দুজনের অহংকার ও ক্যারিয়ারের লড়াইয়ের কারণে বিয়েটি টেকেনি।
ফ্র্যাঞ্চট টোন (১৯৩৫–১৯autom): তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত অভিনেতা। কিন্তু স্বামীর অতিরিক্ত মদ্যপান এবং জোয়ানের ক্যারিয়ারের প্রতি অন্ধ ভালোবাসার কারণে ১৯৩৯ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
ফিলিপ টেরি (১৯৪২–১৯৪৬): এই অভিনেতার সাথে বিয়ের সময় জোয়ান একটি সুন্দর সংসার ও সন্তান পাওয়ার জন্য খুব চেষ্টা করেছিলেন।
অ্যালফ্রেড স্টিল (১৯৫৫–১৯৫৯): তিনি ছিলেন বিখ্যাত পেপসি-কোলা (Pepsi-Cola) কোম্পানির চেয়ারম্যান। এই বিয়েটি জোয়ানের জীবনে স্থায়িত্ব এবং ব্যবসার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। কিন্তু ১৯৫৯ সালে অ্যালফ্রেডের হঠাৎ মৃত্যুতে এই সুখের অবসান ঘটে।
শারীরিক সমস্যার কারণে জোয়ান নিজে মা হতে পারেননি, তাই তিনি সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩৯-৪০ সালের দিকে তিনি ক্রিস্টিনা নামের একটি মেয়েকে দত্তক নেন। এরপর ক্রিস্টোফার নামে এক ছেলেকে এবং ১৯৪৭ সালে টেনেসি থেকে ক্যাথি ও সিন্থিয়া (“সিন্ডি”) নামে দুই যমজ বোনকে দত্তক নেন।
নিজের ক্যারিয়ারের মতো সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রেও জোয়ান ছিলেন চরম কঠোর ও নিখুঁত। কড়া রুটিন, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতে হতো সন্তানদের। তিনি তাঁর সন্তানদের সব ধরনের দামি সুযোগ-সুবিধা দিলেও, তাঁর এই অতিরিক্ত কঠোর আচরণ পরবর্তীতে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
অধ্যায় ৭: এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন – ‘মিলড্রেড পিয়ার্স’ এবং অস্কারের গৌরব
১৯৪৩ সালের মধ্যে জোয়ানের মনে হতে লাগল এমজিএম (MGM) স্টুডিও তাঁকে শুধু একই ধরনের গ্ল্যামারাস চরিত্রে আটকে রাখছে। তাই তিনি নিজের চুক্তি বাতিল করে ভালো চরিত্রের আশায় ‘ওয়ার্নার ব্রাদার্স’ (Warner Bros.) স্টুডিওতে যোগ দেন। সেখানে বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘মিলড্রেড পিয়ার্স’ (Mildred Pierce, 1945) সিনেমার প্রধান চরিত্রের জন্য তিনি আক্ষরিক অর্থেই লড়াই করেন।
এই সিনেমাটি ব্যবসায়িক এবং সমালোচক—উভয় দিক থেকেই বিশাল সাফল্য পায়। এক সংগ্রামী মায়ের চরিত্রে, যিনি রেস্তোরাঁ কর্মী থেকে কঠোর পরিশ্রমে একজন বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন কিন্তু শেষে নিজের মেয়ের কাছ থেকেই ধোঁকা পান—জোয়ানের এই জীবন্ত অভিনয় দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল। এই সিনেমার জন্য ১৯৪৬ সালে তিনি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার (Academy Award) লাভ করেন। এটি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
এরপর ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ‘হিউমারেস্ক’ (১৯৪৬) এবং ‘পজেসড’ (১৯৪৭, যার জন্য তিনি আবার অস্কারের মনোনয়ন পান) সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে দেন যে, তিনি শুধু ফ্যাশনেবল তরুণীই নন, বরং যেকোনো জটিল ও গম্ভীর চরিত্রেও সমান পারদর্শী।
অধ্যায় ৮: ক্যারিয়ারের শেষভাগ এবং নিজেকে নতুন করে চেনা – ‘বেবি জেন’ এবং হরর সিনেমা
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশক জোয়ানের জীবনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে আসে। ১৯৫২ সালে ‘সাডেন ফিয়ার’ সিনেমার জন্য তিনি ক্যারিয়ারের তৃতীয়বারের মতো অস্কার মনোনয়ন পান। এছাড়া ‘জনি গিটার’ (১৯৫৪) এবং ‘অটাম লিভস’ (১৯৫৬) এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে তিনি প্রশংসা কুড়ান।
এই সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা ছিল ১৯৬২ সালের ‘হোয়াট এভার হ্যাপেন্ড টু বেবি জেন?’ (What Ever Happened to Baby Jane?)। এই সিনেমায় তিনি তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেত্রী বেটি ডেভিসের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করেন। দুই বয়োবৃদ্ধ বোনের এই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমাটি দারুণ হিট হয় এবং দুই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারকেই নতুন জীবন দেয়। পর্দার বাইরে তাঁদের দুজনের আসল শত্রুতার খবর সিনেমার প্রচারণাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি বেশ কিছু হরর (ভীতিপ্রদ) সিনেমা, যেমন— ‘স্ট্রেট-জ্যাকেট’ (১৯৬৪) এবং টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৭০ সালের ‘ট্রগ’ (Trog) ছিল তাঁর জীবনের শেষ সিনেমা। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছিলেন এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন।
অধ্যায় ৯: পারিবারিক বিতর্ক এবং ‘মামি ডিয়ারেস্ট’-এর কালো ছায়া
জোয়ান ক্রফোর্ডের মৃত্যুর পর, তাঁর দত্তক নেওয়া বড় মেয়ে ক্রিস্টিনা ক্রফোর্ড ১৯৭৮ সালে ‘মামি ডিয়ারেস্ট’ (Mommie Dearest) নামে একটি স্মৃতিকথা বা বই প্রকাশ করেন। এই বইটিতে তিনি মায়ের বিরুদ্ধে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন, জোয়ান সন্তানদের ওপর অত্যন্ত কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দিতেন, মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে ঘরদোর পরিষ্কার করাতেন এবং লোহার হ্যাঙ্গারে কাপড় রাখার অপরাধে মারধর করতেন (যা পরবর্তীতে ‘ওয়্যার-হ্যাঙ্গার ঘটনা’ নামে পরিচিত হয়)। বইটিতে জোয়ানকে একজন মদ্যপ এবং এমন এক মা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যিনি পরিবারের চেয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এমনকি মৃত্যুর আগে জোয়ান তাঁর উইল বা সম্পত্তিতে ক্রিস্টিনা এবং ক্রিস্টোফারকে বঞ্চিত করে যান, যার কারণ হিসেবে লেখা ছিল— “তারা নিজেরাই এই কারণ ভালো করে জানে।”
বইটি প্রকাশের পর তা বিশ্বজুড়ে দারুণ সাড়া ফেলে এবং বিক্রির শীর্ষে চলে যায়। ১৯৮১ সালে এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি সিনেমাও তৈরি হয়। জোয়ানের এই রূপ দেখে সারা বিশ্বের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং জনমনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। জোয়ানের কিছু পুরনো কর্মচারী ও পরিচিত মানুষ ক্রিস্টিনার এই অভিযোগগুলোকে সত্য বলে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, জোয়ানের বাকি দুই জমজ মেয়ে ক্যাথি এবং সিন্ডি এই অভিযোগগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন যে ক্রিস্টিনা সস্তা প্রচারের জন্য বিষয়গুলোকে বাড়িয়ে বলেছেন। এই একটি বিতর্ক জোয়ান ক্রফোর্ডের সাজানো ইমেজকে চিরতরে বদলে দেয় এবং তাঁর আজীবনের সমস্ত সাফল্যকে আড়ালে ঠেলে দেয়।
অভিযোগগুলো কতখানি সত্যি আর কতখানি মিথ্যা—সেই বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। তবে এই ঘটনাটি মানুষকে একটি নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়: স্টারডম বা তারকা খ্যাতির পেছনে একজন মানুষকে কতটা চড়া মূল্য চোকাতে হয় এবং বাইরের পরিচ্ছন্ন ইমেজ বজায় রাখার পেছনে ভেতরের জীবন কতটা বিষাক্ত হতে পারে।
অধ্যায় ১০: সফল ব্যবসায়ী, শেষ অধ্যায় এবং চিরন্তন অমরত্ব
১৯৫৯ সালে স্বামী অ্যালফ্রেড স্টিলের মৃত্যুর পর, জোয়ান ক্রফোর্ড বিখ্যাত ‘পেপসি-কোলা’ (Pepsi-Cola) কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে (Board of Directors) যোগ দেন। সেই যুগে কোনো বড় কর্পোরেট কোম্পানির এত বড় পদে কোনো নারীর বসা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি পেপসির প্রচারের জন্য দিনরাত কাজ করেন এবং বিজ্ঞাপনের জন্য নামী পরিচালকদের নিয়োগ করেন। জীবনের এই পর্যায়টি প্রমাণ করে যে, অভিনয়ের বাইরেও ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং কঠোর পরিশ্রমে তিনি কতটা পারদর্শী ছিলেন।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ধীরে ধীরে লাইমলাইট বা প্রচারের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ১৯৭৭ সালের ১০ই মে, নিউইয়র্কের নিজের ফ্ল্যাটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে (হার্ট অ্যাটাক) এই মহান অভিনেত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (কিছু সূত্রে জানা যায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে ভুগছিলেন)। নিউইয়র্কের হার্টসডেলে অবস্থিত ফার্নক্লিফ কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
জোয়ান ক্রফোর্ড আজ আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন তাঁর জীবনের এই জটিলতাগুলোর জন্যই। তিনি ছিলেন নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার এক জীবন্ত উদাহরণ—একজন দরিদ্র মেয়ে, যে নিজের নাচ এবং লড়াইয়ের জোরে একদিন দুনিয়ার শীর্ষে পৌঁছেছিল। নির্বাক যুগের চঞ্চল তরুণী থেকে শুরু করে ‘মিলড্রেড পিয়ার্স’-এর এক সংগ্রামী মা, কিংবা ‘বেবি জেন’-এর এক মানসিক বিকারগ্রস্ত নারী—প্রতিটি চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
তাঁর জীবনকাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রূপালী পর্দার এই রূপকথার নায়িকারাও আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ—যাদের জীবনে যেমন ভুলত্রুটি ছিল, তেমনি ছিল জেদ, জয় আর ট্র্যাজেডি। কানসাস সিটির কাপর কাচার ঘর থেকে শুরু করে অস্কারের মঞ্চ এবং বড় কোম্পানির বোর্ডরুম—জোয়ান ক্রফোর্ড প্রমাণ করে গেছেন যে, প্রতিভা, শৃঙ্খলা আর অদম্য ইচ্ছা থাকলে একদম শূন্য থেকেও ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা সম্ভব।
তিনি কেবল হলিউডে টিকে ছিলেন না, বরং হলিউডকে নিজের মতো করে সাজিয়েছিলেন। আজ তাঁর চলে যাওয়ার বহু বছর পরেও, রূপালী পর্দার আলোয় তাঁর নামটি সমান উজ্জ্বল।
সমাপ্ত – অথবা বলা ভালো, তাঁর অনন্ত অমরত্বের শুরু।
এই দশটি অধ্যায়ের মাধ্যমে আমরা এমন এক নারীর জীবনকে দেখলাম, যিনি নিজের দারিদ্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন এবং সিনেমার ইতিহাসে এক অমলিন দাগ রেখে গেছেন। তাঁর সিনেমাগুলো আজও সিনেমা প্রেমীদের কাছে শিক্ষার মাধ্যম, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আজও আলোচনার বিষয় এবং তাঁর লড়াই করার ক্ষমতা আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়। জোয়ান ক্রফোর্ড সত্যিই শূন্য থেকে হলিউডের আকাশে এক অমর নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন।

