Pindar এর দশটি কবিতা (c. 518–438 BCE)

পিন্দার (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮–৪৩৮ অব্দ) ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকবি এবং ‘বিজয়গাথা’ বা ‘অভিষেকসংগীত’ (Epinikia) রচনার একচ্ছত্র সম্রাট। তাঁর যে সমস্ত কবিতা আজ টিকে আছে, তার বেশিরভাগই অলিম্পিক, পাইথিয়ান, নেমিয়ান এবং ইস্থমিয়ান—এই চার বিখ্যাত প্যানহেলেনিক গেমসের বিজয়ীদের সম্মান জানাতে রচিত হয়েছিল। এগুলো সুর ও নৃত্যের তালে কোরাস বা সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হতো। স্যাফোর কবিতার মতো এগুলো সংক্ষিপ্ত বা ব্যক্তিগত অনুভূতিমূলক নয়; বরং এগুলো উপকথা, নৈতিক ভাবনা, বিজয়ী যোদ্ধা, তাঁর পরিবার ও নগরীর প্রশংসায় মুখর এক একটি বিশাল এবং জটিল প্রকাশ্য স্তবগান।

১. অলিম্পিয়ান ওড ১ (সাইরাকিউসের হিয়েরনের জন্য, ৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – একক ঘোড়দৌড়)

সূচনা

জলই সর্বশ্রেষ্ঠ, আর সোনা—রাতের অন্ধকারে জ্বলতে থাকা আগুনের মতো,

সমস্ত রাজকীয় ঐশ্বর্যের মাঝে একচ্ছত্র মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে।

কিন্তু হে আমার হৃদয়, তুমি যদি প্রতিযোগিতার গান গাইতে চাও,

তবে দিনের আকাশে একাকী উজ্জ্বল সূর্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ

অন্য কোনো নক্ষত্রের সন্ধান করো না;

আর এসো, আমরাও অলিম্পিয়ার চেয়ে মহান কোনো প্রতিযোগিতার ঘোষণা না করি।

২. পাইথিয়ান ওড ১ (এটনার হিয়েরনের জন্য, ৪৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – রথদৌড়)

সূচনা – লাইয়ারের (বীণা) ক্ষমতা

হে স্বর্ণালী লাইয়ার, দেবতা অ্যাপোলো এবং বেগুনি-কেশা কাব্যদেবী বা মিউজদের যৌথ অধিকার তুমি,

যার সুরের তালে নেচে ওঠে নৃত্যের চরণ, যা দিয়ে শুরু হয় জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব;

আর গায়কেরা মেনে চলে তোমার সুরের মূর্ছনা, যখনই তোমার কম্পিত তারগুলো দিয়ে

তুমি কোরাস বা সমবেত গানের মুখবন্ধ তৈরি করো।

তুমি চিরন্তন আগুনের সেই যুদ্ধবাজ বজ্রপাতকেও শান্ত করতে পারো।

এমনকি দেবরাজ জিউসের রাজদণ্ডের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে ঈগল পাখি—পাখিদের রাজা,

তার দুপাশের দ্রুতগামী ডানা দুটি শিথিল করে;

আর তুমি তার বাঁকানো মাথার ওপর ঢেলে দাও এক অন্ধকার কুয়াশা,

তার চোখের পাতায় এক মধুর ঘুমের মোহর।

৩. অলিম্পিয়ান ওড ২ (আক্রাগাসের থেরনের জন্য, ৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – রথদৌড়)

পরকাল এবং পুনর্জন্ম প্রসঙ্গে

হে গান, লাইয়ারের শাসকদল, কোন দেবতা, কোন বীর বা কোন মানুষের বন্দনা করব আমরা?

তবে যারা নিজেদের আত্মাকে সম্পূর্ণ পবিত্র রেখে ধৈর্য ধরেছে,

তারা জিউসের পথ ধরে ক্রোনাসের দুর্গের দিকে যাত্রা করে,

যেখানে মহাসমুদ্রের মৃদু বাতাস বয়ে যায় পুণ্যবানদের সেই পরম দ্বীপের (Isle of the Blessed) চারিপাশে…

৪. পাইথিয়ান ওড ৪ (সাইরিনের আরকেসিলাসের জন্য, ৪৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – রথদৌড়)

দীর্ঘ আর্গোনাট ওড – সূচনা

আজ, হে কাব্যদেবী (মিউজ), তোমাকে দাঁড়াতে হবে এক প্রিয় বন্ধুর পাশে,

যিনি রথের নগরী সাইরিনের রাজা;

যাতে উৎসবমুখর মানুষদের মাঝে আরকেসিলাসের সাথে মিলে

তুমি লেটোর সন্তানদের এবং পাইথোর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত স্তবগানের হাওয়া বইয়ে দিতে পারো…

৫. অলিম্পিয়ান ওড ৩ (আক্রাগাসের থেরনের জন্য, ৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – রথদৌড়)

হাইপারবোরিয়ানদের কাছ থেকে পাওয়া জলপাইয়ের মুকুট

আমি প্রার্থনা করি যেন টিন্ডারেউসের অতিথি পরায়ণ পুত্রদের এবং সুন্দর চুলের হেলেনকে সন্তুষ্ট করতে পারি,

এবং থেরনের অলিম্পিক বিজয়ের উদ্দেশ্যে একটি গান বেঁধে বিখ্যাত আক্রাগাস নগরীকে সম্মানিত করতে পারি…

সেই জলপাইয়ের মুকুট, যা হাইপারবোরিয়ানদের উপহার এবং দেবরাজ জিউসের সেবক…

৬. পাইথিয়ান ওড ৩ (সাইরাকিউসের হিয়েরনের জন্য, ৪৭৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ঘোড়দৌড়)

মনুষ্য সীমানা এবং করোনিসের গল্প প্রসঙ্গে

আমি প্রার্থনা করতাম যেন কাইরন এখনো বেঁচে থাকতেন—ফিলিরার সেই প্রয়াত পুত্র,

যদি এই প্রার্থনা আমার মুখ থেকে বের হওয়া বৈধ ও সঙ্গত হতো…

কিন্তু যেহেতু আমি মৃতদের ফিরিয়ে আনতে পারি না,

তাই আমি সেই গল্পটিই প্রকাশ করব যা বহু আগে বলা হয়েছিল…

৭. নেমিয়ান ওড ১ (এটনার ক্রোমিয়সের জন্য, ৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – রথদৌড়)

হারকিউলিসের জন্ম

হে আলফেয়াসের পবিত্র নিশ্বাস,

অরটিজিয়ার গৌরব, বিখ্যাত সাইরাকিউসের এক শাখা…

সেখানে, দেবরাজ জিউসের অনুগ্রহে,

দেবী আর্টেমিস তাঁর সৌম্য দৃষ্টিতে আগলে রাখেন তাঁর প্রজাদের…

৮. ইস্থমিয়ান ওড ৮ (এজিনার ক্লিয়ান্ড্রসের জন্য, ৪৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – প্যানক্রেশন বা প্রাচীন কুস্তি)

পারস্য যুদ্ধের সমাপ্তি প্রসঙ্গে

ক্লিয়ান্ড্রস এবং তাঁর যৌবনের এই শ্রেষ্ঠ সময়ের জন্য,

হে তরুণেরা, কেউ একজন যাও এবং ইস্থমিয়ান গেমসে তাঁর কঠোর পরিশ্রমের

এক মধুর পুরস্কার ডেকে নিয়ে এসো…

এখন যেহেতু সেই ব্রোঞ্জের বর্মধারী যুদ্ধের অবসান ঘটেছে…

৯. অলিম্পিয়ান ওড ৭ (রোডসের ডায়াগোরাসের জন্য, ৪৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – বক্সিং)

সূর্যদেব এবং রোডসের উপকথা

যেমন কোনো এক ধনী ব্যক্তি তাঁর হাত থেকে তুলে নেন

একটি সোনার পাত্র—তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মধ্যে সেরা সম্পদ,

যা তিনি নিজের দক্ষতায় তৈরি করেছেন…

তেমনি আমিও বিজয়ীদের কাছে পাঠিয়ে দিই আমার তরল অমৃত, যা কাব্যদেবী বা মিউজদের উপহার…

১০. পাইথিয়ান ওড ৮ (এজিনার অ্যারিস্টোমেনিসের জন্য, ৪৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – কুস্তি)

মানবীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সেই বিখ্যাত সমাপ্তি অংশ

ক্ষণজন্মা জীব আমরা! কে-ই বা এই মানুষ?

আর কে-ই বা কেউ নয়? একটি ছায়ার স্বপ্ন

হলো এই মানবজাতি। কিন্তু যখন জিউসের দেওয়া স্বর্গীয় আলো আসে,

তখন মানুষের ওপর এক দীপ্তিময় জ্যোতি জ্বলে ওঠে, আর জীবন হয়ে ওঠে মধুর।

এই নির্বাচিত অংশগুলো পিন্দারের স্বভাবসুলভ মহিমান্বিত রূপকে ফুটিয়ে তোলে: উপকথা থেকে বর্তমান বিজয়ের মুহূর্তে তাঁর দ্রুত পটপরিবর্তন, গভীর ধর্মীয় অনুভূতি এবং এই বিশ্বাস যে, ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেলেই মানুষের কৃতিত্ব তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

পিন্দার (প্রায় ৫১৮–৪৩৮ খ্রিস্টপূর্ব)
প্রাচীন গ্রিক গীতিকাব্যের মহান কবি
— বিজয়োৎসবের গানের (Epinikia) অমর রচয়িতা

পিন্দার ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে সম্মানিত গীতিকাব্য রচয়িতাদের একজন। তিনি বিজয়োৎসবের গান (Victory Odes বা Epinikia) রচনার জন্য বিখ্যাত। এই গানগুলো প্যানহেলেনিক খেলার (অলিম্পিক, পিথিয়ান, নেমিয়ান ও ইস্থমিয়ান গেমস) বিজয়ীদের সম্মানে লেখা হতো। প্রাচীনকালে তাঁকে গীতিকাব্যের শীর্ষস্থানীয় কবি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাঁর কবিতা ঘন, রূপকময় এবং পৌরাণিক কাহিনী ও নৈতিক চিন্তায় সমৃদ্ধ।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

পিন্দার জন্মগ্রহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮ সালে বয়োটিয়া অঞ্চলের সিনোসেফালাই (Cynoscephalae) গ্রামে, থিবস শহরের কাছে। তাঁর পরিবার সম্ভ্রান্ত ছিল এবং তিনি থিবসের অভিজাত পরিবেশে বড় হন।

শৈশবে তাঁর প্রতিভার কিংবদন্তি আছে — বলা হয়, মৌমাছিরা তাঁর মুখে মধু রেখে গিয়েছিল, যা তাঁর ভবিষ্যৎ কাব্যপ্রতিভার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তিনি থিবসে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে কবিতা রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

কাব্যকর্ম ও বিশেষত্ব: বিজয়োৎসবের গান

পিন্দারের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা হলো চারটি বইয়ের বিজয়োৎসবের গান (Epinikia):

  • অলিম্পিক ওডস (Olympian Odes)
  • পিথিয়ান ওডস (Pythian Odes)
  • নেমিয়ান ওডস (Nemean Odes)
  • ইস্থমিয়ান ওডস (Isthmian Odes)

এই গানগুলো খেলার বিজয়ীদের (যেমন: দৌড়বিদ, কুস্তিগীর, রথচালক) সম্মানে লেখা হতো। তিনি শুধু বিজয়ীর প্রশংসা করতেন না, বরং:

  • বিজয়ীর শহর ও পরিবারের গৌরব বর্ণনা করতেন
  • পৌরাণিক কাহিনী (মিথ) ব্যবহার করে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন
  • মানুষের সাফল্যে দেবতাদের অনুগ্রহের কথা বলতেন

তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে ছিল স্তোত্র (Hymns), পেয়ান (Paeans), ডিথিরাম্ব (Dithyrambs) ইত্যাদি, কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে। আজ আমাদের কাছে মূলত ৪৫টি বিজয়োৎসবের গান টিকে আছে — যা প্রাচীন গ্রিক গীতিকবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত।

জীবন, ভ্রমণ ও পৃষ্ঠপোষকতা

পিন্দার ছিলেন একজন পেশাদার কবি। তিনি বিভিন্ন গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের ধনী ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের (পৃষ্ঠপোষক) জন্য কবিতা লিখতেন। তিনি সিসিলি, এথেন্স, থেসালি, আর্গোসসহ অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছেন।

তাঁর সময়কাল ছিল পারস্য যুদ্ধের যুগ। থিবস পারস্যের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিল, তাই পিন্দারের কবিতায় এ বিষয়ে সতর্কতা দেখা যায়। তিনি মূলত নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন এবং গ্রিক ঐক্য ও দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলেছেন।

শৈলী ও বিষয়বস্তু

পিন্দারের কবিতা অত্যন্ত জটিল ও ঘন। তাঁর ভাষা ছিল ডোরিক উপভাষা (Doric) মিশ্রিত। তিনি:

  • দ্রুত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যেতেন
  • পৌরাণিক কাহিনীকে আধুনিক বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করতেন
  • নৈতিক উপদেশ ও ধর্মীয় চিন্তা প্রকাশ করতেন

তাঁর বিখ্যাত উক্তি: মানুষের সাফল্য দেবতাদের অনুগ্রহ ছাড়া সম্ভব নয়।

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

পিন্দার প্রাচীনকালে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। রোমান যুগেও তাঁর কবিতা পঠিত হতো। পরবর্তীকালে তাঁর জটিল শৈলী অনেক কবিকে প্রভাবিত করেছে। আধুনিক যুগে তাঁর কবিতা পুনরায় আবিষ্কৃত হয়েছে এবং পণ্ডিতরা তাঁর গভীরতা ও শৈল্পিক দক্ষতার প্রশংসা করেন।

তিনি ছিলেন “ক্যানোনিক্যাল নয়জন গীতিকবির” একজন, এবং তাঁর রচনা সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত।

পিন্দার ছিলেন একজন পেশাদার কবি, যিনি খেলাধুলার বিজয়কে শুধু খেলা হিসেবে নয়, বরং দেবতাদের অনুগ্রহ, মানবিক প্রচেষ্টা ও নগরের গৌরব হিসেবে উদযাপন করেছেন। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে মুগ্ধ করে তার গভীরতা, সৌন্দর্য ও নৈতিক শক্তির জন্য।

“পিন্দার ছিলেন সেই কবি, যিনি বিজয়ের মুহূর্তকে চিরকালীন করে রেখেছিলেন — দেবতা, মানুষ ও ইতিহাসের মিলনে।”

Comment