“আয়েশার ছোট্ট পৃথিবী: এক বাবার হৃদয়ের দিনলিপি”
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
আমাদের বাড়ির সবচেয়ে ছোট মানুষটির নাম আয়েশা। বয়স তার প্রায় তিন বছর। কিন্তু তার ছোট্ট দুই পায়ের টুপটাপ শব্দে মনে হয়, পুরো বাড়িটাই যেন তার রাজ্য। সে যেন এক ক্ষুদ্র সম্রাজ্ঞী—যার হাসিতে ঘর আলো হয়ে যায়, কান্নায় আকাশ মেঘলা হয়ে ওঠে।
আমি যখন কোনো কাজে ব্যস্ত থাকি, হঠাৎ কোথা থেকে ছোট্ট পায়ের শব্দ তুলে এসে সামনে দাঁড়ায়। তারপর তার সেই চিরচেনা ডাক—“আব্বু, চকলেট খাব।” একটু পর আবার, “আব্বু, হস খাব।” হরলিকস শব্দটি সে এখনো ঠিকমতো বলতে পারে না; তার মুখে সেটাই “হস”। আমি ইচ্ছে করেই তাকে ঠিক করি না। মনে হয়, এই ভুল উচ্চারণের মধ্যেই তো শৈশবের সবচেয়ে মধুর সুর লুকিয়ে আছে।
ভাত খাওয়ানো আয়েশাকে নিয়ে আরেক গল্প। ভাতের প্লেট সামনে থাকলেও তার চোখ খোঁজে “আমলি”—মোবাইল। সে বলে, “আমলি দাও, তারপর ভাত খাব।” কোনো ছড়া বা কার্টুন চলতে থাকলে এক লুকমা, দুই লুকমা, তিন লুকমা করে ভাত খাওয়ানো যায়। আমি তখন ভাবি, আমাদের শৈশব আর তার শৈশবের মধ্যে সময় কত বদলে গেছে! তবু মুখে ভাতের দানা লেগে থাকা সেই নিষ্পাপ হাসি আজও একই রকম নির্মল।
আমার পড়ার টেবিলটাই যেন তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আমি টেবিলে বসলেই সে দৌড়ে আসে। এক লাফে কাঁধে উঠে পড়ে। কখনো চশমা খুলে নেয়, কখনো বইয়ের পাতায় দাগ টানে, কখনো কলম নিয়ে পালিয়ে যায়। আমার বই-খাতার সামনে, পেছনে, ডানে-বামে তার অসংখ্য আঁকিবুঁকি। যেন সে তার নিজস্ব ভাষায় আমার লেখাগুলোর পাশে আরেকটি শৈশব লিখে রাখছে।
অনেক সময় ইচ্ছে করেই টেবিল থেকে উঠতে একটু দেরি করি। কারণ জানি, এই কাঁধে ওঠার বয়স খুব বেশি দিন থাকবে না। একদিন সে বড় হয়ে যাবে। নিজের বই নিয়ে পড়বে, নিজের বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তখন হয়তো আর বলবে না, “আব্বু, কোলে নাও।”
আয়েশার পৃথিবী খুব ছোট—একটি খেলনার ডিম, কয়েকটি খেলনার হাঁড়ি-পাতিল, আব্বুর কাঁধ, মায়ের কোল আর দাদা-দাদুর পেছন পেছন ঘুরে বেড়ানো। সে যখন হাসে, মনে হয় ঘরের দেয়ালগুলোও হাসতে শেখে। তার আধো-আধো কথাগুলো কোনো অভিধানে নেই, তবু সেই ভাষাই পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ভাষা।
তার নাকের ঘ্রাণশক্তি যেন বিস্ময়কর। আমি বাইরে থেকে গেট খুলতে না খুলতেই সে চিৎকার করে বলে ওঠে, “আব্বু আসছে! আম্মু, আব্বু আসছে!” এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে এমন এক টান থাকে, যা পৃথিবীর সব ব্যস্ততাকে মুহূর্তে অর্থহীন করে দেয়। ঘরে ঢুকতেই সে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে, যেন আমি বহু বছর পর ফিরে এসেছি।
আয়েশা হয়তো জানে না, সে আমার ক্লান্ত দিনের বিশ্রাম। তার ছোট্ট হাতের স্পর্শে অবসাদ গলে যায়, তার হাসিতে দুঃখের মেঘ সরে যায়। “আব্বু চকলেট খাব” কিংবা “আব্বু হস খাব”—এই ছোট্ট আবদারগুলোর মধ্যেই আমি জীবনের সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা খুঁজে পাই।
সময় একদিন তাকে বড় করে দেবে। আধো-আধো কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে যাবে, টলমল পায়ের হাঁটা দৃঢ় পদক্ষেপে বদলে যাবে। কিন্তু এই বয়সের সরলতা, নিষ্পাপ হাসি, আর আব্বুকে জড়িয়ে ধরার সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা—এসবই হয়ে থাকবে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমার আয়েশাকে সুস্থ, ঈমানদার, সুশিক্ষিত ও উত্তম চরিত্রের একজন নেককার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তার হাসি যেন সব সময় এমনই উজ্জ্বল থাকে, আর সে যেন সারাজীবন আমাদের ঘরের রহমত হয়ে থাকে। আমীন।
লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
01301418823, 01867611814
nazmulislam19122@gmail.com