✨✨✨কাজী নজরুল ইসলাম ✨✨✨
১. ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যের সুনীল আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক এবং বীর সৈনিক। পরাধীন ভারতের শোষিত মানুষের বুকে তিনি জাগিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্পৃহা। তাঁর লেখনী যেমন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, তেমনি তা প্রেম ও মানবতার চিরন্তন বাণী।এই বিদ্রোহী কবি ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন।
২.শৈশব ও শিক্ষাজীবন:
কবির শৈশব কাটে চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যু হলে তার পরিবার দরিদ্রের মুখোমুখি হন এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব অনেকটা তাঁর উপর পড়ে। অভাবের তাড়নায় কবির শৈশব হয়ে ওঠে আনন্দহীন।
দারিদ্র্যের কারণে নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খণ্ডিত। মক্তবের পড়া শেষ করে তিনি সেখানেই একবছর শিক্ষকতা করেন। বরো বছর বয়সে তিনি লেটোর দলে যোগ দেন এবং দলের জন্য পালাগান রচনা করেন। বস্তুত তখন থেকেই তিনি সৃষ্টিশীল সত্তার অধিকারী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুল এবং বর্ধমানের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। তবে প্রথাগত বাঁধাধরা নিয়মের চেয়ে জীবনের উন্মুক্ত পাঠশালাই ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষালয়।
৩. সৈনিক জীবন:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নজরুল প্রথাগত পড়াশোনা ছেড়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। তারপর তিনি করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করেন এবং তাঁর কর্মদক্ষতার কারণে অতি দ্রুত সাধারণ সৈনিক থেকে ‘হাবিলদার’ পদে উন্নীত হন।সেনানিবাসের শৃঙ্খলিত জীবন নজরুলকে গভীর জীবনবোধ, অস্ত্র চালনা এবং বিশ্বরাজনীতি (যেমন: ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব) সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা দিয়েছিল।
৪.নজরুলের সাহিত্যে পদার্পণ ও অবদান:
মুক্তি
“রানিগঞ্জের অর্জুনপটির বাঁকে
যেখান দিয়ে নিতুই সাঁঝে ঝাঁকে ঝাঁকে
রাজার বাঁধে জল নিতে যায় শহুরে বৌ কলস কাঁখে”—
(কাজী নজরুল ইসলাম)
করাচিতে থাকাকালীন সময়েই কাজী নজরুল ইসলাম এর সাহিত্য জীবনের সূচনা ঘটে। তখন তিনি এই মুক্তি কবিতাটি প্রথম রচনা করেছিলেন।তাবে তার প্রথম প্রকাশিত রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” নামের একটি ছোটগল্প। তিনি ১৯২০ সালে পরিপূর্ণভাবে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বড়দের জন্য যেমন অগ্নিগর্ভ কবিতা লিখেছেন, তেমনি কোমলমতি শিশুদের সুপ্ত মনস্তত্ত্বকে জাগিয়ে তুলতে চমৎকার সব ছড়া, কবিতা ও গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত কাব্যসমূহ- ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘সিন্ধু হিন্দোল’, ‘চক্রবাক’, ‘সন্ধ্যা’, ‘প্রলয়-শিখা’। এছাড়াও তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। অসংখ্য সংগীতের স্রষ্টা নজরুল। দেশাত্মবোধক গান, শ্যামাসংগীত ও গজল রচনায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
৪.ব্রিটিশ আন্দোলেনে নজরুলের কারাবরণ
নজরুলের লেখনী ছিল ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপানোর প্রধান হাতিয়ার। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের অপরাধে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।বিচারে তাঁকে প্রেসিডেন্সি ও হুগলি জেলে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠও তাঁর কণ্ঠ রোধ করতে পারেনি। জেলে বসেই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রবন্ধ, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ ও ‘শিকল পরার গান’ এর মতো অগ্নিঝরা রচনা। জেলে বন্দীদের উপর ব্রিটিশদের অমানবিক অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি টানা ৩৯ দিন অনশন ধর্মঘট পালন করেছিলেন।তার লেখায় তিনি সামাজিক অবিচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।তিনি অন্যায় এর কাছে মাথা নত করেননি। তিনি লিখেছিলেন,,,
বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির
৪. নজরুল এর সাম্যবাদী চেতনা
নজরুল ছিলেন জাত-পাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং শ্রেণীভেদের ঊর্ধ্বে এক খাঁটি মানবতাবাদী কবি। শোষক আর শোষিতের বৈষম্যমূলক সমাজকে ভেঙে তিনি একটি সমতার পৃথিবী গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে ‘মানুষ’। তৎকালীন ভারতীয় সমাজের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক অনন্য সম্প্রীতির সেতু।মানবতার জয়গান গাইতে গিয়ে তিনি শোষিত ও বঞ্চিতদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন:
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ,
অভেদ ধর্ম-জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-
ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
৫.নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় নজরুল এর
ভূমিকা
নারীর সমঅধিকার, সম্মান ও মুক্তির প্রশ্নে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক আপসহীন ও দূরদর্শী কণ্ঠস্বর। সমসাময়িক পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। নজরুল বিশ্বাস করতেন, সভ্যতার অগ্রগতিতে নর এবং নারীর অবদান সমান। পুরুষ সমাজ যুগ যুগ ধরে নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রী বা চার দেয়ালের বন্দি হিসেবে দেখেছে, কিন্তু নজরুল সেই সংকীর্ণ মানসিকতার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে পুরুষদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, পুরুষের বীরত্ব বা বিজয়ের পেছনে নারীর প্রেরণা ও ত্যাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা নারী নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিতে নারীর সমান অংশীদারিত্ব দাবি করে তিনি উচ্চকণ্ঠে গেয়েছিলেন:
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
…কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।”
— (কবিতা: নারী, কাব্যগ্রন্থ: সাম্যবাদী)
৬.কাজী নজরুল ইসলামের অর্জন
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা, কিন্তু অর্জনের দিক থেকে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে, রুটির দোকানে কাজ করে, লেটোর দলে গান গেয়ে, সৈনিকের জীবন কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা বাঙালির জন্য এক অনুপ্রেরণা।
সাহিত্যিক জীবনে সম্মাননা সরূপ তিনি পেয়েছেন অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন: বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে ১৯৪৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।এছাড়াও তিনি পেয়েছেন একুশে পদক ।তাঁর অর্জন শুধু পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর অর্জন হলো কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা।
৭. ট্র্যাজিক অসুস্থতা ও দীর্ঘ নির্বাক জীবন
কাজী নজরুল ইসলামের কর্মময় ও সৃষ্টিশীল জীবন ছিল অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী, যা বাংলা সাহিত্যের জন্য এক চরম ট্র্যাজেডি। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে, যখন কবির বয়স মাত্র ৪৩ বছর এবং তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা মধ্যগগনে, তখন তিনি আচমকা এক মারাত্মক ও রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হন। প্রখ্যাত চিকিৎসকদের মতে, কবি ‘Pick’s Disease নামক এক বিরল ও নিরাময়অযোগ্য মানসিক ও স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ব্যাধির ফলে কবি ধীরে ধীরে অমূল্য বাকশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। দেশ-বিদেশে দীর্ঘ চিকিৎসা করানো সত্ত্বেও কবিকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে জীবনের শেষ দীর্ঘ ৩৪টি বছর এই কালজয়ী কালপুরুষ সম্পূর্ণ নীরব, নিস্তব্ধ ও নির্বাক অবস্থায় কাটান। যে বজ্রকণ্ঠ একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় সমগ্র বাঙালি জাতি এক গভীর বেদনায় নিমজ্জিত হয়। কবির এই চরম একাকীত্ব ও নীরবতা যেন তাঁরই পূর্বের একটি কবিতার লাইনের সাথে মিলে যায়:
“আমি আসিয়াছিলাম ক্ষণকালের তরে—
তোমরা ভুলিয়া যাও
আমি কবি, আমি
তোমাদেরই কেউ।”
৮. কাজী নজরুল ইসলাম এর বিদায়কাল
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করে নাগরিকত্ব ও দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়।১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ই ভাদ্র) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির পূর্বের একটি গানের আকুল ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
১৯. উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিশ শতকের একজন ক্ষণজন্মা কবি বা সাহিত্যিক নন; তিনি একটি কালোত্তীর্ণ চেতনা, একটি অবিনাশী আদর্শ এবং বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন বাতিঘর। সাম্য, মানবতা, প্রেম ও দ্রোহের যে বীজ তিনি বাঙালির মনে রোপণ করে গেছেন, তা আজও আমাদের প্রতিটি সংকট ও সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান থেকে শুরু করে মানুষের হৃদয়ের সূক্ষ্মতম প্রেমের আকুলতা—সবখানেই তাঁর অবাধ ও রাজকীয় বিচরণ ছিল। সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর এই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু ঝড়ের মতো আগমন বাংলা ভাষাকে করেছে বিশ্বজনীন ও সমৃদ্ধ। যতদিন বাংলা ভাষা টিকে থাকবে, যতদিন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষেরা গর্জে উঠবে এবং যতদিন তরুণ সমাজ সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার গান গাইবে, ততদিন নজরুল তাঁর অবিনাশী সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং জাতীয় জীবনে।