Tareque Masud

তারেক মাসুদ: ‘মাটির ময়না’র মাধ্যমে একটি জাতির আত্মাকে ক্যামেরায় বন্দী করা এক দূরদর্শী পরিচালক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সমৃদ্ধ ইতিহাসে তারেক মাসুদের মতো খুব কম ব্যক্তিত্বই আছেন যিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। তিনি এমন একজন পরিচালক যাঁর মাস্টারপিস ‘মাটির ময়না’ (The Clay Bird) বিশ্বজুড়ে দর্শকদের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং বাঙালি পরিচয়ের সূক্ষ্ম লড়াইকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করা তারেক মাসুদ ছিলেন এক গভীর জীবনবোধসম্পন্ন গল্পকার। তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতির সাথে ঐতিহাসিক সত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন যা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ধর্ম, স্বাধীনতা এবং মানবতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

১৯৫৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার নূরপুর গ্রামে তারেক মাসুদ জন্মগ্রহণ করেন। একটি অত্যন্ত ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে তরুণ মাসুদকে খুব ছোটবেলাতেই একটি মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। এই মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর বিশ্বদর্শন এবং শৈল্পিক চেতনা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মাদ্রাসার সেই কঠোর পরিবেশ, যা একদিকে ছিল আধ্যাত্মিক শিক্ষায় পূর্ণ এবং অন্যদিকে বাইরের বৃহত্তর জগত থেকে বিচ্ছিন্ন, তাঁর মনে এক অমলিন দাগ রেখে যায়। এই সময়টি ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকের উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমির সাথে মিলে যায়, যা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।

এই যুদ্ধ মাসুদের জীবন সহ আরও লাখ লাখ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর, তিনি ধর্মীয় পড়াশোনা ছেড়ে সাধারণ শিক্ষায় ফিরে আসেন। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফিল্ম সোসাইটি বা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়া তাঁর মনে চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন যে, চলচ্চিত্র সামাজিক সমালোচনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

তারেক মাসুদের প্রাথমিক চলচ্চিত্র জীবন বিকশিত হয়েছিল তাঁর স্ত্রী, মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক ক্যাথরিন মাসুদের সাথে যৌথ কাজের মাধ্যমে। এই দম্পতি একসাথে ‘অডিওভিশন’ নামের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং বেশ কিছু প্রভাবশালী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুক্তির গান’ (Song of Freedom) প্রামাণ্যচিত্রটির মাধ্যমে তাঁরা প্রথম বড় ধরণের সাফল্যের দেখা পান। এই প্রামাণ্যচিত্রটিতে দুর্লভ সব ফুটেজ এবং গানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোকে তুলে ধরা হয়েছিল, যা বাঙালি জাতির অদম্য সাহসের এক অনন্য দলিল হিসেবে টিকে আছে। চলচ্চিত্রটি কেবল ইতিহাসকেই নথিবদ্ধ করেনি, বরং হারিয়ে যাওয়া বা চেপে রাখা সাংস্কৃতিক স্মৃতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল, যার সত্যতা ও আবেগঘন প্রকাশ সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়।

এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তারেক মাসুদ তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতাকে ঢেলে সাজান এবং তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ‘মাটির ময়না’ নির্মাণ করেন, যার কাজ ২০০২ সালে শেষ হয়। এই চলচ্চিত্রের গল্পটি ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ পটভূমিতে গড়ে উঠেছে, যেখানে একটি পরিবার কঠোর ধর্মীয় ভক্তি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়ার মাঝে পড়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছিল। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ‘আনু’ নামের একটি ছোট ছেলে, যার জীবনের মধ্য দিয়ে মূলত তারেক মাসুদের নিজের মাদ্রাসা জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। ছবিটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধর্মীয় সহনশীলতা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষয়ক্ষতির গল্প ফুটিয়ে তোলে।

২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ডাইরেক্টরস ফোর্টনাইট’ (Directors’ Fortnight) বিভাগে *’মাটির ময়না’*র আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার হয়। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ফেডারেশন থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিপ্রেসি পুরস্কার’ (FIPRESCI Prize) লাভ করে, যা কান উৎসবের মতো এত বড় মঞ্চে কোনো বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল। সমালোচকরা এর কাব্যিক সিনেমাটোগ্রাফি, নিখুঁত অভিনয় এবং কঠোরতার বিপরীতে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া সুফিবাদের চমৎকার উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ছবিটি কোনো সরলীকৃত সমাধান না দিয়ে বরং অত্যন্ত সহানুভূতি ও গভীরতার সাথে জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তুলেছিল।

উৎসবের এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও, ‘মাটির ময়না’ শুরুতে নিজ দেশে কিছু আইনি জটিলতা এবং সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল, যা পরবর্তীতে ব্যাপক আন্দোলনের পর তুলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশে মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং জাতীয় পরিচয়, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। এর আন্তর্জাতিক পরিবেশনা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকে এক নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশী পরিচালকদের শৈল্পিক পরিপক্বতাকে প্রমাণ করে।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবতাবোধ ও কাব্যিক গল্প বলার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। আবহমান বাংলার আসল রূপ তুলে ধরার জন্য শুটিংয়ের স্থানগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্বাচন করা হতো, আর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা সংগীতে ব্যবহার করা হতো খাঁটি লোকজ উপাদান (যেমন বাউল বা সুফি গান), যা আবেগের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিত। বাণিজ্যিক ফর্মুলার বাইরে গিয়ে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গল্প ফুটিয়ে তুলতে তিনি প্রতিভাবান অভিনেতা ও কলাকুশলীদের সাথে কাজ করতেন। তাঁর কাজগুলো সবসময়ই ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার আড়ালে থাকা মানবিক দিকগুলোকে—সেটা মুক্তিযুদ্ধই হোক বা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের ভেতরের সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন—আলাদাভাবে আলোয় নিয়ে আসত।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট এই প্রতিভাবান ও দূরদর্শী পরিচালকের পথচলা আচমকা থেমে যায়। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মানিকগঞ্জের কাছে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। সে সময় তিনি তাঁর পরবর্তী প্রজেক্ট ‘কাগজের ফুল’ (Kagojer Phool)-এর শুটিংয়ের লোকেশন নির্বাচন করে ঢাকায় ফিরছিলেন, যা মূলত *’মাটির ময়না’*র প্রিক্যুয়েল বা আগের গল্প হিসেবে পরিকল্পিত ছিল। এই দুর্ঘটনায় তাঁর সাথে থাকা আরও বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র কর্মী প্রাণ হারান, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলে দেয়। বিশ্বজুড়ে থাকা চলচ্চিত্র নির্মাতা, বুদ্ধিজীবী এবং ভক্তরা এক মহান রূপকারের অকাল প্রস্থানে শোক প্রকাশ করেন।

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তারেক মাসুদকে মরণোত্তর বহু সম্মানে ভূষিত করা হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। পরবর্তী বছরগুলোতেও তিনি বহু আজীবন সম্মাননা লাভ করেন, যা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে অমর করে রেখেছে। আজও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর সিনেমাগুলো নিয়মিত প্রদর্শিত হয়, যা তরুণ পরিচালকদের সাহসী ও আত্মবিশ্লেষণমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছে।

তারেক মাসুদের কাজের চিরন্তন আবেদন হলো মানুষের ভেতরের ভেদাভেদ দূর করার ক্ষমতা। ‘মাটির ময়না’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কীভাবে একটি ব্যক্তিগত গল্প বৃহত্তর ঐতিহাসিক সত্যকে উন্মোচন করতে পারে। ছবির ধীরগতি, চমৎকার দৃশ্যপট এবং রূপক প্রতীক—যেমন খাঁচার ভেতরের মাটির ময়না পাখিটি নিজেই মানুষের ভঙ্গুর স্বপ্ন এবং সাংস্কৃতিক সহনশীলতার প্রতীক—দর্শকদের সহাবস্থান ও পরমতসহষ্ণুতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। তারেক মাসুদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো উগ্র বা একপেশে ছিল না, বরং মেরুকরণের এই যুগে তা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

পরিচালনার পাশাপাশি বাংলাদেশে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র (independent cinema) আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং তরুণ নির্মাতাদের মেন্টরিং বা দিকনির্দেশনা দিতে তারেক মাসুদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাণিজ্যিক চাপের কাছে মাথা নত না করে খাঁটি গল্প বলার প্রতি তাঁর এই জেদ একঝাঁক নতুন চিন্তাশীল নির্মাতার জন্ম দিয়েছে। ‘মুক্তির কথা’-র মতো প্রামাণ্যচিত্রগুলো প্রমাণ করে যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রান্তিক মানুষের মুখে শোনা ইতিহাস ধরে রাখতে কতটা নিবেদিত ছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া এই সৃষ্টিগুলো আসলে একটি দেশের আত্মপরিচয় খোঁজার এক অনন্য সাংস্কৃতিক আর্কাইভ বা দলিল।

মুক্তির দুই দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও, ‘মাটির ময়না’ আজও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সমানভাবে আকর্ষণ করে। বিশ্বায়নের এই যুগে, বিশ্বজনীন শক্তির বিপরীতে স্থানীয় সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াইয়ের এই গল্পটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস এবং চলচ্চিত্র পাঠ্যক্রমে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকরাও মূলধারার ব্লকবাস্টার সিনেমার বাইরে এক খাঁটি সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারছেন।

বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষ থেকে শুরু করে কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেট পর্যন্ত তারেক মাসুদের এই জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে শিল্পের রূপান্তরকারী ক্ষমতা কতটা অসীম। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো কেবল বিনোদন দেয় না; সেগুলো আমাদের শিক্ষিত করে, চিন্তা করতে শেখায় এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করার এই তাগিদ নিশ্চিত করে যে, শারীরিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর সৃষ্টি ও কণ্ঠস্বর আগামী বহু প্রজন্ম ধরে আমাদের মাঝে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।

তারেক মাসুদ এবং ‘মাটির ময়না’ সম্পর্কে ৫টি আকর্ষণীয় প্রশ্ন ও উত্তর

১. শৈশবের কোন লুকিয়ে থাকা অভিজ্ঞতা ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের মূল আবেগকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা ব্যক্তিগত কষ্টকে এক অনবদ্য শিল্পে রূপ দিয়েছিল?

তারেক মাসুদ সরাসরি তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই ছবির রসদ সংগ্রহ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের উত্তাল বছরগুলোতে তাঁকে একটি কঠোর নিয়মের মাদ্রাসায় পড়তে হয়েছিল। শৈশবের সেই একাকীত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণের অনুভূতিকেই তিনি ‘আনু’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে একটি সার্বজনীন ও হৃদয়স্পর্শী গল্পে রূপ দিয়েছিলেন।

২. ধর্ম ও পরিবার নিয়ে তৈরি একটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গ্ল্যামারাস চলচ্চিত্র উৎসবে সব বাধা ভেঙে ইতিহাস তৈরি করেছিল?

২০০২ সালে ‘মাটির ময়না’ প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র হিসেবে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো সম্মানজনক মঞ্চে প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রশংসাসহ মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিপ্রেসি পুরস্কার’ (FIPRESCI Prize) জিতে নেয়। এটি প্রমাণ করেছিল যে, অত্যন্ত নিখুঁত পরিচালনা এবং মানবিক গভীরতা থাকলে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির গল্প দিয়েও বিশ্বমঞ্চ জয় করা সম্ভব।

৩. ভাগ্যের কোন মর্মান্তিক পরিহাসের কারণে তারেক মাসুদ তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজের সিক্যুয়েল বা প্রিক্যুয়েলটি শেষ করে যেতে পারেননি?

২০১১ সালে তাঁর স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘কাগজের ফুল’ (যা ছিল মূলত মাটির ময়নার আগের পটভূমিতে তৈরি গল্প)—এর শুটিংয়ের জায়গা নির্বাচন করে ফেরার পথে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সহকর্মী প্রাণ হারান। এর ফলে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গন এক অসমাপ্ত মাস্টারপিস হারায় এবং গভীরভাবে শোকাহত হয়।

৪. মুক্তির এত বছর পরও ‘মাটির ময়না’ কেন বাংলাদেশে ধর্ম ও আত্মপরিচয় নিয়ে আজও এত আলোচনার জন্ম দেয়?

চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় শিক্ষার কঠোর ও কোমল—উভয় দিকই ফুটিয়ে তুলেছে। এটি একদিকে যেমন চরমপন্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, অন্যদিকে সহনশীলতার প্রতীক সুফি ঐতিহ্যকে উদযাপন করে। ফলে সমাজের চলমান বিভিন্ন গঠনমূলক আলোচনায় এই ছবিটি আজও একটি অন্যতম রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।

৫. দীর্ঘ ক্যারিয়ার না পাওয়া সত্ত্বেও একজন পরিচালক হিসেবে তারেক মাসুদের লিগ্যাসি বা ঐতিহ্য কেন এত শক্তিশালী?

তারেক মাসুদ খুব বেশি সিনেমা বানাননি, তবে ‘মুক্তির গান’ এবং ‘মাটির ময়না’-র মতো হাতে গোনা কয়েকটি অত্যন্ত খাঁটি ও কালজয়ী কাজের মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ লাভ করেছিলেন। সস্তা বাণিজ্যিক সাফল্য বা সংখ্যার পেছনে না ছুটে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক সততা ও ঐতিহাসিক সত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণেই তাঁর ঐতিহ্য আজও এত শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী।