লি বাই (৭০১–৭৬২) — যিনি লি পো বা লি বো নামেও পরিচিত — চীনা ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং টাং রাজবংশের (৬১৮–৯০৭) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই সময়কালকে প্রায়ই চীনা কবিতার “স্বর্ণযুগ” বলা হয়ে থাকে। দু ফু-র পাশাপাশি, তাঁকেও টাং যুগের দুই মহান কবির একজন হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়।
লি বাই-এর কবিতা তাঁর রোমান্টিক চেতনা, সাহসী কল্পনা, তাওবাদী স্বাধীনতা, প্রকৃতির প্রতি প্রেম (বিশেষ করে পাহাড় ও নদী), গভীর বন্ধুত্ব এবং মদের আনন্দ উদযাপনের জন্য বিখ্যাত। তাঁর পংক্তিগুলো শুনলে মনে হয় যেন কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে, চাঁদের আলোয় এক কাপ মদ হাতে এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেলা হয়েছে।
১. নিঝুম রাতের ভাবনা
(চীনা ভাষার অন্যতম বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বেশি মুখস্থ করা কবিতা।)
আমার বিছানার সামনে চাঁদের আলো ঝলমল করে,
মনে হয় যেন মাটির বুকে জমে থাকা হিমেল তুষার।
মাথা তুলে আমি সেই উজ্জ্বল চাঁদকে দেখি,
তারপর মাথা নিচু করে আমার দেশের কথা ভাবি।
২. চাঁদের আলোয় একাকী মদ্যপান
(নিঃসঙ্গতা, কল্পনা এবং আনন্দের এক অনন্য সৃষ্টি।)
ফুলের মাঝে এক কলসি মদ —
পাশে কেউ নেই, আমি একাই পান করছি।
আমি আমার কাপটি তুলে উজ্জ্বল চাঁদকে আমন্ত্রণ জানাই;
আর আমার ছায়াকে নিয়ে, আমরা তিনজন হয়ে উঠি।
হায়, চাঁদ তো জানে না কীভাবে মদ পান করতে হয়;
আর আমার ছায়াও কেবল বৃথাই আমাকে অনুসরণ করে।
আপাতত এই চাঁদ আর ছায়াই আমার সঙ্গী —
বসন্ত ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আনন্দ মেতে উঠতে হবে।
আমি গান গাই — চাঁদ থমকে দাঁড়ায় আর দুলতে থাকে;
আমি নাচি — আমার ছায়াও এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
যতক্ষণ সজ্ঞান আছি, আমরা একসাথে আনন্দ ভাগ করি;
যখন মাতাল হয়ে যাই, আমরা যে যার পথে চলে যাই।
এসো আমরা এক আত্মিক বন্ধন গড়ে তুলি,
আর বহুদূরের ছায়াপথে আবার একে অপরের দেখা পাই।
৩. ওয়াং লুন-এর উদ্দেশ্যে
(বিদায়বেলায় লেখা বন্ধুত্বের এক হৃদয়স্পর্শী কবিতা।)
লি বাই ইতিমধ্যেই নৌকায় চড়ে বসেছে, এখনই ছেড়ে যাবে,
তখনই হঠাৎ তールの দিক থেকে পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো।
এ তো ওয়াং লুন, যে তাকে বিদায় জানাতে এসেছে —
তার গাওয়া গানটি এই ‘পিচ ব্লসম’ হ্রদের চেয়েও গভীর।
৪. ভোরে বাইদি নগরী ত্যাগ
(নির্বাসন থেকে মুক্তির পর স্বস্তি ও তীব্র গতির এক বহিঃপ্রকাশ।)
ভোরে রঙ-বেরঙের মেঘের মাঝে আমি বাইদি নগরী ছেড়েছিলাম,
আর মাত্র একদিনেই এক হাজার লি দূরের জিয়াংলিং-এ ফিরে এলাম।
দুই তীরের বানরদের চিৎকার থামার আগেই,
আমার হালকা নৌকাটি ইতিমধ্যে দশ হাজার পাহাড় পার হয়ে গেছে।
৫. লু পাহাড়ের জলপ্রপাতের দিকে তাকিয়ে
(প্রকৃতির এক প্রাণবন্ত, প্রায় চলচ্চিত্রের মতো বর্ণনা।)
সূর্যের আলো এসে পড়েছে ধূপদানির মতো দেখতে সেই পাহাড়ি চূড়ায়,
যার থেকে বেগুনি রঙের ধোঁয়া কুয়াশার মতো উঁচুতে উঠছে।
বহুদূর থেকে মনে হচ্ছে জলপ্রপাতটি যেন নদীর সামনে ঝুলে আছে —
জলধারা তিন হাজার ফুট নিচে আছড়ে পড়ছে,
যেন স্বর্গের নবম আকাশ থেকে আস্ত এক ছায়াপথ নেমে আসছে।
৬. জিংটিং পাহাড়ে একাকী বসা
(প্রকৃতির সাথে একাত্মতা ও গভীর নির্জনতার কবিতা।)
সব পাখি উড়ে গেছে দূর আকাশে;
একটিমাত্র মেঘ অলসভাবে একাকী ভেসে চলেছে।
আমরা কেউ কারও দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত হই না —
কেবল আমি আর এই জিংটিং পাহাড়।
৭. ইয়োলো ক্রেন টাওয়ারে মং হাওরানকে বিদায়
(তাঁর বন্ধু তথা বিখ্যাত কবি মং হাওরানকে উৎসর্গ করা একটি বিদায়ী কবিতা।)
আমার পুরনো বন্ধু ইয়োলো ক্রেন টাওয়ার ছেড়ে পশ্চিমে চলে যাচ্ছে;
বসন্তের কুয়াশাময় ফুলের মাঝে সে নদী বেয়ে ইয়াংঝুর দিকে চলেছে।
দূরের সেই পালের নৌকাটি নীল আকাশে মিলিয়ে গেল,
আর এখন আমি কেবল দিগন্তের দিকে বয়ে চলা দীর্ঘ নদীটিই দেখতে পাচ্ছি।
৮. মদ নিয়ে এসো
(জীবন, উদযাপন এবং ভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখা লি বাই-এর অন্যতম দীর্ঘ ও বিখ্যাত কবিতা।)
তুমি কি দেখছ না কীভাবে স্বর্গ থেকে হলুদ নদী বয়ে আসছে,
যা আরអេឡិចត្រូនិច কখনোই সমুদ্রে ফিরে যাবে না?
তুমি কি দেখছ না সেই রাজকীয় হলের উজ্জ্বল আয়নাটি,
যা সকালে সাদা চুলের জন্য শোক করে, অথচ গোধূলিতে তা বরফের মতো শুভ্র হয়ে যায়?
জীবন যতক্ষণ আনন্দের, তাকে পুরোপুরি উপভোগ করো —
তোমার সোনার পাত্রটিকে চাঁদের সামনে খালি পড়ে থাকতে দিও না!
ঈশ্বর আমাকে প্রতিভা দিয়েছেন, তা অবশ্যই কাজে লাগবে;
হাজারটি সোনার মুদ্রা খরচ হয়ে গেলেও তা আবার ফিরে আসবে।
… (কবিতাটি জীবনকে সাহসের সাথে বাঁচার এবং মদ্যপানের তীব্র আহ্বান নিয়ে আরও এগিয়ে গেছে।)
৯. বসন্তের সকালে ঘুম ভাঙা
(জীবনকে একটি স্বপ্ন হিসেবে দেখার হালকা অথচ দার্শনিক ভাবনা।)
এই পৃথিবীর জীবন তো একটা বড় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয় —
তাহলে আমি কেন এত খাটুনি আর পরিশ্রম করব?
তাই সারাটা দিন আমি মাতাল হয়ে থাকি,
আর আমার দরজার সামনের বারান্দায় অবশ হয়ে পড়ে থাকি।
যখন আমার ঘুম ভাঙে, আমি বাগানের ঘাসের দিকে পিটপিট করে তাকাই;
ফুলের মাঝে একটি পাখি গান গাইছে।
আমি সেই গান গাওয়া পাখিটিকে জিজ্ঞেস করি, “এখন কোন ঋতু?”
কিন্তু পাখিটি তার কণ্ঠে বসন্তের হাওয়া নিয়ে গান গেয়েই চলে।
তাতে আবেগাপ্লুত হয়ে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি এবং নিজেকেই প্রশ্ন করি:
যতক্ষণ সময় আছে, আমার কি উচিত নয় মদ্যপান করে আনন্দ করা?
১০. পাহাড়ে প্রশ্নোত্তর
(তাওবাদী দর্শনে মোড়া একটি চটজলদি সংলাপ।)
তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো কেন আমি এই সবুজ পাহাড়ে বাস করি —
আমি মৃদু হাসি, কোনো উত্তর দিই না; আমার মন শান্ত ও স্থির।
পিচ ফুলগুলো জলের ওপর ভেসে দূর থেকে দূরে হারিয়ে যায়;
এখানে এক অন্য স্বর্গ আর পৃথিবী রয়েছে, যা এই সাধারণ জগতের অংশ নয়।
টাং রাজবংশের রোমান্টিক ও মুক্ত-স্বাধীন আত্মাকে লি বাই-এর মতো করে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। তাঁর এই পংক্তিগুলো আজও বিশ্বজুড়ে পাঠকদের তাদের সৌন্দর্য, রসবোধ এবং গভীর বিস্ময়বোধ দিয়ে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
লি বাই (Li Bai, ৭০১–৭৬২)
লি বাই ছিলেন চীনা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিভাবান ও রোমান্টিক কবিদের একজন। তাং রাজবংশের (Tang Dynasty) স্বর্ণযুগে তিনি দু ফু-এর সঙ্গে চীনের দুই শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁকে “কবি অমর” (Poet Immortal / 诗仙 Shīxiān) বলা হয়। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা, উদার কল্পনা, প্রকৃতির গভীর অনুভূতি, বন্ধুত্ব এবং মদের আনন্দ অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা, ভ্রমণপ্রিয় ও দার্শনিক কবি।
জন্ম ও প্রথম জীবন
লি বাই-এর জন্ম ৭০১ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে। অনেকে মনে করেন তিনি মধ্য এশিয়ার সুয়াব (বর্তমান কিরগিজস্তান) অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, আবার কেউ কেউ বলেন তিনি চীনের সিচুয়ান প্রদেশে জন্মেছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা সম্ভবত তাং সম্রাটদের বংশধর ছিলেন বলে দাবি করা হতো।
শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি কনফুসিয়ান ও দাওবাদী (Daoist) দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং অল্প বয়সেই কবিতা লিখতে শুরু করেন। যৌবনে তিনি গৃহত্যাগ করে দেশভ্রমণ শুরু করেন। তাঁর জীবন ছিল স্বাধীন ও অস্থির — তিনি পাহাড়-পর্বত, নদী ও প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন।
আদালতের জীবন ও রাজকীয় অনুগ্রহ
৭৪২ সালে লি বাই সম্রাট জুয়ানজং-এর (Xuanzong) দরবারে যোগ দেন। সম্রাট তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে “অমর কবি” উপাধি দেন এবং রাজকীয় আদালতে সম্মানজনক পদ দেন। এই সময় তিনি বিখ্যাত সুন্দরী ইয়াং গুইফেই-এর (Yang Guifei) জন্য কয়েকটি অমর কবিতা রচনা করেন, যার মধ্যে (Qīng Píng Diào) সিরিজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু দরবারের জীবন তাঁর স্বাধীন স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ছিল না। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও দরবারীদের ঈর্ষার কারণে ৭৪৪ সালে তিনি আদালত থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন।
নির্বাসন, ভ্রমণ ও বন্ধুত্ব
আদালত ত্যাগের পর লি বাই আবার দেশভ্রমণ শুরু করেন। এই সময় তিনি আরেক মহান কবি দু ফু-এর সঙ্গে পরিচিত হন। দু ফু লি বাই-কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। লি বাই-এর জীবন ছিল দারিদ্র্য, ভ্রমণ, মদ্যপান ও কবিতা রচনায় ভরা। তিনি প্রায়শই মদ খেয়ে কবিতা লিখতেন এবং তাঁর অনেক বিখ্যাত কবিতা এই অবস্থায় রচিত হয়েছে।
তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদের বেদনা এবং জীবনের অনিত্যতা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি দাওবাদী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং স্বাধীনতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মিলনকে জীবনের আদর্শ বলে মনে করতেন।
সাহিত্যকর্ম ও শৈলী
লি বাই-এর কবিতা অত্যন্ত রোমান্টিক, কল্পনাপ্রবণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি প্রচলিত নিয়ম ভেঙে স্বাধীনভাবে লিখতেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- (Jìng Yè Sī) — শান্ত রাতের চিন্তা (Quiet Night Thoughts)
- (Yuè Xià Dú Zhuó) — চাঁদের নিচে একা মদ্যপান
- (Jiāng Jìn Jiǔ) — মদ আনো (Bring in the Wine)
- (Wàng Lú Shān Pù Bù) — লু পর্বতের জলপ্রপাত দেখা
- (Zèng Wāng Lún) — ওয়াং লুনকে উপহার
তাঁর কবিতায় প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানবিক অনুভূতি এবং জীবনের আনন্দ-বেদনা অসাধারণ দক্ষতায় ফুটে উঠেছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
৭৬২ খ্রিস্টাব্দে লি বাই আনহুই প্রদেশের দাংতুতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু নিয়েও অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে — কেউ বলেন তিনি নদীতে চাঁদ ধরতে গিয়ে ডুবে মারা যান, আবার কেউ বলেন তিনি অসুস্থ অবস্থায় মারা যান।
লি বাই চীনা কবিতার ইতিহাসে এক অমর নাম। তাঁর কবিতা শুধু চীনেই নয়, সারা বিশ্বে অনুবাদ হয়েছে এবং আজও পাঠকদের মুগ্ধ করে। তিনি চীনা রোমান্টিক কবিতার প্রতীক হয়ে আছেন। তাঁর স্বাধীনতা-প্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী ও কল্পনাপ্রবণ শৈলী পরবর্তী অনেক কবিকে প্রভাবিত করেছে।
চীনা সাহিত্যে দু ফু যেখানে বাস্তবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক, সেখানে লি বাই হলেন রোমান্টিকতা, স্বাধীনতা ও কাব্যিক কল্পনার প্রতীক।