।। স্মৃতি ফিরে আসে বার বার ।।
কাঞ্চন চক্রবর্তী
ঘুম ভাঙল গণেশের ফোনে।
— কি রে! ঘুমোচ্ছিস নাকি? বাঁ দিকের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখ। কপালগুনে বাঁ দিকের লোয়ার বার্থেই সিট ছিল আমার। ফোন কানে দিয়ে তড়িঘড়ি জানালা য় চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম সবুজ চা বাগান আর জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে মাঝে মধ্যেই তুষারশুভ্র ঘুমন্ত বুদ্ধকে দেখা যাচ্ছে । শরতের নীল আকাশে সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘা আর চারিদিকে সবুজ গালিচার মত চা বাগান দেখতে দেখতে উপলব্ধি করলাম আমার বয়স যেন অনেকটা কমে গিয়েছে, বাড়তি অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করতে শুরু করছে আর মনের মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দের হিল্লোল অনুভূত হচ্ছে। ফোনের ওপাশ থেকে আসা গণেশের কথাগুলো প্রায় কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। প্রকৃতির সৌন্দর্যের খনিতে ডুবে ছিলাম কতক্ষণ জানিনা। ওপাশ থেকে আসা গণেশের ধমক খেয়ে সম্বিত ফিরল।
— কি রে কি হল, কিছু বলছিস না যে!
— অপূর্ব ! অপূর্ব ! অসাধারণ দৃশ্য দেখালি।
— তুই না ফোন করলে দারুণ মিস করতাম। সত্যি গণশা, ইউ আর গ্রেট।
ও হেসে বলল,
— ঠিক আছে তুই প্রকৃতির রাজ্যে ডুবে থাক আর ছবি তুলে যা, আমরা একটু পরে তোর কাছে আসছি।
ফোন অফ করে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে খচা খচ্ শব্দে ছবি তুলে যাচ্ছি আর মাঝে মধ্যেই ভিডিও করছি বাঁক নেওয়া ট্রেন ও পাশ দিয়ে সরে সরে যাওয়া অপূর্ব দৃশ্যগুলির। ট্রেনের জানালা দিয়েই দূরে দুই পাহাড়ের মাঝে সেবক ব্রীজ দেখা যাচ্ছে ছবি না তুলে পারলাম না। কোন এক বইয়ে পড়েছিলাম 1941 সালে তৈরি এই সেবক করোনেশন ব্রীজ নাকি প্রথম দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল।চলতে চলতে মনে হচ্ছিল ফরেস্টের এই গাছগুলি, পাহাড়, নদী, ঝোরা এ সবই যেন কোন এক প্রাচীন শিল্পীর নিপুন হাতের ছোঁয়ার সৃষ্টি। ডুয়ার্সের এই প্রকৃতিকে কোন সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না—এর সৌন্দর্য অপার অসীম।
পুজোর পর এই সময়টায় টিকিটের ক্রাইসিস থাকে বলেই বোধহয় আমাদের চার বন্ধুর সিট একই কম্পার্টমেন্টে হল না। তিনটে রিজার্ভেশন হল এস-2 তে আর একটা হল এস-5 এ। এই সময়টাতে পরিবার সহ ডুয়ার্সে যাওয়ার এত হিড়িক থাকে যে অনেক যাত্রীকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউই রাজি হল না আমাদের চারমূর্তির অভিযান একই কম্পার্টমেন্টে হোক। পরিস্থিতি সামাল দিতে বললাম,
— আমি চলে যাচ্ছি এস-5 এ।
রাতের ট্রেন জার্নি টা এক সাথে না হওয়ায় আমাদের সবারই মন খারাপ দেখে জয়ন্ত বলল
— আরে দাঁড়া আগে এক রাউন্ড চা হয়ে যাক। ট্রেন ছাড়তে এখনো দশ মিনিট বাকি।
দুটো লোয়ার বার্থের নিচে লাগেজগুলো সান্টিং করে নির্দিষ্ট সিটে একটু চেপেচুপে চারজনই বসে পড়লাম।
ভ্রমণে আমাদের থেকে গণেশের অভিজ্ঞতা একটু বেশি। তাই ওকে টাকা পয়সা আর প্যাকেজের পুরো দায়িত্ব দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত।
চা, বিস্কুট ও চানাচুরের সাথে চললো আমাদের আড্ডা। ঠিক হল ডুয়ার্সের মূর্তিকে কেন্দ্র করেই এবারে আমাদের ভ্রমণ হবে। হঠাৎ ট্রেন টা দুলে উঠল সবাই ঘড়ি দেখলাম রাত্রি 8-35 মিনিট। অর্থাৎ কাঞ্চনকন্যা ঠিক সময়েই ছাড়ল। ডুয়ার্স ভ্রমণের জন্য এর চাইতে ভালো ট্রেন আর নেই। এই ট্রেন টা আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত যায়।
রাত দশটায় পরোটা, ডিমকষা আর সন্দেশ দিয়ে ডিনার সারলাম। এস-5 এ যাবার জন্য লাগেজগুলো বইতে গণেশ আমাকে সাহায্য করল। ভেস্টিবিউল দিয়ে এস-5 এ এসে দেখি ভালোই হল আমার সিট টা পরেছে লোয়ারে। গণেশও খুশি কারণ ও জানে আমি জনালার ধারে বসে ফটো তুলতে ভালোবাসি। প্রসঙ্গত বলে রাখি ফটো তোলা আমার হবি এবং প্রকৃতির সিনারি আর ওয়াইল্ডলাইফের ছবি তোলা আমার নেশা।
গণেশ গুড নাইট জানিয়ে চলে যাবার পর লাগেজগুলো সান্টিং করে এয়ার পিলো মাথায় দিয়ে একটা চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে। শোবার আগে আমার বহুকালের চেনা ড্রাইভার সাজিতকে গাড়ি নিয়ে কাল সকাল 9-30 মিনিটে নিউ মাল জংশন স্টেশনে আসার কথা আর একবার মনে করিয়ে দিলাম। শুয়ে শুয়ে টের পেলাম কাঞ্চনকন্যা অন্ধকারের বুক চিরে দূর্বার গতিতে উত্তরের কোন এক মহিনীর দিকে ছুটে চলেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে হিমেল হাওয়া আমাকে আর একটা চাদর মুড়ি দিতে বাধ্য করল। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না হঠাৎ মোবাইল ফোন টা বেজে উঠল।
সকাল 9-45 মিনিটে আমরা নিউ মাল জংশন স্টেশনে নামতেই ময়ূরের ডাক শুনতে পেলাম। স্টেশনের বাঁ দিকে সবুজ চা বাগানে দুটো ময়ূর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ওভারহেড তারে একটা নীলকন্ঠ পাখি বসে রয়েছে। ক্যামেরাটা হাতেই ছিল মুহূর্তে ওদের ক্যামেরাবন্দি করলাম।
স্টেশন চত্ত্বরেই সাজিত দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ি নিয়ে। বন্ধুদের সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিয়ে লাগেজগুলো নিয়ে আমরা চারজন গাড়িতে উঠে বসলাম। যতবারই উত্তরবঙ্গে এসেছি সাজিত আমাকে বা আমার সঙ্গীদের ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়েছে। ডুয়ার্স ওর নখদর্পণে।
আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে মাখনের মত মসৃন রাস্তা দিয়ে। রাস্তার দু ধারে উঁচু উঁচু গাছগুলো যেন স্ব-মহিমায় দাঁড়িয়ে মূর্তিতে আসবার জন্য আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাস্তার দু ধারে সবুজ গালিচার মত চা বাগান দূরে বহু দূরে নীল পাহাড়ের রেখা দেখা যাচ্ছে। এখানকার আবহাওয়ায় অদ্ভুত এক হিমেল হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজে।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা মূর্তির বনানী নেচার রিসর্টে পৌঁছালাম। লাউঞ্জে আমাদের লাগেজগুলো রেখে সোজা রিসর্টের খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা চারমূর্তি, মূর্তি নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে। আহা কি অপূর্ব দৃশ্য! নদী ও চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্ষণিকের জন্য আমাদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। WBFDC এই রিসর্টটির পোজিশন অতি চমৎকার, একেবারে মূর্তি নদীর গায়ে যার ওপারে রয়েছে গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক। বাঁ দিকে প্রায় 180 ডিগ্রি জুড়ে রয়েছে ছাই রঙের ভূটান পাহাড়। ডানদিকে মূর্তি নদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে একটি নীল সাদা ব্রীজ যেটা পেরোলেই গরুমারা ফরেস্টকে নাগালে পাওয়া যাবে। অপূর্ব! অপূর্ব দৃশ্য! একদল মহিলা জঙ্গল থেকে মাথায় কাঠ নিয়ে নদী পেরিয়ে এপারে আসছে আর এপার থেকে এক পাল গরু নদী সাঁতরে ওপারে যাচ্ছে। দূর থেকে ময়ূরের ডাক ভেসে আসছে। এক ঝাঁক সাদা বক উড়ে যাচ্ছে সবুজ ফরেস্টের গাঁ ঘেঁষে। ওঃ কি অসাধারণ দৃশ্য! অসাধারণ অনুভূতি! কতক্ষণ এই সৌন্দর্যের মোহতে ডুবে ছিলাম জানিনা হঠাৎ সাজিত এসে খবর দিল রিসর্টের ম্যানেজার আমাদের ডাকছে রেজিস্টারে এন্ট্রি করার জন্য। এন্ট্রি করা হয়ে গেলে ম্যানেজারের কাছে শুনলাম এখানে নাকি প্রায়ই একদল হাতি আসে এই মূর্তি নদীতে স্নান করতে। খবরটা শুনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল সবার।
বনানী রিসর্টের ঘরগুলো বিভিন্ন নদীর নামে। দোতলায় যে চারটে ঘর রয়েছে তাদের নাম হল শুক্তি, মূর্তি, গড়াতি ও জলঢাকা। এক তলার ঘরগুলোর নাম তিস্তা,তোর্সা,ডায়না। এছাড়াও এক তলায় সাত বেডের আর একটি টায়ার বাঙ্ক নামে ফ্যামিলি রুম রয়েছে।
বনানী র ক্যাম্পাসে বহু ধরণের গাছ, লন,পার্ক ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে দোয়েল, কোয়েল, মুনিয়া, ময়না, ইত্যাদি নামে বেশ কিছু এ সি ও নন এ সি কটেজ রয়েছে।একটু আগে আমরা যে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম সেই দিকে ছোট্ট একটি গেট দিয়ে বেরিয়ে খুব সহজেই মূর্তি নদীতে নামা যায়।
প্রায় সাড়ে এগারোটার সময় চায়ের সাথে অল্প কিছু মুখে দিয়ে আমরা নদীতে গেলাম। স্রোতোস্মিনী নদীর জল খুব ঠান্ডা ও এত স্বচ্ছ যে ছোট ছোট মাছগুলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এগুলোই কি বোরোলি মাছ? ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেলাম জলের নিচের পাথরগুলো খুবই পেছল তাই আর দ্বিতীয় বার চেষ্টা করিনি। যাই হোক হৈ হৈ করে চার বন্ধু মূর্তি নদীতে স্নান করে বোরোলি মাছের ঝোল ও চিকেন কষা দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। এখানে থাকলে জঙ্গল সাফারির খুব সুবিধে হয় কারণ টিকিটের ব্যবস্থা রিসর্টের ম্যানেজারই করে দিতে পারেন।
ম্যানেজারের কথা মতোই আমরা বিকেলের ট্রিপে জঙ্গল সাফারিতে গিয়ে অনেক ধরণের পাখি ও বন্য জন্তুর ছবি তুললাম। সবাই খুশি হলেও হাতির দেখা না পাওয়ায় আমি পুরোপুরি খুশি হতে পারলাম না। আমাকে খুশি করার জন্য অথবা হাতি দর্শনের উদ্দেশ্যেই হয়তো গাইডের কথা মত জিপের ড্রাইভার আমাদের মূর্তি নদীর ধারে অসাধারণ এক মনোমুগ্ধকর জায়গায় নিয়ে এল। জায়গাটির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। পুরোটাই উপলব্ধির বিষয়। জঙ্গল ঘেরা এমন সুন্দর পাহাড়ি এলাকায় এলে মনে হয় নিজেকে চেনার বা জীবনকে অন্য ভাবে জানার জন্য নগর কলকাতার ব্যস্ত জীবনকে টপকে অন্ততঃ কয়েকটা দিনের জন্য সত্যিই জঙ্গলে আসা উচিত। না হলে প্রকৃতির এই বিপুল ঐশ্বর্যের মাঝে আমরা যে কত ক্ষুদ্র কত নগণ্য তা উপলব্ধ হয় না। সত্যিই নগর সভ্যতার জাঁতাকলে আমরা ভুলে যেতে বসেছি, ‘আমরাই পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী নই’। আমরা যে এই বিপুল উদ্ভিদ রাজি ও প্রাণী বৈচিত্র্যের মধ্যে শত সহস্র বছরের বিবর্তনের ধারায় এই নীল গ্রহে নিজেদের জায়গা করে নিতে পেরেছি এটাই তো মনুষ্য জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা। ‘মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব’— তাই আমাদের দায়িত্ব এই প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্র্য কে রক্ষা করা। এই মহত কাজে আমরা ব্যর্থ হলে একদিন নিশ্চিত সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
ফেরার পথে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে বাজ পড়তেে সুরু করল। ভূটান পাহাড়ের দিক থেকে হিম শীতল ঝুরো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হুড খোলা আমাদের সাফারি জীপটাকে ক্ষণিকের জন্য দাঁড় করিয়ে গাইড তাড়াতাড়ি করে আমাদের হুডে ঢেকে দিল। জীপের মধ্যেটা অন্ধকার হয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি করল। ততক্ষণে প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে সেই অবস্থায় আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। গাড়ির হেড লাইটে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুতের ঝলকানির সাথে প্রবল বেগে বৃষ্টি পরছে। এই রকম দুর্যোগ পেরিয়ে আমরা যখন রিসর্টের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি, এমন কি গাড়ির হেড লাইটে দূরে ব্রীজটাও দেখা যাচ্ছে তখন হঠাৎ ব্রেক কষে আমাদের জীপটা রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। কি হয়েছে দেখবার জন্য হুড একটু ফাঁক করে দেখি চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার খানিকটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে জোনাকির মত বেশ কয়েকটা আলো জ্বলছে। আলোগুলো দেখে আমার জোনাকি মনে হল না কেমন যেন অদ্ভুত রঙ এবং সাইজে অনেক বড় । আমাদের গাইড গাড়ির সামনের দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে টর্চের জোরালো আলো ফেলতেই দেখি রাস্তা জুড়ে এক বিশাল গাছ পড়ে রয়েছে। গাইড ওর কুকরি দিয়ে বেশ কয়েকটা ডাল ছেঁটে দিয়ে যাবার রাস্তা করে দিল। জিপ থেকে নামতে যাচ্ছিলাম ড্রাইভার হাতির টাটকা পটি দেখিয়ে সাবধান করে দিল, বলল আশেপাশেই রয়েছে। পুরো ভিজে সন্ধ্যে 7 টায় আমরা চারজন বনানী রিসর্টে ফিরলাম। রিসর্টের চারপাশটা আমার কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগল।
পরে জেনেছিলাম এক পাল হাতি নাকি বিকেল পাঁচটা থেকে প্রায় দু-ঘন্টা ধরে এখানে তান্ডব চালিয়ে গেছে। এত সুযোগ পেয়েও হাতির ছবি তুলতে না পারার বেদনা নিয়ে সেবার ডুয়ার্স থেকে ফিরতে হয়েছিল আমাদের।
Copyright:
নাম: কাঞ্চন চক্রবর্তী
ঠিকানা: 26/2A, Jadunath Ukil Road,
Kolkata 41, PIN 700041
ফোন: 9830522596
