দু ফু (৭১২-৭৭০)
চীনের “কবি-ইতিহাসবিদ” এবং তাং কবিতার শ্রেষ্ঠ কারিগর
দু ফু চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বিশৃঙ্খল তাং রাজবংশের আমলে—বিশেষ করে বিধ্বংসী আন লুশান বিদ্রোহের (৭৫৫-৭৬৩) সময়ে এবং তার পরে লেখার মাধ্যমে তিনি নিয়ন্ত্রিত ছন্দের (লুশি) প্রযুক্তিগত দক্ষতার সাথে গভীর নৈতিক গুরুত্ব, সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং প্রখর ঐতিহাসিক সচেতনতাকে একত্রিত করেছিলেন। তাকে প্রায়শই “কবি-মহর্ষি” বা “কবি-ইতিহাসবিদ” বলা হয়।
এখানে দু ফু-এর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রতিনিধিত্বমূলক ১০টি কবিতা বাংলা অনুবাদে উপস্থাপন করা হলো।
১. বসন্তের দৃশ্য
আন লুশান বিদ্রোহের সময় ৭৫৭ সালে লিখিত
দেশটা চূর্ণবিচূর্ণ, কিন্তু পাহাড় ও নদী রয়ে গেছে;
শহরের বুকে বসন্ত—ঘাস আর গাছপালা গভীর হয়েছে।
সময়ের আবর্তে ব্যথিত হয়ে ফুলেরা অশ্রু ঝরায়;
বিচ্ছেদের বেদনায় পাখিরাও মনকে শঙ্কিত করে।
টানা তিন মাস ধরে যুদ্ধের সংকেত আগুন জ্বলছে;
বাড়ির একটা চিঠি এখন দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার সমান মূল্যবান।
আমার সাদা চুল, চুলকাতে চুলকাতে আরও ছোট হয়ে গেছে,
শীঘ্রই মাথায় একটা চুলের কাঁটাও আটকে রাখার মতো থাকবে না।
২. জোছনা রাত
যুদ্ধের কারণে বিচ্ছিন্ন থাকার সময় তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা
আজ রাতে ফুঝৌ-এর আকাশে চাঁদ জ্বলছে;
নিজের কক্ষে বসে সে একাকী তা দেখছে।
দূর থেকে আমি আমার ছোট বাচ্চাদের কথা ভাবি—
তারা এখনও তাদের মায়ের এই আকুলতা বোঝে না।
মেঘের মতো তার চুল সুগন্ধি কুয়াশায় ভিজে গেছে;
নির্মল জোছনায় তার হাতির দাঁতের মতো ফর্সা হাত শীতল হয়ে আসছে।
কবে আমরা আবার সেই শূন্য জানালার পাশে একসাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াব,
আমাদের চোখের জল শুকিয়ে যাবে, আর আমাদের মুখ সেই আলোয় উজ্জ্বল হবে?
৩. সৈন্যবাহিনীর গাড়ি
একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরোধী কবিতা
গাড়িগুলো গড়গড় শব্দ করছে, ঘোড়াগুলো ডাকছে,
কোমরে ধনুক ও তীর নিয়ে পুরুষরা মার্চ করে চলেছে।
পিতা-মাতা এবং স্ত্রীরা তাদের পেছনে পেছনে ছুটছে,
ধুলোয় ঢেকে গেছে শিয়ানইয়াং সেতু।
তারা সৈন্যদের পোশাক আঁকড়ে ধরে কাঁদছে:
“কান্নায় রাস্তা কর্দমাক্ত আর হাঁটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
“মহাশয়, আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না—
কৃষ্ণ নদীর তীরে মৃতদের হাড়গুলো
আজও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সৈন্যরা সংগ্রহ করছে?”
৪. স্টোন মোট গ্রামের কর্মকর্তা
বাধ্যতামূলক সৈন্য নিয়োগ নিয়ে তাঁর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বর্ণনামূলক কবিতাগুলোর একটি
গোধূলি বেলায় আমি স্টোন মোট গ্রামে আশ্রয়ের খোঁজ করেছিলাম;
রাতে এক সরকারি কর্মকর্তা এলো পুরুষদের ধরে নিয়ে যেতে।
বৃদ্ধ লোকটি প্রাচীর বেয়ে পালিয়ে গেল;
বৃদ্ধা নারীটি দরজা খুলতে এগিয়ে এলো।
কর্মকর্তার কাছে সে কী আকুলভাবেই না কেঁদে উঠেছিল!
“ইয়ে নগরে আমার তিন ছেলে শহর রক্ষা করছে।
একজন চিঠি লিখেছিল—বাকি দুজন এইমাত্র যুদ্ধে মারা গেছে।
যারা বেঁচে আছে তারা কোনোমতে টিকে আছে;
যারা মারা গেছে তারা চিরতরে চলে গেছে।”
৫. আমার খড়ের চাল শরৎকালের বাতাসে ধ্বংস হয়ে গেছে
চেংদুতে লেখা—দরিদ্রদের জন্য একটি আকুল আবেদন
শরতের বাতাস আমার খড়ের চাল ছিঁড়ে ফেলছে;
উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে খড়ের তিনটি স্তর।
খড়গুলো নদীর ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে তীরে ছড়িয়ে পড়ছে;
উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে ছোট ছেলেরা বাকি অংশ চুরি করছে।
আমি লাঠিতে ভর দিয়ে ফিরে আসি এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
আমার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, আমার চুল সাদা।
কবে আমি একটি বিশাল অট্টালিকা দেখব, দশ হাজার কক্ষের সমান চওড়া,
যা পৃথিবীর সমস্ত দরিদ্র পণ্ডিতদের আশ্রয় দেবে,
যাদের মুখে আর কখনো ক্ষুধা ও শীতের কষ্ট দেখা যাবে না?
৬. ইউয়েইয়াং টাওয়ারে আরোহণ
জীবনের শেষভাগে, ৭৬৮ সালে লিখিত
অনেক আগে আমি দংতিং হ্রদের কথা শুনেছিলাম;
আজ আমি ইউয়েইয়াং টাওয়ারে আরোহণ করেছি।
হ্রদের জল পূর্ব ও দক্ষিণের উ এবং চু অঞ্চলকে গ্রাস করে;
দিন-রাত আকাশ ও পৃথিবী যেন এর ওপর ভেসে বেড়ায়।
আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব—কারো কাছ থেকে একটি চিঠিও নেই;
বৃদ্ধ এবং অসুস্থ হয়ে আমি একটি একাকী নৌকায় ভেসে চলছি।
যুদ্ধঘোড়াগুলো এখনও উত্তরের সীমান্ত মাড়িয়ে চলেছে;
রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আমি আমার দূরবর্তী জন্মভূমির জন্য কাঁদছি।
৭. আকাশের শেষ প্রান্তে বসে লি বাই-এর কথা ভাবা
লি বাই-এর নির্বাসনের পর লেখা
আকাশের শেষ প্রান্তে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে;
ভদ্রলোকটি এখন কী ভাবছেন?
বুনো রাজহাঁসগুলো কবে আসবে?
নদী ও হ্রদগুলো শরতের জলে পূর্ণ।
সাহিত্য সফল জীবনকে ঘৃণা করে;
মানুষের দুর্ভাগ্যে দানবরা আনন্দ পায়।
আমাদের আত্মার জগতে একসাথে কথা বলা উচিত—
দূরের নদীর প্রান্ত থেকে আমার কাছে একটি কবিতা পাঠিও।
৮. দক্ষিণে লি গুইনিয়ানের সাথে দেখা
পুরোনো ভালো দিনগুলোর স্মৃতিচারণমূলক একটি পরবর্তী কবিতা
আমি প্রায়শই কুই-এর রাজপুত্রের বাড়িতে লি গুইনিয়ানকে দেখতাম;
চুই জিউ-এর দরবারে বেশ কয়েকবার তাঁর গান শুনেছি।
এখন এটি দক্ষিণের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য—
কিন্তু যখন ফুল ঝরে পড়ে, তখনই আমাদের আবার দেখা হয়।
৯. রাতে ভ্রমণের সময় লেখা
বার্ধক্য এবং ব্যর্থতার ওপর একটি গভীর ব্যক্তিগত প্রতিফলন
তীরের নরম ঘাস, মৃদু বাতাস;
উঁচু মাস্তুল, রাতের আঁধারে একটি নিঃসঙ্গ নৌকা।
বিশাল প্রান্তরের ওপর তারাগুলো নিচু হয়ে ঝুলে আছে;
নদীর স্রোতে চাঁদ দুলছে।
সাহিত্যের মাধ্যমে আমার নাম জানা যাবে না;
আমার কর্মজীবন—আমি বৃদ্ধ ও অসুস্থ, আমার অবসর নেওয়া উচিত।
ভেসে চলা, কেবলই ভেসে চলা—আমি কিসের মতো?
আকাশ আর পৃথিবীর মাঝে একটি একাকী গাঙচিল।
১০. প্রাচীন সাইপ্রাস গাছের গান
দৃঢ় গুণের প্রতীক (প্রায়শই একজন বিশ্বস্ত মন্ত্রীর প্রশংসা হিসেবে পড়া হয়)
কংমিং মাজারের সামনে একটি প্রাচীন সাইপ্রাস গাছ দাঁড়িয়ে আছে;
এর কাণ্ডটি সবুজ ব্রোঞ্জের মতো, এর শিকড় পাথরের মতো।
এর তুষারাবৃত ছাল চারপাশে ত্রিশ হাত চওড়া;
এর গাঢ় সবুজ চূড়া দুই হাজার ফুট উঁচুতে আকাশকে স্পর্শ করেছে।
এমনকি এটি যদি কোনো দক্ষ কারিগরের দেখাও পেত,
একটি বড় প্রাসাদ তৈরি করার মতো কাঠ সে কোথায় পেত?
যদিও এর তিক্ত হৃদয়টি ইতিমধ্যেই পিঁপড়ারা কুঁদে কুঁদে খেয়েছে,
তবুও এর উঁচু ডালগুলো এখনও ফিনিক্স পাখিদের আশ্রয় দেয়।
এই দশটি কবিতা দু ফু-এর ব্যাপ্তিকে প্রদর্শন করে: অন্তরঙ্গ ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে শুরু করে মহৎ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতি থেকে শুরু করে শান্ত দার্শনিক প্রতিফলন। নিয়ন্ত্রিত ছন্দে তাঁর প্রযুক্তিগত উজ্জ্বলতা এবং নৈতিক গভীরতা তাঁকে চীনের “কবি-ইতিহাসবিদ” হিসেবে স্থায়ী মর্যাদা এনে দিয়েছে।
ডু ফু (৭১২–৭৭০)
চীনের ঐতিহাসিক কাব্যিক বিবেক এবং শিল্পী কারিগর
ডু ফু (চীনা: পিনয়িন: Dù Fǔ), যিনি ডু জিমেই নামেও পরিচিত, ছিলেন তাং রাজবংশের (Tang Dynasty) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী চীনা কবি। তাঁকে প্রায়শই “কবি-ঋষি” (Poet-Sage) এবং “কবি-ইতিহাসবিদ” (Poet-Historian) বলা হয়। তাঁর কবিতায় চীনের সামাজিক যন্ত্রণা, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক দুর্দশার গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে। লি বাই-এর সঙ্গে তাঁকে চীনা কাব্যের দুই শীর্ষস্থানীয় কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
ডু ফু জন্মগ্রহণ করেন ৭১২ সালে হেনান প্রদেশের গং কাউন্টি (Gong County) অঞ্চলে। তাঁর পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত ও পণ্ডিত পরিবার। তাঁর পিতামহ ছিলেন একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও কবি। শৈশবেই তাঁর মা মারা যান, এবং তিনি খালার কাছে বড় হন।
তিনি ঐতিহ্যবাহী কনফুসীয় শিক্ষা লাভ করেন। যুবক বয়সে তিনি দেশ ভ্রমণ করেন এবং কবিতা রচনা শুরু করেন।
শিক্ষা, পরীক্ষা ও প্রথম যৌবন
ডু ফু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় (Imperial Examination) দুবার ব্যর্থ হন। এটি তাঁর জীবনে বড় হতাশার কারণ হয়। তিনি চাংআন (Chang’an) রাজধানীতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হননি।
এ সময় তিনি লি বাই (Li Bai)-এর সঙ্গে পরিচিত হন এবং দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যদিও তাঁদের কাব্যশৈলী ও জীবনদর্শন ভিন্ন ছিল — লি বাই ছিলেন স্বাধীনচেতা ও রোমান্টিক, আর ডু ফু ছিলেন গুরুগম্ভীর, নৈতিক ও বাস্তববাদী।
আন লুশান বিদ্রোহ ও কষ্টের বছরগুলি
৭৫৫ সালে আন লুশান বিদ্রোহ (An Lushan Rebellion) শুরু হলে ডু ফু-এর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। এই বিদ্রোহ তাং রাজবংশকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ডু ফু যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শরণার্থী সমস্যা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি নিজে বন্দী হন, পরে পালিয়ে যান এবং দীর্ঘদিন দারিদ্র্য ও অস্থিরতার মধ্যে কাটান। এই সময় তাঁর কবিতায় যুদ্ধের ভয়াবহতা, সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং রাজনৈতিক সমালোচনা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
চেংদু ও পরবর্তী জীবন
বিদ্রোহের পর ডু ফু চেংদু (Chengdu)-তে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি একটি ছোট খড়ের কুটির (Thatched Cottage) তৈরি করেন, যা আজও ডু ফু-এর খড়ের কুটির নামে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে তিনি শান্তিতে অনেক কবিতা রচনা করেন।
পরবর্তীকালে তিনি আবার ভ্রমণ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে সামান্য সরকারি পদে কাজ করেন। শেষ জীবনে তিনি দারিদ্র্য ও অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
কাব্যশৈলী ও বিষয়বস্তু
ডু ফু ছিলেন নিয়মিত কবিতা (regulated verse / lüshi)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য:
- গভীর নৈতিকতা ও মানবিক সহানুভূতি
- সামাজিক বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক ঘটনার সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ
- জটিল ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা
- প্রকৃতি, বন্ধুত্ব, পরিবার ও দেশপ্রেম
তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে “বসন্তের দৃশ্য” (Spring Prospect), “সেনাবাহিনীর গাড়ি” (The Army Carts) ইত্যাদি। তিনি প্রায় ১৫০০টি কবিতা রেখে গেছেন, যা চীনা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
উত্তরাধিকার
ডু ফু-এর মৃত্যুর পর তাঁর খ্যাতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। চীনা সমালোচকরা তাঁকে “কবি-ঋষি” এবং “ইতিবৃত্তকার-কবি” বলে সম্মান জানান। তাঁর কবিতা পরবর্তীকালের চীনা, জাপানি ও পশ্চিমা সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আজও চীনে তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়। তাঁর চেংদুর খড়ের কুটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান।
ডু ফু শুধু একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর যুগের বিবেক। তিনি যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অরাজকতার মধ্যেও মানুষের দুর্দশা ও নৈতিক মূল্যবোধকে কাব্যে ধরে রেখেছেন। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে শেখায় — সত্যিকারের কবিতা শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং সত্য ও মানবতার দর্পণ।
“ডু ফু ছিলেন সেই কবি, যিনি চীনের যন্ত্রণাকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে তাকে অমর কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন।”