বাংলাদেশের একমাত্র মুসলিম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মণিপুরি মুসলমান, মৈতৈ পাঙাল বা পাঙাল জনজাতির সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা
মো. আব্দুস সামাদ
ভূমিকা
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ ভুবনে মণিপুরি মুসলমান, মৈতৈ পাঙাল বা পাঙাল সম্প্রদায় একটি অনন্য স্বাতন্ত্র্য বহন করে। দেশের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এটি একমাত্র মুসলিম জনজাতি—যাদের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবন-ধারা মূলধারার মুসলমানদের থেকে ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্প্রদায়ের সাহিত্যকর্ম, মৌখিক ঐতিহ্য কিংবা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা এখনো পর্যাপ্তভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। ফলে সাংস্কৃতিক বিলোপের ঝুঁকি, ইতিহাসচ্যুতি এবং পরিচয়ের সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের মণিপুরি মুসলমান জনজাতির সাহিত্যচর্চা সময়ের দাবি—তাদের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
১. ইতিহাস ও পরিচয়ের সংরক্ষণ
মণিপুরে মুসলমানদের অনুগমণ মধ্যযুগ থেকে শুরু হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম লগ্নে সেখানকার রাজপরিবারের অন্তর্কলহের সূত্র ধরে মুসলিম সৈন্যদের মণিপুরে অনুগমন ঘটে। মণিপুরে আসা এই মুসলিম সৈন্যরা মণিপুরের রাজার প্রস্তাব মেনে মণিপুরি নারী বিবাহ করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন, লাল্লুপ ব্যবস্থায় (রাজকীয় কর্মব্যবস্থা) অন্তর্ভুক্তি, পাঙাল সাংলেন নামে বিশেষ প্রশাসনিক দপ্তর ও পাঙাল ফুন্দ্রেই, পাঙাল ফুসাবা, পাঙাল ইন্খোল, পাঙাল সিঙ্গা প্রভৃতি বিভিন্ন বিভাগ স্থাপন, বিভিন্ন পেশানুসারে য়ুম্নাক বা উপাধি প্রদান, পর্যায়ক্রমে মণিপুরি ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে মণিপুরিত্বে রূপান্তর ইত্যাদি মণিপুরে মুসলমানদের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলার অংশ।
পরবর্তীতে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বার্মা কর্তৃক মণিপুর দখল করে নিলে মণিপুরিরা দলে দলে কাছাড়ে আশ্রয় গ্রহণ, কাছাড় থেকে সিলেটে স্থানান্তর, সিলেট থেকে লংলার পৃত্থিমপাশা হয়ে ভানুগাছ উপত্যকায় বসতি স্থাপন, ভানুগাছ উপত্যকা থেকে ত্রিপুরায় বসতি সম্প্রসারণ—এই জাতিসত্তার ইতিহাসকে আরও জটিল করেছে। অধিকন্তু এই দীর্ঘ ইতিহাস অনেকাংশেই মৌখিক ধারায় রয়ে গেছে।
সাহিত্যচর্চা পারে—
ছড়িয়ে থাকা তথ্যকে নথিবদ্ধ করতে,
প্রবীণদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে,
নতুন প্রজন্মকে তাদের অতীতচেতনার সঙ্গে যুক্ত করতে।
ইতিহাস সংরক্ষণ না হলে একটি জাতি ভবিষ্যৎ-দিশাহীন হয়ে পড়ে—আর সাহিত্যই সেই সংরক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
২. ভাষা ও উপভাষার সংরক্ষণ –
বাংলাদেশের পাঙালরা বাংলা ভাষায় কথা বললেও তাদের মাতৃভাষা কিন্তু মৈতৈলোন।
তাদের রয়েছে—
নিজস্ব শব্দভাণ্ডার,
অনন্য উচ্চারণভঙ্গি,
ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিভাষা,
লোকগান ও বিয়ের গানের স্বতন্ত্র ধারা।
এই ভাষাগত উপাদানগুলো লিপিবদ্ধ না হলে দ্রুত বিলুপ্ত হবে।
সাহিত্যই পারে মৈতৈলোন–বাংলা দ্বিভাষিক পরিচয়কে সুরক্ষিত রাখতে।
৩. সংস্কৃতি, আচার–অনুষ্ঠান ও জীবন-দর্শনকে নথিভুক্ত করা –
মণিপুরি মুসলমানদের রয়েছে অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়—
বিবাহরীতি,
খাবারসংস্কৃতি,
পোশাক,
লাথি ও কুস্তি প্রথা,
সাংস্কৃতিক সংগীতচর্চা।
কিন্তু এর নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেশন নেই।
সাহিত্য—গবেষণা, গল্প, কবিতা, স্মৃতিকথা—এই সংস্কৃতিকে স্থায়ী নথিতে রূপ দিতে পারে।
৪. সামাজিক সচেতনতা ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি-
দীর্ঘদিন ধরে পাঙাল সমাজ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বঞ্চনা ও পরিচয় সংকটের মুখোমুখি।
সাহিত্য পারে—
এসব সমস্যাকে আলোচনায় আনতে,
নারীদের সংগ্রাম, সাফল্য ও নেতৃত্বকে দৃশ্যমান করতে,
বৈষম্য ও উন্নয়ন বৈরিতা তুলে ধরতে,
আত্মপরিচয়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে।
সাহিত্য একটি সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে এবং আত্ম-মর্যাদাকে শক্তিশালী করে।
৫. নতুন প্রজন্মকে পরিচয়বোধে ফিরিয়ে আনা-
আজকের তরুণ সমাজের অনেকেই নিজেদের পাঙাল পরিচয় সম্পর্কে অল্পই জানে।
বিশ্বায়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর জীবন, প্রবাসগমন—সব মিলিয়ে তারা শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সাহিত্যচর্চা পারে—
তরুণদের নিজেদের ইতিহাস শেখাতে,
পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ তৈরি করতে,
সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে।
যে জাতি নিজের শেকড় ভুলে যায়, সে জাতির টিকে থাকা কঠিন।
৬. বাংলাদেশের বহুসংস্কৃতির ভুবনে দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি-
জাতীয় আলোচনা, একাডেমিক গবেষণা, পাঠ্যক্রম বা গণমাধ্যমে মণিপুরি মুসলমানদের বিষয়টি খুব কমই প্রতিফলিত হয়।
সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে—
জাতীয় পর্যায়ে তাদের পরিচিতি বাড়বে,
গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ সৃষ্টি হবে,
বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা উৎসাহিত হবে।
একটি জাতিগোষ্ঠী টিকে থাকে তখনই, যখন সে নিজের ইতিহাস নিজে লেখে।
৭. নারী সাহিত্যিকদের সম্ভাবনা-
মণিপুরি মুসলমান নারীরা সমাজ-সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও কণ্ঠস্বর এখনো অদৃশ্য।
নারীরা লেখালেখিতে যুক্ত হলে—
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হবে,
নারীর অধিকার ও শিক্ষা বিষয়ে আলাপ তৈরি হবে,
সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক হবে।
৮. সাহিত্য অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে-
বর্তমানে—
গবেষণা বই,
সাংস্কৃতিক ডকুমেন্টেশন,
গল্পগ্রন্থ,
আত্মজীবনী,
নাটক,
তথ্যচিত্র
এসবের বাজার বিস্তৃত।
মণিপুরি মুসলমানদের সাহিত্য দেশ–বিদেশে, বিশেষত প্রবাসী পাঙাল সমাজের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
সুতরাং সাহিত্য অর্থনৈতিক সম্পদও হয়ে উঠতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের একমাত্র মুসলিম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—মণিপুরি মুসলমান জনজাতি—ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের দিক থেকে অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ ক্রমেই ক্ষয়ের মুখে।
অতএব, সাহিত্যচর্চা তাদের অস্তিত্ব সংরক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম—
এটি শুধু নান্দনিক প্রয়াস নয়, বরং পরিচয় রক্ষার দায়িত্ব, ইতিহাসের পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার।
মণিপুরি মুসলমানদের সাহিত্যচর্চা যত প্রসারিত হবে, ততই তাদের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের বহুসংস্কৃতির ভুবনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মো. আব্দুস সামাদ
লেখক ও গবেষক,
সভাপতি, বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম এডুকেশন ট্রাস্ট।
abdusjuly@gmail.com
=================

