জর্জর্দানো ব্রুনো: মহাবিশ্ব নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করায় যাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল
নোলার এই মহান দার্শনিকের জীবন, বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা, বিপজ্জনক ভ্রমণ, নাটকীয় বিচার এবং অমর কীর্তি নিয়ে দশ অধ্যায়ের এক বিস্তারিত আলোচনা। যিনি এক অসীম মহাবিশ্ব এবং তাতে অসংখ্য জগতের অস্তিত্বের কথা কল্পনা করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
অধ্যায় ১: উত্তাল রেনেসাঁ – একজন বিদ্রোহী চিন্তাবিদের পটভূমি
ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ ছিল এক চরম ওলটপালটের যুগ। ১৫৪৩ সালে নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর এক বইতে অত্যন্ত শান্তভাবে দাবি করেছিলেন যে, সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত সমাজে প্রাচীন টলেমি ও অ্যারিস্টটলের ধারণাই রাজত্ব করছিল। সেই প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব ছিল সীমিত এবং পৃথিবী ছিল তার কেন্দ্রে। পৃথিবীকে ঘিরে ছিল কিছু স্বচ্ছ গোলক, যার সবচেয়ে বাইরের স্তরে ছিল স্থির নক্ষত্ররাজি। আর মানুষ ছিল ঈশ্বরের সৃষ্টির একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে, যা ছিল এক বিশেষ মর্যাদার প্রতীক।
ক্যাথলিক চার্চ এবং তাদের ধর্মীয় আদালত (ইনকুইজিশন) এই পুরনো মহাবিশ্বের ধারণাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে রক্ষা করত। ঠিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই জন্ম নেন এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি কোপার্নিকাসের ধারণাকে আরও অনেক দূর নিয়ে গিয়েছিলেন। জর্জর্দানো ব্রুনো কেবল একজন সাধারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, কবি এবং আধ্যাত্মিক সাধক। দূরবীন আবিষ্কার হওয়ারও বহু শতাব্দী আগে তিনি আজকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অসীম মহাবিশ্বের ধারণাটি নিখুঁতভাবে অনুমান করেছিলেন। নিজের এই স্বাধীন চিন্তার জন্য তিনি কোনো আপস করেননি এবং এর জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য চুকাতে হয়েছিল।
অধ্যায় ২: নোলা থেকে মঠের জীবন – শৈশব ও সন্ন্যাস জীবন
১৫৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইতালির নেপলস রাজ্যের নোলা নামের এক ছোট শহরে ফিলিপ্পো ব্রুনো (ব্রুনোর ছোটবেলার নাম) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জোভান্নি ব্রুনো ছিলেন একজন সাধারণ সৈনিক এবং মা ছিলেন ফ্রাউলিসা সাভোলিনা। তাঁর শৈশব সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না, তবে কৈশোরেই তিনি মানবিক বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা ও তর্কবিদ্যা শেখার জন্য নেপলসে চলে যান।
১৫৬৫ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি নেপলসের বিখ্যাত ‘সান ডোমেনিকো মাজ্জোরে’ মঠে যোগ দেন। সেখানে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘জর্জর্দানো’ এবং একজন সন্ন্যাসী হিসেবে কঠোর জীবন শুরু করেন। ব্রুনো ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু চঞ্চল স্বভাবের ছাত্র। তিনি ধর্মতত্ত্ব, দর্শনের পাশাপাশি মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর প্রাচীন কৌশল নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন।
১৫৭২ সালে তিনি পাদ্রি (পুরোহিত) হিসেবে দীক্ষা নেন। ওপর ওপর তিনি চার্চের নিয়ম মেনে চললেও, মনের ভেতরে তাঁর স্বাধীন চিন্তার জন্ম নিচ্ছিল। মঠে থাকার সময়ই তিনি চার্চের নিষিদ্ধ কিছু বই পড়ে ফেলেন, যা ঈশ্বরের প্রচলিত রূপ নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি করতে শুরু করে।
অধ্যায় ৩: সন্দেহের বীজ – মঠের ভেতরেই চিন্তার জাগরণ
মঠের ভেতরের কঠোর ও একঘেয়ে পড়াশোনা ব্রুনোর কাছে দমবন্ধকর মনে হতো। তিনি এমন কিছু প্রাচীন বই পড়তে শুরু করেন যেখানে মহাবিশ্বকে জীবন্ত, আন্তঃসংযুক্ত এবং ঐশ্বরিক শক্তিতে ভরপুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
এর ফলে চার্চের কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। ব্রুনো প্রকাশ্যে এমন কিছু ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন যা চার্চের চোখে অপরাধ ছিল। ১৫৭৬ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহীতার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার প্রস্তুতি চলে। বিষয়টি বুঝতে পেরে ২৮ বছর বয়সী এই সন্ন্যাসী মঠের পোশাক ত্যাগ করে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর এভাবেই শুরু হয় তাঁর যাযাবর জীবন। মঠের নিয়ম থেকে মুক্ত হয়ে ব্রুনো পরম সত্যের সন্ধানে নেমে পড়েন—তা চার্চের নিয়মের যতই বিরুদ্ধে যাক না কেন।
অধ্যায় ৪: নির্বাসিত জীবন – এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়ানো
ব্রুনোর এই যাযাবর জীবন শুরু হয় রোম থেকে। এরপর ১৫৭৮ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পৌঁছান। সেখানে তিনি প্রুফরিডার হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু জেনেভাও মুক্ত চিন্তার জন্য নিরাপদ ছিল না। ওখানকার একজন অধ্যাপকের সমালোচনা করে একটি লেখা প্রকাশ করায় তিনি চার্চের ক্ষোভের মুখে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে জেনেভা ত্যাগ করেন।
এরপর তিনি ফ্রান্সে যান। ফ্রান্সের তুলুজ শহরে দর্শন পড়িয়ে তিনি প্যারিসের মানুষের নজর কাড়েন। ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরি ব্রুনোর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে আশ্রয় দেন। কিন্তু ব্রুনোর স্পষ্টভাষী ও একগুঁয়ে স্বভাবের কারণে সেখানেও বিরোধ তৈরি হয়। ১৫৮৩ সালে ফরাসি রাজার সুপারিশপত্র নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং লন্ডনে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের অতিথি হিসেবে বসবাস শুরু করেন।
ইংল্যান্ডে কাটানো সময়টা ব্রুনোর জীবনের অন্যতম সেরা সময় ছিল। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন (যদিও সেখানকার রক্ষণশীল অধ্যাপকরা তাঁকে খুব একটা পছন্দ করেননি)। এই ইংল্যান্ডে বসেই ১৫৮৩ থেকে ১৫৮৫ সালের মধ্যে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই ও সংলাপগুলো লিখেছিলেন, যেখানে তিনি মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর চূড়ান্ত ধারণা প্রকাশ করেন।
অধ্যায় ৫: অসীম মহাবিশ্বের উন্মোচন – ব্রুনোর বৈপ্লবিক মহাজাগতিক ধারণা
এই অধ্যায়টিই হলো ব্রুনোর চিন্তাভাবনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই অসাধারণ ধারণার কারণেই ইতিহাস তাঁকে একজন দূরদর্শী মহাকাশ বিপ্লবী হিসেবে চিরকাল মনে রাখবে।
সে যুগের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব ছিল সীমাবদ্ধ এবং পৃথিবী ছিল তার কেন্দ্রে। আর নক্ষত্রদের সীমানার বাইরে ছিল ঈশ্বরের স্বর্গ। ব্রুনো এই প্রাচীন চিন্তাভাবনার দেওয়াল পুরোপুরি ভেঙে ফেলেন। ১৫৮৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন বইয়ে (যেমন: অন দ্য ইনফিনিট ইউনিভার্স অ্যান্ড ওয়ার্ল্ডস) তিনি দাবি করেন—এই মহাবিশ্ব অসীম, এর কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই এবং কোনো শেষ সীমানাও নেই।
তিনি ঘোষণা করেন, রাতের আকাশে আমরা যে তারা বা নক্ষত্রগুলো দেখি, সেগুলো কোনো কাঁচের গোলকে আটকে থাকা আলোর বিন্দু নয়। সেগুলো আসলে আমাদের সূর্যের মতোই একেকটি দূরবর্তী সূর্য! আর আমাদের সূর্যের চারপাশে যেমন গ্রহরা ঘুরছে, তেমনি সেই দূরান্তের সূর্যগুলোকে কেন্দ্র করেও ঘুরছে অসংখ্য গ্রহ (যাদের আজ আমরা ‘বহির্গ্রহ’ বা এক্সোপ্ল্যানেট বলি)। ব্রুনো আরও বলেন, “মহাবিশ্বে এমন অসংখ্য সূর্য এবং কোটি কোটি গ্রহ রয়েছে, যা আমাদের ধারণারও বাইরে।” এমনকি এই দুনিয়াগুলোর কোনো কোনোটিতে আমাদের মতো প্রাণও থাকতে পারে। মহাবিশ্ব কোনো বন্ধ পেঁয়াজের খোসার মতো নয়, বরং এটি এক সীমাহীন বিস্তার।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রুনো আরও গভীরে গিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর কোনো দূর আকাশে বসে থাকা আলাদা সত্তা নন, বরং ঈশ্বর স্বয়ং এই অসীম ও জীবন্ত প্রকৃতির মাঝেই মিশে আছেন। মহাবিশ্বে পরম বলতে কোনো ‘ওপর-নিচ’ বা ‘কেন্দ্র’ নেই; সব গতিই আপেক্ষিক।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, পবিত্র বাইবেলের শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা উন্নত করার জন্য, বৈজ্ঞানিক ভূগোলের বিবরণ দেওয়ার জন্য নয়। ব্রুনোর এই মহাজাগতিক তত্ত্ব কোনো জটিল গণিতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি, বরং তা এসেছিল তাঁর গভীর উপলব্ধি থেকে: তাঁর যুক্তি ছিল, ঈশ্বর যদি অসীম হন, তবে তাঁর সৃষ্টিও কেন অসীম হবে না? এই চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও কাব্যিক। তবে তৎকালীন ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট—উভয় পক্ষের ধর্মগুরুদের কাছেই এটি ছিল চরম অপরাধ, কারণ তারা বিশ্বাস করত মহাবিশ্ব ছোট এবং মানুষই তার একমাত্র প্রধান অংশ।
অধ্যায় ৬: ইউরোপজুড়ে যাত্রা – ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং তার বাইরে
ইংল্যান্ড ছাড়ার পর ব্রুনো আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং এরপর জার্মানির বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ান। তিনি জার্মানির ভিটিনবার্গে শিক্ষকতা করেন, হেল্মস্টেটে লুথারান চার্চের ক্ষোভের মুখে পড়েন এবং ফ্রাঙ্কফুর্টে তাঁর নতুন বই প্রকাশ করেন। এই সময়ে তিনি ল্যাটিন ভাষায় বেশ কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি পরমাণু এবং অসীম মহাবিশ্ব নিয়ে তাঁর চিন্তাকে আরও নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন।
ব্রুনো যেখানেই গেছেন, সেখানেই মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিজের ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কখনো কখনো অহংকারের পর্যায়ে চলে যেত। তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা ও জাদুকরী স্মৃতিশক্তি রাজদরবারের বড় বড় মানুষদের মুগ্ধ করত, ঠিক তেমনি পুরনো ও গোঁড়া পণ্ডিতদের আক্রমণ করার স্বভাব রক্ষণশীলদের তাঁর শত্রুতে পরিণত করত। তিনি নিজের বুদ্ধি ও প্রতিভাকে ভরসা করে বেঁচে ছিলেন—বিতর্ক করা, পড়ানো এবং বই প্রকাশ করাই ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু অসীম মহাবিশ্বের স্বপ্ন দেখা এই মানুষটি নিজের জন্য এই সীমাবদ্ধ ও অনুদার পৃথিবীতে একটি স্থায়ী বাড়ি বা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাননি।
অধ্যায় ৭: কলম ও তলোয়ার – প্রধান রচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ
ব্রুনোর লেখার পরিধি ছিল বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর লেখার শৈলী ছিল নাটকীয়, আক্রমণাত্মক এবং ব্যঙ্গাত্মক। তিনি তাঁর বিরোধীদের যুক্তি দিয়ে কোণঠাসা করতেন এবং একই সাথে প্রাচীন দর্শন ও কোপার্নিকাসের আধুনিক বিজ্ঞানকে মিলিয়ে এক নতুন তত্ত্ব তৈরি করতেন।
তাঁর মূল কথা ছিল, দর্শন এবং ধর্মের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। ধর্ম সাধারণ মানুষকে ভালো পথে চলতে গাইড করে, আর দর্শন জ্ঞানীদের আলোর পথ দেখায়। চার্চের কিছু মূল নিয়ম (যেমন—ঈশ্বরের প্রচলিত ত্রিত্ববাদ বা ট্রিনিটি তত্ত্ব এবং চিরস্থায়ী নরকের ধারণা) অস্বীকার করায় তিনি চার্চের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ফলস্বরূপ, চার্চের পক্ষ থেকে তাঁর বইগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
অধ্যায় ৮: ভেনিসের ফাঁদ – ইতালিতে প্রত্যাবর্তন এবং বিশ্বাসঘাতকতা
দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটানোর পর, ১৫৯১ সালে ব্রুনো ইতালিতে ফিরে আসার এক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, ভেনিসের কোনো উদার শিল্পপ্রেমী বা অভিজাত ব্যক্তি তাঁর স্মৃতিশক্তির কৌশল এবং দর্শনের কদর করবেন ও তাঁকে আশ্রয় দেবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি জোভান্নি মোচেনಿಗো নামের ভেনিসের এক ধনীর বাড়িতে অতিথি হিসেবে ওঠেন এবং তাঁকে স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর বিদ্যা শেখাতে শুরু করেন।
কিন্তু মোচেনিগোর সাথে ব্রুনোর সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। হতে পারে তা পারিশ্রমিক নিয়ে অমিল বা ব্রুনোর চার্চ-বিরোধী স্বাধীন চিন্তার কারণে। ১৫৯২ সালের মে মাসে মোচেনিগো চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং ব্রুনোর বিরুদ্ধে ভেনিসের ধর্মীয় আদালতের (ইনকুইজিশন) কাছে নালিশ করেন। চার্চের নির্দেশে ব্রুনোকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করা হয়। ভেনিসের আদালতে তাঁর বিচার শুরু হলে তিনি তাঁর কিছু বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও মহাবিশ্ব সংক্রান্ত তাঁর মূল বৈপ্লবিক তত্ত্বগুলো থেকে এক চুলও নড়েননি। এরপর ১৫৯৩ সালে তাঁকে রোমের কেন্দ্রীয় আদালতের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যেখানে রোমান ইনকুইজিশন তাঁর বিচারের দায়িত্ব নেয়।
অধ্যায় ৯: রোমের বিচার – ইনকুইজিশনের বিরুদ্ধে অসীম মহাবিশ্বের পক্ষে লড়াই
রোমের আদালতে ব্রুনোর এই বিচার চলেছিল দীর্ঘ প্রায় আট বছর (১৫৯৩-১৬০০)। এই সময়ে তাঁকে অসংখ্য বিষয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রধান অভিযোগগুলো ছিল:
চার্চের প্রচলিত প্রার্থনা ও নিয়মকানুনকে অস্বীকার করা।
ঈশ্বরের প্রচলিত ত্রিত্ববাদ (ট্রিনিটি) এবং যীশু খ্রীষ্টের অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
চিরস্থায়ী নরক এবং কুমারী মেরির অলৌকিক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা।
পুনর্জন্ম বা আত্মার এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তর হওয়া নিয়ে মতামত প্রচার করা।
মহাবিশ্বকে অসীম এবং তাতে অসংখ্য জগতের অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করা।
জাদুবিদ্যা চর্চা করা এবং সবকিছুর মাঝে ঈশ্বর আছেন—এমন আধ্যাত্মিক মতবাদে বিশ্বাস রাখা।
ব্রুনো অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ়তার সাথে নিজের পক্ষে যুক্তি লড়েছিলেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, তাঁর অনেক কথাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে মহাবিশ্বের অসীমতা এবং জগতের প্রকৃতির প্রশ্নে তিনি নিজের অবস্থানে একেবারে অটল ছিলেন। রবার্ট বেলারমিনের মতো চার্চের প্রভাবশালী কার্ডিনালরা তাঁকে তাঁর ভুল স্বীকার করার জন্য চাপ দেন। ১৫৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে তাঁর ‘ভুল’ ধারণাগুলো লিখিতভাবে প্রত্যাহার করার শেষ সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্রুনো তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন, বিশেষ করে মহাবিশ্ব সংক্রান্ত তাঁর মূল বৈপ্লবিক তত্ত্বগুলো থেকে তিনি এক চুলও সরতে রাজি হননি।
১৬০০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চার্চের আদালত তাঁকে একজন “অনুতপ্ত না হওয়া, একগুঁয়ে এবং চরম ধর্মদ্রোহী” হিসেবে ঘোষণা করে। চার্চের পক্ষ থেকে তাঁর পাদ্রি বা সন্ন্যাসীর মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয় এবং শাস্তির জন্য তাঁকে রোমের নগর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রায় শোনার পর আদালতের বিচারকদের উদ্দেশ্যে ব্রুনো তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন: “হয়তো এই রায় দেওয়ার সময় আমার চেয়ে আপনারা নিজেরাই বেশি ভয়ে কাঁপছেন।”
অধ্যায় ১০: চিরন্তন অগ্নিশিখা – আত্মত্যাগ, উত্তরাধিকার এবং এক অপরাজেয় আত্মা
১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। জর্জর্দানো ব্রুনোকে রোমের ‘কাম্পো দে ফিওরি’ (Campo de’ Fiori) চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সবার সামনে তাঁকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে একটি কাঠের খুঁটির সাথে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময়ের বিবরণ অনুযায়ী, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ব্রুনো ছিলেন একদম শান্ত। এমনকি যীশু খ্রীষ্টের ক্রুশবিদ্ধ মূর্তির দিক থেকে তিনি নিজের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর সব বইপত্র জনসমক্ষে পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর চিন্তাভাবনাকে নিষিদ্ধ করা হয়।
ব্রুনোকে কেবল তাঁর মহাকাশ সংক্রান্ত ধারণার জন্যই মরতে হয়নি। এর পেছনে ছিল তাঁর ধর্মীয় মতবিরোধ, স্বাধীন দর্শন এবং চার্চের কাছে মাথা নত না করার একগুঁয়ে মনোভাব। তবুও, কোনো কেন্দ্র ছাড়া এক অসীম মহাবিশ্বের ধারণা এবং তাতে অজস্র জগতের অস্তিত্বের যে তত্ত্ব তিনি দিয়েছিলেন, তা চার্চ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। কারণ এই চিন্তাটি চার্চের সেই পুরনো ধারণাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, যা বিশ্বাস করত যে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং মানুষই ঈশ্বরের একমাত্র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
গত কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রুনো মুক্ত চিন্তার এক মহান প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ১৮৮৯ সালে রোমের ঠিক সেই ‘কাম্পো দে ফিওরি’ চত্বরে—যেখানে তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল—শিল্পী ইত্তোরে ফেরারি-র তৈরি ব্রুনোর একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়। মুক্ত চিন্তার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা এই মহান দার্শনিককে সম্মান জানাতেই এটি করা হয়েছিল।
আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে যখন নতুন নতুন গ্রহ (বহির্গ্রহ) আবিষ্কার হচ্ছে এবং পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান চলছে, তখন ব্রুনোর সেই বহু পুরনো সাহসী ভাবনার কথাই বারবার মনে পড়ে যায়। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য কখনো কখনো চড়া মূল্য দিতে হয়। কিছু স্বপ্ন বা ভাবনা এত বিশাল হয় যে, তা পুড়িয়ে মারার আগুনকেও জয় করে টিকে থাকে।
জর্জর্দানো ব্রুনোকে অনেক কারণে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল—যখন তাঁর মন এক অসীম মহাবিশ্বকে দেখতে পাচ্ছিল, তখন তিনি চার্চের চাপিয়ে দেওয়া এক ছোট ও সীমাবদ্ধ মহাবিশ্বকে মেনে নিতে রাজি হননি। নোলার এই দূরদর্শী মানুষটি মানুষের কল্পনার জগতে এমন এক আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, যা আজও জ্বলছে। তাঁর এই আত্মত্যাগ চিরকাল মানুষকে প্রচলিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সাহস জুগিয়ে যাবে।

