কীভাবে রাপা নুইয়ের মানুষেরা তাদের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে শত শত বিশাল ‘মোআই’ মূর্তি তৈরি ও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল?
প্রশ্ন: মোআই (Moai) মূর্তিগুলো আসলে কী, আর এগুলোকে কেন এত রহস্যময় ও শক্তিশালী মনে হয়?
মোআই হলো প্রায় ১,০০০টি বিশাল পাথরের মূর্তি, যা প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত রাপা নুই (ইস্টার আইল্যান্ড) নামক একটি বিচ্ছিন্ন আগ্নেয় দ্বীপে তৈরি করা হয়েছিল। এই মূর্তিগুলো তৈরি করেছিলেন সেখানকার আদি বাসিন্দা রাপা নুই মানুষেরা। বেশিরভাগ মূর্তিই ২ থেকে ৫ মিটার (প্রায় ৬ থেকে ১৬ ফুট) লম্বা। তবে কিছু মূর্তি প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু—যা একটি তিন তলা বাড়ির সমান! এগুলোর ওজন ৮০ টন বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে, যা একটি মালবোঝাই বড় ট্রাক কিংবা এক ডজন হাতির চেয়েও ভারী।
এই মূর্তিগুলো কিন্তু শুধু “মাথা” নয়। অনেকে এগুলোকে ভুল করে ‘ইস্টার আইল্যান্ডের মাথা’ বলে থাকেন, কিন্তু আসলে বেশিরভাগ মোআই মূর্তির পুরো শরীর, হাত এবং আঙুল রয়েছে, যা তাদের পেটের ওপর রাখা আছে। কিছু মূর্তির কোমরে খোদাই করা বেল্ট বা কাপড়ও দেখা যায়। এদের মুখাবয়ব বেশ নজরকাড়া: ভারী ভ্রু, লম্বা সোজা নাক, পাতলা ঠোঁট এবং গভীর চোখের কোটর। যখন এই চোখগুলোতে সাদা প্রবাল এবং লাল পাথরের মণি বসিয়ে কাজ শেষ করা হতো, তখন বিশ্বাস করা হতো যে মূর্তিগুলো এবার ‘দেখতে পাচ্ছে’ এবং তাদের মধ্যে এক অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক শক্তি ভর করেছে।
প্রায় ১২০০ থেকে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৯০০টি মোআই মূর্তি খোদাই করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি মূর্তি এখনও সেই মূল পাথরের খনিতে বা তার আশেপাশে রয়ে গেছে; কিছু মূর্তি এখনও পাথরের পাহাড়ের সাথে অর্ধেক লেগে আছে, আবার কিছু পাহাড়ের ঢালে শুয়ে আছে। বাকি ৩০০টির মতো মূর্তি একসময় ‘আহু’ (Ahu) নামের বিশেষ পাথরের বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকত। এগুলো সাধারণত দ্বীপের ভেতরের দিকে মুখ করে থাকত, যাতে তারা গ্রাম ও গ্রামবাসীদের ওপর নজর রাখতে এবং তাদের রক্ষা করতে পারে। অতীতে ভেঙে পড়ার পর, বর্তমানে অনেক মূর্তিকে আবার সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই মূর্তিগুলোকে এত রহস্যময় মনে হওয়ার কারণ হলো, সে যুগে চাকা, লোহার হাতিয়ার বা কোনো বড় পশুপাখির সাহায্য ছাড়াই শুধু পাথরের তৈরি সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে এই বিশাল মূর্তিগুলো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব বলে মনে হয়। এটি মানুষের শিল্পকলা, প্রকৌশল এবং দলগত প্রচেষ্টার এক অসাধারণ নিদর্শন।
প্রশ্ন: ইস্টার আইল্যান্ড কোথায় অবস্থিত, এবং সেখানকার বাসিন্দারা বাকি পৃথিবী থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন ছিলেন?
রাপা নুই বা ইস্টার আইল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন ও নির্জন জনবসতিগুলোর একটি। এটি চিলির মূল ভূখণ্ড থেকে পশ্চিমে ৩,৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে এবং এর সবচেয়ে কাছের জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ (পিটকেয়ার্ন দ্বীপ) থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। দ্বীপটি বেশ ছোট—লম্বায় মাত্র ২৪ কিলোমিটার আর চওড়ায় সর্বোচ্চ ১২ কিলোমিটার। তিন কোণায় তিনটি আগ্নেয়গিরি থাকায় দ্বীপটির আকার দেখতে অনেকটা ত্রিভুজের মতো।
আনুমানিক ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পলিনেশিয়ান সাগরমিনেরা দুই-নৌকা জোড়া দেওয়া বিশেষ ক্যানো (Canoe) বা ডিঙি নৌকা নিয়ে এখানে এসেছিলেন। তারা আকাশ ভরা তারা, সমুদ্রের ঢেউ, বাতাস, পাখি এবং মেঘের গতিপ্রকৃতি দেখে দিক ঠিক করতেন—যা খোলা সমুদ্রে পথ চেনার এক অবিশ্বাস্য কৌশল ছিল। একবার এখানে পৌঁছানোর পর তারা পুরোপুরি একা হয়ে যান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অন্য কোনো দ্বীপের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। খাবার, ঘরবাড়ি, সরঞ্জাম এবং পরবর্তীকালের এই বিশাল মূর্তি—সবকিছুই তাদের এই ছোট দ্বীপের সম্পদ থেকেই তৈরি করতে হয়েছিল।
এই চরম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কারণেই মোআই মূর্তিগুলো আরও বেশি বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। রাপা নুইয়ের মানুষেরা তাদের এই ছোট্ট আগ্নেয় দ্বীপটিকে বিশাল শিল্পকলা ও উৎসবের এক অসাধারণ কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।
প্রশ্ন: কারা এই মোআই মূর্তিগুলো খোদাই করেছিলেন এবং তারা কীভাবে এত বড় কাজ পরিচালনা করতেন?
এই মূর্তিগুলোর কারিগর ছিলেন রাপা নুইয়ের মানুষেরা। তারা ছিলেন পলিনেশিয়ান বংশোদ্ভূত, যারা সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতেন। তাদের সমাজে কৃষক, জেলে, পুরোহিত এবং দক্ষ পাথর-শিল্পী ছিলেন। বিভিন্ন পরিবার বা বংশের মানুষেরা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণে মোআই তৈরি করতে কখনো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন, আবার কখনো মিলেমিশে কাজ করতেন। মোআই তৈরি করা কেবল কোনো সাধারণ শিল্প ছিল না; এটি ছিল একটি ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ, যা সমাজে সম্মান, আধ্যাত্মিক সুরক্ষা এবং ঐক্য নিয়ে আসত।
এই কাজে শত শত মানুষ যুক্ত থাকতেন: যেমন পাথর বাছাই করার দল, খোদাইশিল্পী, দড়ি তৈরির কারিগর, সবার জন্য খাবার জোগাড় করার মানুষ এবং মূর্তি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার দল। এটি ছিল একটি বিশাল এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক কাজ—ঠিক যেমন ইউরোপে প্রাচীনকালে সবাই মিলে বড় বড় গির্জা তৈরি করতেন, কিন্তু এখানে তফাত হলো তারা ব্যবহার করেছিলেন কেবল পাথরের হাতিয়ার আর নিজেদের গায়ের শক্তি।
প্রশ্ন: এই মূর্তি তৈরির পাথর কোথা থেকে আসত এবং কীভাবে এগুলো খোদাই করা হতো?
শতকরা ৯৫ ভাগ মোআই মূর্তি তৈরি হয়েছিল রানো রারাকু (Rano Raraku) নামের একটি আগ্নেয়গিরির নরম ছাই-পাথর দিয়ে। এই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখটি ছিল দ্বীপের একটি বিশাল ভাস্কর্য কারখানার মতো। অন্যান্য শক্ত পাথরের চেয়ে এই পাথর খোদাই করা সহজ ছিল, আবার মূর্তি তৈরি করার পর তা বেশ মজবুতও থাকত।
মূর্তি খোদাই করার ধাপগুলো ছিল ঠিক এইরকম:
১. ভাস্কর বা শিল্পীরা প্রথমে আগ্নেয়গিরির ঢালে একটি সুন্দর জায়গা বেছে নিতেন।
২. ‘তোকি’ (Toki) নামের শক্ত ব্যাসল্ট পাথরের তৈরি এক ধরনের কুড়ুল বা ছেনি দিয়ে তারা পাহাড়ের গায়ের পাথরে মূর্তির একটা খসড়া তৈরি করতেন।
৩. তারা সবার আগে মূর্তির মুখমণ্ডল খোদাই করতেন—যা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যাতে একটি গম্ভীর ও শক্তিশালী ভাব ফুটে ওঠে।
৪. এরপর তারা শরীর, হাত এবং আঙুলগুলো তৈরি করতেন (আঙুলগুলো সাধারণত নাভির দিকে নির্দেশ করত, যা জীবন ও সৃষ্টির প্রতীক)।
৫. মূর্তিটি যখন মাটিতে শুয়ে থাকত, তখনই পিঠের ও পাশের নকশার কাজ শেষ করা হতো।
৬. সবশেষে, একদম নিচের অংশটি সাবধানে কেটে মূর্তিটিকে পাহাড়ের মূল পাথর থেকে আলাদা করা হতো। এরপর অনেক মূর্তিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামিয়ে আনা হতো।
প্রশ্ন: চাকা, ক্রেন বা ইঞ্জিন ছাড়াই এই বিশাল, ভারী মূর্তিগুলোকে পুরো দ্বীপে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
এই প্রশ্নটি বহু শতাব্দী ধরে মানুষকে অবাক করেছে। পুরোনো ধারণা অনুযায়ী ভাবা হতো, মোআই মূর্তিগুলোকে কাঠের স্লেজ বা দ্বীপের পাম গাছ দিয়ে তৈরি গোল গুঁড়ির ওপর শুইয়ে শত শত মানুষ দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যেত। কিন্তু তার জন্য প্রচুর শক্তি এবং অনেক গাছের প্রয়োজন হতো।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এবং পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন অনেক সহজ ও বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দেখাচ্ছে, যা রাপা নুইয়ের প্রাচীন লোককথার সাথেও মিলে যায়: আসলে মোআই মূর্তিগুলোকে সোজা দাঁড় করিয়ে ‘হাঁটিয়ে’ নেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিশদ গবেষণা (যার মধ্যে প্রায় ১,০০০টি মূর্তি ও নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে করা ২০২৫ সালের একটি বড় গবেষণাপত্রও রয়েছে) দেখায় যে, অনেক মোআই মূর্তিকে—বিশেষ করে যেগুলো প্রাচীন রাস্তার ধারে পাওয়া গেছে—ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেগুলো সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে থাকে এবং এগুলোর নিচের অংশটি ইংরেজি ‘D’ অক্ষরের মতো চওড়া হয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে মূর্তিগুলো একদিকে যেমন স্থির থাকত, অন্যদিকে তেমনি সহজেই এপাশ-ওপাশ দোলানো যেত—ঠিক যেভাবে কয়েকজন মিলে একটি খুব ভারী রেফ্রিজারেটর বা আলমারি সাবধানে এক কোণ থেকে অন্য কোণে নাড়িয়ে নাড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়।
কাজটি যেভাবে করা হতো:
গাছের শক্ত আঁশ দিয়ে তৈরি মজবুত দড়ি মূর্তির মাথায় বা শরীরের ওপরের অংশে বাঁধা হতো।
১০ থেকে ২০ জনের দল (ছোট মূর্তির জন্য আরও কম মানুষ) মূর্তির দুই পাশে এবং পেছনে দাঁড়াত।
এক তালে তাল মিলিয়ে দুই পাশের দড়ি ধরে টানা এবং ছাড়ার মাধ্যমে তারা মোআই মূর্তিটিকে ডানে ও বাঁয়ে দোলাত।
প্রতিবার দোলানোর সাথে সাথে মূর্তির ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুটি সামান্য সামনের দিকে এগিয়ে যেত।
পেছনের একটি দড়ি বা দল মূর্তিটিকে পেছনের দিকে উল্টে যাওয়া থেকে ধরে রাখত।
এভাবে মূর্তিটি বিশেষভাবে তৈরি রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে বা হাঁসের মতো হেলেদুলে আস্তে আস্তে ‘হাঁটতে হাঁটতে’ সামনের দিকে এগিয়ে যেত।
একটি পরীক্ষায় গবেষকেরা ৪.৩৫ টন ওজনের একটি কংক্রিটের নিখুঁত রেপ্লিকা বা নকল মূর্তি তৈরি করেছিলেন, যা আসল মূর্তির মতোই সামনের দিকে ঝুঁকে থাকত। মাত্র ১৮ জন মানুষ এবং দড়ির সাহায্যে তারা মূর্তিটিকে মাত্র ৪০ মিনিটে ১০০ মিটার ‘হাঁটাতে’ পেরেছিলেন!
এই পদ্ধতিটি রাপা নুইয়ের প্রবীণদের বহু পুরোনো কথার সাথে হুবহু মিলে যায়, তারা সবসময় বলতেন: মূর্তিগুলো তাদের গন্তব্যে ‘হঁটে’ গিয়েছিল। এটি আরও বুঝিয়ে দেয় যে কেন রাস্তার ধারের মূর্তিগুলোর গড়ন সোজাভাবে টেনে নেওয়ার জন্য একদম উপযুক্ত ছিল, কেন রাস্তাগুলো চওড়া ও মসৃণ করে বানানো হয়েছিল এবং কেন ভেঙে যাওয়া মূর্তিগুলোর ধরণ দেখে মনে হয় সেগুলো হাঁটিয়ে নেওয়ার সময় পড়ে গিয়ে ভেঙেছে, টেনে নেওয়ার সময় নয়।
এই ‘হাঁটানোর’ পদ্ধতিটি ছিল প্রকৌশলবিদ্যার এক অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা। মাটিতে শুইয়ে টেনে নেওয়ার চেয়ে এই পদ্ধতিতে অনেক কম মানুষ এবং খুব কম কাঠের প্রয়োজন হতো। এটি ভারসাম্য, লিভারের ব্যবহার এবং দলগত কাজের এক দারুণ প্রমাণ।
প্রশ্ন: মোআই মূর্তিগুলো তাদের বেদিতে পৌঁছানোর পর কীভাবে সোজা করে দাঁড় করানো হতো, আর তাদের মাথার লাল ‘টুপি’গুলোর রহস্যই বা কী?
কয়েক টন ওজনের একটি মূর্তিকে সোজা করে দাঁড় করানো ছিল আরেকটি বুদ্ধির খেলা। কর্মীরা সম্ভবত মাটির ঢালু রাস্তা বা র্যাম্প তৈরি করতেন এবং দড়ি, লিভার ও অনেক মানুষের সাহায্যে মূর্তিটিকে ‘আহু’ (পাথরের বেদি)-র ওপর তৈরি করা গর্তে বা খাঁজে নিখুঁতভাবে বসিয়ে দিতেন।
অনেক মোআই মূর্তির মাথায় পুকাও (Pukao) নামের বড় ও গোলাকার লাল রঙের ‘টুপি’ বা খোঁপা পরানো থাকত। এগুলো ‘পুনা পাউ’ নামের অন্য একটি খনি থেকে লাল রঙের হালকা আগ্নেয় পাথর খোদাই করে তৈরি করা হতো। একেকটি টুপির ওজনও কয়েক টন হতো! এগুলোকে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা মোআই মূর্তির সামনে মাটির ঢালু রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে ওপরে তোলা হতো, তারপর সাবধানে মূর্তির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হতো।
এই লাল রংটি সম্ভবত উচ্চ মর্যাদা, পবিত্র শক্তি বা মাথার চুলকে বোঝাত। যখন মূর্তিটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেত এবং মাথায় টুপি পরানো হতো, তখন কর্মীরা চোখের কোটর খোদাই করে তাতে সাদা প্রবাল এবং লাল পাথরের মণি বসিয়ে চোখ তৈরি করতেন। বিশ্বাস করা হতো, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের পূর্বপুরুষেরা জেগে উঠতেন এবং গ্রামবাসীদের রক্ষা করতেন।
প্রশ্ন: রাপা নুইয়ের মানুষেরা কেন এত মোআই মূর্তি তৈরি করেছিলেন? এর অর্থ কী ছিল?
মোআই মূর্তিগুলো আসলে ছিল পাথরে রূপ নেওয়া পূর্বপুরুষ। প্রতিটি মূর্তি কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা বা পূর্বপুরুষের স্মরণে তৈরি করা হতো, যা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ‘মানা’ (Mana) বা এক আধ্যাত্মিক শক্তি বহন করত। এই শক্তি জমি রক্ষা করত, ভালো ফসল ফলাতে সাহায্য করত, সমুদ্রে প্রচুর মাছ পেতে এবং সমাজের মঙ্গল বয়ে আনত। গ্রামের দিকে মুখ করে বেদির ওপর এদের বসানোর অর্থ ছিল, যেন শক্তিশালী প্রহরীরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর নজর রাখছেন।
মোআই তৈরি এবং তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া পরিবার ও বংশগুলোর জন্য তাদের ভক্তি প্রকাশ, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বন্ধন শক্ত করার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এটি একাধারে ছিল ধর্ম, শিল্প, রাজনীতি এবং প্রকৌশল—যা শত শত বছর ধরে রাপা নুইয়ের সংস্কৃতির মূল পরিচয় ছিল।
প্রশ্ন: পরবর্তীতে কী ঘটেছিল? কেন মূর্তি তৈরি বন্ধ হয়ে গেল এবং কেন এত মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল?
১৬০০ এবং ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এত বড় পরিসরে মোআই খোদাই করার কাজ ধীর হয়ে আসে এবং একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর কারণগুলো বেশ জটিল এবং তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে:
দ্বীপের পাম বনের পরিমাণ কমে গিয়েছিল (কিছুটা চাষাবাদের জন্য বন কাটার কারণে, আর কিছুটা ইঁদুরেরা গাছের বীজ খেয়ে ফেলার কারণে)।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং সম্পদের সংকট দেখা দেয়।
সামাজিক প্রতিযোগিতা একসময় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একে অপরের মোআই মূর্তিগুলো ভেঙে বা উল্টে ফেলে দিত (huri moai), যাতে তাদের আধ্যাত্মিক শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। মানুষ না মেরে শত্রুকে ‘পরাজিত’ করার এটি ছিল একটি নাটকীয় উপায়।
১৭২২ সাল থেকে ইউরোপীয়দের আগমন দ্বীপটিতে মারাত্মক রোগব্যাধি নিয়ে আসে এবং ১৮৬০-এর দশকে পেরুর দাস ব্যবসায়ীরা শত শত দ্বীপবাসীকে ধরে নিয়ে যায়, যার ফলে এখানকার জনসংখ্যা এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়।
পরবর্তীতে খ্রিস্টান মিশনারিরা এসে বাকি থাকা মূর্তিগুলোকে ‘মূর্তিপূজা’ মনে করে ভেঙে ফেলার জন্য উৎসাহিত করেন।
তবে এই গল্পটি কেবল একটি পরিবেশগত ধ্বংসের গল্প নয়। রাপা নুইয়ের মানুষেরা অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেন, নতুন ঐতিহ্য (যেমন ‘বার্ডম্যান’ বা পাখি-মানব উৎসব) তৈরি করেন এবং টিকে থাকেন। আজ রাপা নুইয়ের মানুষেরা তাদের ঐতিহ্যের জন্য গর্ববোধ করেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক মোআই মূর্তিকে আবার সসম্মানে সোজা করে দাঁড় করানো হয়েছে এবং এই দ্বীপটি এখন ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
প্রশ্ন: আজকের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই সমস্ত তথ্য জানতে পেরেছেন?
তারা অনেকগুলো সূত্র একসাথে মিলিয়ে এই রহস্যের সমাধান করেছেন:
খনি, প্রাচীন রাস্তা এবং বেদির চারপাশের মাটি সাবধানে খুঁড়ে ও ম্যাপ তৈরি করে।
হাতিয়ারের দাগ, অর্ধেক তৈরি মূর্তি এবং ভেঙে যাওয়া মূর্তির ধরন পরীক্ষা করে।
থ্রিডি (3D) মডেল এবং পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তবে কী করা সম্ভব ছিল তা যাচাই করে।
রাপা নুইয়ের প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা বংশানুক্রমিক লোককথা বা ইতিহাস জেনে।
মূর্তির আকার এবং রাস্তার বৈশিষ্ট্যের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করে।
অন্যান্য পলিনেশিয়ান সংস্কৃতির সাথে এর তুলনা করে।
নতুন প্রযুক্তি এবং রাপা নুইয়ের স্থানীয় মানুষের সাথে সম্মানজনক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতি বছরই নতুন নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।
