EASHIN IBN FIROJ

অদৃশ্য পাল্লা

​বৃষ্টিভেজা এক অভিশপ্ত রাত। শহরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রহমতগঞ্জ -এর পরিবেশটা আজ বড্ড গুমোট। গোডাউনের মেঝেতে পড়ে আছে এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী চাল ও ধান ব্যবসায়ী ইউনূস মিয়ার নিথর দেহ। মাথার পেছনে ভারী কিছুর আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর রায়হান। তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর অপরাধীর মনস্তত্ত্ব পড়ার অদ্ভুত ক্ষমতার জন্য পুলিশ ডিপার্টমেন্টে তিনি কিংবদন্তিতুল্য। তিনি লাশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোলাতেই চোখে পড়ল কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি পুরনো লোহার ১০ কেজির বাটখারা, যার গায়ে ছোপ ছোপ রক্ত। রায়হান গ্লাভস পরা হাতে বাটখারাটি তুলে নিলেন। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। ১০ কেজির একটি লোহার বাটখারা হাতে নিলে যতটা ভারী লাগার কথা, এটি ততটা ভারী লাগছে না। তিনি তার সহকারীকে দিয়ে ফরেনসিক ডিজিটাল স্কেলে সেটি মাপালেন। ওজন দেখাল মাত্র ৯ কেজি ২০০ গ্রাম! ভেতর থেকে লোহা গলিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে এর ওজন কমানো হয়েছে, যা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।

রায়হানের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল। কারণ, গত ছয় মাসে এই এলাকার আরও চারজন বড় ব্যবসায়ী রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছেন। ইউনূস মিয়া হলেন পঞ্চম এবং শেষ শিকার। সিন্ডিকেটের অন্ধকার জগৎ ও তদন্তের জাল রায়হান গোডাউনের হিসেবের খাতা এবং ডিজিটাল-ম্যানুয়াল সব স্কেল পরীক্ষা করলেন। বেরিয়ে এলো এক ভয়ংকর সত্য। ইউনূস মিয়া একা নন, গত ছয় মাসে খুন হওয়া বাকি চারজন ব্যবসায়ী মিলে এই এলাকায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তারা এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার সময় দামে তো ঠকাতোই, পাশাপাশি এই বিশেষ বাটখারা ও স্কেল ব্যবহার করে ওজনেও কম দিত। আবার যখন তারা সেই ধান বা চাল বিক্রি করত, তখন অন্য স্কেল ব্যবহার করে ওজনে গরমিল করত। এই পাঁচজনের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি ছিল পুরো এলাকার কৃষকরা।

​তদন্তের স্বার্থে রায়হান কেবল এই হত্যাকাণ্ডের দিকেই ফোকাস করলেন না। তিনি গত এক বছর ধরে ইউনূস মিয়ার কাছে ধান বিক্রি করেছে, এমন কৃষকদের তালিকা বের করলেন। তাদের পারিবারিক অবস্থা, ব্যাংক ব্যালেন্স, আত্মীয়-স্বজনের তথ্য এবং সাম্প্রতিক জীবনের ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর ডেটা বিশ্লেষণ করলেন।
​বিশ্লেষণ শেষে তিনি আটজন কৃষককে থানায় ডেকে পাঠালেন। টানা কয়েকদিন ধরে চলল ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু কেউ মুখ খুলল না। তাদের চোখেমুখে চাপা ক্ষোভ থাকলেও, খুনের কথা কেউ স্বীকার করল না।

​রায়হান হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি ওই আট জনের প্রোফাইল আরও গভীরভাবে যাচাই করে মাত্র তিনজনকে আলাদা করলেন, যাদের জীবনে এই সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল এবং ইউনূসকে খুন করার সবচেয়ে জোরালো মোটিভ যাদের আছে।
​এই তিনজনের মধ্যে একজন ছিল সোলায়মান। ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ কৃষক। রায়হান সোলায়মানের অতীত নিয়ে আরও ঘাঁটাঘাঁটি করলেন এবং মেডিকেল রিপোর্ট ও ইউনিয়ন পরিষদের ডেটাবেজ থেকে এমন কিছু তথ্য পেলেন, যা তাকে স্তব্ধ করে দিল। রায়হান সোলায়মানকে আলাদা একটি ইন্টারোগেশন রুমে নিয়ে এলেন।

​টেবিলের ওপাশে শান্ত হয়ে বসে আছে সোলায়মান। চেহারায় কোনো ভীতি নেই, বরং এক অদ্ভুত শীতলতা। ​রায়হান শান্ত কণ্ঠে বললেন, গত বিশ বছর ধরে আপনি ইউনূস মিয়া আর তার সিন্ডিকেটের কাছে ধান বিক্রি করছেন। আপনার মেয়েটা ক্যান্সারে ভুগছিল। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার ছিল। আপনি আপনার শেষ সম্বলটুকুর ফসল তাদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সিন্ডিকেট করে আপনাকে ন্যায্য দাম তো দেয়ইনি, উল্টো কারচুপির বাটখারা দিয়ে আপনার ফসল মেপে অর্ধেক দাম ধরিয়ে দেয়। টাকার অভাবে গত বছর আপনার মেয়েটা মারা যায়।

​সোলায়মান পাথরের মতো বসে রইল।
​রায়হান টেবিলের ওপর পাঁচটি ফাইল ছুড়ে দিয়ে বললেন, আপনি যখন জানতে পারলেন যে শুধু দামেই নয়, গত বিশ বছর ধরে ওজনেও তারা আপনাকে ঠকিয়ে এসেছে, তখন আপনার রাগের পাহাড় আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে। আপনি হিসাব করে দেখলেন, যদি তারা আপনাকে ন্যায্য দাম এবং সঠিক ওজন দিত, তবে আপনার যে টাকা জমতো, তা দিয়ে আপনার মেয়েটার চিকিৎসা করানো যেত। আপনার মেয়ে আজ বেঁচে থাকতো। তাই না?

​সোলায়মান এবার মুখ তুলল। তার চোখে কোনো জল নেই, আছে ভয়ংকর এক শূন্যতা। সে ধীর কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ, স্যার। আমি খুন করেছি। শুধু ইউনূসকে নয়, গত ছয় মাসে খুন হওয়া বাকি চারজনকেও আমিই নিজের হাতে মেরেছি। ওরা মানুষ ছিল না, জোঁক ছিল। তিল তিল করে গত বিশ বছর ধরে ওরা আমার ও এলাকার কৃষকদের রক্ত চুষে খেয়েছে। ইউনূস ছিল ওই সিন্ডিকেটের শেষ সদস্য। গতকাল রাতে আমি তার ওই ঠকানোর বাটখারাটা দিয়েই তার মাথা থেঁতলে দিয়েছি। সোলায়মান একটু থামল, তারপর রায়হানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, আমার মেয়েটা বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরেছে স্যার। আজ ইউনূসকে শেষ করার পর আমার বুকে আর কোনো কষ্ট নেই। আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আপনি আমাকে ফাঁসি দিয়ে দিন।

​সোলায়মানের স্বীকারোক্তি শোনার পর ইন্টারোগেশন রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। রায়হানকে আইনের রক্ষক হিসেবে সোলায়মানকে গ্রেপ্তার করতে হয়েছে। সিরিয়াল কিলার হিসেবে তার হয়তো ফাঁসিই হবে। কিন্তু রায়হানের হৃদয় এক অদ্ভুত বিষাদে ভরে গেল।
​সেদিন রাতে ডিউটি শেষে রায়হান তার চেম্বারে বসে ডায়েরিটা খুললেন। এই কেসটি তাকে পবিত্র কোরআনের একটি নির্দিষ্ট সূরার কথা গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিল। তিনি ডায়েরির পাতায় লিখলেন, আজকের কেসটি আমাকে সূরা আল-মুতাফফিফীন-এর কথা মনে করিয়ে দিল। মহান আল্লাহ দেড় হাজার বছর আগেই এই ভয়ংকর অপরাধের কথা উল্লেখ করে সূরার শুরুতেই বলেছেন, দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (আয়াত: ১-৩)

​রায়হান কলম থামিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন। রাতের নিস্তব্ধতায় তার মনে হলো, ইউনূস মিয়া ও তার সিন্ডিকেট হয়তো ভেবেছিল তাদের এই সূক্ষ্ম চুরি, এই সিন্ডিকেট কেউ কোনোদিন ভাঙতে পারবে না। তারা ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ ছিল। কিন্তু মানুষের হক নষ্ট করার পরিণতি যে কত ভয়ংকর হতে পারে, তা তারা বুঝতে পারেনি। ​তিনি আবার লিখতে শুরু করলেন,
​ইউনূস মিয়ারা দুনিয়ার চোখে হয়তো সফল ব্যবসায়ী ছিল, কিন্তু তাদের এই লোভ শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংস ডেকে আনল। আল্লাহ এই সূরার ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? এক মহা দিনে!

​দুনিয়ার আদালতে আজ সোলায়মান খুনি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শাস্তি তাকে পেতেই হবে। কিন্তু ইউনূস মিয়া আর তার সিন্ডিকেট যে বিশ বছর ধরে অসংখ্য মানুষের রক্ত চুষে সম্পদের পাহাড় গড়েছিল, তার নিখুঁত বিচার হবে আখেরাতের আদালতে। দুনিয়ার পাল্লায় তারা মানুষকে ঠকিয়েছে, কিন্তু আখেরাতের পাল্লায় আজ তারা সম্পূর্ণ দেউলিয়া। ডায়েরিটা বন্ধ করে রায়হান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। টেবিলের ওপর রাখা সেই ৯ কেজি ২০০ গ্রামের বাটখারাটার দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন,দুনিয়া এবং আখেরাত, দুই জগতেই এই অদৃশ্য পাল্লাগুলোই একদিন মানুষের ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সমাপ্ত

0 Comments