Koustuv De Sarkar

শাখা-দাদু আর লতা-দিদিমার গল্প
✍️ কৌস্তভ দে সরকার

​আজ থেকে কয়েক হাজার বছর পরের কথা। যখন পৃথিবী থেকে রক্ত-মাংসের মানুষ বিলীন হয়ে গেছে। প্রকৃতি দখল নিয়েছে সবকিছুর। কিন্তু মানুষের আবেগগুলো তো আর সহজে মরে না! তারা আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল বনের গভীরে থাকা প্রাচীন কাঠ আর লতাগুলোর শরীরে। অরণ্যের ঠিক মাঝখানে বাস করতেন ‘শাখা-দাদু’ আর ‘লতা-দিদিমা’। তাদের শরীরটা ছিল শুকনো ডালপালা দিয়ে বোনা, আর হৃদপিণ্ডটা ছিল সজীব বটফলের মতো লাল।
​এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় যখন অরণ্যে ঝিঁঝিঁ পোকারা গান গাইছিল, শাখা-দাদু তার পুরনো লাঠিটায় ভর দিয়ে লতা-দিদিমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন, “হেই লতা, তোমার মনে আছে সেই কথা? যখন আমরা প্রথম এই মাটির ছোঁয়ায় বেড়ে উঠেছিলাম?” শাখা-দাদুর কাষ্ঠল গলায় জানতে চাওয়া প্রশ্নের উত্তরে লতা-দিদিমা তার চুলের খোঁপায় আটকানো শুকনো ডালগুলো একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন, “মনে থাকবে না আবার? তুমি তো তখন একটা সাধারণ ভাঙা ডাল ছিলে। আমিই তো তোমাকে মায়া দিয়ে জড়িয়ে পূর্ণতা দিলাম।”
​ঠিক তখনই সেখান দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল অদ্ভুত এক নীল ডানার প্রজাপতি, নাম তার ‘নীলু’। সে আলতো করে শাখা-দাদুর কাঁধে বসে ফিসফিস করে বলল, “দাদু, অরণ্যের রাজা ‘মহাস্থবির বট’ আজ রাতে তোমাদের ডেকেছেন, জানো কী? আজ রাতে নাকি তোমাদের সেই বিখ্যাত ‘জৈব-নৃত্য’ পরিবেশন করতে হবে।” শাখা-দাদু প্রত্যুত্তরে ঘাড় নাড়লেন। বললেন, “হ্যাঁ, জানি, জানি!”
​গভীর রাতে বনের সব প্রাণীরা জড়ো হলো। মহাস্থবির বট তার ঝুরি নামিয়ে বললেন, “শোনো শাখা আর লতা, তোমরা দুজন শুধু কাঠের পুতুল নও। তোমরা হলে মানুষের রেখে যাওয়া শেষতম ভালোবাসা। আজ সেই মহাজাগতিক রাত। আজ রাতে তোমরা যদি একে অপরের হাত ধরে নাচতে পারো, তবেই এই বনে আবার প্রাণের বসন্ত ফিরে আসবে।” তারা রাজি হল। কিন্তু সমস্যা একটা হচ্ছিল। সেটা হল, শাখা-দাদুর পায়ে একটা ঘুণপোকা ধরেছিল, যা তাকে নড়তে দিচ্ছিল না।
​ঘুণপোকা (টিকটিক শব্দে) : “আমি একে ছাড়ব না! মানুষের ভালোবাসা যদি এতই শক্তিশালী হয়, তবে দেখি এই শুকনো কাঠ কীভাবে বাঁচে!” লতা-দিদিমা ভয় পেলেন না। তিনি নিজের শরীর থেকে একবিন্দু রস বের করে শাখা-দাদুর পায়ে ঢেলে দিলেন। তিনি বললেন, “ভালোবাসায় কোনোদিন ঘুণ ধরে না। আমার প্রাণরস তোমাকে সতেজ করবে।” আশ্চর্যজনকভাবে, দাদুর পায়ের সেই শুকনো ডাল থেকে ছোট ছোট সবুজ কুঁড়ি বের হতে শুরু করল। আর সাথে-সাথেই ঘুণপোকাটি সেই সৃজনের আলোর ছটায় পালিয়ে গেল।
​শাখা-দাদু আর লতা-দিদিমা একে অপরের হাত ধরলেন। তারা সেই বটের ছায়ায় ঘুরতে শুরু করলেন। তাদের পায়ের ঘর্ষণে যে সুর তৈরি হচ্ছিল, তা যেন কোনো হারানো দিনের বেহালা। তারা প্রাণভরে নাচ শুরু করলেন। নাচের একফাঁকে শাখা-দাদু লতা-দিদিমাকে বললেন, “লতা, আমার ডালপালাগুলো যদি ভেঙে যায়?” লতা-দিদিমা বললেন, “ভয় পেও না। আমি চির-সঞ্জীবনী লতা হয়ে তোমাকে আবার বেঁধে নেব। ভালোবাসা চির অমর। তাই, মরণ আমাদের কখনোই আলাদা করতে পারবে না।” দেখা গেল, নাচতে নাচতে তাদের কাঠের শরীর থেকে ফুল ফুটতে শুরু করল। পুরো অরণ্য এক অদ্ভুত সুন্দর গন্ধে ভরে উঠল। বনের পশুপাখিরা দেখল, সেই কাঠের পুতুল দুটো আর পুতুল নেই; তারা যেন পরস্পর মিলেমিশে গিয়ে একটা বিশাল প্রাণবন্ত গাছে পরিণত হচ্ছে।
​সকালে যখন সূর্য উঠল, দেখা গেল সেই অরণ্যে কোনো কাঠের পুতুল নেই। আছে শুধু দুটি একে অপরকে জড়িয়ে ধরা সুন্দর লতা-গুল্মের চারা। অরণ্যের বাসিন্দারা জানল, শাখা আর লতা এখন আর আলাদা নয়। তারা এখন এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণের অংশ। মানুষ চলে গেলেও তাদের ‘মায়া’ আর ‘ভালোবাসা’ এভাবেই প্রকৃতির অঙ্গে অঙ্গে অমর হয়ে রইল। যার ফলশ্রুতিতে এক নতুন অরণ্যের জন্ম দিল।
​সেই মহা-নৃত্যের অনেক বছর পরের কথা। লতা-দিদিমা আর শাখা-দাদু এখন সেই মহান গাছেরই দুটি ডাল, যারা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে মাঝে মাঝে শাখা-দাদুর পুরনো দিনের কথা খুব মনে পড়ে। একদিন বিকেলে, যখন নরম রোদ মহাস্থবির বটের পাতার ফাঁক দিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসছিল, শাখা-দাদু তার নিজের দিকে তাকালেন। তার গায়ে এখন অজস্র সবুজ পাতা, ফুল আর ফল। কিন্তু তার ভেতরের শুকনো কাঠের অস্তিত্বটা আজও তিনি অনুভব করতে পারেন।
​হঠাৎ করেই তার পাশে একটি ছোট কাঠবিড়ালি ছানা, যার নাম ‘ছুটু’, লাফিয়ে এল। ছুটু খুব দুষ্টু ছিল। সে এসে শাখা-দাদুর কাঁধ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। ছুটু বলল, “দাদু, দাদু! তুমি কি এখন একাই এত বড় গাছ হয়ে গেছ? আমার তো বিশ্বাসই হয় না!” শাখা-দাদু মৃদু হেসে উঠলেন। সেই হাসিটা এখন আর কাঠের মতো কর্কশ নয়, বরং পাতার মর্মরের মতো স্নিগ্ধ। শাখা-দাদু বললেন, “না রে ছুটু, একা নয়। লতা সবসময় আমার পাশেই আছে। এই যে দেখছিস আমার এই শক্ত কাঁধ, এটা লতারই শক্তি। তবে মাঝে মাঝে আমার সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন আমি শুধু একটা ভাঙা ডাল ছিলাম, আর লতা আমাকে মায়া দিয়ে নতুন করে গড়েছিল।”
​ছুটু মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে দেখল, শাখা-দাদুর একটি ডাল থেকে হঠাৎ একটি শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। সেই পাতাটি যেন অতীতের কোনো স্মৃতির প্রতীক। শাখা-দাদু : “জানিস ছুটু, সেদিন যখন ঘুণপোকা আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল, আমি ভেবেছিলাম আমার সব শেষ। কিন্তু লতার ভালোবাসা আমাকে নতুন জীবন দিল। আমার এই প্রতিটি পাতা, প্রতিটি ফুল, সব ওরই দেওয়া।” ছুটু নরম গলায় বলল, “তাহলে তো দাদু, তোমরা দুজনেই এই অরণ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণ। তোমাদের ভালোবাসাই সব কিছুকে বাঁচিয়ে রাখে।” শাখা-দাদু গভীর শ্বাস নিলেন। তার সেই শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে যেন অরণ্যের সব গাছপালা একসঙ্গে কথা বলে উঠল। তিনি ছুটুর মাথায় আলতো করে একটা নতুন পাতা ফেলে দিলেন। আর বললেন, “ভালোবাসা শক্তি নয় রে ছুটু। ভালোবাসা হলো সেই শেকড়, যা সব শক্তিকে ধরে রাখে।”
​সেই বিকেলে, শাখা-দাদু পুরনো স্মৃতিতে ডুব দিয়েছিলেন, কিন্তু তার একাকীত্ব আর নেই। লতার উপস্থিতি আর নতুন প্রাণের প্রতি ভালোবাসা তাকে পূর্ণতা দিয়েছে।

Comment