স্যাফো (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬৩০–৫৭০ অব্দ) ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম সেরা গীতিকবি। লেসবস দ্বীপে বসবাসকারী এই কবির লেখনীতে অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্য, বন্ধুত্ব এবং প্রকৃতির রূপ ফুটে উঠত। প্লেটো এবং পরবর্তীকালের লেখকেরা তাঁকে “দশমকাব্যদেবী” (Tenth Muse) বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রায় সবটুকুই আজ কেবল উদ্ধৃতাংশ বা খণ্ডাংশ (Fragments) হিসেবে টিকে আছে—যা পরবর্তীকালের লেখকদের বিভিন্ন উদ্ধৃতিতে অথবা প্রাচীন প্যাপিরাসের টুকরোয় আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের কাছে কেবল একটিই প্রায় সম্পূর্ণ কবিতা রয়েছে এবং বাকিগুলো আংশিক হলেও অত্যন্ত প্রভাবশালী।
১. আফ্রোদিতির প্রতি স্তবগান (খণ্ডাংশ ১)
আমাদের কাছে থাকা একমাত্র প্রায় সম্পূর্ণ কবিতা—প্রেমের দেবীর কাছে এক আকুল প্রার্থনা
হে মৃত্যুহীন আফ্রোদিতি, দীপ্তিময় মনের অধিকারিণী,
হে জিউসের কন্যা, ছলনার জাল বুনে চলো যিনি,
তোমাকে মিনতি করি দেবী, তীব্র যন্ত্রণায় আমার হৃদয় ভেঙে দিয়ো না,
বরং নেমে এসো এখন, অতীতে যেমন কখনো
বহু দূর থেকে তুমি শুনেছ আমার কণ্ঠস্বর, রেখেছ মনে,
আর ছেড়ে এসেছ তোমার পিতার সেই স্বর্ণপ্রাসাদ,
রথে জুড়ে দিয়েছিলে ঘোড়া; সেই সুন্দর ও দ্রুতগামী
চড়ুই পাখিরা তোমাকে কালো পৃথিবীর বুকে নিয়ে এসেছিল নামি,
আকাশের বুক চিরে পাখার ঝাপটায় নেমে এসেছিল তারা।
তারা এসেছিল। আর তুমি, হে পবিত্র দেবী,
তোমার অম্লান মুখে ফুটিয়ে মৃদু হাসি, জানতে চেয়েছিলে—
কী আমার কষ্ট, কেন আজ আবার তোমাকে ডাকছি আমি…
তবে চলে এসো আজো, মুক্ত করো আমায়
এই বুকভাঙা দুশ্চিন্তা থেকে, আর এনে দাও
যা কিছু পেতে ব্যাকুল আমার প্রাণ। তুমি হও আমার সখা।
২. দেবতাকুল সমকক্ষ মনে হয় তারে (খণ্ডাংশ ৩১)
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কবিতা—কামনার শারীরিক তীব্রতার এক অনন্য প্রকাশ
সেই পুরুষকে আমার দেবতাদের সমকক্ষ মনে হয়
যে তোমার ঠিক মুখোমুখি
বসে থাকে এবং খুব কাছ থেকে শোনে
তোমার মিষ্টি আলাপন
আর তোমার ওই মধুর হাসি—ওহ! তা যেন
আমার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটাকে পাখনা মেলে দেয়,
কারণ যখনই আমি তোমার দিকে তাকাই, একটি পলকের জন্যও,
আমার মুখে আর কোনো কথা থাকে না,
না; জিভ যেন ভেঙে যায়, আর এক সূক্ষ্ম
আগুনের স্রোত বয়ে যায় চামড়ার নিচে,
চোখে আর কিছু দেখা যায় না, কানের ভেতর
বাজে কেবলই মাদলের শব্দ,
শীতল ঘাম আমায় জাপটে ধরে, আর এক কম্পন
গ্রাস করে আমায় পুরোপুরি, ঘাসের চেয়েও মলিন বিবর্ণ
হয়ে পড়ি আমি, যেন মৃত—অথবা মৃতপ্রায়।
৩. কেউ বলে অশ্বারোহী দল… (খণ্ডাংশ ১৬)
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বস্তু কোনটি, তা নিয়ে
কেউ বলে অশ্বারোহী দল, কেউ বলে পদাতিক সৈন্য,
কেউ বা বলে রণতরীর বহরই সবচেয়ে সুন্দর
এই অন্ধকার পৃথিবীর বুকে; কিন্তু আমি বলি—
তুমি যাকে ভালোবাসো, সুন্দর তো সেই।
সবার কাছে এই সত্য স্পষ্ট করা খুবই সহজ,
কারণ হেলেন, সৌন্দর্যে যিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন
বাকি সবাইকে, তিনিও ফেলে রেখেছিলেন
তাঁর এক সুযোগ্য স্বামীকে,
এবং যাত্রা করেছিলেন ট্রয়ের পানে
একবারের জন্যও মনে না রেখে
তাঁর নিজের কন্যা কিংবা প্রিয় পিতা-মাতাকে…
মোহগ্রস্ত হয়ে…
আর আজ আমার মনে পড়ে অ্যানাক্টোরিয়ার কথা, যার ওই মিষ্টি হাঁটার ছন্দ
কিংবা তার মুখের ওপর আলোর সেই মৃদু ঝলকানি,
আমি দেখতে চাই লিজিয়ান রথের চেয়েও আগে,
কিংবা বর্মধারী হোপ্লাইট (গ্রিক সৈন্য) বাহিনীর সারির চেয়েও বেশি।
৪. টিথোনাসের কবিতা (খণ্ডাংশ ৫৮)
বার্ধক্য এবং মরণশীলতা নিয়ে লেখা একটি মর্মস্পর্শী কবিতা (যার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ ২০০৪ সালে আবিষ্কৃত হয়)
হে কন্যারা, তোমরা সুবাসিত ফুলের মতো বরদানকারী
কাব্যদেবী বা মিউজদের সুন্দর উপহার আর সেই সুরেলা লাইয়ারের (বীণা) প্রতি অনুরাগী হও:
কিন্তু এখন বার্ধক্য এসে গ্রাস করেছে আমার এই সুকোমল শরীরকে,
এখন আমার চুল পেকে সাদা, আর আগের মতো কালো নেই।
আমার মন আজ ভারী, আমার পা দুটি আর ভার সইতে পারে না,
যা এককালে হরিণশাবকের মতো দ্রুতবেগে নেচে বেড়াত নৃত্যের তালে।
আমি প্রায়ই নিজের এই অবস্থার জন্য শোক করি; কী-ই বা করতে পারি আমি?
মানুষ হয়ে জন্মালে বুড়ো না হওয়ার তো কোনো উপায় নেই।
তারা বলে, গোলাপী-বাহু ঊষা দেবী নাকি একদা প্রেমে পড়ে
টিথোনাসকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে:
তখন সে সুদর্শন আর তরুণ ছিল বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত
সেই অমর স্ত্রীর মরণশীল স্বামীকে ধরে ফেলেছিল ধূসর বার্ধক্য।
৫. প্রেম কাঁপিয়ে দিল মোর মন (খণ্ডাংশ ৪৭)
প্রেম কাঁপিয়ে দিল মোর মন,
যেমন করে পর্বতের বুকে বয়ে যাওয়া বাতাস
ওলটপালট করে দেয় ওক গাছের বন।
৬. একদা বহু আগে ভালোবেসেছিলাম তোমায়, অ্যাথিস (খণ্ডাংশ ৪৯)
একদা বহু আগে ভালোবেসেছিলাম তোমায়, অ্যাথিস,
তখন তুমি ছিলে যেন এক ছোট্ট, চপল খুকি।
৭. সে যে মরে যায়, সাইথিরিয়া… (অ্যাডোনিস-প্রসঙ্গ)
সে যে মরে যায়, সাইথিরিয়া, তোমার সেই সুকোমল অ্যাডোনিস,
এখন আমাদের কী করা উচিত?
বুকে আঘাত করো মেয়েরা, ছিঁড়ে ফেলো তোমাদের পোশাক…
৮. এরোস, আবারো এখন… (খণ্ডাংশ ১৩০)
এরোস, অঙ্গ-শিথিলকারী সেই দেবতা আবারো আমায় ব্যাকুল করে তোলে,
সে এক তিক্ত-মধুর, চতুর, এক অবাধ্য প্রাণী…
৯. পাহাড়ি হায়াসিন্থের মতো (খণ্ডাংশ ১০৫-ক)
ঠিক সেই পাহাড়ি হায়াসিন্থ ফুলের মতো, সেই বেগুনি ফুল—
রাখালেরা যাকে মাটির বুকে মাড়িয়ে চলে যায় অবহেলায়…
১০. মিউজরা ভরিয়ে দিয়েছে মোর জীবন (কাব্যদেবী-প্রসঙ্গ)
কাব্যদেবী তথা মিউজরা ভরিয়ে দিয়েছে মোর জীবন
অসীম আনন্দে।
তাই যখন আমি মরব, আমি হারিয়ে যাব না বিস্মৃতির অতলে।
এই খণ্ডাংশগুলো স্যাফোর অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ দেয়: তিনি মাত্র কয়েক লাইনের মধ্যে কামনার তীব্র শারীরিক অনুভূতি, বিচ্ছেদের বেদনা, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সময়ের বয়ে চলাকে ধরে রাখতে পারতেন। দীর্ঘ ২৬০০ বছর পরেও তাঁর কণ্ঠস্বর আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক মনে হয়।
স্যাফো (প্রায় ৬৩০–৫৭০ খ্রিস্টপূর্ব)
প্রাচীন গ্রিক গীতিকাব্যের অমর কবি
— “দশম মিউজ”
স্যাফো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী নারী কবি। তিনি আর্কাইক যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ৭ম–৬ষ্ঠ শতাব্দী) গীতিকাব্য রচয়িতা। তাঁর কবিতা প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্য, বন্ধুত্ব ও মানবিক অনুভূতির গভীরতা নিয়ে লেখা। প্রাচীনকালে তাঁকে “দশম মিউজ” (Tenth Muse) বলে সম্মান দেওয়া হতো — অর্থাৎ, নয়জন মিউজের (কাব্যের দেবী) সঙ্গে তাঁকেও স্থান দেওয়া হয়েছিল। আজও তাঁর নাম থেকে ইংরেজি শব্দ “Sapphic” ও “Lesbian” এসেছে।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
স্যাফো লেসবস দ্বীপে (বর্তমান গ্রিস) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬৩০ থেকে ৬১২ সালের মধ্যে। জন্মস্থান সম্ভবত এরেসোস বা মাইটিলিনি শহর। তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন।
তাঁর পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি নিশ্চিত তথ্য নেই। কবিতায় তিনি তাঁর দুই ভাই — লারিকাস ও কারাকসাস — এর কথা উল্লেখ করেছেন। এক কন্যা ক্লেইস (Cleïs) ছিল বলে জানা যায়। স্যাফো সম্ভবত বিয়ে করেছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গে মাইটিলিনিতে বাস করতেন।
কাব্য রচনা ও শৈলী
স্যাফোর কবিতা ছিল গীতিকাব্য (Lyric poetry) — অর্থাৎ, সুরের সঙ্গে গাওয়ার জন্য লেখা। তিনি এওলিক উপভাষায় (Aeolic dialect) লিখতেন। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল মূলত:
- নারীর প্রতি নারীর প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা
- সৌন্দর্য ও প্রকৃতি
- বিবাহের গান (Epithalamia)
- ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সম্পূর্ণ কবিতা হলো “অড টু আফ্রডিটি” (Aphrodite-এর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা)। এছাড়া “টিথোনাস পয়েম” (বার্ধক্য নিয়ে) সাম্প্রতিক প্যাপিরাস আবিষ্কারে আরও সম্পূর্ণ রূপে পাওয়া গেছে।
স্যাফোর ভাষা ছিল সরল, সরাসরি ও চিত্রকল্পময়। তিনি আবেগকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করতেন।
“দশম মিউজ” ও খ্যাতি
প্রাচীন গ্রিসে স্যাফোর খ্যাতি ছিল অপরিসীম। আলেকজান্দ্রিয়ার পণ্ডিতরা তাঁকে নয়জন গীতিকবির একজন হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন। প্লেটোসহ অনেক প্রাচীন লেখক তাঁকে “দশম মিউজ” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কবিতা নয়টি বইয়ে সংকলিত ছিল, যার বেশিরভাগই পরবর্তীকালে হারিয়ে যায়।
জীবনের অন্যান্য দিক
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের দিকে রাজনৈতিক কারণে স্যাফো ও তাঁর পরিবারকে সিসিলিতে নির্বাসিত করা হয়। পরে তিনি লেসবসে ফিরে আসেন।
তিনি মাইটিলিনিতে অবিবাহিত তরুণীদের একটি শিক্ষাকেন্দ্র (thiasos) পরিচালনা করতেন। সেখানে কবিতা, সংগীত ও আফ্রডিটির উপাসনা শেখানো হতো। এই কেন্দ্র থেকেই তাঁর অনেক প্রেমের কবিতার অনুপ্রেরণা এসেছে।
রচনার বর্তমান অবস্থা
স্যাফো প্রায় দশ হাজার পঙ্ক্তি রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু আজ মাত্র একটি কবিতা সম্পূর্ণভাবে টিকে আছে। বাকি সব খণ্ডাংশ (fragments) — প্যাপিরাসের টুকরো বা পরবর্তী লেখকদের উদ্ধৃতি থেকে পাওয়া। তবু এই খণ্ডাংশগুলোই তাঁকে অমর করে রেখেছে।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
স্যাফোর প্রভাব আজও অপরিসীম:
- তিনি নারীর কণ্ঠস্বরকে প্রাচীন সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন।
- তাঁর কবিতা পরবর্তীকালের অনেক কবিকে (রোমান, রেনেসাঁস ও আধুনিক) অনুপ্রাণিত করেছে।
- “Sapphic” ও “Lesbian” শব্দ দুটি তাঁর নাম ও জন্মভূমি থেকে উদ্ভূত।
- আজও তাঁর কবিতা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সংবেদনশীল ও সুন্দর নিদর্শন হিসেবে পঠিত হয়।
স্যাফো শুধু একজন কবি নন, তিনি মানবিক আবেগের একজন অসাধারণ দোভাষী। তাঁর কবিতায় প্রেমের আনন্দ, ব্যথা, স্মৃতি ও বার্ধক্যের অনুভূতি এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে আজও পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। যদিও তাঁর জীবনের অনেকটাই রহস্যে ঢাকা, তবু তাঁর সৃষ্টি আজও জীবন্ত।
“স্যাফো ছিলেন সেই কবি, যিনি নারীর হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে শব্দ দিয়ে অমর করে রেখেছিলেন।”