কবি  Omar Khayyam এবং তাঁর কবিতা (1048–1131)

ওমর খৈয়াম (১০৪৮–১১৩১)

পারস্যের বহুবিদ্যাবিশারদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং দার্শনিক

রুবাইয়াতের গুরু – চার লাইনের কবিতা যা জীবন, ভাগ্য, সময় এবং অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি নিয়ে ধ্যান করে

ওমর খৈয়াম আজ তাঁর বৈজ্ঞানিক সাফল্যের জন্য ততটা স্মরণীয় নন (তিনি পারস্যের ক্যালেন্ডার সংস্কার করেছিলেন এবং বীজগণিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন), যতটা তিনি স্মরণীয় তাঁর রুবাইয়াত-এর জন্য—যা পারস্য ভাষায় রচিত ছোট, দার্শনিক চার লাইনের কবিতার (রুবাই) একটি সংকলন। এই চতুষ্পদী কবিতাগুলো জীবনের সংক্ষিপ্ততা, ভাগ্যের রহস্য, মদ্য ও বন্ধুত্বের সান্ত্বনা এবং মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টার নিরর্থকতাকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে।

সবচেয়ে বিখ্যাত ইংরেজি সংস্করণটি এসেছে এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের ১৮৫৯ সালের অনুবাদ (পরবর্তীতে সংশোধিত) থেকে, যা মূল কবিতার চেতনা এবং বিষাদময় সৌন্দর্যকে ধারণ করে। এখানে সবচেয়ে উদযাপিত ১০টি রুবাই সম্পূর্ণ ছোট কবিতা হিসেবে বাংলা অনুবাদে উপস্থাপন করা হলো।

১. জেগে ওঠার আহ্বান

জেগে ওঠো! কারণ রাত্রির পাত্রে প্রভাত এসে

ছুঁড়ে মেরেছে পাথর, যা তারকাদের দিয়েছে তাড়িয়ে:

আর দেখো! প্রাচ্যের শিকারি আলোর ফাঁসে

সুলতানের গম্বুজকে নিয়েছে জড়িয়ে।

২. কবিতার বই

শাল মহীরুহের ছায়াতলে একটি কবিতার বই,

এক পাত্র সুরভি মদ্য, কিছু রুটি—আর তুমি

আমার পাশে বসে গাইছো গান এই নির্জনতায়—

অহো, এই নির্জনতাই তবে আমার স্বর্গভূমি!

৩. এসো, পাত্রটি পূর্ণ করো

এসো, পাত্রটি পূর্ণ করো, আর বসন্তের আগুনে

তোমার অনুশোচনার শীতকালীন বস্ত্র দাও ফেলে:

সময়ের পাখির উড়ে যাওয়ার পথ তো খুবই অল্প

ডানা ঝাপটে—আর দেখো পাখিটি ডানা মেলেছে চলে।

৪. চলন্ত আঙুল

চলন্ত আঙুল লিখে চলে; আর লেখা শেষ হলে,

সামনে এগিয়ে যায়: তোমার কোনো পুণ্য বা পাণ্ডিত্য

তাকে প্রলোভিত করে আধখানা লাইনও মুছতে পারবে না,

কিংবা তোমার চোখের সব জলও তার একটি শব্দ ধুয়ে দিতে পারবে না।

৫. এমন লাল গোলাপ কখনো ফোটেনি

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এমন লাল রঙের গোলাপ

কখনো ফোটেনি যেখানে কোনো সমাহিত সিজারের রক্ত ঝরেনি;

উদ্যানে ফুটে থাকা প্রতিটি হাইসিন্থ ফুল

কোনো এক সময়ের সুন্দর মস্তক থেকে তার কোলে খসে পড়েনি।

৬. যা আমাদের অবশিষ্ট আছে তা উপভোগ করো

আহ, আমাদের যতটুকু সময় ও সামর্থ্য অবশিষ্ট আছে তা উপভোগ করো,

আমরা নিজেরাও ধুলোয় মিশে যাওয়ার আগে;

ধুলো মিশবে ধুলোয়, আর ধুলোর নিচে শুয়ে থাকতে হবে,

মদ্যহীন, গানহীন, গায়কহীন, এবং—অনন্তকাল ধরে!

৭. জাগতিক আশা

মানুষ যে জাগতিক আশার ওপর তার হৃদয় সঁপে দেয়

তা ছাইতে পরিণত হয়—অথবা সফল হয়; আর পরক্ষণেই,

মরুভূমির ধূলিময় বুকে বরফের মতো,

ঘণ্টাখানেক বা দুই ঘণ্টার আলো দেখিয়ে—উধাও হয়ে যায়।

৮. এই মহাবিশ্বে

এই মহাবিশ্বে আগমন, কেন তা না জেনে

কোথা থেকে আসা তাও না জেনে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বয়ে চলা জলের মতো;

আর এখান থেকে প্রস্থান করা, প্রান্তর জুড়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো,

কোথায় যাওয়া তাও জানি না, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ফুঁসে ওঠার মতো।

৯. কুম্ভকার এবং কাদামাটি

আর, আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই মাটির পাত্রদের মাঝে

কেউ কেউ কথা বলতে পারছিল, আবার অন্যরা পারছিল না:

আর হঠাৎ করেই একজন অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে উঠল—

“দয়া করে বলবে কি, কে এখানে কুম্ভকার, আর কে-ই বা পাত্র?”

১০. আহ, কিন্তু আমার গণনা

আহ, কিন্তু লোকেরা বলে, আমার গণনা নাকি

বছরের হিসাবকে আরও নিখুঁত করেছে?—না,

তা ছিল কেবল ক্যালেন্ডার থেকে বাদ দেওয়া

অনাগত আগামীকাল, আর মৃত গতকালকে।

এই দশটি চতুষ্পদী কবিতা ওমর খৈয়ামের কণ্ঠস্বরের মূল নির্যাসকে ধারণ করে: সংশয়বাদ, আনন্দবাদ, বিষাদ এবং শান্ত প্রজ্ঞার এক অপূর্ব মিশ্রণ। তিনি জীবন বা ভাগ্য সম্পর্কে কোনো সহজ উত্তর দেন না। পরিবর্তে, তিনি পাঠককে জীবনের সংক্ষিপ্ততা এবং রহস্য সম্পর্কে সচেতন রেখে বর্তমান মুহূর্তটিকে পুরোপুরি উপভোগ করার আমন্ত্রণ জানান।

রুবাইয়াত বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম অনুবাদিত এবং উদ্ধৃত কাজ হিসেবে টিকে রয়েছে ঠিক এই কারণেই যে, এই ছোট কবিতাগুলো শতাব্দী এবং সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে সরাসরি মানুষের অন্তরের কথা বলে।

ওমর খৈয়াম (১০৪৮–১১৩১)
পারস্যের বহুমুখী প্রতিভা – জীবন ও ভাগ্য নিয়ে গভীর চিন্তার রুবাইয়াতের রচয়িতা

গিয়াসউদ্দিন আবুল ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরী, যিনি সাধারণভাবে ওমর খৈয়াম নামে পরিচিত, ছিলেন মধ্যযুগীয় পারস্যের (বর্তমান ইরান) অন্যতম শ্রেষ্ঠ বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং কবি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা রুবাইয়াত (Rubaiyat) — চার লাইনের কবিতার সংকলন, যেখানে তিনি জীবন, মৃত্যু, ভাগ্য, সময় এবং মানব অস্তিত্বের গভীর রহস্য নিয়ে চিন্তা করেছেন।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

ওমর খৈয়াম জন্মগ্রহণ করেন এক হাজার আটচল্লিশ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের খোরাসান প্রদেশের নিশাপুর শহরে। তাঁর পিতা ছিলেন তাঁতি বা তাঁবু নির্মাতা। শৈশবেই তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। নিশাপুর তখন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক অবদান

খৈয়াম নিশাপুর, বুখারা এবং সমরকন্দে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন ও চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

তাঁর সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অবদান হলো জালালি ক্যালেন্ডার সংস্কার। এক হাজার একশো সাতাত্তর খ্রিস্টাব্দে তিনি সুলতান মালিক শাহের নির্দেশে এই ক্যালেন্ডার তৈরি করেন, যা আজকের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়েও বেশি নির্ভুল ছিল। গণিতে তিনি তৃতীয় ঘাতের সমীকরণ সমাধানের জন্য জ্যামিতিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

কাব্যকর্ম: রুবাইয়াত

খৈয়ামের কাব্যকর্ম রুবাইয়াত নামে পরিচিত। এগুলো চার লাইনের স্বাধীন কবিতা (quatrains)। এতে তিনি জীবনের অনিত্যতা, ভাগ্যের রহস্য, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করার কথা বলেছেন।

তাঁর কবিতায় প্রায়শই মদ (wine) এর প্রতীকী ব্যবহার দেখা যায়, যা আসলে জীবনের আনন্দ ও মুক্ত চিন্তার প্রতীক। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভণ্ডামির সমালোচনা করেছেন এবং মানুষকে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন।

দর্শন ও চিন্তাধারা

ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন সংশয়বাদী দার্শনিক। তিনি মহাবিশ্বের রহস্য সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর চিন্তায় এপিকিউরীয় ও সংশয়বাদী দর্শনের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জীবন সংক্ষিপ্ত, তাই বর্তমানকে পূর্ণভাবে উপভোগ করা উচিত। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “কার্পে দিয়েম” (Carpe Diem) এর মতো চিন্তা তাঁর রুবাইয়াতে বারবার ফুটে উঠেছে।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

ওমর খৈয়াম মারা যান এক হাজার একশো একত্রিশ খ্রিস্টাব্দে নিশাপুরে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবিতাগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

উনিশ শতকে ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড তাঁর রুবাইয়াতের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করলে তা বিশ্বসাহিত্যে সাড়া ফেলে। আজও তাঁর কবিতা জীবনের অর্থ, ভাগ্য ও মানব অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তাশীল পাঠকদের আকর্ষণ করে।

ওমর খৈয়াম ছিলেন সেই বিরল প্রতিভা, যিনি একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও কাব্যের চরম শিখরে পৌঁছেছিলেন। তিনি জীবনকে কোনো সহজ সূত্রে বাঁধতে চাননি। বরং তিনি মানুষকে প্রশ্ন করতে, চিন্তা করতে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিতে শিখিয়েছেন। তাঁর রুবাইয়াত আজও পাঠককে মনে করিয়ে দেয় — জীবন রহস্যময়, কিন্তু সেই রহস্যের মধ্যেই এর সৌন্দর্য নিহিত।

“জীবন একটি ছায়া, যা আসে এবং চলে যায়। তাই যতদিন আছে, ততদিন আনন্দ করো।”
— ওমর খৈয়াম

Comment