৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমাহার : বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল

সবুজ পাহাড়ের নীরব প্রহর, ঝরনার কলকল ধ্বনি, নদীর বহমান স্রোত আর বিস্তীর্ণ চা-বাগানের কোমল সবুজে মোড়ানো এক অপরূপ জনপদ-বৃহত্তর সিলেট। এ অঞ্চল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যেই অনন্য নয়; ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোয়ও এটি বাংলাদেশের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

প্রায় সাড়ে সাতশত বছর আগে- মরু সাহারা তথা আরবভূমি থেকে হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.)–এর নেতৃত্বে ৩৬০ জন সুফি দরবেশ ও অলী-আওলিয়া এ ভূখণ্ডে আগমন করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্যায় ও পাপাচারের অবসান ঘটিয়ে শান্তি, মানবপ্রেম ও সত্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁদের ত্যাগ, সাধনা ও নিরলস প্রচেষ্টায় সিলেট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক চেতনার এক শক্ত ভিত। এই পবিত্র ধারাবাহিকতায় যুগে যুগে এ মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন বহু আলেম, আরিফ ও বুজুর্গানে দীন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-হযরতুল আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (ফুলতলী), হযরতুল আল্লামা শেখ লুৎফুর রহমান হামিদী (বরুণী), মাওলানা নূরউদ্দীন চৌধুরী সাহেব (গহরপুরী) প্রমুখ। তাঁদের পূর্বসূরি ও উত্তরসূরিদের স্মৃতি ও অবদান সিলেটকে দিয়েছে পুণ্যভূমির মর্যাদা।

সিলেট অঞ্চল যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ আজও বহন করে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য। রাজনগরের তারাপাশায় অবস্থিত বিষ্ণুপদ ধামসহ সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য তীর্থস্থান স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চর্চার প্রাণকেন্দ্র। নির্বিঘ্নে ধর্মীয় উৎসব ও আচার পালনের এই পরিবেশই প্রমাণ করে-সিলেট মানবিক সহাবস্থানের এক অনুপম উদাহরণ।

মরমী সাধনা ও বাউল সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সিলেট এক উর্বর ভূমি। হাছন রাজা, আরকুম শাহ, সৈয়দ শাহনূর, সিতালং শাহ, রাধারমন দত্ত, দীনভবানন্দ, শেখ ভানু, শাহ আব্দুল করিমদের গানে, দর্শনে ও সাধনায় মিশেআছে মানবপ্রেম ও আত্মঅনুসন্ধানের বাণী। তাঁদের পথ ধরে পরবর্তী সময়ে আবির্ভূত হন পণ্ডিত রামকানাই দাস, কারী আমীর উদ্দীন, রুহী দাশ ঠাকুর, পাগল হাসানসহ আরও অনেকে, যাঁরা বাউল ও মরমী সংগীতের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

নাগরি বর্ণে রচিত মহানবী (সা.)–এর জীবনীগ্রন্থ ‘কেতাবে হালতুন্নবি’–এর প্রণেতা মুন্সী সাদেক আলী আজ চিরনিদ্রায় শায়িত মৌলভীবাজারের রাজনগরে। তাঁর এই সাহিত্যকীর্তি নিয়ে বর্তমান সময়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ইতিহাসবিদ ড. মুমিনুল হকের মতো গবেষকেরা। পাশাপাশি সিলেটের মধুবনে প্রতিষ্ঠিত ‘আউকা সিলটি নাগরি হিকি’ নাগরি লিপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।

এই জনপদ যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য কীর্তিমান ও গুণী ব্যক্তিত্বকে। তাঁদের চিন্তা, লেখনী, সংগ্রাম ও সুকর্ম আজও মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও রম্যলেখক ড. সৈয়দ মুজতবা আলী, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান, সাহিত্যিক চৌধুরী গোলাম আকবর (সাহিত্যভূষণ), মুন্সী আশরাফ হোসেন (সাহিত্যরত্ন), ভাষাসৈনিক ও সংগঠক মফিজ আলী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাংবাদিক সৈয়দ মতিউর রহমান-এঁরা সবাই বৃহত্তর সিলেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবেও সিলেট অতুলনীয়। সিলেট, মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের চা–বাগানের সবুজ ঢেউ, কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, জাফলং ও লালাখালের নীল–সবুজ জলরাশি, সুনামগঞ্জের নীলাদ্রী লেক, শিমুলবাগান ও বিস্তৃত হাওরাঞ্চল-সব মিলিয়ে এ অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের এক স্বপ্নিল ঠিকানা।
সংস্কৃতি, শিল্পকলা, ফল–ফলাদি ও খনিজ সম্পদেও সিলেট অঞ্চল সমৃদ্ধ। কমলগঞ্জে মনিপুরি সম্প্রদায়ের ললিতকলা একাডেমি, গারো ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের নৃত্য–উৎসব ও হস্তশিল্প, শীতলপাটি, শ্রীমঙ্গলের আনারস, শমসেরনগরের টিলাভূমির সুস্বাদু কাঠাল ও জৈন্তাপুরের কমলা এ অঞ্চলকে করেছে প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর। পাশাপাশি তেল, গ্যাস ও চুনাপাথরসহ খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য এবং ছাতকের সিমেন্ট শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
সত্যিই, বৃহত্তর সিলেট—পুণ্য, প্রকৃতি ও মানবিকতার এক অনন্য মিলনভূমি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ছড়াকার।

Syed Ubaidur Rahman Sharif

Comment