অণু গল্প:
অস্মিতা
পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকান। ওখানেই আড্ডা। কত মানুষের সাথে আলাপ আর পরিচয় – কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়।
দুদিন বাড়ির বাইরে ছিলাম তারপর দোকানে
সেদিন চা খেতে গেছি । হাতে মোবাইলটা নিয়ে সবে যুৎ করে বসেছি কাঠের বেঞ্চে। হঠাৎ একটি ছোট্ট ছেলে এসে গা ঘেঁষে বসলো। চোখ তার আমার হাতের মোবাইলে। কৌতুহলী হলাম আমি। কি অদ্ভুত সারল্য ওই শিশুর চোখে মুখে আচরণে। অনায়াসে কত আপন ভেবে ফেলেছে আমায়। নির্দ্বিধায় পাশে বসেছে এমন ভাবে যেন একটু স্নেহের পরশ চায়। আমি শিশুদেরকে খুব ভালোবাসি তাই ওকে একটু প্রশ্রয় দিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোর -নাম কি রে?
উত্তর এলো, ‘রাহুল হেমব্রম ‘।
আমি আর কিছু বলার আগেই দোকানের লোকেরা বলে উঠলো, ” ধুর! ও রাহুল টুডু।”
ছেলেটি তীব্র প্রতিবাদে গর্জে উঠলো, “দেখব আমি রাহুল টুডু না, আমি রাহুল হেমব্রম!”
বিস্মিত হলাম।
খোঁজ নিলাম ওর বিষয়ে । জানলাম ছেলেটিকে।
এক দিন দরিদ্র আদিবাসী পরিবারে জন্ম। বাবা মা দুজনেই ওকে ছেড়ে অন্য সঙ্গীর সাথে বাসা বেঁধেছে অন্যত্র। অনাথ শিশু। স্কুলের পাঠ ও চুকিয়ে ফেলেছে কবে। পিসিমণির আস্তানায় ঠাঁই হয়েছিল কিছুদিন। জোটেনি পেটের ভাত, মেটেনি মনের খিদে। তাই অগত্যা জীবন সংগ্রাম – একরত্তি শিশুর। চায়ের দোকানে আশ্রয়।
এমনিতেই ওর এখন তেমন কোনো দুঃখ নেই। পোশাক, খাবার, আশ্রয় জুটেছে। পেয়েছে স্নেহ- মমতাও কিছুটা মানবিকতার পরশে। এমনিতেই সুবোধ বালক কিন্তু চটে যায় ওই একটি কথায় – পদবীর বদল হলেই রেগে খাঁই।
– দেখব, আমি রাহুল টুডু না ,আমি রাহুল হেমব্রম!
বুঝি ওটাই ওর আত্ম পরিচয়। ওটাই অহংকার! তাই ঘা লেগে যায় পদবী বদল হলেই।
সব তো গেছে হারিয়ে। এই অস্মিতা টুকু বেঁচে থাক।

