জালালুদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩), যিনি মওলানা (“আমাদের মাস্টার” বা “আমাদের গুরু”) নামেও পরিচিত, ছিলেন ১৩ শতকের একজন পারস্য কবি, ইসলামি পণ্ডিত এবং সুফি সাধক। বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ শহরে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন তুরস্কের কোনিয়া শহরে। তাঁর কবিতা—মূলত মসনবি এবং দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি—ঐশ্বরিক প্রেম, আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা এবং ঈশ্বরের সাথে আত্মার মিলনের যাত্রার এক পরম উদ্যাপন। রুমির বাণী ধর্ম ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে সরাসরি ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ এবং অস্তিত্বের সুন্দরের কথা বলে।
১. বাঁশির আর্তনাদ
(মসনবি-র শুরুর অংশ)
শোনো এই বাঁশির কথা, সে কী কাহিনী শোনায়,
সে সুর গেয়ে চলে বিরহের বিষাদ।
যেদিন থেকে ওরা আমাকে আমার নলখাগড়ার বন থেকে কেটে এনেছে,
আমার সেই রোদন পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সবার চোখে জল এনেছে।
আমি এমন এক হৃদয় চাই যা ব্যাকুলতায় ছিন্নভিন্ন,
যেন এই প্রেমের যন্ত্রণা আমি তার সাথে ভাগ করে নিতে পারি।
যে কেউ তার আপন উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে,
সে চিরকাল ব্যাকুল হয়ে ঘোরে সেই মিলনেরstate-এ ফিরে যাওয়ার জন্য।
২. অতিথিশালা
এই মানবজীবন হলো একটা অতিথিশালা।
প্রতিটি সকাল যেন এক নতুন অতিথির আগমন।
কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ, কখনো বা ক্ষুদ্রতা,
কিংবা ক্ষণিকের কোনো এক সচেতনতা আসে
এক অপ্রত্যাশিত অতিথি হয়ে।
তাদের সবাইকে স্বাগত জানাও এবং আপ্যায়ন করো!
এমনকি তারা যদি একদল শোকও হয়,
যারা এসে তোমার ঘরটাকে একদম ফাঁকা করে দেয়
সব আসবাবপত্র ভেঙে চুরে,
তবুও, প্রতিটি অতিথিকে সম্মানের সাথে দেখবে।
হতে পারে সে তোমাকে ভেতর থেকে খালি করে দিচ্ছে
কোনো এক নতুন আনন্দের পথ তৈরি করতে।
ভেতরের অন্ধকার চিন্তা, লজ্জা কিংবা হিংসা,
দরজায় দাঁড়িয়ে হেসেই তাদের মুখোমুখি হও,
এবং ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানাও।
যে-ই আসুক না কেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো,
কারণ প্রত্যেকেই প্রেরিত হয়েছে
ওপারের এক একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে।
৩. এসো, এসো, তুমি যে-ই হও না কেন
এসো, এসো, তুমি যে-ই হও না কেন।
পথিক, উপাসক, কিংবা বারবার পথ হারানো প্রেমিক।
তাতে কিছুই এসে যায় না।
আমাদের এই কাফেলা কোনো হতাশার কাফেলা নয়।
এসো, এমনকি তুমি যদি তোমার প্রতিজ্ঞা ভেঙে থাকো
হাজার বারও।
তবুও এসো, আরও একবার, এসো, এসো।
৪. ধারণার ওপারে
ভালো কাজ আর মন্দ কাজের ধারণার অনেক ওপারে,
একটা মাঠ আছে। আমি তোমার সাথে সেখানে দেখা করব।
যখন আত্মা সেই ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে,
তখন পৃথিবীটা এতটাই পরিপূর্ণ মনে হয় যে কথা বলার ভাষা থাকে না।
ধারণা, ভাষা, এমনকি “একে অপরকে” শব্দবন্ধটিও
তখন আর কোনো অর্থ বহন করে না।
৫. যেদিন আমি প্রথম প্রেমের গল্প শুনেছিলাম
যেদিন আমি প্রথম প্রেমের গল্প শুনেছিলাম,
সেদিন থেকেই আমি তোমাকে খুঁজতে শুরু করি, না জেনেই
যে সেটা কতটা অন্ধের মতো খোঁজা ছিল।
প্রেমিকরা আসলে শেষমেশ কোথাও গিয়ে মিলিত হয় না।
তারা তো শুরু থেকেই একে অপরের ভেতরেই বিরাজ করে।
৬. যখন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, তখন নাচো
নাচো, যখন তুমি ভেতরে একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছ।
নাচো, যদি তুমি তোমার ক্ষতের ব্যান্ডেজটা ছিঁড়ে ফেলেছ।
নাচো, যখন চারপাশে তুমুল লড়াই চলছে।
নাচো, নিজের রক্তের মাঝে দাঁড়িয়ে।
নাচো, যখন তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীন।
৭. শোক কোরো না
শোক কোরো না। তুমি যা কিছু হারাবে, তা ঘুরেফিরে আসবেই
অন্য কোনো এক রূপে।
যে শিশু মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়,
সে-ই তো পরে সুরা পান করতে শেখে।
যে প্রেমিককে তুমি ভেবেছিলে চিরতরে হারিয়ে গেছে,
সে-ই আবার ফিরে এসেছে অন্য কোনো বেশে।
৮. প্রেমিকরা কোথাও গিয়ে মিলিত হয় না
প্রেমিকরা আসলে শেষমেশ কোথাও গিয়ে মিলিত হয় না।
তারা তো শুরু থেকেই একে অপরের ভেতরেই বিরাজ করে।
৯. তুমি যা খুঁজছ, তা-ই তোমাকে খুঁজছে
তুমি যা খুঁজছ, তা-ই তোমাকে খুঁজছে।
তোমার ভেতরে যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা আসলে পরম প্রিয়তমের টান।
তা থেকে পালিয়ে যেয়ো না।
ওটা তো তোমার নিজের আত্মাই, যে তোমাকে ঘরে ফেরার ডাক দিচ্ছে।
১০. আমি তোমার চাঁদ
আমি তোমার চাঁদ এবং তোমার চাঁদের আলোও।
আমি তোমার ফুলের বাগান এবং তোমার জলও।
আমি এতটা পথ হেঁটে এসেছি শুধু তোমার আকুলতায়,
পায়ে কোনো জুতো নেই, গায়ে কোনো চাদর নেই।
আমি চাই তুমি হাসো
যাতে তোমার সব দুশ্চিন্তা মুছে যায়,
আমি চাই তোমাকে ভালোবাসতে
যাতে তোমার প্রাণ পুষ্টি পায়।
ওহ মধুর তিক্ততা!
আমি তোমাকে সান্ত্বনা দেব এবং তোমায় সুস্থ করব।
আমি তোমার জন্য গোলাপ নিয়ে আসব।
আমিও তো একসময় কাঁটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলাম।
রুমির কবিতা কেবল পড়ার জন্য নয়—তা আসলে অনুভব করার জন্য। তাঁর শব্দগুলো আমাদের মনের সীমানা পেরিয়ে হৃদয়ের সেই গভীরে নিয়ে যায়, যেখানে পরম প্রেম সমস্ত বিচ্ছিন্নতা দূর করে দেয়।
জালালুদ্দিন রুমি (Jalaluddin Rumi, ১২০৭–১২৭৩)
জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি, যিনি মেভলানা (আমাদের মাস্টার) নামে পরিচিত, ছিলেন মধ্যযুগীয় ইসলামের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি কবি, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তাঁর কবিতা ঐশ্বরিক প্রেম, আত্মিক আকাঙ্ক্ষা এবং মানবজাতির সার্বজনীন ঐক্যের গভীর অনুভূতিতে ভরপুর। আজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিদের একজন হিসেবে তিনি সীমানা, ধর্ম ও সংস্কৃতি অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
জন্ম ও প্রথম জীবন
৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ সালে বর্তমান আফগানিস্তানের বালখ শহরে রুমির জন্ম। তাঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন একজন বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ও সুফি শিক্ষক। শৈশবেই রুমি ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চর্চায় মগ্ন হয়ে পড়েন।
মঙ্গোল আক্রমণের ভয়ে পরিবার ১২১৯ সালের দিকে বালখ ত্যাগ করে। দীর্ঘ ভ্রমণের পর তারা আনাতোলিয়ার (বর্তমান তুরস্ক) কোনিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কোনিয়ায় এসে রুমি পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ধর্মীয় শিক্ষক ও বিচারক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
শামস তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ
১২৪৪ সালে রুমির জীবনে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে। তিনি শামসুদ্দিন মুহাম্মদ তাবরিজি (শামস তাবরিজি) নামে এক অদ্ভুত সুফি সাধকের সঙ্গে পরিচিত হন। শামস ছিলেন রুমির আধ্যাত্মিক গুরু ও প্রিয়তম। তাঁর সঙ্গে রুমির দেখা হওয়ার পর তাঁর জীবন ও কবিতা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
শামসের সঙ্গে রুমির সম্পর্ক ছিল ঐশ্বরিক প্রেমের প্রতীক। শামস চলে যাওয়ার পর রুমি গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এই বেদনা ও আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁর অমর কবিতাগুলো জন্ম নেয়।
সাহিত্যকর্ম
রুমির দুটি প্রধান গ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ:
- মসনবি-ই মানবি (Mathnawi): ছয় খণ্ডের বিশাল কাব্যগ্রন্থ। এটি সুফি দর্শন, আধ্যাত্মিক উপাখ্যান ও ঐশ্বরিক প্রেমের বিশ্বকোষ বলা হয়।
- দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি: শামসের উদ্দেশ্যে লেখা আবেগঘন গজল ও কবিতার সংকলন। এতে রুমির আধ্যাত্মিক উন্মাদনা ও প্রেমের উচ্ছ্বাস স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
তাঁর কবিতায় প্রেম, মদ, নাচ, সংগীত ও প্রকৃতির প্রতীক ব্যবহার করে আত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের মিলনের কথা বলা হয়েছে।
দর্শন ও শিক্ষা
রুমি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত প্রেম ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়। তিনি বলতেন, “প্রেম ছাড়া জীবন অর্থহীন।” তাঁর কবিতায় ধর্মীয় সংকীর্ণতা নেই; বরং তিনি সকল মানুষকে ভালোবাসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি:
“যে তোমাকে ভালোবাসে, সে তোমার ধর্ম জিজ্ঞাসা করে না।”
তিনি মানুষকে আত্মজ্ঞান, ধৈর্য ও ঐশ্বরিক প্রেমের পথে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
রুমি কোনিয়াতেই শেষ জীবন কাটান। তাঁর চারপাশে অসংখ্য শিষ্য জড়ো হয়, যারা পরবর্তীকালে মেভলেভি সুফি তরিকা (ঘূর্ণায়মান দরবেশ) প্রতিষ্ঠা করে।
১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩ সালে ৬৬ বছর বয়সে কোনিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর “শেব-ই আরুস” (বিয়ের রাত) হিসেবে পালিত হয়, কারণ তিনি মৃত্যুকে প্রিয়তমের সঙ্গে মিলন বলে মনে করতেন।
উত্তরাধিকার
আজ রুমি শুধু ইসলামি বিশ্বেই নয়, সারা বিশ্বে সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন। তাঁর কবিতা ইংরেজি, বাংলা, জার্মান, স্প্যানিশসহ অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আধুনিক যুগে তিনি শান্তি, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
তাঁর শিক্ষা আজও মানুষকে শেখায় — প্রেমই সবচেয়ে বড় শক্তি, এবং আত্মার প্রকৃত স্বাধীনতা ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের মধ্যেই নিহিত।