সাহিত্য ও সাহিত্যিক
উইলিয়াম হ্যাজলিট (William Hazlitt, ১০ এপ্রিল ১৭৭৮ – ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৩০)
১. মেইডস্টোনের সকাল
মেইডস্টোনের ভোরে জন্ম নিল এক স্বপ্ন,
আয়ারল্যান্ড-আমেরিকার পথে ঘুরে এল যে যাযাবর।
পিতার বিপ্লবী আগুন বুকে ধরে,
স্বাধীনতার নামে লিখল প্রথম অক্ষর।
ছোট্ট শরীরে বড়ো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে,
হ্যাজলিট জন্মাল — ইতিহাসের নতুন সুরে।
২. মেটাফিজিক্যাল আবিষ্কার
হলবাখের পাতা উল্টে খুঁজে পেল সে,
মানুষ স্বার্থপর নয় — নির্লিপ্ত হৃদয় তার।
ভবিষ্যৎ স্বয়ং অন্যের মতো দূরের,
কল্পনার ডানায় ভর করে উড়ে যায় সে।
এই আবিষ্কারই হয়ে উঠল তার প্রথম আলো,
হ্যাজলিটের চিন্তায় জন্ম নিল নতুন দর্শনের পথ।
৩. ল্যুভরের আলো
প্যারিসের ল্যুভরে দাঁড়িয়ে রেমব্রান্টের সামনে,
রং-আলো-ছায়ায় খুঁজল সে মানুষের গভীরতা।
প্রতিকৃতির তুলিতে ধরতে চাইল আত্মার ছবি,
কিন্তু শেষে বুঝল — শব্দই তার আসল রং।
চিত্রশিল্পী থেকে সমালোচক হয়ে উঠল সে,
হ্যাজলিটের চোখে জন্ম নিল সাহিত্যের নতুন দৃষ্টি।
৪. কলরিজের সাথে সেই হাঁটা
নেদার স্টোয়ের পথে কলরিজের পাশে হাঁটতে হাঁটতে,
বলল সে তার সেই মেটাফিজিক্যাল স্বপ্ন।
কলরিজ শুনে বলল — “well-headed and well-feathered”,
দুজনের চিন্তায় জন্ম নিল রোমান্টিকতার প্রথম আলো।
সেই হাঁটাই হয়ে রইল ইতিহাসের এক গোপন সেতু,
হ্যাজলিট-কলরিজের কথায় জেগে উঠল নতুন যুগ।
৫. শেকসপিয়রের আয়না
শেকসপিয়রের চরিত্রে দেখল সে মানুষের সব রূপ,
হ্যামলেটের দ্বিধা, ফ্যালস্টাফের হাসি, লেডি ম্যাকবেথের ক্ষুধা।
নিয়মের বাইরে গিয়ে লিখল সে আবেগের গল্প,
প্রতিটি নাটকে খুঁজে পেল জীবনের গভীর সত্য।
Characters of Shakespear’s Plays — তার প্রথম বড়ো উপহার,
রোমান্টিক সমালোচনার জন্ম দিল এক নতুন ভাষা।
৬. সংক্ষিপ্ত নোটের জাদু (রোমান্টিক আন্দোলনের স্থপতি)
প্রবন্ধের আড়ালে যে সংক্ষিপ্ত নোটগুলি লিখেছিল,
সেই নোটেই গেঁথে দিল রোমান্টিক আন্দোলনের কাঠামো।
নিয়ম-শৃঙ্খল ভেঙে কল্পনার মুক্ত আকাশ দেখাল,
ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কলরিজ-শেলির স্বপ্নকে দিল নতুন ভাষা।
“গাস্টো” আর “বিশেষত্ব” — তার দুটি জাদুর শব্দ,
হ্যাজলিটের নোট আজও জ্বলে রোমান্টিকতার প্রদীপ।
৭. কল্পনার উড়ান
কল্পনা শুধু স্বপ্ন নয় — সেতু অন্যের হৃদয়ে,
ভবিষ্যৎ স্বয়ংকে দেখায় অন্যের চোখ দিয়ে।
হ্যাজলিট বলল — এই শক্তিই মানুষকে মহৎ করে,
কবিতায়, সমালোচনায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
নিয়মের কারাগার থেকে মুক্তি দেয় যে ডানা,
সেই কল্পনার জয়গান গেয়েছিল হ্যাজলিট সারাজীবন।
৮. যুগের আত্মা
The Spirit of the Age — লিখল সে সমকালের প্রতিকৃতি,
ওয়ার্ডসওয়ার্থের নির্জনতা, কলরিজের দ্বিধা, বেন্থামের যুক্তি।
তীক্ষ্ণ চোখে দেখল সে প্রত্যেকের আলো-অন্ধকার,
প্রশংসা আর সমালোচনায় মিশিয়ে দিল সত্যের স্বাদ।
যুগের আত্মাকে ধরতে চাইল একটি বইয়ের পাতায়,
হ্যাজলিটের কলমে জেগে উঠল ঊনবিংশ শতাব্দীর ছবি।
৯. স্বাধীনতার আগুন
স্বাধীনতা তার কাছে ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো,
নেপোলিয়নকে দেখেছিল মুক্তির প্রথম আলো হিসেবে।
সরকারের দুর্নীতি, রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল — সবার বিরুদ্ধে,
লিখেছিল সে “জনগণ কী?” — এক দুর্দান্ত প্রশ্ন।
মৃত্যুর আগে বলেছিল — “Well, I’ve had a happy life”,
সেই স্বাধীন আত্মার জয়গান আজও বাজে হ্যাজলিটের লেখায়।
১০. রোমান্টিক স্থপতির উত্তরাধিকার
প্রবন্ধ ছাড়িয়ে যে সংক্ষিপ্ত নোট রেখে গেল সে,
সেই নোটেই আজও জীবন্ত রোমান্টিক আন্দোলনের স্পন্দন।
কল্পনার শক্তি, আবেগের সত্য, মানুষের নির্লিপ্ত হৃদয় —
সব মিলিয়ে গড়ে তুলল এক নতুন সাহিত্যের জগত।
হ্যাজলিট আজও বেঁচে আছে তার নোটের ভেতর,
রোমান্টিকতার চিরকালীন স্থপতি — অমর, অবিস্মরণীয়।
উইলিয়াম হ্যাজলিট ছিলেন ইংরেজ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধকার, নাটক ও সাহিত্য সমালোচক, চিত্রশিল্পী, সামাজিক ভাষ্যকার এবং দার্শনিক। তিনি রোমান্টিক যুগের (Romanticism) একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর মানবতাবাদী, তীক্ষ্ণ ও আবেগঘন প্রবন্ধ তাঁকে স্যামুয়েল জনসন ও জর্জ অরওয়েলের সঙ্গে তুলনীয় করে তুলেছে। তবে প্রবন্ধ ছাড়াও তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর কাঠামোগত নোট, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং বক্তৃতামালা (বিশেষ করে Lectures on the English Poets) রোমান্টিক আন্দোলনের সাহিত্যিক কাঠামো, কল্পনার শক্তি, আবেগ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মূল্যবোধকে সংজ্ঞায়িত ও প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নিওক্লাসিক্যাল নিয়মের বিরোধিতা করে কল্পনা, “গাস্টো” (vivid particularity) এবং স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
জন্ম, পরিবার ও প্রারম্ভিক জীবন
হ্যাজলিট ১০ এপ্রিল ১৭৭৮ সালে ইংল্যান্ডের কেন্টের মেইডস্টোন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। তাঁর পিতা রেভারেন্ড উইলিয়াম হ্যাজলিট ছিলেন আইরিশ ইউনিটারিয়ান (Unitarian) মন্ত্রী, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ। পিতা গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডাম স্মিথের সমসাময়িক ছিলেন। মা গ্রেস লফটাস কেমব্রিজশায়ারের একটি ডিসেন্টিং (Dissenting) পরিবার থেকে এসেছিলেন।
পরিবারটি ঘন ঘন স্থানান্তরিত হয়। ১৭৮০ সালে আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি কর্কের ব্যান্ডনে যান। ১৭৮৩–১৭৮৬ সালে সংক্ষিপ্তভাবে আমেরিকায় যান (পিতা বোস্টনে ইউনিটারিয়ান চার্চ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন)। ১৭৮৭ সালে ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের ওয়েমে স্থায়ী হন। এই যাযাবর জীবন পরবর্তীকালে তাঁর স্বাধীনতা, পরিবর্তন ও মানব প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তাকে প্রভাবিত করে। শৈশবে তিনি ছিলেন কিছুটা রুক্ষ ও একাকী, কিন্তু নিবিড় পাঠে মগ্ন থাকতেন।
শিক্ষা ও দার্শনিক জাগরণ
১৭৯৩ সালে তিনি লন্ডনের নিউ কলেজ, হ্যাকনি (Unitarian Dissenting academy)-তে ভর্তি হন। এখানে গ্রিক-লাতিন সাহিত্য, গণিত, ইতিহাস, সরকারব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব পড়েন। জোসেফ প্রিস্টলি ও রিচার্ড প্রাইসের মতো র্যাডিক্যাল চিন্তাবিদদের প্রভাবে ফরাসি বিপ্লব ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। প্রায় দুই বছর পর মন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে কলেজ ছেড়ে দেন।
এ সময় তাঁর “মেটাফিজিক্যাল ডিসকভারি” ঘটে। ব্যারন ডি’হলবাখের লেখা পড়ে তিনি মনস্তাত্ত্বিক অহংবাদ (psychological egoism)-এর বিরোধিতা করেন এবং মানুষের সহজাত নির্লিপ্ততা (natural disinterestedness) ও কল্পনার সক্রিয় শক্তির কথা প্রতিষ্ঠা করেন। এই চিন্তা পরবর্তীকালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ An Essay on the Principles of Human Action (১৮০৫)-এর ভিত্তি হয়। তিনি জন লক, ডেভিড হার্টলি, জর্জ বার্কলে, ডেভিড হিউম, হেলভেশিয়াস প্রমুখের চিন্তার সমালোচনা করেন এবং মনের সক্রিয়, সৃজনশীল ভূমিকা ও কল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ স্বয়ং ও অন্যের অনুভূতি অনুধাবনের কথা বলেন।
চিত্রশিল্পী থেকে লেখক ও সমালোচক
প্রথমে তিনি ভাই জন হ্যাজলিটের (একজন খ্যাতনামা মিনিয়েচার চিত্রশিল্পী) কাছে চিত্রাঙ্কন শেখেন। ১৮০২ সালে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে পুরনো মাস্টারদের কপি করতে যান। রেমব্রান্ট-শৈলীর প্রতিকৃতি আঁকেন এবং ১৮০২ সালে রয়্যাল একাডেমিতে প্রদর্শিত হয়। কলরিজ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও হার্টলি কলরিজের প্রতিকৃতি আঁকেন। কিন্তু ক্লায়েন্টদের তোষামোদ করতে না পারায় এবং আর্থিক সংকটে ১৮১২ সালের দিকে চিত্রাঙ্কন ছেড়ে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।
তিনি The Morning Chronicle-এ সংসদীয় প্রতিবেদক হন, The Examiner, The Champion, Edinburgh Review প্রভৃতিতে লিখতে শুরু করেন। ১৮১২ সালে রাসেল ইনস্টিটিউশনে দর্শনের উপর বক্তৃতা দেন।
রোমান্টিক কবিদের সাথে বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক
১৭৯৮ সালে স্যামুয়েল টেলর কলরিজের সাথে পরিচয় হয়। নেদার স্টোয়েতে কলরিজের সাথে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁর দার্শনিক আবিষ্কারের কথা বলেন। কলরিজ তাঁর চিন্তাকে “well-headed and well-feathered” বলে প্রশংসা করেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাথেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে (আলফক্সটন সফর)। চার্লস ও মেরি ল্যাম্বের সাথে দীর্ঘস্থায়ী (কিন্তু ঝগড়া-বিবাদপূর্ণ) বন্ধুত্ব ছিল। জন কিটস, পার্সি বিশ শেলি, লেই হান্ট প্রমুখের সাথেও যোগাযোগ ছিল।
তবে পরবর্তীকালে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কলরিজের রক্ষণশীলতার সমালোচনা করায় সম্পর্কে ফাটল ধরে।
ব্যক্তিগত জীবন: বিবাহ, প্রেম ও যন্ত্রণা
১৮০৮ সালে মেরি ল্যাম্বের বন্ধু সারাহ স্টোডার্টকে বিয়ে করেন। উইন্টারস্লো (স্যালিসবারি প্লেইন)-এ থাকতেন, যা তাঁর প্রিয় লেখার আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। তিন সন্তানের মধ্যে শুধু উইলিয়াম জুনিয়র বেঁচে ছিলেন। ১৮১৯ সালে বিচ্ছেদ ঘটে।
১৮২০-এর দিকে তিনি তাঁর বাড়িওয়ালার কন্যা সারাহ ওয়াকারের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেন। এই অসম্পূর্ণ, যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্ক Liber Amoris; or, The New Pygmalion (১৮২৩) গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। ১৮২২ সালে স্কটল্যান্ডে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
১৮২৪ সালে স্কটিশ বিধবা ইসাবেলা ব্রিজওয়াটারকে বিয়ে করেন। এই বিবাহও টেকেনি; ১৮২৭ সালে বিচ্ছেদ ঘটে। আর্থিক অস্বচ্ছলতা, মদ্যপান ও মানসিক চাপ তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।
প্রধান রচনাবলী ও সাহিত্য সমালোচনা
- An Essay on the Principles of Human Action (১৮০৫) — দার্শনিক গ্রন্থ, নির্লিপ্ততার তত্ত্ব।
- Characters of Shakespear’s Plays (১৮১৭) — শেকসপিয়রের নাটকের আবেগঘন, চরিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণ।
- Lectures on the English Poets (১৮১৮) — চসার থেকে সমকালীন কবিদের উপর বক্তৃতা (পরে গ্রন্থাকারে)।
- Lectures on the English Comic Writers (১৮১৯)।
- Table-Talk (১৮২১–২২) — মন্টেইন-স্টাইলের পরিচিত প্রবন্ধ।
- The Spirit of the Age (১৮২৫) — সমকালীন ব্যক্তিত্বদের (ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কলরিজ, বেন্থাম, গডউইন প্রমুখ) তীক্ষ্ণ প্রতিকৃতি।
- The Plain Speaker (১৮২৬), Notes of a Journey through France and Italy (১৮২৬), অসমাপ্ত Life of Napoleon (মরণোত্তর)।
তাঁর গদ্যশৈলী ছিল জ্বলন্ত, সরাসরি, আবেগপূর্ণ ও ব্যক্তিগত — “gusto” শব্দটি তিনিই জনপ্রিয় করেন।
রোমান্টিক আন্দোলনে অবদান: সংক্ষিপ্ত কাঠামোগত নোট ও বক্তৃতা
প্রবন্ধের বাইরে হ্যাজলিটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তাঁর সংক্ষিপ্ত কাঠামোগত নোট এবং বক্তৃতামালা। Lectures on the English Poets-এ তিনি সাহিত্যের ইতিহাসকে কাঠামোবদ্ধভাবে বিশ্লেষণ করেন — নিওক্লাসিক্যাল যুগের নিয়ম-নিষ্ঠা থেকে রোমান্টিক যুগের কল্পনা, আবেগ, প্রকৃতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দিকে স্থানান্তর দেখান। তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কলরিজ ও শেলির প্রতিরক্ষা করেন এবং “imagination”-এর সক্রিয় শক্তিকে কবিতার মূল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণমূলক নোটগুলি রোমান্টিক আন্দোলনের জন্য এক ধরনের সমালোচনামূলক কাঠামো তৈরি করে। তিনি দেখান কীভাবে কবিতা যান্ত্রিক নিয়মের বদলে মনের সৃজনশীল শক্তি, বিশেষত্ব (particularity) ও আবেগের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করে। The Spirit of the Age-এ তিনি সমকালীন চিন্তার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে রোমান্টিকতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও শক্তি তুলে ধরেন। এই কাজগুলি রোমান্টিক আন্দোলনকে শুধু কাব্যিক নয়, সমালোচনামূলকভাবেও দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
রাজনৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
তিনি ছিলেন জীবনব্যাপী র্যাডিক্যাল — স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে। নেপোলিয়নকে প্রথমে মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন (পরে সমালোচনা করেন)। সরকারের দুর্নীতি, উত্তরাধিকারসূত্রে রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেন। ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর দর্শনে কল্পনা ছিল নৈতিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণের হাতিয়ার।
বিতর্ক, ঝগড়া ও পরবর্তী জীবন
তিনি অনেকের সাথে ঝগড়া করেছেন — ওয়ার্ডসওয়ার্থ (The Excursion নিয়ে), টোরি পত্রিকা (Blackwood’s Magazine তাঁকে “pimpled Hazlitt” বলে আক্রমণ করে)। Liber Amoris প্রকাশের পর অনেক বন্ধু দূরে সরে যান। আর্থিক সংকট, স্বাস্থ্যহানি ও মানসিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও তিনি লিখে চলেছিলেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৮৩০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনের সোহোতে ৫২ বছর বয়সে পেটের অসুখে (সম্ভবত পাকস্থলীর ক্যান্সার) মৃত্যুবরণ করেন। শেষ কথা ছিল: “Well, I’ve had a happy life.” সেন্ট অ্যানের চার্চইয়ার্ড, সোহোতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুর পর তাঁর খ্যাতি কিছুটা ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু ২০শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পুনরুজ্জীবিত হয়। আজ তিনি ইংরেজি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধকার ও সমালোচক হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর রচনা মানব প্রকৃতি, স্বাধীনতা, কল্পনা ও সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়।
প্রধান রচনার সংক্ষিপ্ত তালিকা (কালানুক্রমিক):
- ১৮০৫: An Essay on the Principles of Human Action
- ১৮১৭: Characters of Shakespear’s Plays
- ১৮১৮: Lectures on the English Poets
- ১৮২১–২২: Table-Talk
- ১৮২৫: The Spirit of the Age
হ্যাজলিটের জীবন ছিল সংগ্রাম, আবেগ ও সৃজনশীলতার মিশ্রণ। তাঁর সংক্ষিপ্ত কাঠামোগত নোট ও সমালোচনা রোমান্টিক আন্দোলনকে শুধু কাব্যিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও দৃঢ় করে তোলে — এটাই তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী অবদান।

Sablu Shahabuddin
সবাই কবি হতে পারে না, কেউ কেউ কবি হয়
শাবলু শাহাবউদ্দিন
১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি.) রোজ শুক্রবার দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছয়জন বিশিষ্ট কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাসমূহ পড়ে মনে হলো কবিদের কবিতার সৌন্দর্যের কিংবা বাস্তবিক কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোথাও না কোথাও কিছুটা হলেও কমতি রয়েছে। সালেহ আহমদ-এর লেখা ‘শনিবারের আড্ডা’ কবিতাটির একদম শেষ লাইনে কবি লিখেছেন: “পয়ারের নরম তুলতুলে শব্দের কবিতা শোনাব”। কবি নিজেই যেহেতু এখানে ‘পয়ার’ ছন্দের কথা উল্লেখ করেছেন, সেহেতু কবিতাটির গঠনে পয়ারের বৈশিষ্ট্য (প্রতি লাইনে ১৪ অক্ষর এবং ৮+৬ মাত্রার বিন্যাস) থাকা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু পুরো কবিতাটি মুক্তক বা গদ্যছন্দে লেখা হয়েছে, যেখানে অক্ষরের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব রাখা হয়নি। এটি কোনো ভুল নয় (আধুনিক কবিতায় এমনটা হয়), তবে পয়ারের উল্লেখ থাকায় পাঠক প্রথাগত ছন্দ খুঁজতে পারেন। প্রথম স্তবকের চতুর্থ লাইনে “তরুণ এক কবির সাথে” এর পর একটি কমা (,) বা ড্যাশ (—) দিলে পরের লাইনের সাথে সংযোগটি আরও স্পষ্ট হতো। দ্বিতীয় স্তবকের তৃতীয় লাইনে “নাকি রাজনীতি কবিতাকে?” এর পর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) দেওয়া আছে, যা যৌক্তিক। কিন্তু তার ঠিক পরের লাইনে “আপনি ফলবতী গাছের মতো মাথা নুয়ে,”—এখানে কমার বদলে একটি ড্যাশ (—) ব্যবহার করলে বক্তব্যের গভীরতা আরও ভালো প্রকাশ পেত। হ্যাঁ, আরেকটা বিষয়; এই আধুনিক যুগে এসে আপনি একজন নারীকে এত ছোট করে দেখতে পারেন না। নিজে লিখছেন আধুনিক কবিতা কিন্তু একজন নারী কেন আপনার চোখে এখনো আধুনিক হতে পারল না? উনুন সামলাবে, ভয়ে-লজ্জায় মুখ নিচু করে টেবিলের শেষ প্রান্তে বসবে, কণ্ঠ হবে নিম্নগামী, অবলার মতো পরতে হবে সাদা শাড়ি? কিন্তু কেন? নিজের মন থেকে নারীজাতিকে সম্মানের চোখে দেখা উচিত।
নিজাম বিশ্বাস-এর লেখা ‘রূপবতী’ কবিতাটি বেশ রূপকধর্মী এবং আবেগপূর্ণ। রূপকধর্মী কবিতার পাঠক সব সময় চান ছন্দ, লয় এবং অন্ত্যমিল মিলিয়ে তা হৃদয়ে গেঁথে রাখতে, যা ‘রূপবতী’ কবিতায় পাঠক খুঁজে পাবেন না। কবিতাটিতে সর্বনামের ব্যবহারে প্রথমে দূর সম্পর্ক দৃশ্যমান হলেও পরে আপন সম্পর্ক দেখা গেছে, যা পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার কোথাও বিরামচিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে অযাচিতভাবে, কোথাও আবার বিরামচিহ্নের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যবহার করা হয়নি। ‘আসো’ কিংবা ‘মতো’ শব্দের পরিবর্তে ‘বসো’ শব্দটি ব্যবহার করলে হয়তো কবিতার নান্দনিকতা বৃদ্ধি পেত। ‘রূপবতী’ কবিতায় উপমার ভুল প্রয়োগও পরিলক্ষিত হয়েছে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘ধানদুধ’ কবিতায় উপমার ভুল প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়েছে। কবিতার নান্দনিকতার দিকে মোটেও খেয়াল রাখা হয়নি। আধুনিক কবিতা মানে এই নয় যে জোর করে কয়েকটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে বলে দিলাম এটা একটা কবিতা—এমন কিন্তু নয়। ইঞ্জিনবিহীন উড়োজাহাজ কি আকাশে উড্ডয়ন করে? নিশ্চয়ই করে না। ভাবের গভীরতা আছে, কিন্তু শ্রুতিমধুরতা কোথায়? শ্রুতিমধুরতা কিন্তু কবিতার একটা প্রাণ।
নাজমুল আমীন-এর লেখা “জননী—তোমার মায়াবী হাত” কবিতাটি পড়ে মনে হলো এ যেন উপনিষদের বিস্ময়কর শ্লোক! অপ্রচলিত শব্দের সমারোহ, প্রাঞ্জলতার কোনো বালাই নেই। শব্দগুলোকে জোর করে একটির পর আরেকটি বসিয়ে দিয়ে কবি নিজেকে রক্ষা করেছেন। আধুনিক কবিতায় সুর, ছন্দ, তাল, লয়, অন্ত্যমিল কিছুরই কি থাকার দরকার নেই? শুধু কি ভাবের গভীরতা দিলেই একটা কবিতার জন্ম হয়?
সুশান্ত মজুমদারের “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটি মূলত একটি তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার কবিতা। এটি সমাজের চরম অবক্ষয়, বাক্-স্বাধীনতা হরণ, মেধার অবমূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের এক অন্ধকার দলিল। কবি সবকিছুর মাঝে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখতে পেলেও কবিতার মাঝে এগুলো খুঁজে পান না। “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটি সম্পর্কে প্রথমত প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যি একটা কবিতা, নাকি প্রবন্ধ? কবিতার একটা নিজস্ব গঠনরীতি আছে, “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটিতে যা রক্ষা করা হয়নি। কবিতা আর প্রবন্ধের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে, যা মনে হয় কবি নিজে মানতে নারাজ।
রাজীব আর্জুনির “সাধক মাছ, কাকতাড়ুয়া” কবিতাটি একটি আধুনিক কবিতা। আইরিশ নাট্যকার এবং লেখক স্যামুয়েল বেকেটের লেখা “ওয়েটিং ফর গোডো” পড়েছিলাম। নাটক হিসেবে এটি সার্থক; কিন্তু নাটকের প্রধান দুই চরিত্র ভ্লাদিমির এবং এস্ট্রাগন ‘গোডো’র জন্য অপেক্ষা করে যা করে, তা যে এই আধুনিক যুগে কতটুকু যৌক্তিক, তার হিসাব কে মিলিয়ে দেখবে? “সাধক মাছ, কাকতাড়ুয়া” কবিতায় মূলভাব বা মূল চেতনা (Theme) ছাড়া আর কিছু পাঠক খুঁজে পাবেন বলে মনে হয় না। কবিতা লেখার জন্য আসলে কী দরকার, তা কি কবি সাহেব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
একটি কবিতা তখনই কবিতা হতে পারবে, যখন তার মধ্যে তাল, লয়, অন্ত্যমিল, শ্রুতিমধুরতা, ভাব ও আবেগ, সংক্ষিপ্ততা ও ঘনত্ব, চিত্রকল্প ও উপমা, শব্দচয়ন ও পরিমিতিবোধ, নির্দিষ্ট কাঠামো, সহজবোধ্যতা ও আকর্ষণ এবং পাঠকের মনোরঞ্জন ইত্যাদি থাকবে।
কবিতা লেখা কিছুটা ঐশ্বরিক শক্তির ব্যাপার, যা কেবল ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। তাই সবাই কবি হতে পারে না, কেউ কেউ কবি হয়। জোর করে কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে কোনো ভাব বা আবেগকে কেবল প্রকাশ করার নাম কখনো কবিতা হতে পারে না। কবিতা কেবল সেই লিখতে পারে, যার মধ্যে কবিত্ব আছে; আর বাকিরা হবে কেবল লেখক, কবি নয়।
শাবলু শাহাবউদ্দিন
কবি ও গল্পকার
বৈদেশিক ডাক অফিস, ঢাকা জিপিও, ঢাকা-১০০০
+৮৮০১৫৬৮৩৮৭৬০৯

সাহিত্য ও সাহিত্যিক
টমাস ক্যাম্পবেল (Thomas Campbell, ১৭৭৭–১৮৪৪)
১. ইংল্যান্ডের নাবিকেরা
ইংল্যান্ডের নাবিকেরা, সমুদ্রের বুকে বীর,
ঝড় তুলে লড়ো তুমি, জয় করো অন্ধকারের তীর।
পতাকা উড়ুক বাতাসে, তরবারি ঝলসে উঠুক,
ব্রিটেনের নামে গর্জে উঠুক তোমার হৃদয়ের ঢেউ।
যুদ্ধের ঝড়ে দাঁড়াও তুমি, অটল পাহাড়ের মতো,
শত্রুর বুকে ভয় জাগাও — ইংল্যান্ডের সন্তান তুমি!
২. বাল্টিকের যুদ্ধ
বাল্টিক সাগরে ঝড় উঠেছে, জাহাজ দুলছে প্রবল,
কামানের গর্জন মিশে গেছে ঢেউয়ের চিৎকারে।
বীরেরা দাঁড়িয়ে আছে, মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে,
পতাকা রক্তে রাঙা হয়, তবু হার মানে না কেউ।
ছন্দময় যুদ্ধের গান বাজে বাতাসে আজ,
বাল্টিক সাক্ষী — ব্রিটেন জিতেছে, শত্রু পালিয়েছে আজ!
৩. হোহেনলিন্ডেনের তুষারযুদ্ধ
তুষারে ঢাকা মাঠ, রক্তের লাল ছাপ পড়েছে,
কামানের আগুন জ্বলে উঠেছে শীতের রাতে।
সৈনিকেরা লড়ছে, মৃত্যুকে বুকে টেনে নিয়ে,
প্রতিটি পদক্ষেপে গর্জে উঠছে যুদ্ধের ছন্দ।
হোহেনলিন্ডেন — নামটি আজও কাঁপায় হৃদয়,
বীরত্বের গান গেয়ে যায় ক্যাম্পবেলের কলম।
৪. সৈনিকের স্বপ্ন
যুদ্ধের মাঠে ক্লান্ত সৈনিক শুয়ে আছে,
চোখ বন্ধ করে দেখে সে সুদূর গ্রামের বাড়ি।
স্ত্রীর হাসি, শিশুর কোল, শান্তির সোনালি আলো —
যুদ্ধের আগুন ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তের জন্য।
স্বপ্ন ভাঙে কামানের শব্দে, আবার যুদ্ধে ফিরে যায়,
তবু হৃদয়ে বাজে সেই স্বপ্নের মধুর সুর।
৫. আয়ারল্যান্ডের নির্বাসিত
আয়ারল্যান্ড ছেড়ে দূর সমুদ্রে ভেসে যায় সে,
মাতৃভূমির স্মৃতি বুকে নিয়ে, চোখে জলের ধারা।
শত্রুর অত্যাচারে ঘর হারিয়েছে, দেশ হারিয়েছে,
তবু গান গায় সে — স্বাধীনতার স্বপ্নের গান।
ক্যাম্পবেলের কলমে জেগে উঠেছে তার কষ্ট,
নির্বাসিতের হৃদয়ে আজও জ্বলে আশার আলো।
৬. পোল্যান্ডের জন্য হৃদয়
পোল্যান্ডের আকাশে রক্তের মেঘ জমেছে আজ,
ওয়ারশ পতনের খবরে কাঁপছে ক্যাম্পবেলের বুক।
স্বাধীনতার জন্য লড়ছে তারা, মৃত্যুকে তুচ্ছ করে,
তবু বিশ্ব চুপচাপ — কবি বলে, “এ অন্যায়!”
হৃদয় রাতদিন পোল্যান্ডের জন্য কাঁদে,
স্বাধীনতার গান লেখে তিনি — চিরকালের জন্য।
৭. লর্ড উলিনের কন্যা
লর্ড উলিনের কন্যা পালায় প্রেমিকের সাথে,
ঝড়ের রাতে নৌকা চলে সমুদ্রের বুকে।
পিতার ক্রোধ, প্রেমের আগুন — দুইয়ে মিলেছে যুদ্ধ,
ঢেউয়ের গর্জনে মিশে যায় তাদের শেষ কথা।
ছন্দময় ব্যালাডে বেজে ওঠে ভাগ্যের খেলা,
ক্যাম্পবেলের কলমে অমর হয় প্রেম-বিদ্রোহ।
৮. আশার আনন্দ
আশা — মানুষের বুকে চিরন্তন আলোর দীপ,
অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও জ্বলে ওঠে আবার।
যুদ্ধ, দাসত্ব, অত্যাচার — সব ভেঙে দেয় সে,
নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায়, নতুন পথ দেখায়।
ক্যাম্পবেলের প্রথম কাব্যে বেজেছে এই সুর,
আশার গান আজও গায় হৃদয় — অটুট, অবিচল।
৯. স্কটিশ কবির যুদ্ধগান
গ্লাসগো থেকে লন্ডনের পথে হেঁটে এসেছে সে,
হৃদয়ে বাজে যুদ্ধের ছন্দ, দেশপ্রেমের সুর।
কলম ধরে লেখে সে — সমুদ্রের গান, তুষারের যুদ্ধ,
সৈনিকের স্বপ্ন, নির্বাসিতের বেদনা।
স্কটল্যান্ডের মাটি থেকে জন্ম নিয়েছে এই কবি,
যার গান আজও জাগায় বুকে — বীরত্বের আগুন।
১০. ক্যাম্পবেলের উত্তরাধিকার
যুদ্ধের গান লিখে গেছে সে, ছন্দে-ছন্দে উদ্দীপনা,
নাবিক, সৈনিক, নির্বাসিত — সবার হয়ে কথা বলেছে।
শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে, পোল্যান্ডের পক্ষে দাঁড়িয়েছে,
ওয়েস্টমিনস্টারের কোণে চিরকালের জন্য ঘুমিয়েছে।
তবু তার গান বাজে আজও — সমুদ্রে, যুদ্ধক্ষেত্রে, হৃদয়ে,
টমাস ক্যাম্পবেল — ছন্দময় যুদ্ধকাব্যের অমর কবি!
স্কটিশ কবি, যাঁর উদ্দীপক, ছন্দময় যুদ্ধকাব্য ও দেশপ্রেমিক গান আজও জাতীয় স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে
টমাস ক্যাম্পবেল ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় স্কটিশ কবি। তিনি তাঁর উদ্দীপক, ছন্দময় যুদ্ধকাব্য (martial war lyrics) এবং দেশপ্রেমিক গানের জন্য সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় — যেমন Ye Mariners of England, The Battle of the Baltic ও Hohenlinden। এই গানগুলো শুধু কবিতা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ও নৌবাহিনীতে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দীর্ঘ কাব্যের রচয়িতা, সাংবাদিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ এবং মানবিক অধিকারের সমর্থক। তাঁর রচনায় নব্যধ্রুপদী (neoclassical) ছন্দ ও রোমান্টিক অনুভূতির মিশ্রণ ঘটেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
২৭ জুলাই ১৭৭৭ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের হাই স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন টমাস ক্যাম্পবেল। তিনি ছিলেন আলেকজান্ডার ক্যাম্পবেল ও মার্গারেট ক্যাম্পবেলের একাদশ সন্তান (সবচেয়ে ছোট)। পিতা আলেকজান্ডার ছিলেন একজন বণিক; তিনি ভার্জিনিয়ায় তামাকের ব্যবসা করতেন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয় এবং পরিবার প্রায় ২০,০০০ পাউন্ড হারায়। পিতা ছিলেন দার্শনিক টমাস রিডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু — এজন্যই কবির নাম রাখা হয় টমাস। মাতা মার্গারেট ছিলেন সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী; তাঁর প্রভাবে ক্যাম্পবেলের সাহিত্যিক রুচি গড়ে ওঠে।
শিক্ষা ও যুবকাল
গ্লাসগো হাই স্কুল ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ক্লাসিক্স ও কাব্য রচনায় পুরস্কার লাভ করেন। ছুটির সময় পশ্চিম হাইল্যান্ডসে গৃহশিক্ষকতা করতেন। এ সময় তিনি Glenara ও Ballad of Lord Ullin’s Daughter-এর মতো কবিতা লেখেন। ১৭৯৭ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে বক্তৃতা শোনেন, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ বেশি ছিল। এডিনবার্গে তিনি স্যার ওয়াল্টার স্কট, হেনরি ব্রাফাম, ফ্রান্সিস জেফ্রি প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত হন। এই সময় তিনি The Wounded Hussar, The Dirge of Wallace ইত্যাদি লেখেন।
প্রথম বড় সাফল্য: The Pleasures of Hope (১৭৯৯)
১৭৯৯ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বড় কাব্য The Pleasures of Hope। এটি heroic couplet-এ রচিত দীর্ঘ কবিতা — আশা, ফরাসি বিপ্লব, পোল্যান্ডের বিভাজন, দাসপ্রথা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। কবিতাটি তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ক্যাম্পবেলকে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও খ্যাতি এনে দেয়। এটি তাঁর নব্যধ্রুপদী শৈলীর নিদর্শন।
ইউরোপ ভ্রমণ ও যুদ্ধকাব্যের জন্ম (১৮০০)
১৮০০ সালে জার্মানি ভ্রমণ করেন। হামবুর্গ, রেগেনসবার্গ (ফরাসি বাহিনীর দখলে পড়ার ঠিক আগে) এবং আলটোনায় অবস্থান করেন। এই ভ্রমণ তাঁর কাব্যজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এ সময় তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত যুদ্ধকাব্য ও দেশপ্রেমিক গান:
- Ye Mariners of England — ব্রিটিশ নৌসেনাদের উদ্দেশে উদ্দীপক গান। ছন্দময়, শক্তিশালী, দেশপ্রেমে ভরপুর।
- The Battle of the Baltic — ডেনমার্ক-ব্রিটেন যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত নৌযুদ্ধের গান।
- Hohenlinden — ১৮০০ সালের হোহেনলিন্ডেনের যুদ্ধের বর্ণনা। শীতের যুদ্ধক্ষেত্র, রক্তাক্ত তুষার, বীরত্ব — সব মিলিয়ে অসাধারণ ছন্দ ও চিত্রকল্প।
- The Soldier’s Dream — যুদ্ধের ক্লান্ত সৈনিকের স্বপ্নের কথা (পরে বিটোফেন সুরারোপ করেন)।
- The Exile of Erin — আইরিশ নির্বাসিতদের প্রতি সহানুভূতি।
এই গানগুলোর উদ্দীপক, ছন্দময়, martial চরিত্র তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সুরারোপযোগ্য ছন্দ, সহজ ভাষা ও দেশপ্রেমের আবেগ এগুলোকে জনপ্রিয় গানে পরিণত করে।
লন্ডনে স্থায়ী বসবাস, বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
১৮০৩ সালে দ্বিতীয় চাচাতো বোন মাতিল্ডা সিনক্লেয়ারকে বিয়ে করেন। লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। ১৮০৫ সালে সরকারি পেনশন (২০০ পাউন্ড) পান। সিডেনহ্যামের পিক হিলে বাড়ি করেন। দুই পুত্রের মধ্যে একজন শৈশবে মারা যান, অন্যজন মানসিক ভারসাম্য হারান। ১৮২৮ সালে স্ত্রী মাতিল্ডা অল্প বয়সে মারা যান — এটি তাঁর জীবনে বড় আঘাত।
পরবর্তী প্রধান কাব্যকর্ম
- Gertrude of Wyoming (১৮০৯): স্পেনসেরিয়ান স্তবকে রচিত দীর্ঘ আখ্যানকাব্য। পেনসিলভানিয়ার ওয়াইওমিং উপত্যকায় ১৭৭৮ সালের গণহত্যার পটভূমিতে। প্রকৃতি, প্রেম ও ট্র্যাজেডির মিশ্রণ। সমসাময়িকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও পরে সমালোচিত হয় অতিরিক্ত বিস্তারের জন্য।
- Theodric (১৮২৪): পারিবারিক জীবনের কবিতা।
- The Pilgrim of Glencoe (১৮৪২): শেষ বড় আখ্যানকাব্য।
তাঁর ছোট গানগুলোই বেশি স্থায়ী হয়েছে।
সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড
১৮০৫ সাল থেকে The Star পত্রিকায় বিদেশি সংবাদ অনুবাদ করতেন। ১৮১৯ সালে প্রকাশ করেন Specimens of the British Poets — ব্রিটিশ কবিদের নির্বাচিত রচনা ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধসহ। ১৮২০–১৮৩০ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা করেন The New Monthly Magazine। ১৮৩১ সালে The Metropolitan Magazine চালু করেন (সফল হয়নি)। ১৮১২ সালে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে কাব্য বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
ক্যাম্পবেল ছিলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (London University)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা অধ্যয়ন করে লর্ড ব্রাফামকে সুপারিশ পাঠান। ১৮২৬–১৮২৯ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লর্ড রেক্টর নির্বাচিত হন (স্যার ওয়াল্টার স্কটকে হারিয়ে)। শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ ও আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
পোল্যান্ড সমর্থন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
The Pleasures of Hope-এ পোল্যান্ডের পক্ষে কথা বলেছিলেন। ১৮৩১ সালে রাশিয়ার হাতে ওয়ারশ পতনের পর গভীরভাবে আহত হন। “Poland preys on my heart night and day” — এমন কথা লিখেছিলেন। Literary Association of the Friends of Poland-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। হল্যান্ড হাউসের হুইগ সমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শেষ জীবন, দুর্ভাগ্য, মৃত্যু ও সমাধি
স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। ১৮৩৪ সালে প্যারিস ও আলজিয়ার্স ভ্রমণ করেন (Letters from the South, ১৮৩৭)। ১৮৪৪ সালের ১৫ জুন ফ্রান্সের বুলোন-সুর-মেরে (Boulogne-sur-Mer) মারা যান। ৩ জুলাই ১৮৪৪ সালে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির Poets’ Corner-এ সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
জীবদ্দশায় ক্যাম্পবেল অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর যুদ্ধকাব্যগুলো জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। পরবর্তীকালে ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কলরিজের রোমান্টিক আন্দোলনের ছায়ায় কিছুটা ম্লান হয়ে যান, কিন্তু দেশপ্রেমিক গান ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় থেকে গেছেন। ফ্রান্সিস জেফ্রি একবার তাঁকে লিখেছিলেন যে তিনি নিজের ধারণাকে অতিরিক্ত পরিশীলিত করে ফেলেন — অর্ধেক জাঁকজমক হারিয়ে যায়। তবু তাঁর ছন্দের দক্ষতা, যুদ্ধের চিত্রকল্প এবং মানবিক সহানুভূতি আজও পাঠককে আকর্ষণ করে।
টমাস ক্যাম্পবেল ছিলেন একজন কবি যিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বীরত্বকে ছন্দের মাধ্যমে অমর করে রেখেছেন, একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেছেন। তাঁর কবিতা শুধু সাহিত্য নয় — ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে উঠেছে।

Dr.ChanchalKumar Mondal
দহন কালের কবিতা
ড.চঞ্চলকুমার মণ্ডল
এইযে নিত্য উথাল পাথাল পাড় ভাঙা ঢেউ বুকে;
অথচ কত সুখী সুখী ভাব চেহারা চোখে ও মুখে।
এইযে নিত্য ছবি আঁকি মনেরই ক্যানভাসে;
পাঁজরে পাঁজরে যন্ত্রনা বয় ভীষণ হা-হুতাশে!
শব্দে শব্দে মালা গাঁথি রোজ
বুনে যাই অন্ত্যমিল ;
অথচ ভেতরে ভেতরে আস্ত
বিরহী শঙ্খ চিল!
চারপাশে শত মানুষের ভীড় তবু,শূন্য মনে হয়;
মনের মানুষ ছাড়া মন ফাঁকাই কেবল রয়।
পুড়ে পুড়ে খুব গোপনে হয়ে চলি দগ্ধীভূত;
বাইরে দেখাই ভীষণ প্রাণোচ্ছল,ভেতরে থেকেই মৃত।
জীবন সে নয় চাওয়া পাওয়া কেবল উপভোগ;
জীবন হল চেয়ে না পাওয়া গোপন ক্ষয়রোগ!
বুকের গভীরে ফুটেই শুকোয় স্বপ্ন রঙিন ফুল;
যা নয় আমার তার জন্য বিভোর মশগুল!
সবাই বাঁচে বাঁচার মতো বুকের দহন ছাড়াই;
পুড়বে হাত জেনেও তবু
দহনে হাত বাড়াই।
ধরা ছোঁয়ার বাইরে যা
হবে না নিজের কভু;
তার জন্য বুকের চুলার আগুনে পুড়ি তবু।
পুড়তে পুড়তে অন্তর্দাহে
মাটিতে যাব মিশে;
নিজের ক্ষত আগলাই নিজে
দুঃখের নীল বিষে।

Dr.ChanchalKumar Mondal
লোভের ক্ষুধা
চঞ্চলকুমার মণ্ডল
ক্ষুধার কোন ধর্ম নেই,নেই কোন জাতপাত;
ফোটা শিউলির বোঁটায় খোঁজে তপ্ত সাদা ভাত।
ক্ষুধা বোঝে না মান- অপমান,ক্ষুধা বড় প্রতারক;
জঠর ক্ষুধার বড় শত্রু জ্বালাময়ী অম্ল-ক্ষারক।
ক্ষুধায় খরিশ সর্প ও নাকি খেয়ে ফেলে ডিম- ছানা!
ক্ষুধার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর নেই তো কারুর জানা।
লোভের ক্ষুধার আগুন চোখ বিধ্বংসী প্রায়;
বোঝেনা সম্পর্ক লোভের ক্ষুধা কাক কাকের মাংস খায়।
আরো চাই! আরো চাই! লোভ ভীষণ ক্ষুধাতুর;
সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে লোভের ক্ষুধা হয় মুচির কুকুর!
লোভের ক্ষুধার কাছে নাড়ীর যোগ ও ফেলে ছেঁটে;
কুকুর হয়ে কুকুরের মাংস খায় কামড়ে,ছিঁড়ে,কেটে!
লোভের হাঙর ক্ষুধা দেখেছি আমারই অগ্রজের চোখে;
সব শুষে খেয়েও ভেঙে পড়তে দেখিনি এতটুকুও পিতৃশোকে!
যে শোক- সন্ত্বাপে স্বয়ং প্রকৃতি ও অশ্রু হয়ে ঝরে;
আসলে লোভের ক্ষুধার কাছে বিবেক- মনুষ্যত্ব যায় মরে।
পড়েছে ভেঙে স্বয়ং খুল্লতাত ভীষণ ভাতৃবিয়োগের শোকে;
অথচ,লোভের ক্ষুধা চির জাগ্রত আমারই অগ্রজের মুখে- চোখে!!

Uttam Ghosh
শহুরে জোছনায় নদীর ঢেউ নেই, কাশবনের দোলা নেই, শিশিরভেজা ঘাস নেই। আছে কংক্রিটের ছাদ, দূরের গাড়ির শব্দ আর জানালার ফাঁকে জেগে থাকা কিছু একাকী মানুষ। সেই মানুষগুলোর মনের ভেতরেই হয়তো জমে থাকে হারিয়ে যাওয়া গ্রামের উঠোন, শৈশবের রাত, প্রিয় মুখ আর পুরোনো কোনো অপেক্ষা।
কতদিন আমার চাঁদ দেখি না।
২৯/০৯/২৬

Uttam Ghosh
যে রাস্তা
কলমে : ঘোষ উত্তম
তারিখ : ২৭/০৯/২৬
যে রাস্তাটা বাড়ি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে এই রাস্তায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা । নামলাম। হাতের ডানে বাড়ির পথ আর বামে ব্রম্মপুত্র নদ। অনেক ইতিহাসের পাতায় এই পথটুকু।
স্মৃতিময়।
এখন আর এ পথে প্যাক কাদা ধুলো বালি নেই । শৈশবে কাঁদা-মাটির রাস্তায় স্কুল থেকে ফেরার স্মৃতিটা আজও মনে হলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বর্ষার দিনে ভেজা মাটির গন্ধে চারদিক ভরে থাকত, পায়ে কাদা লেগে ভারী হয়ে যেত চলা, তবু সেই ক্লান্তির মাঝেও একরকম অজানা আনন্দ লুকিয়ে থাকত। বগলে করে বইখাতা, জামার কোণে কাদার ছোপ—সবকিছু মিলিয়ে যেন ছিল আমাদের প্রতিদিনের গল্প। কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, কখনো বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি, আবার কখনো দূর থেকে মায়ের ডাক শোনার জন্য মন ছুটে চলা—এই সব ছোট ছোট মুহূর্তেই গড়ে উঠেছিল শৈশব।আর এ রাস্তা । এ রাস্তা ধরে আমার বিকেলে ব্রম্মপুত্র নদের পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডুবেছে। আবার এ রাস্তা ধরেই প্রিয়জনরা কাঁধ বয়ে শেষকৃত্যের দিকে নদীতে নেমেছে। আর আজ
আজ পাকা রাস্তা, দ্রুত জীবন, সবকিছু সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই কাঁদা-মাটির পথ আর সেই অনুভূতিগুলো সহজে মুছে যায় না। কারণ ওই পথেই শেখা হয়েছিল সহনশীলতা, বন্ধুত্ব আর স্বপ্ন দেখার প্রথম পাঠ। স্মৃতির পাতায় সেই রাস্তা আজও ভেজা থাকে—হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখ ভিজিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় কোথা থেকে আমরা এসেছি।
আমার সামনে দিয়ে সেই রাস্তা ধরে চলছে । স্কুল ফেরার ছেলে মেয়ের দল। সামনে যেতে ইচ্ছে করল না। পিছু নিয়ে ছবি তুলে নিলাম। আর মনে মনে স্মৃতির আয়না ফ্রেমে বন্দী করে নিলাম সেই দিনের ____________
ঘোষ উত্তম
ভাবখালী, সদর, ময়মনসিংহ।
০১৮২৫৩৯০৩০৯

Uttam Ghosh
যে রাস্তা
কলমে : ঘোষ উত্তম
তারিখ : ২৭/০৯/২৬
যে রাস্তাটা বাড়ি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে এই রাস্তায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা । নামলাম। হাতের ডানে বাড়ির পথ আর বামে ব্রম্মপুত্র নদ। অনেক ইতিহাসের পাতায় এই পথটুকু।
স্মৃতিময়।
এখন আর এ পথে প্যাক কাদা ধুলো বালি নেই । শৈশবে কাঁদা-মাটির রাস্তায় স্কুল থেকে ফেরার স্মৃতিটা আজও মনে হলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বর্ষার দিনে ভেজা মাটির গন্ধে চারদিক ভরে থাকত, পায়ে কাদা লেগে ভারী হয়ে যেত চলা, তবু সেই ক্লান্তির মাঝেও একরকম অজানা আনন্দ লুকিয়ে থাকত। বগলে করে বইখাতা, জামার কোণে কাদার ছোপ—সবকিছু মিলিয়ে যেন ছিল আমাদের প্রতিদিনের গল্প। কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, কখনো বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি, আবার কখনো দূর থেকে মায়ের ডাক শোনার জন্য মন ছুটে চলা—এই সব ছোট ছোট মুহূর্তেই গড়ে উঠেছিল শৈশব।আর এ রাস্তা । এ রাস্তা ধরে আমার বিকেলে ব্রম্মপুত্র নদের পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডুবেছে। আবার এ রাস্তা ধরেই প্রিয়জনরা কাঁধ বয়ে শেষকৃত্যের দিকে নদীতে নেমেছে। আর আজ
আজ পাকা রাস্তা, দ্রুত জীবন, সবকিছু সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই কাঁদা-মাটির পথ আর সেই অনুভূতিগুলো সহজে মুছে যায় না। কারণ ওই পথেই শেখা হয়েছিল সহনশীলতা, বন্ধুত্ব আর স্বপ্ন দেখার প্রথম পাঠ। স্মৃতির পাতায় সেই রাস্তা আজও ভেজা থাকে—হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখ ভিজিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় কোথা থেকে আমরা এসেছি।
আমার সামনে দিয়ে সেই রাস্তা ধরে চলছে । স্কুল ফেরার ছেলে মেয়ের দল। সামনে যেতে ইচ্ছে করল না। পিছু নিয়ে ছবি তুলে নিলাম। আর মনে মনে স্মৃতির আয়না ফ্রেমে বন্দী করে নিলাম সেই দিনের ____________
ঘোষ উত্তম
ভাবখালী, সদর, ময়মনসিংহ।
০১৮২৫৩৯০৩০৯

সাহিত্য ও সাহিত্যিক
রবার্ট সাউদে (Robert Southey, ১৭৭৪–১৮৪৩)
১. ব্লেনহাইমের বিজয়ের পর
গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বসে বুড়ো কাসপার,
ছোট নাতি-নাতনি খেলে তার পাশে।
হঠাৎ পাওয়া গোলাকার খুলি হাতে,
বলল, “বিখ্যাত জয়ে পড়েছিল যে!”
“কেন লড়াই হয়েছিল, বলো দাদু?”
বুড়ো বলে, “ফরাসি-ইংরেজ, জয় ইংরেজের।
কী লাভ হয়েছিল শেষে? জানি না রে বাবা,
তবু সবাই বলে—বিখ্যাত বিজয়!”
হাজার হাজার মৃতদেহ পচে রোদে,
মা-শিশু পুড়ে মরেছে আগুনে-তরবারিতে।
তবু বুড়ো বলে, “এমনই হয় বিখ্যাত জয়ে…”
শিশুরা চুপ, চোখে বিস্ময় আর বেদনা।
২. ইনচকেপ রকের ঘণ্টা
শান্ত সমুদ্র, নিঃশব্দ বাতাস,
জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে যেন ঘুমিয়ে।
ঢেউয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিপদের পাথর—
ইনচকেপ রক, যার ঘণ্টা বাজত সতর্কতায়।
সদাচারী অ্যাবট বসিয়েছিলেন সেই ঘণ্টা,
ঝড়ে-ঝড়ে সাবধান করত নাবিকদের।
কিন্তু দুষ্ট জলদস্যু র্যালফ কেটে ফেলল ঘণ্টা,
ফেলে দিল সমুদ্রে—হাসতে হাসতে।
ঝড় এল যখন, অন্ধকারে ঘন,
র্যালফের জাহাজ ছুটে চলল সেই পাথরের দিকে।
কোনো সতর্কতা নেই, কোনো ঘণ্টার শব্দ নেই…
ন্যায়ের বিচারে ডুবে গেল দুষ্টের জাহাজ।
৩. বৃদ্ধের সান্ত্বনা
“তুমি বুড়ো, ফাদার উইলিয়াম,” বলে যুবক,
“মাথার চুল পেকে গেছে, তবু হাসি ঠোঁটে।
কী করে এত সুস্থ রইলে এই বয়সে?”
বুড়ো হেসে বলে, “আনন্দে, প্রেমে, আর সততায়।”
“যৌবনে আমি কখনো রাগ করিনি অকারণে,
মিথ্যা বলিনি, লোভ করিনি অপরের সম্পদে।
প্রতিদিন হেসেছি, গেয়েছি, ভালোবেসেছি জীবনকে—
এই সহজ নিয়মেই বুড়ো বয়স এসেছে আশীর্বাদ হয়ে।”
৪. দুষ্ট বিশপের শাস্তি
বিশপ হ্যাটো ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী, নিষ্ঠুর।
দুর্ভিক্ষে মানুষ মরে, সে খাদ্যশস্য লুকিয়ে রাখে।
একদিন তার শস্যাগারে ইঁদুরের দল ঢুকে পড়ে,
কামড়ে কামড়ে খায় তার শরীর—প্রতিশোধ নেয় প্রকৃতি।
সে পালায় টাওয়ারে, দরজা বন্ধ করে,
কিন্তু ইঁদুর সাঁতার কেটে আসে জল পেরিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বিশপের হাড়গোড় খেয়ে ফেলে ইঁদুরের দল—
দুষ্টের শাস্তি আসে অদৃশ্য হাতের টানে।
৫. মৃতদের সঙ্গে আমার দিনগুলি
আমার দিনগুলি মৃতদের সঙ্গে কেটে যায়,
চারপাশে পুরোনো গ্রন্থের সারি—মহান মনের সঙ্গীরা।
প্রতিদিন কথা হয় প্লেটো, হোমার, মিল্টনের সঙ্গে,
তাঁদের জ্ঞানে আমি ভরে উঠি, শান্ত হয়ে যাই।
যখন দুঃখ আসে, তাঁরা সান্ত্বনা দেয়,
যখন আনন্দ আসে, তাঁরা সঙ্গী হয়।
একদিন আমিও যাব তাঁদের কাছে চিরকালের জন্য,
কিন্তু রেখে যাব এই নাম—যা ধুলোয় মিশবে না।
৬. সেন্ট কেইনের জাদুকূপ
ওয়েলসের সেই পবিত্র কূপের কথা শোনো,
যেখানে প্রথমে যে পান করে—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কে বেশি ক্ষমতা পায়।
যদি স্ত্রী প্রথমে পান করে, সে হয় ঘরের রানি,
স্বামী হয় অনুগত—এমনই প্রাচীন কিংবদন্তি।
অনেক দম্পতি আসে সেই কূপের তীরে,
কেউ হাসে, কেউ ভয় পায় ভাগ্যের খেলায়।
প্রকৃতির এই ছোট্ট নিয়মে লুকিয়ে আছে বড় শিক্ষা—
ভালোবাসায় সমতা আর শ্রদ্ধাই সবচেয়ে বড় জাদু।
৭. থালাবার অভিযান (থালাবা দ্য ডেসট্রয়ারের ছায়ায়)
আরবের মরুভূমিতে এক তরুণ বীরের যাত্রা,
শয়তানি জাদুকরদের দুর্গের বিরুদ্ধে একাকী লড়াই।
পবিত্র তরবারি হাতে, হৃদয়ে ঈমানের আলো,
সে জয় করে অন্ধকার—আলোর পথ দেখায় সবাইকে।
৮. কেহামার অভিশাপ
হিন্দু পুরাণের ছায়ায় এক নিম্নবর্ণের যুবক,
সহ্য করে অপমান, কিন্তু হার মানে না।
অভিশাপ ভাঙতে সে লড়ে যায় স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে,
ধৈর্য আর সত্যের জোরে জয় করে অসম্ভব যুদ্ধ।
৯. ম্যাডকের স্বপ্ন
ওয়েলশ রাজপুত্র ম্যাডক সমুদ্র পেরিয়ে যায় দূরে,
নতুন ভূমিতে (আজটেকের দেশে) স্থাপন করে সভ্যতার বীজ।
বর্বরতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে,
খ্রিস্টীয় আলো ছড়ায়—স্বপ্নের নতুন জগৎ গড়ে।
১০. গ্রেটা হলের কবি
কেসউইকের পাহাড়-ঘেরা গ্রেটা হলে বসে সাউদে,
চারপাশে হাজারো বই, মাথায় প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের স্বপ্ন।
থালাবা, কেহামা, ম্যাডক—সব জন্মায় এখানেই,
লেক কবির কলমে জেগে ওঠে বিশাল বহিরাগত আখ্যান।
ব্রিটিশ লেক কবি যিনি বিশাল, বহিরাগত পুরাণকথাময় মহাকাব্যিক আখ্যান নির্মাণ করেছিলেন
রবার্ট সাউদে ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম প্রভাবশালী ইংরেজ সাহিত্যিক — কবি, ইতিহাসবিদ, জীবনীকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং বিতর্কিত চিন্তাবিদ। তিনি লেক পোয়েটস (Lake Poets) নামে পরিচিত সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, যাঁদের মধ্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও স্যামুয়েল টেলর কলরিজ সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৮১৩ সাল থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত — ত্রিশ বছর ধরে — তিনি যুক্তরাজ্যের কবি লরিয়েট (Poet Laureate) পদ অলংকৃত করেছিলেন।
তাঁর সবচেয়ে স্বতন্ত্র অবদান হলো বিশালাকার বহিরাগত পুরাণকথাভিত্তিক মহাকাব্যিক আখ্যান নির্মাণ। ইসলামী আরব্য-রাত্রির জগৎ, হিন্দু পুরাণ, ওয়েলশ কিংবদন্তি ও প্রাক-কলম্বীয় আমেরিকার কল্পনাকে তিনি ইংরেজি কাব্যে অভূতপূর্বভাবে মিশিয়েছিলেন। এই রচনাগুলো তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল এবং পরবর্তী রোমান্টিক কবিদের (বিশেষ করে পার্সি বিশ শেলি) প্রভাবিত করেছিল।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা (১৭৭৪–১৭৯৩)
১২ আগস্ট ১৭৭৪ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে (Wine Street) জন্মগ্রহণ করেন রবার্ট সাউদে। পিতা রবার্ট সাউদে ছিলেন একজন লিনেন ব্যবসায়ী, যিনি আর্থিকভাবে অসফল ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যান। মাতা মার্গারেট হিল সাউদে। শৈশবে তিনি মূলত আত্মীয়দের কাছে বড় হন — বিশেষ করে এক উদ্ভট খালার তত্ত্বাবধানে। এই বিচ্ছিন্নতা ও আবেগ দমনের অভ্যাস তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াশোনা করেন (১৭৮৮–১৭৯২)। এখানেই তাঁর বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ পায়। তিনি The Flagellant নামে একটি ছাত্র পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং একটি প্রবন্ধে শারীরিক শাস্তি (flogging)-কে “শয়তানের উদ্ভাবন” বলে আক্রমণ করেন। এর ফলে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পরবর্তীতে তিনি অক্সফোর্ডের ব্যালিওল কলেজে ভর্তি হন (১৭৯৩) পবিত্র যাজকত্বের উদ্দেশ্যে (মামার ইচ্ছায়)। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণশীল পরিবেশ, গোঁড়ামি ও শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে। তিনি রুশো, ভলতেয়ার, গিবন ও টমাস পেইন-এর প্রভাবে রিপাবলিকান, ডিস্ট ও ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক হয়ে ওঠেন। অক্সফোর্ডে তিনি বেশিদিন থাকেননি।
কলরিজের সাথে বন্ধুত্ব ও প্যান্টিসোক্রেসির স্বপ্ন (১৭৯৪–১৭৯৫)
১৭৯৪ সালে সাউদে স্যামুয়েল টেলর কলরিজের সাথে পরিচিত হন। দুজনেই তরুণ, উদ্দীপ্ত, বিপ্লবী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ। তাঁরা একসঙ্গে The Fall of Robespierre (১৭৯৪) নামে একটি নাটক লেখেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল প্যান্টিসোক্রেসি (Pantisocracy) নামক ইউটোপীয় সম্প্রদায় গড়ার পরিকল্পনা। রবার্ট লাভেলসহ কয়েকজন বন্ধু মিলে আমেরিকার সাসকুয়েহানা নদীর তীরে একটি সমতাবাদী, সম্মিলিত কৃষি সম্প্রদায় গড়তে চেয়েছিলেন — যেখানে সম্পত্তি, শ্রম ও সুখ সমানভাবে ভাগ হবে। এই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অর্থাভাব ও ব্যক্তিগত মতভেদের কারণে ভেঙে যায়। তবে এটি সাউদের প্রথম যৌবনের আদর্শবাদের প্রতীক হয়ে থেকে যায়।
প্রথম বিবাহ, পরিবার ও প্রথম সাহিত্যিক সাফল্য
১৪ নভেম্বর ১৭৯৫ সালে সাউদে এডিথ ফ্রিকার (Edith Fricker)-কে বিয়ে করেন। এডিথের বোন সারা পরে কলরিজকে বিয়ে করেন। এডিথ ছিলেন অত্যন্ত অনুগত স্ত্রী ও মা। তাঁদের সংসারে বেশ কয়েকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের অনেকেই শৈশবে মারা যায় — এটি সাউদের জীবনে বারবার আঘাত হানে।
১৭৯৫ সালেই তিনি প্রথম কবিতার সংকলন প্রকাশ করেন (রবার্ট লাভেলের সাথে)। ১৭৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বড় কাব্যকর্ম জোয়ান অফ আর্ক (Joan of Arc) — যা ফরাসি জাতীয় বীরিনীর কাহিনি অবলম্বনে রচিত এবং তৎকালীন বিপ্লবী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। চার্লস ল্যাম্ব এই কাব্য সম্পর্কে অত্যন্ত প্রশংসা করে বলেছিলেন যে এটি একাই যুগের কাব্যিক অবক্ষয়ের অভিযোগ খণ্ডন করতে পারে।
একই সময়ে তিনি স্পেন ও পর্তুগাল ভ্রমণ করেন (১৭৯৬ ও ১৮০০–১৮০১)। এই অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় Letters Written During a Short Residence in Spain and Portugal (১৭৯৭) — তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গদ্য রচনা।
লেক জেলায় স্থায়ী বসবাস ও লেক পোয়েটস পর্ব (১৮০৩ onwards)
১৮০৩ সালে সাউদে পরিবারসহ কেসউইকের (Keswick) গ্রেটা হল (Greta Hall)-এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর (মৃত্যু পর্যন্ত) বাস করেন। এই বাড়িটি লেক জেলার (Lake District) সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত এবং এখানেই তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো জন্ম নেয়।
এখানে তিনি কলরিজের পরিত্যক্ত পরিবারেরও যত্ন নেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাথেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এই তিনজনকে একসঙ্গে লেক পোয়েটস বলা হয়। সাউদে এখানে অসাধারণ পরিশ্রমী জীবন যাপন করেন — বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেখেন এবং চিঠিপত্রের মাধ্যমে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন।
কবি লরিয়েট নিযুক্তি ও বিতর্ক (১৮১৩)
১৮১৩ সালে স্যার ওয়াল্টার স্কট কবি লরিয়েট পদ প্রত্যাখ্যান করলে সাউদেকে এই সম্মান দেওয়া হয়। তিনি এই পদ গ্রহণ করেন, কিন্তু এটি তাঁর জন্য মিশ্র আশীর্বাদ হয়ে ওঠে।
বিতর্ক:
- ১৮১৭ সালে তাঁর যৌবনকালের র্যাডিক্যাল নাটক ওয়াট টাইলার (Wat Tyler, ১৭৯৪ সালে লেখা) গোপনে প্রকাশিত হয়। রাজনৈতিক শত্রুরা এটি ব্যবহার করে তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” প্রমাণ করতে চায়।
- লর্ড বায়রন তাঁকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। The Vision of Judgement (১৮২১) কাব্যে সাউদের রচনার প্যারোডি করে বায়রন তাঁকে “Satanic School”-এর বিরোধী বলে বিদ্রূপ করেন। বায়রন সাউদেকে অর্থলোভী, সংকীর্ণমনা ও কপট বলে চিত্রিত করেন।
- উইলিয়াম হ্যাজলিট The Spirit of the Age (১৮২৫)-এ লেখেন: “তিনি যৌবনে স্বাধীনতাকে প্রেমিকার মতো ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু পরে ‘বৈধতা’ নামক এক বয়স্কা ও সন্দেহজনক মহিলাকে বিয়ে করেছেন।”
সাউদে নিজেকে রক্ষা করে বলেছিলেন যে তিনি লক্ষ্য পরিবর্তন করেননি, শুধু উপায় বুঝতে শিখেছেন এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালোবেসে রক্ষা করতে শিখেছেন।
বিশাল বহিরাগত পুরাণকথাময় মহাকাব্যিক আখ্যান
সাউদের সবচেয়ে স্বতন্ত্র সৃষ্টি এই ধারায়:
- থালাবা দ্য ডেসট্রয়ার (Thalaba the Destroyer, ১৮০১): ইসলামী-আরব্য পুরাণ ও জাদুকথার জগতে এক তরুণ মুসলিম বীরের শয়তানি জাদুকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এটি প্রাচ্যের রহস্যময়তা ও নৈতিক সংগ্রামের অসাধারণ চিত্রায়ণ।
- দ্য কার্স অফ কেহামা (The Curse of Kehama, ১৮১০): হিন্দু পুরাণ অবলম্বনে রচিত। এক নিম্নবর্ণের (pariah) ধৈর্যশীল ব্যক্তির এক স্বৈরাচারী রাজার বিরুদ্ধে লড়াই। এটি নেপোলিয়ন-বিরোধী সংগ্রামের রূপক হিসেবেও পড়া যায় এবং শেলির Prometheus Unbound-কে প্রভাবিত করে।
- ম্যাডক (Madoc, ১৮০৫): ওয়েলশ কিংবদন্তির রাজপুত্র ম্যাডকের কাহিনি, যিনি কথিত আছে প্রাক-কলম্বীয় আমেরিকায় (আজটেক অঞ্চলে) এসে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী ও খ্রিস্টীয় আদর্শের মিশ্রণ।
- রোডেরিক, দ্য লাস্ট অফ দ্য গথস (Roderick, the Last of the Goths, ১৮১৪): ভিসিগথিক স্পেনের পতন ও মুরদের আক্রমণের কাহিনি। পেনিনসুলার যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত।
এছাড়া ছোট কবিতা “After Blenheim”, “The Inchcape Rock”, “The Cataract of Lodore” এবং বিখ্যাত শিশুতোষ গল্প “The Story of the Three Bears” (The Doctor গ্রন্থে, ১৮৩৭) তাঁর রচনা বলে পরিচিত।
গদ্য সাহিত্য ও ঐতিহাসিক রচনা
সাউদের গদ্য তাঁর কাব্যের চেয়ে আজও বেশি পঠিত ও প্রশংসিত। প্রধান গদ্যকর্ম:
- The Life of Horatio, Lord Viscount Nelson (১৮১৩) — সবচেয়ে জনপ্রিয় জীবনী, এখনও ক্লাসিক।
- The Life of Wesley; and Rise and Progress of Methodism (১৮২০)
- History of Brazil (৩ খণ্ড, ১৮১০–১৮১৯)
- History of the Peninsular War (৩ খণ্ড, ১৮২৩–১৮৩২)
- Sir Thomas More; or, Colloquies on the Progress and Prospects of Society (১৮২৯)
- The Doctor (৭ খণ্ড, ১৮৩৪–১৮৪৭) — অদ্ভুত, র্যাবেলেসীয় স্টাইলের মিশ্র গ্রন্থ।
তিনি অসংখ্য অনুবাদ (Amadis of Gaul, Chronicle of the Cid), সম্পাদনা এবং Quarterly Review-এর জন্য প্রবন্ধ লেখেন।
রাজনৈতিক মতামতের বিবর্তন
যৌবনে তিনি ছিলেন উগ্র রিপাবলিকান ও ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক। পরবর্তীকালে (বিশেষ করে ১৮০০-এর দশক থেকে) তিনি রক্ষণশীল (Tory) হয়ে ওঠেন — গির্জা, রাজতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমর্থক। তিনি সংসদীয় সংস্কার, ক্যাথলিক মুক্তি ও র্যাডিক্যাল আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। তবে কারখানার শ্রমিকদের দুর্দশা ও শিশু শ্রমের বিরুদ্ধেও কিছু সমালোচনা করেছিলেন। এই “বিশ্বাসঘাতকতা”র জন্য তিনি সমসাময়িক র্যাডিক্যালদের তীব্র সমালোচনার শিকার হন।
শেষ জীবন, দ্বিতীয় বিবাহ ও মৃত্যু
এডিথ ১৮৩৭ সালে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মারা যান। দীর্ঘদিনের চিঠিপত্রের বন্ধু ক্যারোলিন অ্যান বোলস (Caroline Anne Bowles)-কে ৪ জুন ১৮৩৯ সালে বিয়ে করেন। কিন্তু সাউদের ডিমেনশিয়া (মানসিক অবক্ষয়) ততদিনে গুরুতর আকার নিয়েছিল। বিয়ের পর সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়।
২১ মার্চ ১৮৪৩ সালে লন্ডনে স্ট্রোক করে তাঁর মৃত্যু হয় (বয়স ৬৮)। তাঁকে কেসউইকের ক্রসথওয়েট চার্চের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়, যেখানে তিনি চল্লিশ বছর ধরে উপাসনা করতেন। সমাধির উপর ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখা শিলালিপি আছে।
উত্তরাধিকার
সাউদে তাঁর জীবদ্দশায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন — “complete man of letters” বলে কলরিজ তাঁকে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর পরীক্ষামূলক কাব্য পরবর্তী প্রজন্মকে (বায়রন, শেলি, ব্রাউনিং, টেনিসন) প্রভাবিত করেছে। তবে আজ তাঁর মহাকাব্যগুলো কম পঠিত হয়; বেশি পঠিত হয় তাঁর গদ্য — বিশেষ করে Life of Nelson এবং কিছু ছোট কবিতা।
আধুনিক সমালোচনায় তাঁকে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে — তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, প্রাচ্যবিদ্যা, ঐতিহাসিক চেতনা ও সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ পরিশ্রমী স্রষ্টা, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লিখে গেছেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে বহিরাগত পুরাণকথার এক অনন্য দ্বার উন্মোচন করেছেন।
রবার্ট সাউদে — একজন কবি যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশাল, দূরের জগতের কাহিনি নিয়ে, এবং সেই স্বপ্নকে কাব্য ও গদ্যে অমর করে রেখে গেছেন।

Aditya Bhowmik
মায়ের আঁচলে গণেশ
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ২৮/৯/২০২৬
সমুদ্রের নীল জলের মতো শান্ত এক স্বপ্নের জগৎ। চারদিকে ঢেউয়ের মৃদু দোলা, ছোট ছোট মাছের ছুটে চলা আর জলের বুকে ভেসে থাকা অসংখ্য বুদবুদের মাঝে যেন ভালোবাসার এক অপূর্ব ছবি আঁকা। সেই ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছেন মা, আর তাঁর কোলে ছোট্ট গণেশ।
গণেশের মাথায় মুকুট, তাতে শোভা পাচ্ছে ময়ূরের পালক। পরনে হলুদ বস্ত্র, শরীরে লাল আভা। কিন্তু দেবত্বের সব অলংকার ছাপিয়ে সবচেয়ে সুন্দর হয়ে উঠেছে মায়ের কোলে তাঁর নিশ্চিন্ত আশ্রয়।
মা তাঁকে দুহাতে আগলে রেখেছেন। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে যেন পৃথিবীর সমস্ত মমতা এসে জমেছে। আর গণেশও মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসায়। সে যেন জানে, পৃথিবীর যত ভয়, যত দুঃখ, যত অন্ধকারই আসুক না কেন, মায়ের ভালোবাসার কাছে তার কোনো শক্তিই নেই।
মায়ের হাতটি যখন আদর করে গণেশের গালে ছুঁয়ে যায়, তখন যেন চারপাশের সমুদ্রও কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হয়ে যায়। মাছেরা থেমে তাকায়, ঢেউগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, আর নীল জলের নীরবতা মিশে যায় সেই মায়াময় মুহূর্তে।
মা তখন মৃদুস্বরে বলেন,
“বাবা, পৃথিবী যত বড়ই হোক, যত দূরেই যাস, মনে রাখিস, মায়ের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয় নেই।”
গণেশ হয়তো মানুষের মতো করে কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু তার চোখের মায়া যেন বলে ওঠে,
“মা, তুমি পাশে থাকলে আমি সব পথ পাড়ি দিতে পারি।”
মায়ের কোলে সন্তানের জন্য কোনো রাজপ্রাসাদের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না সোনা রুপোর অলংকার, অসীম সম্পদ কিংবা পৃথিবীর সমস্ত সুখ। মায়ের বুকের কাছে যে শান্তি, তা পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না।
গণেশ দেবতা হয়েও মায়ের কাছে যেন সেই চিরচেনা ছোট্ট সন্তান। মায়ের আদরে তাঁর দেবত্বও যেন মমতার কাছে শিশুসুলভ হয়ে ওঠে। কারণ মা যত বড় দেবতারই মা হোন না কেন, সন্তানের কাছে তাঁর পরিচয় একটাই, মা।
এই ভালোবাসার কোনো বয়স নেই, কোনো সীমা নেই, কোনো শেষ নেই। সন্তান বড় হয়ে পৃথিবীর যত দূরেই চলে যাক, মায়ের হৃদয়ে সে থেকে যায় সেই ছোট্ট শিশুটিই।
আজও তাই মা ও গণেশের এই ভালোবাসার ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক হলো মা ও সন্তানের সম্পর্ক। মায়ের ভালোবাসার কাছে দেবত্বও যেন একদিন শিশুর মতো মাথা নত করে।

Purnendu Das
বিদ্যাসাগরে ডুব দিই – –
অনেক গভীরে ! অনেক অতলে !
যেখানে ঝিনুক মুক্তো থাকে না —
যেখানে থাকে শুধু বিদ্যা – –
বিদ্যাকে খুঁজে চলি আমরা হাতড়ে হাতড়ে
কত জন আনতে পারি ?
বর্ণ পরিচয়ের রাস্তা কেটে নব ভূমিষ্টর প্রাণ
নিয়ে আমরা পা ফেলি , পায়ে পায়ে —
বিদ্যার নাগাল পেলেও
বিচার করে দেখি কী ? এ সেই বিদ্যা কিনা – -!

Aditya Bhowmik
শরতের আকাশে মায়ের আগমন
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ২৬/৯/২০২৬
শরতের আকাশটা যেন সেদিন একটু বেশিই নীল ছিল। সাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছিল আপন মনে। মাঠের ধারে কাশফুল দুলছিল মৃদু বাতাসে। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধে প্রকৃতি যেন আপন মনে বলে উঠেছিল, মা আসছেন।
কয়েকদিন ধরেই পাড়ার পূজামণ্ডপে ব্যস্ততা। কোথাও আলপনা আঁকা হচ্ছে, কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। রঙিন আলোয় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্য। সন্ধ্যা নামলেই ঢাকের মৃদু শব্দ আর শঙ্খধ্বনিতে বাতাস ভরে উঠছে।
অবশেষে এল মহাসপ্তমী।
প্রতিমার সামনে ধূপ জ্বলল, প্রদীপ জ্বলে উঠল। শঙ্খের ধ্বনি আর ঢাকের তালে চারপাশ যেন এক মুহূর্তে পবিত্র হয়ে উঠল। দেবীর মুখের শান্ত, মমতাময় দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কত অপেক্ষার পর আবারও তিনি ফিরে এসেছেন আপন মানুষের মাঝে।
পূজার দিনগুলো যত এগিয়ে যেতে লাগল, ততই বদলে গেল চারপাশ। সন্ধ্যার আলোয় মণ্ডপ হয়ে উঠল আনন্দের মিলনস্থল। পরিচিত আর অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের আরাধনায় মেতে উঠল। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রদীপ, কারও কণ্ঠে প্রার্থনা।
সেই কয়েকটি দিনে যেন ভুলে যাওয়া হলো সব অভিমান, দূরত্ব আর ব্যস্ততা।
মায়ের আগমনে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, পৃথিবীটা আবারও একটু সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কিন্তু উৎসব তো চিরদিন থাকে না।
বিজয়ার দিন এসে গেল।
ঢাকের তালে তালে বিদায়ের সুর বাজতে লাগল। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে সবার চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। যে মাকে ঘিরে এত আনন্দ, এত আয়োজন, এত ভালোবাসা, তাঁকেই আবার বিদায় দিতে হবে।
নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের সময় আকাশটা যেন নীরব হয়ে গেল।
মনে হলো, মা চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ রেখে যাচ্ছেন মানুষের হৃদয়ে।
শরতের কাশফুল আবার দুলবে, শিউলি আবার ঝরবে, আকাশে আবার সাদা মেঘ ভাসবে। সময়ের স্রোতে আরও একটি পূজা স্মৃতির পাতায় চলে যাবে।
তবু অপেক্ষা থেকে যাবে।
আবার শরৎ আসবে।
আবার শিউলির গন্ধে ভরে উঠবে ভোর।
আবার ঢাক বাজবে, শঙ্খধ্বনি উঠবে, প্রদীপ জ্বলবে।
আর সবাই মিলে আবার বলবে,
“মা, এসো।
আবার এসো।
ভালোবাসা, শান্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে প্রতি শরতে ফিরে এসো।”
ঠিকানা চট্টগ্রাম বাংলাদেশ
সাহিত্য ও সাহিত্যিক
জেমস হগ (১৭৭০–১৮৩৫)
১. এট্রিকের মেষপালক
এট্রিকের পাহাড়ি ঢালে ভেড়ার পাল চরায় ছোট জেমস,
জুতো নেই পায়ে, ছেঁড়া জামা উড়ে হাওয়ায় অসহায়।
তবু তার বুকে বাজে প্রাচীন সুর, মায়ের গল্পের মায়া,
পরীরা ডাকে দূরের গ্লেন থেকে, রাতের তারায় তারায়।
ভেড়ার চোখে দেখে সে স্বপ্ন, ব্যালাডের অদৃশ্য স্রোত,
এট্রিক শেফার্ড জন্ম নেয় এভাবেই—নিঃশব্দে, নিভৃতে।
২. মায়ের ব্যালাড
মা গাইতেন পরীর গান, বুড়ো বাবার কথা শুনে,
“আমার বাবা কথা বলত পরীদের সঙ্গে চাঁদের আলোয়।”
ছোট জেমস শুনত চুপচাপ, ভেড়ার পালের মাঝে বসে,
সেই সুর তার রক্তে মিশে যেত—সীমান্তের চিরন্তন ক্ষোভে।
পরে সে লিখল সেই গান, নতুন করে জাগাল আগুন,
মায়ের কণ্ঠ এখনো বাজে হগের প্রতিটি ব্যালাডের তালে।
৩. কিলমেনির যাত্রা
কিলমেনি গেল উপত্যকায়, পবিত্র পায়ে নিঃশব্দে,
পরীর দেশে হারাল সে, আলো-আঁধারের মায়াজালে।
সেখানে দেখল যুদ্ধের ছায়া, ভবিষ্যতের কান্না-হাসি,
ফিরে এল সে বদলে যাওয়া—আত্মা জয়ী, দেহ অসহায়।
হগ লিখলেন এই কাহিনি, রানির জাগরণের গানে,
কিলমেনি আজো ফিরে আসে প্রতি রাতে এট্রিকের হাওয়ায়।
৪. ব্রাউনির আশীর্বাদ
ব্রাউনি এসেছিল বডসবেকে, রাতের অন্ধকারে চুপে,
গরিব ঘরে আগুন জ্বালাল, শিশুর পাশে রইল জেগে।
হগ শুনেছিলেন সেই কথা, লিখলেন রক্তাক্ত ইতিহাস,
ব্রাউনি হয়ে উঠল প্রতীক—বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝ।
সীমান্তের ঘরে আজো কেউ শোনে পায়ের শব্দ রাতে,
ব্রাউনি ফিরে আসে হগের গানে, চিরকালের সঙ্গী হয়ে।
৫. ভেড়ার পাল চরাতে চরাতে
ভেড়ার পাল চরাতে চরাতে শিখল সে অক্ষরের খেলা,
পাহাড়ের হাওয়া পড়ে দিল তার কানে প্রাচীন ব্যালাডের ঢেউ।
কোনো স্কুল নেই, শুধু আকাশ আর মেঘের খাতা,
তবু সে হয়ে উঠল কবি—স্বশিক্ষিত, স্বপ্নবাজ, একা।
হগ প্রমাণ করলেন, জ্ঞান আসে পাহাড়ি পথ দিয়ে,
মেষপালকের হাতেই জন্ম নেয় মহাকাব্যের প্রথম ছন্দ।
৬. স্কটের সঙ্গে সীমান্তে
ওয়াল্টার স্কট এসেছিলেন, খুঁজছিলেন হারানো গান,
হগ দিলেন পুরনো মানুষের মুখ থেকে শোনা সব কথা।
দুজনে মিলে জাগালেন সীমান্তের ঘুমন্ত আত্মাকে,
ব্যালাড হয়ে উঠল ইতিহাস, রক্ত আর প্রেমের সাক্ষী।
হগের কলমে নতুন সুর, স্কটের বইয়ে চিরস্থায়ী নাম,
একসঙ্গে তারা রক্ষা করলেন স্কটল্যান্ডের রহস্যময় জ্ঞান।
৭. গ্লেনের রহস্যময় সুর
গ্লেনের কুয়াশায় লুকিয়ে আছে হাজার বছরের গান,
পরী, ডাইনি, ভূত—সবাই গায় হগের লেখা নতুন তালে।
বাতাস বয়ে আনে পুরনো কথা, পাথর কথা বলে রাতে,
হগ শুনতেন সেই ফিসফিস, লিখে রাখতেন চিরকালের জন্য।
সীমান্তের প্রতিটি পাথর আজো গুনগুন করে তাঁর নাম,
রহস্য কখনো মরে না—শুধু রূপ বদলায় ব্যালাডের ছন্দে।
৮. এট্রিক শেফার্ডের জাগরণ
এট্রিক শেফার্ড জেগে উঠলেন যখন রানি ফিরে এল স্বপ্নে,
বার্ডদের প্রতিযোগিতায় তিনি গাইলেন কিলমেনির অমর গান।
মেষপালক থেকে হয়ে উঠলেন কবি, সবার চোখে বিস্ময়,
তবু তিনি রইলেন একাই—পাহাড়ের সঙ্গে, ভেড়ার সঙ্গে।
হগ দেখালেন, খ্যাতি আসে, কিন্তু মূল থাকে মাটিতে গেঁথে,
এট্রিক শেফার্ড চিরকালীন—মাটি আর আকাশের মাঝখানে।
৯. পরীর দেশের দূত
পরীরা পাঠাল দূত—একটি মেয়ে, একটি গান, একটি আলো,
হগ ধরলেন সেই আলো, লিখলেন “Kilmeny” নামে অমর কাব্য।
সে দেশে সময় থাকে না, শুধু প্রেম আর আত্মার নাচ,
ফিরে এসে সে হয়ে যায় ভিন্ন—চোখে দেখা যায় অদৃশ্য সত্য।
আজো যে কেউ পড়ে সেই কবিতা, তার মনে জাগে প্রশ্ন,
পরীর দেশ কি সত্যি? নাকি হগের কলমে জেগে ওঠা স্বপ্ন?
১০. অমর উত্তরাধিকার
হগ চলে গেছেন এট্রিকের মাটিতে, কিন্তু গান থেকে গেছে,
প্রতি রাতে এট্রিকের হাওয়া গায় তাঁর লেখা ব্যালাডের সুর।
মেষপালকের কবিতা আজো পড়ে বিশ্ব, বিস্মিত হয় মানুষ,
“কীভাবে একজন ভেড়া-চরানো মানুষ এত রহস্য জানল?”
উত্তর আছে শুধু এট্রিকে—পাহাড়, নদী, পুরনো মানুষের মুখে,
হগ অমর হয়ে আছেন—প্রতিটি স্কটিশ সীমান্ত ব্যালাডের প্রাণে।
জেমস হগ (১৭৭০–১৮৩৫): দ্য এট্রিক শেফার্ড – স্কটিশ সীমান্তের রহস্যময় ব্যালাডের সংগ্রাহক ও রচয়িতা
জেমস হগ স্কটল্যান্ডের সাহিত্য ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ ও অনন্য চরিত্রগুলোর একজন। তিনি ‘এট্রিক শেফার্ড’ (Ettrick Shepherd) নামে বিখ্যাত। একজন সাধারণ মেষপালক থেকে উঠে আসা এই কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও লোকসংগীত সংগ্রাহক স্কটিশ সীমান্ত (Scottish Borders)-এর প্রাচীন লোককথা, অতিপ্রাকৃত ব্যালাড ও রহস্যময় গল্পের জগতকে ঊনবিংশ শতাব্দীর রোমান্টিক সাহিত্যে নতুন করে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর রচনায় পরী, ব্রাউনি, ডাইনি, ভূত-প্রেত ও ধর্মীয় উন্মাদনার গভীর ছায়া মিশে আছে। সবচেয়ে বিখ্যাত তাঁর উপন্যাস The Private Memoirs and Confessions of a Justified Sinner (১৮২৪) এবং দীর্ঘ কাব্য The Queen’s Wake (১৮১৩)-এর অন্তর্গত অমর ব্যালাড “Kilmeny”।
শৈশব ও পরিবার: এট্রিক উপত্যকার কুঁড়েঘরে
জেমস হগ সম্ভবত ১৭৭০ সালের নভেম্বর মাসে স্কটল্যান্ডের সেলকirkশায়ারের এট্রিক (Ettrick) উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাপ্তিস্ম হয় ৯ ডিসেম্বর। তাঁর জন্মতারিখ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ নেই; কেউ কেউ বলেন ২৫ জানুয়ারি (রবার্ট বার্নসের মতো)। তাঁর বাবা রবার্ট হগ ছিলেন tenant farmer ও ভেড়া ব্যবসায়ী। মা মার্গারেট লেডল (née Laidlaw) ছিলেন অসাধারণ ব্যালাড গায়িকা ও গল্পকথক। মায়ের বাবা ‘Will o’ Phawhope’ সীমান্ত অঞ্চলে শেষ ব্যক্তি বলে কথিত যিনি পরীদের সঙ্গে কথা বলতেন।
হগ ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। শৈশবে পরিবারের আর্থিক দুর্দশা নেমে আসে। বাবা দেউলিয়া হয়ে যান যখন জেমস মাত্র ছয়-সাত বছরের। ফলে ছোট্ট জেমসকে গরু চরাতে হয়, পরে মেষপালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতে হয়। Willanslee, Douglas Burn, Blackhouse—বিভিন্ন খামারে তিনি কাজ করেছেন। পায়ে জুতো নেই, একটা ছেঁড়া জামা পরে পাহাড়ি পথে ভেড়ার পাল তাড়াতে তাড়াতে দিন কাটত।
শিক্ষা: ভেড়ার পাল চরাতে চরাতে অক্ষরজ্ঞান
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রায় নেই বললেই চলে। প্যারিশ স্কুলে মাত্র কয়েক মাস (কিছু সূত্রে ছয় মাস) পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সাত বছর বয়সের পর স্কুল ছেড়ে দিতে হয়। তবু তিনি নিজে নিজে শিখেছিলেন। মায়ের কাছ থেকে বাইবেল ও লোককথা শুনে শুনে, পরে নিয়োগকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে খবরের কাগজ ও ধর্মগ্রন্থ পেয়ে পড়তে শেখেন। Blackhouse-এর জেমস লেডল তাঁকে বই ধার দিতেন। ভেড়া চরাতে চরাতে তিনি কবিতা মুখস্থ করতেন, গান রচনা করতেন।
১৭৯৭ সালে রবার্ট বার্নসের Tam o’ Shanter শুনে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। তখন থেকেই তিনি নিজেকে কবি হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেন।
সাহিত্যে প্রবেশ: ওয়াল্টার স্কট ও সীমান্ত ব্যালাড
১৮০১ সালে স্যার ওয়াল্টার স্কট যখন Minstrelsy of the Scottish Border সংকলন করছিলেন, তখন হগ তাঁকে সীমান্তের প্রাচীন ব্যালাড সংগ্রহ করে দেন। এই কাজ তাঁর জীবন বদলে দেয়। স্কটের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে (যদিও পরে হগ স্কটের অননুমোদিত জীবনী লিখেছিলেন)।
১৮০৭ সালে প্রকাশিত হয় The Mountain Bard। ১৮১০ সালে The Forest Minstrel। এগুলোতে তিনি নিজের রচিত গান ও ব্যালাড দেন। অনেকগুলোতেই অতিপ্রাকৃত উপাদান—পরী, ভূত, ডাইনি।
সাফল্যের শিখর: The Queen’s Wake ও “Kilmeny”
১৮১৩ সালে প্রকাশিত The Queen’s Wake তাঁকে খ্যাতির শিখরে নিয়ে যায়। এটি একটি দীর্ঘ কাব্য, যেখানে কল্পিতভাবে মেরি, কুইন অব স্কটস ১৫৬১ সালে ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে বার্ডদের (কবিদের) প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। হগ নিজেকে একজন বার্ড হিসেবে উপস্থাপন করে বেশ কয়েকটি গল্প-ব্যালাড লেখেন।
সবচেয়ে বিখ্যাত “Kilmeny”। এতে একটি অত্যন্ত পবিত্র ও সুন্দরী মেয়ে কিলমেনি উপত্যকায় যায়। সে পরীর জগতে (fairy realm / spirit land) প্রবেশ করে—যেখানে প্রেম, আত্মা ও চিন্তার মিশ্র জগত। সেখানে সে ভবিষ্যতের দৃশ্য দেখে (নেপোলিয়নের যুদ্ধসহ), তারপর ফিরে আসে। কিন্তু সে আর আগের মতো থাকে না—আধ্যাত্মিকভাবে রূপান্তরিত। এই ব্যালাডে খ্রিস্টীয় পবিত্রতা ও সেল্টিক/স্কটিশ পরী-লোককথার অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। এটি আজও স্কটিশ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রহস্যময় ব্যালাড হিসেবে বিবেচিত।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য: “The Witch of Fife” ইত্যাদি।
প্রধান উপন্যাস: The Private Memoirs and Confessions of a Justified Sinner
১৮২৪ সালে বেনামে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি হগের সবচেয়ে বড় মাস্টারপিস। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, গথিক উপন্যাস এবং ধর্মীয় সমালোচনার অসাধারণ মিশ্রণ।
কাহিনির কেন্দ্রে রবার্ট রিংহিম—একজন ক্যালভিনবাদী ধর্মান্ধ যুবক। সে বিশ্বাস করে সে “elect” (ঈশ্বরের নির্বাচিত) এবং তাই যেকোনো পাপ করলেও তার পরিত্রাণ নিশ্চিত। এক রহস্যময় সঙ্গী Gil-Martin (যে হয়তো শয়তান, নয়তো রবার্টেরই মানসিক প্রতিচ্ছবি বা ডপেলগ্যাঙ্গার) তাকে খুন করতে প্ররোচিত করে। ভাই জর্জকে খুন করা হয়। আখ্যান দ্বৈত: একজন সম্পাদকের “বাস্তব” বিবরণী + রবার্টের নিজের “স্বীকারোক্তি” (যা একটি পুরনো কবর থেকে পাওয়া যায়)।
এতে অতিপ্রাকৃততা ও মনোবিজ্ঞানের সীমারেখা ঝাপসা—Gil-Martin রূপ বদলায়, সময় হারিয়ে যায়, রবার্ট নিজের অপরাধ দেখে আতঙ্কিত হয়। এটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, অবিশ্বস্ত বর্ণনাকারী (unreliable narrator) এবং মেটাফিকশনের অগ্রদূত। রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের Dr Jekyll and Mr Hyde-এর দ্বৈত সত্তার থিম এখান থেকে অনুপ্রাণিত।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা: The Three Perils of Man (১৮২২), The Three Perils of Woman (১৮২৩), Jacobite Relics (১৮১৯-২১, সংগীত সংকলন), The Brownie of Bodsbeck (১৮১৮, লোককথা ভিত্তিক)।
ব্যক্তিগত জীবন, খামার ও Noctes Ambrosianae
১৮১৫ সালে ডিউক অব বাক্লিউ তাঁকে আলট্রিভ (Altrive/Eltrive) খামার rent-free দেন। ১৮২০ সালে ২০ বছরের ছোট মার্গারেট ফিলিপসকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তান: জেমস রবার্ট (পুত্র), জেসি, ম্যাগি, হ্যারিয়েট প্রমুখ। আগে দুটি অবৈধ কন্যা (ক্যাথরিন ও এলিজাবেথ) ছিল।
তিনি সবসময় খামারি ছিলেন—ভেড়া পালন করতেন, আবার এডিনবার্গে সাহিত্যিক মহলে যেতেন। Blackwood’s Magazine-এর বিখ্যাত কল্পিত আলোচনা সিরিজ Noctes Ambrosianae-এ তিনি “Ettrick Shepherd” চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হন—আধা-গ্রাম্য, আধা-পণ্ডিত, রসিক। এতে তিনি বিখ্যাত হন, কিন্তু কখনো কখনো নিজেকে উপহাসের পাত্র মনে করতেন।
আর্থিকভাবে তিনি প্রায়ই সংকটে ছিলেন। Mount Benger খামার নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ঋণগ্রস্ত হন।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
জীবনের শেষ দিকে তিনি Altrive Tales (১৮৩২), A Queer Book (১৮৩২) প্রকাশ করেন। ১৮৩৫ সালের ২১ নভেম্বর এট্রিক/ইয়্যারো অঞ্চলে আলট্রিভে তিনি মারা যান। বয়স প্রায় ৬৫ বছর।
উত্তরাধিকার: আধুনিক পুনর্মূল্যায়ন
জীবদ্দশায় তিনি জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু “কৃষক কবি” হিসেবে কিছুটা অবজ্ঞার শিকারও হয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে তাঁর পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। আজ Confessions of a Justified Sinner স্কটিশ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত—গথিক, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ও ধর্মীয় সমালোচনার অনন্য নিদর্শন।
তিনি স্কটিশ সীমান্তের রহস্যময় ব্যালাড ও লোককথাকে সংরক্ষণ ও নতুন করে রচনা করে রোমান্টিক যুগে এক অমূল্য অবদান রেখেছেন। তাঁর রচনায় প্রকৃতি, অতিপ্রাকৃত, ধর্মীয় উন্মাদনা ও মানব মনের অন্ধকার দিকের গভীর অনুসন্ধান আছে। আজও এট্রিক উপত্যকায় তাঁকে স্মরণ করা হয়।
জেমস হগ প্রমাণ করেছেন যে, একজন সাধারণ মেষপালকও বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে থাকতে পারেন—যদি তাঁর অন্তরে সীমান্তের প্রাচীন রহস্যের সুর বাজে।

Aditya Bhowmik
শরতের আকাশে মায়ের আগমন
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ২৬/৯/২০২৬
শরতের আকাশটা যেন সেদিন একটু বেশিই নীল ছিল। সাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছিল আপন মনে। মাঠের ধারে কাশফুল দুলছিল মৃদু বাতাসে। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধে প্রকৃতি যেন আপন মনে বলে উঠেছিল, মা আসছেন।
কয়েকদিন ধরেই পাড়ার পূজামণ্ডপে ব্যস্ততা। কোথাও আলপনা আঁকা হচ্ছে, কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। রঙিন আলোয় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্য। সন্ধ্যা নামলেই ঢাকের মৃদু শব্দ আর শঙ্খধ্বনিতে বাতাস ভরে উঠছে।
অবশেষে এল মহাসপ্তমী।
প্রতিমার সামনে ধূপ জ্বলল, প্রদীপ জ্বলে উঠল। শঙ্খের ধ্বনি আর ঢাকের তালে চারপাশ যেন এক মুহূর্তে পবিত্র হয়ে উঠল। দেবীর মুখের শান্ত, মমতাময় দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কত অপেক্ষার পর আবারও তিনি ফিরে এসেছেন আপন মানুষের মাঝে।
পূজার দিনগুলো যত এগিয়ে যেতে লাগল, ততই বদলে গেল চারপাশ। সন্ধ্যার আলোয় মণ্ডপ হয়ে উঠল আনন্দের মিলনস্থল। পরিচিত আর অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের আরাধনায় মেতে উঠল। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রদীপ, কারও কণ্ঠে প্রার্থনা।
সেই কয়েকটি দিনে যেন ভুলে যাওয়া হলো সব অভিমান, দূরত্ব আর ব্যস্ততা।
মায়ের আগমনে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, পৃথিবীটা আবারও একটু সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কিন্তু উৎসব তো চিরদিন থাকে না।
বিজয়ার দিন এসে গেল।
ঢাকের তালে তালে বিদায়ের সুর বাজতে লাগল। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে সবার চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। যে মাকে ঘিরে এত আনন্দ, এত আয়োজন, এত ভালোবাসা, তাঁকেই আবার বিদায় দিতে হবে।
নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের সময় আকাশটা যেন নীরব হয়ে গেল।
মনে হলো, মা চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ রেখে যাচ্ছেন মানুষের হৃদয়ে।
শরতের কাশফুল আবার দুলবে, শিউলি আবার ঝরবে, আকাশে আবার সাদা মেঘ ভাসবে। সময়ের স্রোতে আরও একটি পূজা স্মৃতির পাতায় চলে যাবে।
তবু অপেক্ষা থেকে যাবে।
আবার শরৎ আসবে।
আবার শিউলির গন্ধে ভরে উঠবে ভোর।
আবার ঢাক বাজবে, শঙ্খধ্বনি উঠবে, প্রদীপ জ্বলবে।
আর সবাই মিলে আবার বলবে,
“মা, এসো।
আবার এসো।
ভালোবাসা, শান্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে প্রতি শরতে ফিরে এসো।”
ঠিকানা চট্টগ্রাম বাংলাদেশ
Aditya Bhowmik
পুজো আসছে
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ২৬/৯/২০২৬
পুজো আসছে, পুজো আসছে, বাজছে আগমনী সুর,
শরতের নীল আকাশ জুড়ে আনন্দ অপরূপ ভরপুর।
কাশফুল দোলে মৃদু হাওয়ায়, শিউলির গন্ধ ভাসে,
মায়ের আগমনের বারতা আজ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।
ঢাকের তালে জেগে উঠবে বাংলার প্রতিটি প্রাণ,
আলোর মালায় সেজে উঠবে মন্দির, পথ আর অঙ্গন।
মা দুর্গা আসবেন ফিরে আপন সন্তানের মাঝে,
ভক্তির আলো জ্বালবে সবাই ভালোবাসার সাজে।
অপেক্ষার এই প্রহর শেষে আসবে সেই শুভক্ষণ,
১৭/১০/২০২৬ মহাসপ্তমীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয়া দুর্গোৎসবের পবিত্র আয়োজন।
মায়ের চরণে রাখব সবাই হৃদয়ের যত আশা,
দুঃখ ভুলে ভরে উঠুক পৃথিবী ভালোবাসায়।
এসো মা দুর্গা, এসো আবার,
আনন্দে ভরুক ঘর,
তোমার আশীর্বাদে মুছে যাক
জীবনের সকল অন্ধকার।
ঠিকানা চট্টগ্রাম বাংলাদেশ

Edith Mirrielees 1929
Writing Fiction By Edith Mirrielees 1929
- গল্প শুরু হয় দেখার ক্ষমতা থেকে — চারপাশের সাধারণ ঘটনাতেও গল্পের বীজ লুকিয়ে থাকে।
- ছোট ঘটনা মানেই ছোট গল্প নয় — একটি ক্ষুদ্র ঘটনাও গভীর মানবিক অর্থ বহন করতে পারে।
- লেখকের প্রথম কাজ পর্যবেক্ষণ করা — মানুষ কী বলে তার চেয়ে কী করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
- গল্পের বিষয় দূরে খুঁজতে হয় না — নিজের পরিচিত জীবন থেকেই শক্তিশালী গল্প জন্মাতে পারে।
- একটি গল্পের কেন্দ্রে একটি স্পষ্ট আগ্রহ থাকা দরকার — অতিরিক্ত বিষয় গল্পকে দুর্বল করে।
- চরিত্র গল্পকে জীবন্ত করে — ঘটনা তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন তা কারও জীবনে প্রভাব ফেলে।
- চরিত্রকে শুধু বর্ণনা করবেন না — তার কাজের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করুন।
- একটি ছোট আচরণ অনেক কথা বলে — মানুষের স্বভাব কখনও একটি অঙ্গভঙ্গিতেই ধরা পড়ে।
- বাস্তব মানুষকে হুবহু নকল করলেই ভালো চরিত্র তৈরি হয় না — বাস্তবতা থেকে উপাদান নিয়ে নতুন মানুষ সৃষ্টি করতে হয়।
- চরিত্রের ইচ্ছাই গল্পকে সামনে ঠেলে দেয় — সে কিছু চাইবে, আর কিছু তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
- সংঘাত গল্পের শক্তি — সব গল্পে যুদ্ধ দরকার নেই; মানসিক দ্বন্দ্বও শক্তিশালী সংঘাত হতে পারে।
- ঘটনার কারণ থাকা জরুরি — একটি ঘটনা যেন স্বাভাবিকভাবে পরের ঘটনাকে জন্ম দেয়।
- কাকতালীয় ঘটনা খুব বেশি ব্যবহার করা বিপজ্জনক — এতে গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
- প্লটকে জটিল করাই দক্ষতা নয় — সহজ কিন্তু অর্থপূর্ণ নির্মাণ অনেক বেশি কার্যকর।
- গল্পের প্রতিটি অংশের কাজ থাকা উচিত — অপ্রয়োজনীয় অংশ পাঠকের মনোযোগ নষ্ট করে।
- শুরুর অংশে দেরি করবেন না — যত দ্রুত সম্ভব গল্পের গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির কাছে পৌঁছান।
- প্রথম বাক্য দরজা খুলে দেয় — সেটি পাঠকের মনে প্রশ্ন, কৌতূহল বা প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।
- পটভূমি গল্পকে সাহায্য করবে, দখল করবে না — পরিবেশের বর্ণনা গল্পের গতিকে থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
- স্থান শুধু ঠিকানা নয় — একটি ঘর, রাস্তা বা শহর চরিত্রের অনুভূতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
- সময়ের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ — গল্পের জন্য সবচেয়ে অর্থপূর্ণ মুহূর্তটিকেই ধরুন।
- সবকিছু শুরু থেকে বলতে হয় না — জীবনের মাঝখান থেকেও গল্প শুরু করা যায়।
- পাঠককে বিশ্বাস করুন — প্রতিটি বিষয় ব্যাখ্যা করে দিলে গল্পের আনন্দ কমে যায়।
- ইঙ্গিত অনেক সময় সরাসরি ব্যাখ্যার চেয়ে শক্তিশালী — পাঠককে কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ দিন।
- সংলাপ বাস্তব কথোপকথনের হুবহু কপি নয় — গল্পে কথোপকথনকে সংক্ষিপ্ত ও উদ্দেশ্যমূলক হতে হয়।
- প্রতিটি চরিত্রের কথা বলার ধরন আলাদা হওয়া উচিত — একই ভাষায় সবাই কথা বললে তারা কৃত্রিম লাগে।
- সংলাপের আড়ালেও গল্প থাকে — চরিত্র যা বলছে না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
- অতিরিক্ত ব্যাখ্যা সংলাপকে দুর্বল করে — পাঠককে নিজে বুঝতে দিন।
- দৃষ্টিকোণ নির্বাচন একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত — গল্পটি কে দেখছে, সেটি নির্ধারণ করে পাঠক কী জানতে পারবে।
- বর্ণনাকারী সবকিছু জানতেই হবে এমন নয় — সীমিত জ্ঞান অনেক সময় গল্পে রহস্য সৃষ্টি করে।
- দৃষ্টিকোণ বদলালে পাঠকের অভিজ্ঞতাও বদলে যায় — একই ঘটনা দুই চরিত্রের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
- শব্দের সঠিকতা সৌন্দর্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — সুন্দর শোনায় কিন্তু অর্থে দুর্বল এমন শব্দ এড়ানো ভালো।
- সংযত ভাষা নতুন লেখকের ভালো বন্ধু — Mirrielees বিশেষভাবে lean, terse বা মেদহীন লেখার দিকে অনুশীলনের কথা বলেছেন। dokumen.pub
- অতিরিক্ত অলংকার গল্পকে ভারী করতে পারে — প্রতিটি উপমা বা বিশেষণ সত্যিই দরকার কি না পরীক্ষা করুন।
- প্রিয় বাক্যও বাদ দিতে হতে পারে — কোনো বাক্য সুন্দর হলেও গল্পের কাজে না লাগলে তাকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।
- লেখকের আত্মমুগ্ধতা সম্পাদনার শত্রু — নিজের লেখা থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শেখা জরুরি।
- প্রথম খসড়া শেষ লেখা নয় — আসল কারিগরি কাজ অনেক সময় সংশোধনের সময় শুরু হয়।
- প্রথম খসড়ায় স্বাধীনভাবে লিখুন — তখন নিখুঁত হওয়ার চেয়ে গল্পটি বের করে আনা বেশি জরুরি।
- সংশোধনের সময় নির্মম হন — দুর্বল শব্দ, অপ্রয়োজনীয় বাক্য ও পুনরাবৃত্তি কেটে দিন।
- প্রতিটি শব্দের কাজ পরীক্ষা করুন — ছোটগল্পে অপ্রয়োজনীয় শব্দের জায়গা খুব কম।
- বাক্যের ছন্দও অর্থ বহন করে — ছোট, দীর্ঘ ও মাঝারি বাক্যের পরিবর্তন গল্পের গতি তৈরি করতে পারে।
- প্যারাগ্রাফ পাঠের গতি নিয়ন্ত্রণ করে — কোথায় বিরতি হবে, সেটিও গল্প বলার অংশ।
- চূড়ান্ত মুহূর্ত প্রস্তুতি ছাড়া আসা উচিত নয় — আগের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে তার দিকে নিয়ে যাবে।
- শেষ মানেই সব প্রশ্নের উত্তর নয় — কখনও একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত পূর্ণ ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি স্মরণীয়।
- একটি ভালো সমাপ্তি আগের ঘটনাগুলোকে নতুন অর্থ দিতে পারে — পাঠক শেষ লাইনের পরেও গল্পটি ভাবতে থাকে।
- একটি গল্পের সামগ্রিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ — বিচ্ছিন্ন সুন্দর অংশের চেয়ে পুরো গল্পের ঐক্য বেশি মূল্যবান।
- পাঠ করা লেখার প্রশিক্ষণ — অন্য গল্প কীভাবে তৈরি হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে নিজের কারিগরি শক্ত হয়।
- শুধু গল্প পড়বেন না, লেখকের সিদ্ধান্ত পড়ুন — কোথায় তিনি দৃশ্য শুরু করলেন, কী বাদ দিলেন, কীভাবে শেষ করলেন—এসব লক্ষ্য করুন।
- নিয়ম শেখা দরকার, কিন্তু নিয়মই সাহিত্য নয় — কৌশল লেখককে সাহায্য করে; কল্পনাকে প্রতিস্থাপন করে না।
- লেখার দক্ষতা চর্চায় তৈরি হয় — প্রতিভার অপেক্ষা করার চেয়ে নিয়মিত লেখা বেশি ফলপ্রসূ।
- ভালো ছোটগল্প কম কথায় বেশি অনুভব করায় — লেখকের লক্ষ্য সবকিছু বলা নয়; এমনভাবে নির্বাচন করা, যাতে অল্প কথার পেছনে বৃহৎ জীবন অনুভূত হয়।

সাহিত্য ও সাহিত্যিক
রবার্ট ট্যানাহিল (১৭৭৪–১৮১০)
১. তাঁতির তাঁতে কবিতা
তাঁতের সুতো বুনতে বুনতে মনে মনে গান বোনে,
পেইজলির তাঁতি কবি — স্বপ্নের রঙে রঙিন করে জীবন।
হাতে তাঁত, চোখে স্বপ্ন, বুকে প্রকৃতির সুর,
সুতোর মাঝে লুকিয়ে থাকে কবিতার অমর অক্ষর।
শ্রমের পাশে সৃজনশীলতার এই মিলন,
ট্যানাহিলের তাঁত হয়ে ওঠে কবিতার মন্দির।
২. গ্লেনিফার ব্রে-এর ডাক
গ্লেনিফার ব্রে-এর পাহাড়ি বাতাস বয়ে যায় মৃদু সুরে,
ট্যানাহিলের কলমে জেগে ওঠে সবুজ বনের ছবি।
ঝরনার কলকল, পাহাড়ের ছায়া, ফুলের হাসি,
সব মিলিয়ে তিনি গেয়ে ওঠেন প্রকৃতির অপূর্ব গান।
পেইজলির এই ব্রে তাঁর হৃদয়ের স্থায়ী ঠিকানা,
প্রতিটি পঙ্ক্তিতে বাজে স্কটল্যান্ডের চিরন্তন সুর।
৩. বালকুইডারের ব্রে
বালকুইডারের ব্রে-এ লুকিয়ে আছে প্রেমের গল্প,
ট্যানাহিল গেয়েছেন সেই পাহাড়ি সৌন্দর্যের কথা।
“ওয়াইল্ড মাউন্টেন থাইম”-এর সুরে মিশে গেছে তাঁর গান,
লাসি যাও কি না — প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয় হৃদয়।
ব্রে-এর ঢালু পথে হেঁটে যেন শুনতে পাই তাঁর কণ্ঠ,
প্রকৃতি আর প্রেমের এই মিলন চিরকাল অমর হয়ে থাক।
৪. ক্রেইগিলির সুন্দর বন
“তু বনি উড অব ক্রেইগিলি” — গেয়ে উঠেছিলেন তিনি,
সেই বনের সবুজ ছায়ায় লুকিয়ে আছে অপূর্ব সৌন্দর্য।
পাতার মর্মর, পাখির ডাক, বাতাসের নরম স্পর্শ,
ট্যানাহিলের কবিতায় সব হয়ে ওঠে জীবন্ত চিত্র।
“ওয়াল্টজিং ম্যাটিল্ডা”-র সুরে আজও বাজে সেই গান,
ক্রেইগিলির বন চিরকাল থেকে যায় তাঁর অমর স্মৃতিতে।
৫. মায়ের প্রতি ভালোবাসা
পিতার মৃত্যুর পর মায়ের একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠলেন,
“দ্য ফিলিয়াল ভাউ” কবিতায় লিখলেন সেই দায়িত্বের গান।
তাঁত বুনে, কবিতা লিখে, পরিবারের ভার বহন করে,
ট্যানাহিল দেখালেন — শ্রম আর ভালোবাসা একসূত্রে বাঁধা।
মায়ের জন্য এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ তাঁর কবিতায় হয়ে উঠল অমর,
পারিবারিক দায়িত্বের এই গান আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
৬. বার্নস ক্লাবের আলো
পেইজলির সান ট্যাভার্নে বসে গড়ে তুললেন বার্নস ক্লাব,
রবার্ট বার্নসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখলেন অমর ওড।
সাহিত্যিক বন্ধুদের সাথে আলোচনায় জ্বলে উঠত তাঁর মন,
তবু তিনি ছিলেন সাধারণ তাঁতি — কবিতার আলোয় উদ্ভাসিত।
বার্নসের ছায়ায় নয়, নিজস্ব পথে হেঁটেছিলেন তিনি,
স্কটিশ কবিতার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে গেছেন চিরকাল।
৭. যুদ্ধের ছায়ায় প্রকৃতি
নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের ছায়ায় তাঁতশিল্পে নেমে আসে মন্দা,
তবু ট্যানাহিল গেয়ে চলেন প্রকৃতির অপূর্ব গান।
দারিদ্র্যের যন্ত্রণা আর যুদ্ধের বেদনা সত্ত্বেও,
তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে ব্রে-এর সবুজ স্বপ্ন।
প্রকৃতি ছিল তাঁর আশ্রয়, সান্ত্বনা আর অনুপ্রেরণা,
কঠিন সময়েও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সৌন্দর্যের আলো।
৮. জেসি — দানব্লেনের ফুল
“জেসি, দ্য ফ্লাওয়ার অব দানব্লেন” — গেয়ে উঠেছিলেন তিনি,
প্রেম আর প্রকৃতির মিলনে তৈরি হয়েছে এই অমর গান।
দানব্লেনের ফুলের মতোই তাঁর কবিতা সুগন্ধ ছড়ায়,
প্রকৃতির কোলে বসে লেখা প্রতিটি পঙ্ক্তি হয়ে ওঠে জীবন্ত।
প্রেমিকার সৌন্দর্য আর প্রকৃতির সৌন্দর্য এক হয়ে যায়,
ট্যানাহিলের গানে চিরকাল বাজে এই মধুর মিলনের সুর।
৯. শেষ দিনের নীরবতা
দ্বিতীয় সংকলন প্রত্যাখ্যানের বেদনায় পুড়িয়ে ফেললেন পাণ্ডুলিপি,
তবু তাঁর গানগুলো রয়ে গেল চিরকালের জন্য।
পেইজলি ক্যানালের স্রোতে ডুবে গেল সেই সংক্ষিপ্ত জীবন,
কিন্তু প্রকৃতির গানগুলো হয়ে উঠল অমর ও অবিনশ্বর।
হতাশার অন্ধকারেও তিনি রেখে গেছেন আলোর বার্তা,
তাঁর কবিতা আজও জ্বলে — প্রকৃতির অপূর্ব সাক্ষী হয়ে।
১০. অমর উত্তরাধিকার
ট্যানাহিল মরেননি — তাঁর গান আজও গায় ট্যানাহিল উইভার্স,
“ওয়াইল্ড মাউন্টেন থাইম”, “ক্রেইগিলির বন” বাজে বিশ্বজুড়ে।
পেইজলির ব্রে-এ আজও শোনা যায় তাঁর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি,
প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তিনি করে গেছেন চিরকালের সম্পদ।
তাঁতি কবির এই উত্তরাধিকার শুধু স্কটল্যান্ডের নয়,
বিশ্বের প্রতিটি প্রকৃতিপ্রেমীর হৃদয়ে বাজে তাঁর অমর সুর।
রবার্ট ট্যানাহিল (১৭৭৪–১৮১০): স্কটল্যান্ডের “তাঁতি কবি” যিনি রচনা করেছিলেন অপূর্ব প্রকৃতি-গান
রবার্ট ট্যানাহিল স্কটল্যান্ডের শ্রমজীবী কবিদের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। তিনি “Weaver Poet” বা “তাঁতি কবি” নামে পরিচিত। রবার্ট বার্নসের সমসাময়িক হয়েও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার — একজন সাধারণ তাঁতশিল্পী যিনি হাতের তাঁতে সুতো বুনতে বুনতে মনে মনে কবিতা ও গান রচনা করতেন। তাঁর রচনায় স্কটল্যান্ডের প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য, পাহাড়ি ব্রে (braes), গভীর গ্লেন, ঝরনার ধার (burnside), বনভূমি ও গ্রামীণ জীবনের মধুর চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি শুধু কবি নন, সুরকার ও সংগীতপ্রেমীও ছিলেন। তাঁর অনেক গান আজও লোকসংগীতের অংশ হয়ে আছে — যেমন “Wild Mountain Thyme” (“Will Ye Go, Lassie, Go?”)-এর ভিত্তি তাঁর “The Braes of Balquhidder”। সংক্ষিপ্ত জীবন (মাত্র ৩৫ বছর) সত্ত্বেও তিনি স্কটিশ সাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করে গেছেন।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
রবার্ট ট্যানাহিল জন্মগ্রহণ করেন ৩ জুন ১৭৭৪ সালে স্কটল্যান্ডের রেনফ্রুশায়ারের পেইজলি শহরের ক্যাসল স্ট্রিটে। পিতা জেমস ট্যানাহিল ছিলেন সিল্ক গজ (silk gauze) তাঁতি — একজন দক্ষ কারিগর। মাতা জ্যানেট (জন্মনাম পোলক)। পরিবার শীঘ্রই পেইজলির কুইন স্ট্রিটের একটি নতুন নির্মিত কুটিরে চলে যায়, যেখানে বাড়ি ও তাঁতের কর্মশালা একসঙ্গে ছিল। তিনি ছিলেন বড় পরিবারের সন্তান (সূত্র অনুসারে ৭ থেকে ৯ ভাইবোনের মধ্যে একজন)। শৈশবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের প্রভাবে তাঁতশিল্পে সংকট দেখা দেয়।
শৈশব, শিক্ষা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা
ট্যানাহিলের শৈশব ছিল সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারের মতো। তিনি খুবই সূক্ষ্ম স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন এবং ডান পায়ে সামান্য বিকৃতির কারণে খোঁড়াতেন। এই শারীরিক দুর্বলতা তাঁর সারা জীবন সঙ্গী ছিল। ১২ বছর বয়সে স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি পিতার কাছে হ্যান্ডলুম তাঁতির শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। অবসর সময়ে কবিতা পড়তেন, সংগীত শিখতেন এবং নিজে লিখতে শুরু করেন। তাঁতের পাশে একটি ছোট বোর্ড রেখে সুতো বুনতে বুনতে কবিতার পঙ্ক্তি মনে মনে গড়ে তুলতেন — এটি তাঁর সৃজনশীলতার অনন্য পদ্ধতি ছিল।
তাঁতি জীবন ও বোল্টনের অভিজ্ঞতা
শিক্ষানবিশি শেষ করে ট্যানাহিল পেইজলিতে তাঁতি হিসেবে পূর্ণকালীন কাজ শুরু করেন। জীবিকা ছিল কঠিন — হাতে তাঁত বুনে দিন কাটাতে হতো। ১৭৯০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের বোল্টনে কিছুদিন কাজ করতে যান (সম্ভবত অর্থনৈতিক সুযোগের জন্য)। কিন্তু ১৮০০/১৮০১ সালে পিতার অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে পেইজলিতে ফিরে আসেন। তিনি মাকে ভরণপোষণ করতেন; ভাই হিউ বিয়ে করার পর মায়ের একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেন। এই দায়িত্ববোধ তাঁর “The Filial Vow” (১৮০২) কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের সময় তাঁতশিল্পে মন্দা দেখা দেয়, খাদ্যের দাম বাড়ে (১৭৯৯–১৮০০-এর দুর্ভিক্ষ)। এই সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর কিছু রচনায় দারিদ্র্য ও যুদ্ধের যন্ত্রণার ছায়া ফেলেছে। তবু তিনি তাঁতের পাশেই কবিতা লিখে চলতেন — শ্রম ও সৃজনশীলতার অপূর্ব মিলন।
সাহিত্যিক জাগরণ ও বার্নসের প্রভাব
কবিতা ও সংগীতে ট্যানাহিলের আগ্রহ গভীর হয় যখন তিনি সুরকার রবার্ট আর্কিবল্ড স্মিথের সাথে পরিচিত হন। স্মিথ তাঁর স্কটস গানগুলোতে সুর দেন। রবার্ট বার্নসের প্রভাব তাঁর ওপর স্পষ্ট — তিনি বার্নস অ্যানিভার্সারির জন্য ওড লিখতেন। একটি বিখ্যাত ওডে স্কটল্যান্ডের জিনিয়াস দেবতাদের কাছে জাতীয় কবির জন্য প্রার্থনা করে, আর বার্নসের জন্ম হয়। তবে ট্যানাহিল বার্নসের অনুকরণকারী নন; তিনি নিজস্ব শৈলী গড়ে তোলেন — আরও লিরিক্যাল, সরল এবং প্রকৃতি-কেন্দ্রিক।
১৮০৩ সালে তিনি পেইজলি বার্নস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন (সান ট্যাভার্নে) এবং সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেমস হগ-এর মতো লেখকরাও এতে যোগ দিতেন। তাঁর রচনা The Scots Magazine-এ প্রকাশিত হতো। তিনি ইংরেজি ও স্কটস উভয় ভাষায় লিখতেন — গান, ওড, টেল, ফেবল, এপিটাফ ও ভার্স এপিসল।
প্রধান রচনা: অপূর্ব প্রকৃতি-গান
ট্যানাহিলের সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর প্রকৃতি-গান। তিনি পেইজলির আশেপাশের গ্লেনিফার ব্রে (Gleniffer Braes), বালকুইডারের ব্রে, ক্রেইগিলি উড, লেভেন সাইডের ফুল ইত্যাদি স্থানের সৌন্দর্যকে অমর করে রেখেছেন। তাঁর গানগুলো ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ সুর (জিগ, রিল) এর সাথে মিশে গেছে — শব্দ ও সংগীতের অপূর্ব সমন্বয়।
উল্লেখযোগ্য রচনা:
- “The Braes of Balquhidder”: সবচেয়ে বিখ্যাত। বালকুইডারের পাহাড়ি প্রকৃতি, ঝরনা ও প্রেমের গল্প। এটি “Wild Mountain Thyme” / “Will Ye Go, Lassie, Go?” গানের ভিত্তি হয়েছে — আজও বিশ্বজুড়ে গাওয়া হয়।
- “Thou Bonnie Wood of Craigielea”: ক্রেইগিলির সুন্দর বনের বর্ণনা। এর সুর “Waltzing Matilda”-এর ভিত্তি।
- “Jessie, the Flower o’ Dunblane”: প্রেম ও প্রকৃতির মিলন।
- “The Flower o’ Leven Side”: লেভেন নদীর ধারের ফুল ও প্রকৃতি।
- “The Soldier’s Return” (১৮০৭): দুই অঙ্কের স্কটিশ ইন্টারলুড — যুদ্ধফেরত সৈনিকের গল্প, ডায়ালেক্ট কাপলেটে।
- অন্যান্য: বার্নস অ্যানিভার্সারির ওড, “The Soldier’s Adieu” (যা “Farewell to Nova Scotia”-এর ভিত্তি), গ্লেনিফার ব্রে-এর প্রকৃতি-বর্ণনামূলক গান।
তাঁর শৈলী লিরিক্যাল, সরল ও সংগীতময়। প্রকৃতিকে তিনি শুধু বর্ণনা করেননি — অনুভব করিয়েছেন। দুষ্টু গ্লেন, ঝরনার কলকল, বনের ছায়া, পাহাড়ের বাতাস — সব মিলিয়ে “গর্জিয়াস নেচার সংস”। পাশাপাশি দারিদ্র্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার ছোঁয়াও আছে। ১৮০৭ সালে তাঁর সংকলন The Soldier’s Return, a Scottish Interlude in Two Acts, with Other Poems and Songs সাবস্ক্রিপশনে প্রকাশিত হয় (৯০০ কপি, দ্রুত বিক্রি)।
ব্যক্তিগত সংগ্রাম, স্বাস্থ্য ও শেষ দিন
ট্যানাহিলের জীবন ছিল কঠিন। সূক্ষ্ম স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সৃজনশীলতার চাপ তাঁকে যন্ত্রণা দিত। ১৮০৭-এর সংকলনের সাফল্যের পর তিনি আরও বড় সংকলন প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গ্রিনক ও এডিনবার্গের প্রকাশকরা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে গভীর হতাশা নেমে আসে। তিনি অনেক পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলেন।
স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে (সম্ভবত যক্ষ্মা)। ১৭ মে ১৮১০ সালের রাতে (মৃত্যুর ১৭ দিন আগে ৩৬তম জন্মদিন) তিনি পেইজলি ক্যানালের নিচের কালভার্টেড স্ট্রিম (ক্যানড্রেন বার্ন)-এ ডুবে মারা যান। জ্যাকেট ও ঘড়ি টানেলের মুখে রেখে যান। ঐতিহ্যগতভাবে একে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালে পেইজলি মিউজিয়াম ও ড. মোয়ারা হ্যানসেনের (ওপেন ইউনিভার্সিটি) গবেষণায় বলা হয়েছে — এটি দুর্ঘটনাজনিত। যক্ষ্মায় ভুগছিলেন, ডিলিরিয়ামের (অসংলগ্ন প্রলাপ) পর্ব ছিল; সম্ভবত শরীর ঠান্ডা করতে স্রোতে নেমেছিলেন এবং ডুবে যান।
আত্মহত্যার সন্দেহে তাঁকে চিহ্নহীন কবরে সমাহিত করা হয় ওয়েস্ট রিলিফ চার্চের কবরস্থানে (বর্তমান ক্যাসেলহেড সিমেট্রি)।
উত্তরাধিকার ও আধুনিক মূল্যায়ন
ট্যানাহিলের গান তাঁর জীবদ্দশাতেই জনপ্রিয় হয় — চ্যাপবুক ও অ্যান্থোলজিতে ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর ১৮১৫, ১৮১৭, ১৮২২ সালে সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৮৬৬ সালে জনসাধারণের চাঁদায় গ্রানাইট স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। ১৮৭৪ সালে জন্মশতবার্ষিকীতে ১৫,০০০ মানুষ গ্লেনিফার ব্রে-এ মিছিল করে। ১৮৭৬–১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ব্রে-এ বার্ষিক কনসার্ট হয়। ১৮৮৩ সালে ডেভিড ওয়াটসন স্টিভেনসনের তৈরি মূর্তি পেইজলি অ্যাবে গ্রাউন্ডে স্থাপিত হয়। স্কট মনুমেন্টে (এডিনবার্গ) তাঁর প্রতিকৃতি আছে। বার্নস ক্লাব এখনো তাঁর পুরনো কুটিরে মিলিত হয়।
আধুনিককালে তাঁর মূল্যায়ন নতুন করে হয়েছে। “সেন্টিমেন্টাল” বলে খাটো করা হতো, কিন্তু ফ্রেড ফ্রিম্যানের The Complete Songs of Robert Tannahill (২০০৬–২০২৪, পাঁচটি অ্যালবাম) প্রকল্প তাঁকে স্কটিশ লিরিক্যাল ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০২৪ সালে ২৫০তম জন্মবার্ষিকীতে ব্যাপক উদযাপন হয়। স্কটিশ ফোক ব্যান্ড Tannahill Weavers (১৯৭৬ থেকে) তাঁর নামে।
ট্যানাহিল শ্রমজীবী মানুষের কবি — যিনি তাঁতের শ্রমের পাশাপাশি প্রকৃতির গভীর অনুভূতি ও স্কটিশ পরিচয়কে কবিতায় ধরে রেখেছেন। তাঁর গান আজও গাওয়া হয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনুপ্রাণিত করে। সংক্ষিপ্ত জীবন সত্ত্বেও তিনি স্কটল্যান্ডের সাহিত্য ও সংগীত ঐতিহ্যে অমর হয়ে আছেন — একজন সত্যিকারের “weaver poet” যিনি সুতোর সাথে স্বপ্ন বুনেছিলেন।

Uttam Ghosh
যে রাস্তা
কলমে : ঘোষ উত্তম
যে রাস্তাটা বাড়ি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে এই রাস্তায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা । নামলাম। হাতের ডানে বাড়ির পথ আর বামে ব্রম্মপুত্র নদ। অনেক ইতিহাসের পাতায় এই পথটুকু।
স্মৃতিময়।
এখন আর এ পথে প্যাক কাদা ধুলো বালি নেই । শৈশবে কাঁদা-মাটির রাস্তায় স্কুল থেকে ফেরার স্মৃতিটা আজও মনে হলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বর্ষার দিনে ভেজা মাটির গন্ধে চারদিক ভরে থাকত, পায়ে কাদা লেগে ভারী হয়ে যেত চলা, তবু সেই ক্লান্তির মাঝেও একরকম অজানা আনন্দ লুকিয়ে থাকত। বগলে করে বইখাতা, জামার কোণে কাদার ছোপ—সবকিছু মিলিয়ে যেন ছিল আমাদের প্রতিদিনের গল্প। কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, কখনো বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি, আবার কখনো দূর থেকে মায়ের ডাক শোনার জন্য মন ছুটে চলা—এই সব ছোট ছোট মুহূর্তেই গড়ে উঠেছিল শৈশব।আর এ রাস্তা । এ রাস্তা ধরে আমার বিকেলে ব্রম্মপুত্র নদের পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডুবেছে। আবার এ রাস্তা ধরেই প্রিয়জনরা কাঁধ বয়ে শেষকৃত্যের দিকে নদীতে নেমেছে। আর আজ
আজ পাকা রাস্তা, দ্রুত জীবন, সবকিছু সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই কাঁদা-মাটির পথ আর সেই অনুভূতিগুলো সহজে মুছে যায় না। কারণ ওই পথেই শেখা হয়েছিল সহনশীলতা, বন্ধুত্ব আর স্বপ্ন দেখার প্রথম পাঠ। স্মৃতির পাতায় সেই রাস্তা আজও ভেজা থাকে—হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখ ভিজিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় কোথা থেকে আমরা এসেছি।
আমার সামনে দিয়ে সেই রাস্তা ধরে চলছে । ছবির স্কুল ফেরার ছেলে মেয়ের দল। সামনে যেতে ইচ্ছে করল না। পিছু নিয়ে ছবি তুলে নিলাম। আর মনে মনে স্মৃতির আয়না ফ্রেমে ঘেরা সেই দিনের ____________
ঘোষ উত্তম
ভাবখালী, সদর, ময়মনসিংহ।
০১৮২৫৩৯০৩০৯

বিদ্যুৎ যায়না; বারেবারে আসে — রমজান বিন মোজাম্মেল
পরকীয়ার কেলেংকারি সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ ; তথাপি
ঘামে ভিজে ক্লান্তদেহ ; বিশ্রামের জন্য এগুতেই
দেখে বিদ্যুৎ নেই আঁধার চাহিদার!
ঘরের স্ত্রী’ পরের মতো হাতবদলায় আদি তালপাখা!!
লোভবাক্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়মিত চর্চা-
গোধূলির আলোমাখা আকাশপটের উপরে-সেইটুকুন
একান্ত তোমার জন্যে তুলে রাখা।
কাওয়ালি ভালো লাগে ; কিন্তু
ভালোবাসি- প্রেম সেহেলি তোমাকেই বউ
একইভাবে চড়পিতচর্চায়,
হৃদয়ে অনন্ত অঙ্গনে কেবল তোমার ছবি আঁকা…
অতঃপর,
বিদ্যুৎ কেন্দ্র জানায় বিদ্যুৎ যায়না; আন্দোলন করার চিন্তা থামান!
তালপাখা ঘুরানোর তালে উর্ধতন কর্মকর্তা আমলা চেঁচায়…
‘আমরাওতো বলিনি, বিদ্যুৎ যায়-
বলেছি, বিদ্যুৎ বারেবারে আসে’।

সাহিত্য ও সাহিত্যিক
ফিলিপ ফ্রেনো (১৭৫২–১৮৩২) – আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধকবি ও প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী কণ্ঠ
১. বিপ্লবের কবি
আমেরিকার বুকে জন্ম নিলে এক অগ্নিকণা,
কলম হয়ে উঠল তরবারি, গান হয়ে উঠল যুদ্ধ।
ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙতে চাইল যে হৃদয়,
তার নাম ফ্রেনো — বিপ্লবের অমর কবি।
প্রিন্সটনের আলোয় জ্বলে উঠল প্রথম স্বপ্ন,
ম্যাডিসনের পাশে গড়ে উঠল উদীয়মান গৌরব।
কলমের আঁচড়ে লিখল স্বাধীনতার ইতিহাস,
যুগ যুগ ধরে জ্বলবে সেই অগ্নিশিখা।
২. প্রিন্সটনের আলোয়
প্রিন্সটনের প্রাঙ্গণে দুই বন্ধু হাত ধরাধরি,
ম্যাডিসন আর ফ্রেনো — ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
“আমেরিকার উদীয়মান গৌরব” গেয়ে উঠল তারা,
ক্লাসিকের পাতা থেকে জন্ম নিল নতুন দেশপ্রেম।
মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে কবিতার পথে এল,
রাজনীতির আগুন জ্বালাল হৃদয়ের গভীরে।
সেই আলো আজও জ্বলে — স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে,
ফ্রেনোর কলমে লেখা প্রথম অমর পঙ্ক্তি।
৩. ক্যারিবিয়ানের অভিশাপ (স্যার টোবির প্রতি)
সেন্ট ক্রোইয়ের রোদে দাসের শৃঙ্খল ঝলসে ওঠে,
ফ্রেনোর চোখে ধরা পড়ে নরকের দৃশ্য।
“স্যার টোবি” — নামে এক অত্যাচারী,
তার হাতে মানুষ হয়ে ওঠে পশু।
কবি লিখলেন সেই অভিশাপের কবিতা,
দাসপ্রথার বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র প্রতিবাদ।
সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা দেখে,
তাঁর কলম হয়ে উঠল মুক্তির প্রথম আলো।
৪. ব্রিটিশ প্রিজন শিপ — নরকের হাল্ক
অন্ধকার হাল্কে তিনশো বন্দী — শ্বাস নিতে কষ্ট,
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ আর মৃতদেহের গন্ধ।
পাশে শুয়ে রাত কাটে — জীবিত আর মৃত একসাথে,
ব্রিটিশ অত্যাচারীরা হাসে নির্দয় হেসে।
“মৃত্যু ভালো, এই বন্দীত্বের চেয়ে” — চিৎকার ওঠে,
তবু কবির কলম জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুনে।
“এই নরকের কথা লিখব — বিশ্ব জানুক সব!”
ফ্রেনোর সেই কবিতা আজও জ্বলে — অত্যাচারের বিরুদ্ধে।
৫. বন্য মধুকুসুম (The Wild Honey Suckle-এর প্রতি)
লুকিয়ে আছে বনে সেই মধুকুসুম ফুল,
সাদা পাপড়িতে সাজানো প্রকৃতির নিজ হাতে।
কোনো পথিকের পা পড়ে না ওর কাছে,
শুধু নরম বাতাস বয়ে যায় মৃদু সুর তুলে।
কিন্তু শীত আসবে, শরৎ আসবে নিঃশব্দে,
সব সৌন্দর্য মিলিয়ে যাবে ধুলায়, মাটিতে।
তবু ওর জীবন সার্থক — ক্ষণিকের এই স্বপ্ন,
প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে মিশে যায় সে চিরকাল।
৬. সমুদ্রের ডাক
সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলে ওঠে জাহাজের পাল,
ফ্রেনো অধিনায়ক — ব্রিটিশ অবরোধ ভাঙে বুকে।
ক্যারিবিয়ানের নীল জলে লড়াই করে সে,
প্রাইভেটিয়ারের তরবারি আর কলম একসাথে।
ঝড়, ঢেউ, শত্রুর গোলা — সব অতিক্রম করে,
সমুদ্র তাঁকে শিখিয়েছে স্বাধীনতার সত্যিকারের স্বাদ।
যুদ্ধ শেষে ফিরে এসেও সমুদ্র ডাকে বারবার,
ফ্রেনোর হৃদয়ে চিরকাল বাজে সেই লবণাক্ত সুর।
৭. কলমের যুদ্ধ — ন্যাশনাল গেজেট
ফিলাডেলফিয়ার রাস্তায় জ্বলে ওঠে নতুন আগুন,
ন্যাশনাল গেজেটের পাতায় ফ্রেনোর কলম চলে।
হ্যামিলটনের নীতির বিরুদ্ধে, ওয়াশিংটনের সমালোচনায়,
জেফারসনের গণতন্ত্রের পক্ষে লেখে তীব্র আক্রমণ।
“রাস্কেল ফ্রেনো” বলে গালাগাল দেয় শত্রুরা,
তবু তাঁর কলম হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ।
রাজনীতির যুদ্ধে কবিতা আর সংবাদ এক হয়ে যায়,
ফ্রেনো দেখালেন — কলমও হতে পারে তরবারি।
৮. আমেরিকার উদীয়মান গৌরব
“আমেরিকার উদীয়মান গৌরব” গেয়ে উঠেছিলেন তিনি,
প্রিন্সটনের মঞ্চে — ব্র্যাকেনরিজের সাথে মিলে।
নতুন দেশের স্বপ্ন, স্বাধীনতার আলো, গণতন্ত্রের আশা,
সব মিলিয়ে লিখেছিলেন ভবিষ্যতের এক মহাকাব্য।
সেই গান আজও গাওয়া হয় — প্রতি চতুর্থ জুলাইয়ে,
ফ্রেনোর কণ্ঠে জেগে ওঠে আমেরিকার প্রথম স্বপ্ন।
ঔপনিবেশিক অন্ধকার ভেঙে নতুন সূর্য উঠুক,
এই ছিল তাঁর প্রার্থনা — আজও পূর্ণ হয়নি শেষ।
৯. খামারের শান্তিতে
যুদ্ধ শেষ, সাংবাদিকতা শেষ — ফিরে এলেন খামারে,
মনমাউথের শান্ত প্রকৃতিতে লিখলেন নতুন কবিতা।
প্রকৃতির ফুল, আকাশের মেঘ, নদীর স্রোত — সব নিয়ে,
তবু হৃদয়ে বাজে বিপ্লবের পুরনো সুর।
বাড়ি পুড়ে গেলেও, আর্থিক সংকটেও হার মানলেন না,
কবিতা লিখে গেলেন — নীরবে, গভীরে, একাকী।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন কবি,
প্রকৃতি আর স্বাধীনতার চিরন্তন প্রেমিক।
১০. তুষারঝড় ও অমর কণ্ঠ
তুষারঝড়ের রাতে পথ হারিয়ে ফেললেন ফ্রেনো,
আশি বছরের শরীর হিম হয়ে গেল চিরতরে।
কিন্তু তাঁর কবিতা, তাঁর আগুন, তাঁর প্রতিবাদ —
কোনো ঝড়, কোনো তুষার তা নিভাতে পারেনি।
আজও পড়া হয় “ব্রিটিশ প্রিজন শিপ”, “মধুকুসুম”,
আজও জ্বলে “ন্যাশনাল গেজেট” আর “উদীয়মান গৌরব”।
ফ্রেনো মরেননি — তিনি হয়ে উঠেছেন অমর কণ্ঠ,
যুগ যুগ ধরে গাইবে স্বাধীনতার এই বিপ্লবী কবি।
ফিলিপ মরিন ফ্রেনো (১৭৫২–১৮৩২): আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধকবি এবং প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী কণ্ঠস্বর
ফিলিপ মরিন ফ্রেনো আমেরিকান সাহিত্য ও ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি “Poet of the American Revolution” (আমেরিকার বিপ্লবের কবি) নামে পরিচিত। তাঁর কবিতা, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক লেখা আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রাথমিক ও সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। ফ্রেনো শুধু যুদ্ধের কবি ছিলেন না; তিনি প্রকৃতি-প্রেমী, সমুদ্রযাত্রী, বন্দী, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদও ছিলেন। তাঁর রচনায় নিওক্লাসিক্যাল ব্যঙ্গ থেকে শুরু করে রোমান্টিক প্রকৃতি-চেতনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা পরবর্তী আমেরিকান সাহিত্যকে (ব্রায়ান্ট, পো, এমারসন, থoreau) প্রভাবিত করেছে। তিনি ছিলেন একজন আদর্শবাদী যোদ্ধা-কবি, যিনি কলম ও অস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে লড়েছেন।
শৈশব, পরিবার ও প্রারম্ভিক শিক্ষা
ফিলিপ মরিন ফ্রেনো জন্মগ্রহণ করেন ২ জানুয়ারি ১৭৫২ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে। তিনি ছিলেন হিউগেনোট (ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট) বংশোদ্ভূত ওয়াইন ব্যবসায়ী পিয়ের ফ্রেনো (Pierre Fresneau) ও স্কটিশ স্ত্রী অ্যাগনেস ওয়াটসনের জ্যেষ্ঠ সন্তান। পরিবার পরবর্তীকালে নিউ জার্সির মনমাউথ কাউন্টিতে (বিশেষ করে মাটাওয়ান এলাকায়) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। শৈশবে তিনি ক্যালভিনবাদী ও প্রেসবিটেরিয়ান পরিবেশে বড় হন। স্থানীয় বিখ্যাত শিক্ষক রেভারেন্ড উইলিয়াম টেনেন্ট জুনিয়রের অধীনে ক্লাসিক্যাল শিক্ষা লাভ করেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা মাঝে মাঝে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। পিতার মৃত্যুর পর ১৭৬৮ সালে ফ্রেনো প্রিন্সটনের কলেজ অব নিউ জার্সিতে (বর্তমান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়) সোফোমোর হিসেবে ভর্তি হন এবং ১৭৭১ সালে স্নাতক হন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রুমমেট ছিলেন জেমস ম্যাডিসন (যিনি পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট হন)। শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত জন উইদারস্পুন। প্রথমে তিনি ধর্মযাজক (minister) হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু প্রিন্সটনে রাজনৈতিক বিতর্ক ও লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়।
প্রিন্সটনে থাকাকালীন তিনি হিউ হেনরি ব্র্যাকেনরিজের সঙ্গে যৌথভাবে “The Rising Glory of America” কবিতাটি রচনা করেন, যা কমেন্সমেন্ট অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয়। এটি আমেরিকার ভবিষ্যৎ গৌরব ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে। এ সময় তিনি “History of the Prophet Jonah” নামে একটি কাব্যিক রচনা এবং ব্র্যাকেনরিজের সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মক গদ্য “Father Bombo’s Pilgrimage to Mecca” (কেউ কেউ একে প্রথম আমেরিকান উপন্যাস বলে মনে করেন) রচনা করেন।
প্রাথমিক কর্মজীবন, ক্যারিবিয়ান অভিজ্ঞতা ও দাসপ্রথার বিরোধিতা
স্নাতকের পর ফ্রেনো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শিক্ষকতা করেন (লং আইল্যান্ডে) এবং প্রায় দুই বছর ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন, কিন্তু উভয়ই ত্যাগ করেন। ১৭৭৫ সালের দিকে ব্রিটিশবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক কবিতা ও লেখা লিখতে শুরু করেন, যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ছিল।
১৭৭৬ সালে তিনি ক্যারিবিয়ান দ্বীপ সেন্ট ক্রোই (St. Croix)-এ একজন বাগান মালিকের সচিব/ব্যবস্থাপক হিসেবে যান। সেখানে দুই বছর কাটান। এ সময় তিনি নৌ-চালনা (navigation) শেখেন এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা রচনা করেন: “The Beauties of Santa Cruz” (স্থানীয় প্রকৃতির সৌন্দর্য) এবং “The House of Night” (গথিক ও অন্ধকারময় আবহাওয়া সমৃদ্ধ, যা আমেরিকান রোমান্টিকতার প্রাথমিক উদাহরণ)। দাসপ্রথার নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে তিনি “On Sir Toby” কবিতাটি লেখেন, যেখানে দাসপ্রথার ভয়াবহতা তীব্রভাবে বর্ণিত হয়েছে। এটি তাঁর প্রাথমিক মানবতাবাদী ও বিলোপবাদী (anti-slavery) দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ। ১৭৭৮ সালে তিনি আমেরিকায় ফিরে আসেন।
বিপ্লবী যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও ব্রিটিশ বন্দীত্ব
১৭৭৮ সালে ফ্রেনো নিউ জার্সি মিলিশিয়ায় যোগ দেন এবং বিপ্লবী বাহিনীর পক্ষে লড়াই শুরু করেন। তিনি প্রাইভেটিয়ার (বেসরকারি যুদ্ধজাহাজ) জাহাজে চাকরি নেন এবং ব্রিটিশ অবরোধ ভেঙে ক্যারিবিয়ানে যাতায়াত করেন। ১৭৮০ সালে ব্রিটিশ জাহাজ তাঁকে বন্দী করে। তিনি প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ প্রিজন শিপে (যেমন Scorpion) অমানবিক অবস্থায় বন্দী ছিলেন — অপুষ্টি, রোগ, নির্যাতন। এই অভিজ্ঞতা প্রায় তাঁর জীবন কেড়ে নিয়েছিল।
মুক্তির পর ১৭৮১ সালে তিনি “The British Prison-Ship” কবিতাটি প্রকাশ করেন। এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও শক্তিশালী রচনাগুলোর একটি — ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক, দেশপ্রেমিক ও মানবিক যন্ত্রণার দলিল। এই কবিতা ও অন্যান্য রচনার জন্য তিনি “Poet of the American Revolution” খ্যাতি অর্জন করেন। যুদ্ধ চলাকালীন ও পরবর্তীকালে তাঁর কবিতা সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও জাতীয় বিতর্ক (১৭৮০-এর দশক–১৭৯০-এর দশক)
যুদ্ধোত্তর সময়ে ফ্রেনো ফিলাডেলফিয়ার Freeman’s Journal-এ নিয়মিত লিখতে থাকেন। ১৭৮৪ থেকে ১৭৯০ সাল পর্যন্ত তিনি সমুদ্র অধিনায়ক (sea captain) হিসেবে ক্যারিবিয়ান বাণিজ্যিক জাহাজ চালান — এটি তাঁর জীবনের আরেকটি অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ অধ্যায়।
১৭৯০ সালে তিনি এলিনর ফরম্যানকে বিয়ে করেন। একই বছর নিউ ইয়র্ক ডেইলি অ্যাডভার্টাইজার-এ সহকারী সম্পাদক হন। ১৭৯১ সালে জেমস ম্যাডিসন ও টমাস জেফারসনের উৎসাহ ও সমর্থনে ফিলাডেলফিয়ায় National Gazette পত্রিকার সম্পাদক হন (১৭৯১–১৭৯৩)। এটি ছিল ফেডারেলিস্ট পত্রিকা Gazette of the United States-এর বিরোধী ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান মুখপত্র।
ফ্রেনো জেফারসনীয় আদর্শের প্রবল সমর্থক ছিলেন: কৃষিভিত্তিক গণতন্ত্র, রাজ্যের অধিকার, সাধারণ মানুষের ক্ষমতা, ফরাসি বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতি এবং অভিজাততন্ত্র ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা। তিনি আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের আর্থিক নীতি, জাতীয় ব্যাংক, এবং জর্জ ওয়াশিংটনের দ্বিতীয় মেয়াদের সমালোচনা করেন (বিশেষ করে নিরপেক্ষতা নীতি ও জে ট্রিটি)। ওয়াশিংটন তাঁকে “that rascal Freneau” বলে অভিহিত করেছিলেন। ফ্রেনোকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে অনুবাদকের একটি sinecure (আয়ের পদ) দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি সম্পাদনায় মনোনিবেশ করতে পারেন (যদিও তিনি শুধু ফরাসি জানতেন)।
তাঁর সাংবাদিকতা ও কবিতা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং রিপাবলিকান দলের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
কাব্যিক অবদান ও সাহিত্যিক শৈলী
ফ্রেনো প্রচুর লিখেছেন — রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, দেশপ্রেমিক কবিতা, সমুদ্র ও নৌযুদ্ধের কবিতা, প্রকৃতি-কবিতা এবং দার্শনিক চিন্তাধর্মী রচনা। ১৭৯০ সালের মধ্যেই তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
প্রধান থিম ও উল্লেখযোগ্য কবিতা:
- রাজনৈতিক ও ব্যঙ্গাত্মক: “The British Prison-Ship” (বন্দীত্বের যন্ত্রণা ও ব্রিটিশবিরোধিতা), বিভিন্ন anti-Tory ও patriotic স্যাটায়ার।
- প্রকৃতি ও রোমান্টিক: “The Wild Honey Suckle” (১৭৮৬) — সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৃতি-কবিতা। লুকানো বন্য মধুকুসুম ফুলের সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়ী জীবন, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং প্রকৃতির নকশার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। এটি আমেরিকান রোমান্টিকতার (Transcendentalism-এর) প্রাথমিক বীজ বলে বিবেচিত। উদাহরণস্বরূপ: ফুলটি “vulgar eye” (সাধারণ চোখ) থেকে দূরে, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সজ্জিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শীত ও শরতের কবলে পড়ে। কবি বলেন, “The space between is but an hour, / The frail duration of a flower” — জীবনের ভঙ্গুরতার গভীর উপলব্ধি।
- আদিবাসী ও প্রিমিটিভিজম: “The Indian Burying Ground” — নেটিভ আমেরিকান সংস্কৃতি ও “noble savage” ধারণার প্রতি সহানুভূতি, যা রোমান্টিক প্রিমিটিভিজমের পূর্বাভাস।
- অন্যান্য: “The House of Night” (গথিক উপাদান, যা পরে Edgar Allan Poe-কে প্রভাবিত করেছে), সমুদ্র ও নৌযুদ্ধের কবিতা।
শৈলী: রাজনৈতিক কবিতায় নিওক্লাসিক্যাল (কাঠামোবদ্ধ ব্যঙ্গ, উপমা)। প্রকৃতি-কবিতায় রোমান্টিক উপাদান — আমেরিকান ল্যান্ডস্কেপের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, আবেগ, ঐশ্বরিক উপস্থিতির অনুভূতি। তিনি আমেরিকান প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতাকে ইউরোপীয় মডেল থেকে আলাদা করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।
পরবর্তী জীবন ও অবসর
১৭৯৩ সালের পর ফ্রেনো ধীরে ধীরে সক্রিয় সাংবাদিকতা থেকে সরে আসেন। উনিশ শতকের প্রথম দিকে তিনি মনমাউথ কাউন্টির (মাটাওয়ান/ফ্রিহোল্ড এলাকা) নিজের খামারে অবসর নেন। সেখানে প্রবন্ধ, কবিতা ও রাজনৈতিক লেখা চালিয়ে যান। জীবনের শেষ দিকে আর্থিক অসুবিধা দেখা দেয় (কিছু সূত্রে ১৮১৫ সালে বাড়ি পুড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে), কিন্তু তিনি শান্ত, চিন্তাশীল জীবনযাপন করেন।
মৃত্যু
১৮ ডিসেম্বর ১৮৩২ সালে ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তুষারঝড়ের (blizzard) মধ্যে পথ হারিয়ে ফ্রিহোল্ডের কাছে হিমায়িত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন — সম্ভবত বাড়ি ফেরার পথে বা কোনো স্থানীয় ইন থেকে ফিরতে গিয়ে। তাঁকে মাটাওয়ানের Philip Morin Freneau Cemetery-তে সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
ফ্রেনোকে প্রায়শই “Father of American Poetry” বলা হয় (যদিও এই দাবি বিতর্কিত এবং পরবর্তীকালে কিছুটা অবহেলিত হয়েছিল)। তিনি আমেরিকান সাহিত্যকে ঔপনিবেশিক যুগ থেকে জাতীয় যুগে উত্তরণে সেতুবন্ধন করেছেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি জেফারসনীয় গণতন্ত্র, সাধারণ মানুষের অধিকার ও আমেরিকান স্বাতন্ত্র্যের প্রবক্তা ছিলেন। সাহিত্যিকভাবে তিনি আমেরিকান প্রকৃতি-চেতনা ও রোমান্টিক সংবেদনশীলতার পথিকৃৎ।
তাঁর সমালোচকরা (বিশেষ করে ফেডারেলিস্টরা) তাঁকে অতিরিক্ত দলীয় ও কট্টর বলে আক্রমণ করেছেন, কিন্তু সমর্থকরা তাঁকে নীতিবান আদর্শবাদী হিসেবে দেখেন। আজকের সাহিত্য ইতিহাসে তাঁর অবদান ক্রমশ পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে। নিউ জার্সিতে তাঁর স্মৃতি রক্ষিত হয়েছে — Freneau নামক সম্প্রদায়, পার্ক, ফায়ার কোম্পানি এবং বিভিন্ন স্মারক (যেমন ১৯৩৯ সালের ভাস্কর্য)।
ফিলিপ ফ্রেনোর জীবন ছিল অ্যাডভেঞ্চার, আদর্শ, সৃজনশীলতা ও ত্যাগের মিশ্রণ। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের “combat poet” — যিনি যুদ্ধের ময়দানে, বন্দীশিবিরে, সংবাদপত্রের পাতায় এবং প্রকৃতির নীরবতায় আমেরিকার স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে সেই বিপ্লবী চেতনা ও মানবিক গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
