শিরোনাম —- নতুন ঠিকানা
ভোর তখন সবে মাত্র ফুটছে। জানালা দিয়ে আসা প্রথম আলোটুকু ঊর্মির চোখে পড়তেই একটা ঠান্ডা স্রোত যেন সারা শরীরে বয়ে গেল। এটা তার ঘরের আলো নয়। এটা তার নতুন ঠিকানার আলো—তার শ্বশুরবাড়ির।
বিয়ের পর আজ নিয়ে তিন দিন হলো। এখনো সবটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে। গতরাতে তার স্বামী, রনজয়, বলেছিল, “ঘুমাও, ঊর্মি। আর তোমায় নিজের ঘরে ফিরে যেতে হবে না।” কথাটা সামান্য হলেও ঊর্মির কানে যেন এক গভীর প্রতিজ্ঞা নিয়ে বেজেছিল।
ঊর্মি বালিশ ছেড়ে উঠে বসল। সাদা পাথরের মেঝেতে পা রাখতেই একটা শীতল স্পর্শ পেল। এই বাড়িতে সবটা তার কাছে নতুন, অচেনা—অথচ রনজয়কে ভালোবেসে সে স্বেচ্ছায় এই নতুন জীবনে এসেছে।
পাশের ঘরেই শাশুড়িমার থাকার কথা। শাশুড়িমা, মিসেস্ প্রতিমা সেন, মানুষটা খুবই রাশভারী। মুখে সবসময় একটা গম্ভীর ভাব লেগে থাকে। বিয়ের পর প্রথম দেখাতেই ঊর্মি তাকে প্রণাম করতে গেলে তিনি কেবল শান্তভাবে মাথায় হাত রেখেছিলেন, কোনো বিশেষ কথা বলেননি। ঊর্মির মনে হচ্ছিল, তিনি যেন তাকে নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
‘সকাল হয়ে গেল, আর কত ঘুম?’
দরজার কাছেই শাশুড়িমাকে দেখে ঊর্মি চমকে গেল। তিনি সামান্য ঝুঁকে মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা দেখিয়ে দিলেন। “এসব কী? এমন করে কাপড় ফেলে রাখলে চলবে না। আর দেখো, সাতটা বাজে। আমাদের বাড়িতে এই সময়ে জলখাবার তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। রনজয় না হয় দেরি করে ওঠে, কিন্তু তুমি এখন এ বাড়ির বউ। যাও, স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে যাও। তারপর রান্নাঘরে আমার সঙ্গে দেখা করো।”
ঊর্মির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার মা তাকে সকালে এত তাড়াতাড়ি কোনোদিন ডাকতেন না। মায়ের বাড়িতে সে হয়তো আটটা-নটার আগে বিছানাই ছাড়ত না। এই নতুন নিয়মের সাথে মানিয়ে নিতে তার কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।
“আসছি, মা,” কাঁপা গলায় বলল ঊর্মি।
স্নান সেরে যখন সে রান্নাঘরে পৌঁছাল, তখন প্রতিমা সেন রুটি বেলার পাটাতন নিয়ে বসে গেছেন। রান্নাঘরটা বেশ বড়, তবে কেমন যেন নীরব। ঊর্মির মনে পড়ল, তার মায়ের রান্নাঘরটা কত জীবন্ত থাকত—মায়ের গানের গুনগুন, বাবার খবরের কাগজের শব্দ আর ছোট ভাইয়ের নানা আবদার।
“দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে কেন? এই নাও, সবজিটা কেটে দাও। আর হ্যাঁ, আলুটা একদম সরু সরু করে কাটবে। রনজয় মোটা আলুর চচ্চড়ি খেতে পারে না,” প্রতিমা সেন বললেন। তার বলার ধরণটা এমন যে মনে হয় যেন তিনি আদেশ করছেন, পরামর্শ নয়।
প্রথম দিনের রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে ঊর্মি বারবার ভুল করতে লাগল। একবার সবজিতে নুন বেশি হয়, তো একবার রান্নার আঁচ ঠিক থাকে না। প্রতিমা সেন তাকে কিছু বলছিলেন না, শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলেন।
“মা, আমি কি ঠিক করছি?” ঊর্মি জিজ্ঞেস করল।
প্রতিমা সেন রুটি বেলার ফাঁকে একবার তাকিয়ে বললেন, “হাতের কাজ একবারেই শেখা যায় না, ঊর্মি। তবে শিখতে তোমায় হবেই। এটা তোমার দায়িত্ব। আমরা কোনো কাজের লোক রাখি না। এ বাড়ির কাজ এ বাড়ির বউই করবে।”
ঊর্মির চোখে জল এসে গেল। বাবার বাড়িতে সে হয়তো খুব বেশি রান্না করেনি, কিন্তু তার মা তাকে কখনো এভাবে বলেননি। তার মনে হচ্ছিল, এই বাড়িটা যেন একটা পরীক্ষা কেন্দ্র, আর সে এখানে একজন ফেল করা ছাত্রী।
সন্ধ্যার পর রনজয় অফিস থেকে ফিরল। সারাটা দিন ঊর্মি তারই প্রতীক্ষায় ছিল। রনজয় ঘরে ঢুকতেই ঊর্মি দৌড়ে তার কাছে গেল।
“আজ সারাদিন খুব একা লেগেছে, রনজয়,” ঊর্মি বলল।
রনজয় হেসে ঊর্মির হাত ধরে বলল, “আমি তো জানি। কিন্তু মন খারাপ করো না। মায়ের স্বভাবটা একটু এরকমই। উনি মুখে কম কথা বলেন, কিন্তু মনটা খুব ভালো। নতুন তো, তাই একটু কঠোর হচ্ছেন যাতে তুমি তাড়াতাড়ি সব শিখে নাও।”
ঊর্মি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিন্তু উনি কোনো ভুল হলেই এমনভাবে তাকান যে আমার ভয় করে। মনে হয় আমি যেন তার জন্য উপযুক্ত নই।”
রনজয় তার কপালে আলতো করে চুমু খেল। “আরে বোকা! তুমি আমার জন্য উপযুক্ত, আর এটাই যথেষ্ট। একটু মানিয়ে নাও। তুমি চেষ্টা করছো, এটা মা ঠিক দেখছেন।”
পরের দিন থেকে ঊর্মি নিজেকে আরও গুছিয়ে নিতে শুরু করল। সে মনে মনে স্থির করল, সে প্রমাণ করবে যে সে এই বাড়ির জন্য উপযুক্ত। সে খুব সকালে উঠে ঠাকুরঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করত। তারপর একাই চেষ্টা করত রান্নাঘরে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে। শাশুড়িমা এখন আর ততটা কঠোরভাবে কিছু বলতেন না। তবে এখনো নীরবতা বজায় ছিল।
একদিন দুপুরে, প্রতিমা সেন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাথা ঘুরছে আর শরীরটা দুর্বল লাগছে। ঊর্মি সেই মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল যে তিনি তার শাশুড়ি। সে যেন তার মাকে দেখছে।
“মা! কী হয়েছে আপনার? রনজয়কে ফোন করব?” ঊর্মি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“না না,” ক্ষীণ স্বরে বললেন প্রতিমা সেন, “সামান্য গ্যাস হয়েছে বোধ হয়। তুমি বরং একটু আদা দিয়ে লিকার চা করে আনো।”
ঊর্মি দ্রুত রান্নাঘরে ছুটে গেল। সে কেবল লিকার চা বানাল না, তার সাথে মায়ের শেখানো ঘরোয়া টোটকা অনুযায়ী একটু জোয়ান ও জল মিশিয়ে দিল। তারপর নিজের হাতে কাপটা শাশুড়িমার দিকে এগিয়ে দিল।
চা শেষ করে প্রতিমা সেন একটু শান্ত হলেন। তিনি কিছুক্ষণ ঊর্মির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চাহনিতে এবার আর কোনো কাঠিন্য ছিল না, ছিল এক ধরণের নরম অভিব্যক্তি।
“তোমার মায়ের হাতের কাজ বুঝি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
ঊর্মি মৃদু হাসল, “হ্যাঁ, মা। মা ছোটবেলায় অসুস্থ হলেই এই চা-টা করে দিতেন।”
“হুম,” প্রতিমা সেন বললেন, “রান্নাঘরে তুমি ভুল করছো, তাই বলে কখনো ভাববে না যে তুমি খারাপ বউ। তুমি সব শিখবে। তবে আমার শরীরটা আজকাল আর চলে না। আগেকার দিনে আমরা সব করতাম, এখন আর পারি না।”
কথাগুলো শুনে ঊর্মির চোখ ভিজে গেল। এই প্রথমবার শাশুড়িমা নিজের মনের কথা বললেন, নিজের দুর্বলতার কথা জানালেন। ঊর্মি এগিয়ে গিয়ে প্রতিমা সেনের হাতটা ধরে বলল, “মা, আমি তো আপনার মেয়েই। আমি সব সামলে নেব। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।”
পরের দিন সকালে, যখন ঊর্মি ঘুম থেকে উঠল, তখন দেখতে পেল বিছানার পাশে একটা ছোট ফুলের তোড়া রাখা। তার সাথে একটা চিরকুট—
প্রিয় ঊর্মি,
“আজ আর এত সকালে উঠতে হবে না। আমি জানি তুমি কাল রাতে আমার জন্য অনেক খেটেছো। তুমি বরং একটু বেলা করে ওঠো। জলখাবার আমি নিজেই তৈরি করেছি।”
— মা
ঊর্মির চোখে জল আর মুখে হাসি। এই বাড়িটার নীরবতা তার কাছে আর ভয়ংকর মনে হচ্ছে না। বরং এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার এক টুকরো রোদ যেন তার হৃদয়ে এসে পড়েছে। সে বুঝে গেল, শ্বশুরবাড়িটা কেবল একটা নতুন ঠিকানা নয়, এটা ভালোবাসার আরেকটি নাম, যেখানে একটু ধৈর্য আর যত্ন দিয়ে অচেনাকে চেনা করা যায়।

