পার্সি বিশি শেলি (১৭৯২–১৮২২) ছিলেন ইংরেজি রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম উগ্রপন্থী (radical) এবং দূরদর্শী কবি। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার, নাস্তিকতা এবং মুক্ত প্রেমের এক তীব্র সমর্থক হিসেবে শেলি তাঁর কবিতায় সুউচ্চ গীতিকাব্যিক সৌন্দর্যের সাথে গভীর দার্শনিক ও বৈপ্লবিক ধারণার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা মানুষের কল্পনাশক্তি, প্রকৃতির ক্ষমতা এবং একটি মুক্ত ও আরও ন্যায়পরায়ণ পৃথিবীর সম্ভাবনাকে উদ্যাপন করে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ইতালিতে সমুদ্রযাত্রার সময় ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি এমন এক সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন যা আজও পাঠকদের তাঁর আবেগ এবং আদর্শবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
১. ওজিম্যান্ডিয়াস (Ozymandias – 1818)
এক প্রাচীন দেশের এক পথিকের সাথে দেখা হয়েছিল আমার,
তিনি বললেন—”পাথরের দুটি বিশাল এবং ধড়হীন পা
দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমিতে। . . . তাদের কাছেই, বালির ওপর,
অর্ধেক ডুবে আছে এক ভেঙে পড়া মুখমণ্ডল, যার ভ্রুকুটি,
আর কুঁচকানো ঠোঁট, এবং শীতল আদেশের অবজ্ঞাসূচক হাসি,
বলে দেয় যে এর ভাস্কর সেই আবেগগুলোকে খুব ভালোভাবেই পড়েছিলেন—
যা আজও টিকে আছে, খোদাই হয়ে এই প্রাণহীন জিনিসগুলোর ওপর;
সেই হাত যা তাদের উপহাস করেছিল, আর সেই হৃদয় যা তাদের লালন করেছিল;
এবং স্তম্ভের বেদিতে এই কথাগুলো ভেসে ওঠে:
‘আমার নাম ওজিম্যান্ডিয়াস, রাজাদের রাজা;
হে পরাক্রমশালীরা, আমার কীর্তি দেখো এবং হতাশ হও!’
তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেই বিশাল ধ্বংসাবশেষের
চারপাশে, সীমাহীন এবং নগ্ন হয়ে
একাকী ও সমতল বালি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।”
২. ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড (Ode to the West Wind – 1819)
১
হে বুনো পশ্চিমা বাতাস, তুমি শরতের অস্তিত্বের নিঃশ্বাস,
তুমি, যার অদৃশ্য উপস্থিতির ভয়ে মৃত পাতাগুলো
ছুটে পালায়, যেন কোনো জাদুকরের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া ভূত,
হলুদ, কালো, ফ্যাকাশে এবং তীব্র লাল,
মহামারী-আক্রান্ত অগণিত জনতা: ওহ তুমি,
যে রথে করে নিয়ে যাও তাদের অন্ধকার শীতকালীন বিছানায়
সেই ডানাযুক্ত বীজগুলোকে, যেখানে তারা শুয়ে থাকে শীতল ও নিচুতে,
প্রত্যেকে যেন তার কবরের ভেতরের এক একটি মৃতদেহ, যতক্ষণ না
বসন্তের তোমার আকাশী-নীল বোনটি ফুঁ দেবে
তার রণশিঙা এই ঘুমন্ত পৃথিবীর বুকে, এবং ভরিয়ে দেবে
(বাতাসে চড়ে বেড়ানো মেষপালের মতো মিষ্টি কুঁড়িগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে)
জীবন্ত রঙ আর সুবাসে প্রান্তর ও পাহাড়কে:
বুনো আত্মা, যা সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে;
ধ্বংসকারী এবং রক্ষক; শোনো, ওহ শোনো!
২
তুমি, যার স্রোতে, খাড়া আকাশের আলোড়নের মাঝে,
ঝরে পড়ে হালকা মেঘের দল যেন পৃথিবীর ক্ষয়িষ্ণু পাতা,
ঝরে পড়ে স্বর্গ ও সমুদ্রের জটলা পাকানো ডালপালা থেকে,
বৃষ্টি আর বজ্রপাতের দূতরা: সেখানে ছড়িয়ে আছে
তোমার বায়বীয় তরঙ্গের নীল উপরিভাগে,
যেন কোনো উগ্র মেনাডের (Maenad) মাথা থেকে উঁচিয়ে থাকা উজ্জ্বল চুল,
দিগন্তের আবছা প্রান্ত থেকে আকাশের সর্বোচ্চ উচ্চতা পর্যন্ত,
আসন্ন ঝড়ের অলকগুচ্ছ। তুমি সেই শোকগাথা
এই বিদায়ী বছরের, যার জন্য এই সমাপ্তি রাতটি
হবে এক বিশাল সমাধিসৌধের গম্বুজ,
যা খিলান দিয়ে ঘেরা তোমার সমস্ত ঘনীভূত শক্তি দিয়ে,
সেই মেঘের বাষ্প থেকে, যার নিরেট বায়ুমণ্ডল থেকে
কালো বৃষ্টি, আগুন এবং শিলাবৃষ্টি ফেটে পড়বে: ওহ শোনো!
৩
তুমি, যে তার গ্রীষ্মের স্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তুলেছিলে
নীল ভূমধ্যসাগরকে, যেখানে সে শুয়ে ছিল,
তার স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ স্রোতের কুন্ডলীতে শান্ত হয়ে,
বাইয়ের (Baiae) উপসাগরের একটি পিউমিস দ্বীপের পাশে,
এবং ঘুমের মধ্যে দেখেছিল পুরোনো রাজপ্রাসাদ আর মিনারগুলো
তরঙ্গের আরও তীব্র আলোয় কাঁপছে,
সবুজ শ্যাওলা আর ফুলে ঢাকা,
যা এতটাই মিষ্টি যে, তাদের কল্পনা করতেই চেতনা হারিয়ে যায়! তুমি,
যার পথের জন্য আটলান্টিকের সমতল শক্তিগুলো
নিজেদের চিরে অতল গহ্বর তৈরি করে, যখন অনেক নিচে
সমুদ্রের ফুল ও কর্দমাক্ত অরণ্যগুলো—যা পরিধান করে আছে
মাসের পর মাস রসহীন পাতা—তারা জানতে পারে
তোমার কণ্ঠস্বর, এবং হঠাৎ ভয়ে ধূসর হয়ে যায়,
এবং কেঁপে ওঠে ও নিজেদের উজাড় করে দেয়: ওহ শোনো!
৪
আমি যদি একটি মৃত পাতা হতাম যা তুমি বয়ে নিয়ে যেতে পারতে;
আমি যদি তোমার সাথে ওড়ার জন্য একটি দ্রুতগামী মেঘ হতাম;
একটি তরঙ্গ হতাম যা তোমার শক্তির নিচে হাঁপিয়ে উঠত এবং ভাগ করে নিত
তোমার শক্তির প্রেরণা, কেবল তোমার চেয়ে কিছুটা কম স্বাধীন
হে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য! যদি আমি এমনও হতাম যেমনটা আমার শৈশবে ছিলাম,
এবং হতে পারতাম স্বর্গে তোমার ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গী,
তখনকার মতো, যখন তোমার আকাশী গতিকে ছাড়িয়ে যাওয়া
কোনো অবাস্তব স্বপ্ন মনে হতো না; তবে আমি কখনই এভাবে লড়াই করতাম না
আমার এই চরম প্রয়োজনে প্রার্থনায় তোমার সাথে।
ওহ, আমাকে একটি তরঙ্গ, একটি পাতা, একটি মেঘের মতো তুলে নাও!
আমি জীবনের কাঁটার ওপর পড়ে গেছি! আমার রক্ত ঝরছে!
ঘন্টার পর ঘন্টার এক ভারী বোঝা শৃঙ্খলিত ও নত করেছে
এমন একজনকে যে ঠিক তোমারই মতো ছিল: অদম্য, দ্রুত এবং অহংকারী।
৫
আমাকে তোমার লাইয়ার (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র) বানিয়ে নাও, যেমনটা এই অরণ্য:
তাতে কী যদি আমার পাতাগুলো তারই মতো ঝরে পড়ে!
তোমার মহান সুরের কোলাহল
উভয় থেকেই কেড়ে নেবে একটি গভীর, শারদীয় সুর,
যা বিষণ্ন হলেও মিষ্টি। তুমি হও, হে উগ্র আত্মা,
আমার আত্মা! তুমিই আমি হও, হে আবেগপ্রবণ!
আমার মৃত ভাবনাগুলোকে মহাবিশ্ব জুড়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাও
শুকনো পাতার মতো, একটি নতুন জন্মের গতি বাড়াতে!
এবং, এই কবিতার মন্ত্রমুগ্ধতার দ্বারা,
ছড়িয়ে দাও, যেন কোনো না-নেভা চুল্লি থেকে
ভস্ম আর স্ফুলিঙ্গ, মানবজাতির মাঝে আমার কথাগুলোকে!
আমার ঠোঁটের মাধ্যমে এই ঘুমন্ত পৃথিবীর কাছে তুমি হও
একটি ভবিষ্যদ্বাণীর তূর্য! ওহ বাতাস,
যদি শীত আসে, তবে কি বসন্ত খুব বেশি দূরে থাকতে পারে?
৩. টু আ স্কাইলার্ক (To a Skylark – 1820)
স্বাগতম তোমাকে, হে প্রফুল্ল আত্মা!
পাখি তুমি কখনোই ছিলে না,
যে স্বর্গ থেকে, কিংবা তার কাছাকাছি কোথাও থেকে,
উজাড় করে দাও তোমার সম্পূর্ণ হৃদয়
পূর্বপরিকল্পনাহীন শিল্পের অফুরন্ত সুরে।
আরও উঁচুতে, আরও উঁচুতে
পৃথিবী থেকে তুমি লাফিয়ে ওঠো
এক আগুনের মেঘের মতো;
নীল অতল গহ্বরে মেলে দাও ডানা,
এবং গাইতে গাইতে উধাও হও, আর উধাও হতে হতে চিরকাল গাও।
অস্তমিত সূর্যের
সেই সোনালী আলোয়,
যার ওপর মেঘেরা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে,
তুমি ভেসে বেড়াও আর ছুটে চলো;
যেন এক শরীরহীন আনন্দ, যার দৌড় সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
… (কবিতাটি স্কাইলার্কের সাথে একজন কবি, একজন কুমারী, একটি জোনাকি এবং একটি গোলাপের সুন্দর তুলনার সাথে এগিয়ে চলে এবং বিখ্যাত অনুরোধের সাথে শেষ হয়: “আমাকে সেই আনন্দের অর্ধেকটা শিখিয়ে দাও / যা তোমার মস্তিষ্ক অবশ্যই জানে…”)
৪. লাভ’স ফিলোসফি (Love’s Philosophy – 1819)
ঝরনাগুলো গিয়ে মেশে নদীর সাথে
আর নদীগুলো গিয়ে সাগরে,
স্বর্গের বাতাস চিরকাল মিশে যায়
এক মধুর আবেগে;
পৃথিবীতে কোনো কিছুই একাকী নয়;
সবকিছুই এক ঐশ্বরিক নিয়মে
এক আত্মায় এসে মেলে এবং মিশে যায়।
তবে কেন আমি তোমার সাথে মিলব না?
দেখো পাহাড়গুলো চুমু খাচ্ছে সুউচ্চ স্বর্গকে
আর তরঙ্গগুলো একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে;
কোনো বোন-ফুলকেই ক্ষমা করা হতো না
যদি সে তার ভাইকে অবহেলা করত;
এবং সূর্যের আলো জড়িয়ে ধরে পৃথিবীকে
আর চাঁদের আলো চুমু খায় সাগরকে:
এই সমস্ত মধুর কাজের কী মূল্য আছে
যদি তুমি আমাকে চুমু না দাও?
৫. ইংল্যান্ড ইন ১৮১৯ (England in 1819 – 1819)
এক বৃদ্ধ, পাগল, অন্ধ, ঘৃণিত এবং মরণাপন্ন রাজা,—
রাজপুত্ররা, তাদের নিস্তেজ বংশের তলানি, যারা ভেসে চলেছে
জনসাধারণের অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে,—কর্দমাক্ত বসন্তের কাদা,—
শাসকেরা যারা দেখেও না, অনুভবও করে না, জানেও না,
কিন্তু জোঁকের মতো তাদের মূর্ছিত দেশের গায়ে লেগে থাকে,
যতক্ষণ না তারা রক্তে অন্ধ হয়ে, কোনো আঘাত ছাড়াই ঝরে পড়ে,—
অনাবাদী মাঠে ক্ষুধার্ত ও ছুরিকাহত এক জনগোষ্ঠী,—
একটি সেনাবাহিনী, যাকে স্বাধীনতা হত্যা এবং শিকারের উদ্দেশ্যে
তৈরি করা হয়েছে একটি দুধারী তলোয়ারের মতো তাদের সবার জন্য যারা এটি চালায়,—
সোনালী এবং রক্তক্ষয়ী আইন যা প্রলুব্ধ করে এবং হত্যা করে;
খ্রিস্টহীন, ঈশ্বরহীন ধর্ম—এক সিলমোহরযুক্ত বই;
একটি সিনেট,—সময়ের সবচেয়ে খারাপ আইন যা বাতিল করা হয়নি,—
এগুলো হলো কবর, যেখান থেকে এক গৌরবময় ভূত (Phantom) হয়তো
ফেটে পড়তে পারে, আমাদের এই ঝড়ো দিনটিকে আলোকিত করতে।
৬. হোয়েন দ্য ল্যাম্প ইজ শ্যাটার্ড (When the Lamp is Shattered – 1822)
যখন প্রদীপটি ভেঙে যায়
আলো তখন ধুলোয় মরে পড়ে থাকে—
যখন মেঘটি কেটে যায়
রামধনুর মহিমা বিলীন হয়ে যায়।
যখন সুরবাহার (lute) ভেঙে যায়,
মিষ্টি সুর আর মনে থাকে না;
যখন ঠোঁট কথা বলে ফেলে,
প্রিয় উচ্চারণগুলো শীঘ্রই ভুলে যাওয়া হয়।
যেমন সঙ্গীত ও জাঁকজমক
প্রদীপ এবং সুরবাহার ছাড়া বাঁচে না,
হৃদয়ের প্রতিধ্বনিও দেয় না
কোনো গান যখন আত্মা নীরব থাকে:—
কোনো গান নয় বরং দুঃখের শোকগাথা,
যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত কুঠুরির মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস,
অথবা সেই শোকার্ত ঢেউ
যা মৃত নাবিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঘণ্টা বাজায়।
৭. সং টু দ্য মেন অব ইংল্যান্ড (Song to the Men of England – 1819)
ইংল্যান্ডের মানুষ, তোমরা কেন হাল চাষ করো
সেই প্রভুদের জন্য যারা তোমাদের নিচু করে রাখে?
কেন তোমরা কঠোর পরিশ্রম আর যত্ন সহকারে বুনন করো
সেই দামী পোশাক যা তোমাদের অত্যাচারীরা পরিধান করে?
কেন তোমরা অন্ন দাও, বস্ত্র দাও এবং রক্ষা করো,
দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত,
সেই অকৃতজ্ঞ অলস ড্রোনদের (মৌমাছিদের) যারা
তোমাদের ঘাম শুষে নেবে—এমনকি তোমাদের রক্ত পান করবে?
…
৮. মিউটেবিলিটি (Mutability – “The flower that smiles today”)
যে ফুলটি আজ হাসছে
আগামীকাল তা মরে যায়;
যা কিছু আমরা ধরে রাখতে চাই
তা প্রলুব্ধ করে এবং তারপর পালিয়ে যায়।
এই পৃথিবীর আনন্দ কী?
বজ্রপাত যা রাতকে উপহাস করে,
যেমন সংক্ষিপ্ত তেমনি উজ্জ্বল।
গুণ (Virtue), কতই না ভঙ্গুর এটি!
বন্ধুত্ব কতই না বিরল!
প্রেম, কীভাবে এটি তুচ্ছ সুখ বিক্রি করে দেয়
অহংকারী হতাশার বিনিময়ে!
কিন্তু আমরা, যদিও তারা শীঘ্রই ঝরে পড়ে,
বেঁচে থাকি তাদের আনন্দের চেয়ে বেশি, এবং সেই সব কিছুর চেয়ে
যাকে আমরা আমাদের নিজস্ব বলি।
৯. ওয়ান ওয়ার্ড ইজ টু অফেন প্রোফেনড (One Word is Too Often Profaned)
একটি শব্দকে প্রায়শই অপবিত্র করা হয়
আমার পক্ষে সেটিকে অপবিত্র করার জন্য,
একটি অনুভূতিকে খুব মিথ্যেভাবে অবহেলা করা হয়
তোমার পক্ষে সেটিকে অবহেলা করার জন্য;
একটি আশা এতটাই হতাশার মতো
যে বিচক্ষণতার পক্ষে তা চেপে রাখা কঠিন,
এবং তোমার কাছ থেকে পাওয়া করুণা অনেক বেশি মূল্যবান
অন্য কারও কাছ থেকে পাওয়ার চেয়ে।
মানুষ যাকে ভালোবাসা বলে আমি তা দিতে পারি না,
কিন্তু তুমি কি গ্রহণ করবে না
সেই আরাধনা যা হৃদয় উচ্চে তুলে ধরে
এবং স্বর্গও যা প্রত্যাখ্যান করে না,—
তারার জন্য পতঙ্গের সেই আকুলতা,
আগামীকালের জন্য রাতের সেই আকাঙ্ক্ষা,
আমাদের দুঃখের পরিমণ্ডল থেকে দূরে
বহুদূরের কিছুর প্রতি সেই ভক্তি?
১০. দ্য ওয়ার্ল্ড’স গ্রেট এজ বিগিনস অ্যানিউ (The World’s Great Age Begins Anew)
(Prometheus Unbound, 1820 থেকে চূড়ান্ত কোরাস)
পৃথিবীর মহান যুগ নতুন করে শুরু হচ্ছে,
সোনালী বছরগুলো ফিরে আসছে,
পৃথিবী একটি সাপের মতো নতুন করে রূপ নিচ্ছে
তার জীর্ণ শীতকালীন খোলসটি ত্যাগ করে:
স্বর্গ হাসছে, এবং বিশ্বাস ও সাম্রাজ্যগুলো জ্বলজ্বল করছে,
যেন কোনো বিলীন হয়ে যাওয়া স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ।
একটি উজ্জ্বল হেলাস (Hellas/গ্রিস) তার পাহাড়গুলোকে তুলে ধরছে
অনেক বেশি শান্ত তরঙ্গ থেকে;
একটি নতুন পেনিউস (Peneus) তার ঝরনাগুলোকে গড়িয়ে দিচ্ছে
ভোরের তারার বিপরীতে।
যেখানে আরও সুন্দর টেম্পে (Tempe) প্রস্ফুটিত হয়, সেখানে ঘুমিয়ে আছে
তরুণ সাইক্ল্যাডস (Cyclads) এক রৌদ্রোজ্জ্বল অতল গহ্বরে।
শেলির কবিতা একাধারে তীব্রভাবে ব্যক্তিগত এবং গভীরভাবে রাজনৈতিক। তিনি পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য ভালোবাসা, কল্পনা এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের শক্তিতে বিশ্বাস করতেন।
পার্সি বিশ শেলি (Percy Bysshe Shelley, ১৭৯২–১৮২২)
পার্সি বিশ শেলি ছিলেন ইংরেজি রোমান্টিক যুগের (English Romanticism) অন্যতম প্রধান কবি এবং সবচেয়ে বিপ্লবী চিন্তাবিদদের একজন। তিনি ছিলেন একজন কবি, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক, যিনি তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা, ভালোবাসা, কল্পনার শক্তি এবং মানবজাতির উন্নতির স্বপ্নকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে “Ozymandias”, “Ode to the West Wind” এবং মহাকাব্যিক নাটক Prometheus Unbound। শেলি ছিলেন একজন নাস্তিক, প্রজাতন্ত্রী এবং সমাজের প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী।
শৈশব ও শিক্ষা
৪ আগস্ট ১৭৯২ সালে ইংল্যান্ডের সাসেক্সের ফিল্ড প্লেসে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে শেলির জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন সংসদ সদস্য। শৈশব থেকেই তিনি খুব সংবেদনশীল ও বিদ্রোহী ছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বন্ধু টমাস হগ-এর সঙ্গে The Necessity of Atheism নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এর ফলে ১৮১১ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এই ঘটনার পর শেলি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন জীবন শুরু করেন। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের পক্ষে লেখালেখি শুরু করেন এবং নিরামিষাশী (vegetarian) হয়ে ওঠেন।
ব্যক্তিগত জীবন
১৮১১ সালে শেলি হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুক নামে এক তরুণীকে বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৮১৪ সালে তিনি দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের কন্যা মেরি গডউইন (পরবর্তীকালে মেরি শেলি)-এর সঙ্গে পালিয়ে যান। মেরি শেলি পরবর্তীতে বিখ্যাত উপন্যাস Frankenstein লেখেন।
শেলির জীবন ছিল নাটকীয় ও দুঃখজনক। তাঁর প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেন। শেলি ও মেরির সন্তানদের অনেকেই অল্প বয়সে মারা যায়। এই ব্যক্তিগত দুঃখ তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাধারা
শেলি ছিলেন একজন আদর্শবাদী কবি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কবিতা ও কল্পনার শক্তি দিয়ে সমাজ বদলানো যায়। তাঁর প্রধান রচনাগুলো হলো:
- Queen Mab (১৮১৩) — প্রাথমিক বিপ্লবী কবিতা
- Prometheus Unbound (১৮২০) — তাঁর সবচেয়ে বড় মহাকাব্যিক নাটক, যেখানে তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহের কথা বলেছেন
- Ode to the West Wind (১৮১৯) — প্রকৃতির শক্তি ও কবির অনুপ্রেরণার অসাধারণ প্রকাশ
- Ozymandias (১৮১৮) — ক্ষমতার অনিত্যতা নিয়ে বিখ্যাত সনেট
- Adonais (১৮২১) — জন কিটসের স্মরণে লেখা শোকগাথা
- The Mask of Anarchy — রাজনৈতিক প্রতিবাদের কবিতা
শেলির কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, স্বাধীনতা এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর আশাবাদ ফুটে উঠেছে। তিনি সমাজের অসাম্য, রাজতন্ত্র ও ধর্মীয় গোঁড়ামির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ইতালিতে জীবন ও মৃত্যু
১৮১৮ সাল থেকে শেলি ইতালিতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি লর্ড বায়রনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। ইতালির প্রকৃতি ও স্বাধীন পরিবেশ তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
৮ জুলাই ১৮২২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে শেলি ইতালির স্পেজিয়া উপসাগরে নৌকাডুবিতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর হৃদপিণ্ড মেরি শেলি সংরক্ষণ করেছিলেন।
উত্তরাধিকার
শেলি তাঁর জীবদ্দশায় খুব বেশি স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর কবিতা ও চিন্তাধারা বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলে। তিনি পরবর্তী অনেক কবি, দার্শনিক ও বিপ্লবীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর আদর্শবাদ, স্বাধীনতার প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিক মূল্যবোধ আজও প্রাসঙ্গিক।
শেলি ছিলেন সেই কবি, যিনি বিশ্বাস করতেন —
“কবিরা হলেন বিশ্বের অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা।”
তাঁর কবিতা শুধু সুন্দর নয়, বরং তা মানুষকে চিন্তা করতে, স্বপ্ন দেখতে এবং পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করে।