নদী উপাখ্যান
হাঁড়িধোয়া নদীটির বয়স কত জানি না আমি। কোন্ আদিম কুয়াশার ভোরে শীতলক্ষ্যার কোল ছিঁড়ে তার জন্ম হয়েছিল তাও জানি না।
শুধু জানি, একসময় সে ছিল চপলা। উছলা জলের উন্মাদ এক কিশোরী নদী। বর্ষার ভিতর যার হাসি ভাঙত, যার ঢেউয়ে কাঁপত কাশবন, যার বুকের ভিতর অস্থির আকাশ নেমে আসত সন্ধ্যাবেলা।
এখন সে শান্ত। স্থির। নিঃশব্দ বিষাদের মতো তার জল পড়ে থাকে।
সেদিনও এমনই এক কার্তিক বিকেল ছিল। মরা রোদের ভিতর শালিকেরা একে একে ফিরে যাচ্ছিল ঘরে, দূরের ধানখেতে ধানের গন্ধ জমছিল ধীরে ধীরে।
আমি আর একটি মেয়ে হাঁটছিলাম হাঁড়িধোয়ার তীর ধরে।
মেয়েটির নামও ছিল নদী।
তার বাড়ি শীতলক্ষ্যার পারে, পলাশে। হয়তো সেই কারণেই তার চোখে এত জল ছিল, তার কণ্ঠে এত দূরের স্রোতের শব্দ।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থেমে গেল।
তারপর নেমে গেল জলের কাছে। দু’হাত আজলা করে হাঁড়িধোঁয়ার জল তুলে আনল বুকে।
নরম স্বরে বলল— “হাত পাতো…”
আমি হাত পাতলাম।
সে তার আজলার জল আমার হাতে ঢেলে দিয়ে বলল- “এই জল আমায় আবার দাও। আমি তোমার পানি গ্রহণ করব…”
কী অদ্ভুত ছিল সেই মুহূর্ত!
মনে হয়েছিল, কার্তিকের বিষণ্ণ আকাশের নিচে দুইটি মানুষ নয় দুইটি নদী পরস্পরের ভিতর তাদের নিঃসঙ্গতা ঢেলে দিচ্ছে।
আমি জল ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তাকে।
আর সেই বিকেলেই, হয়তো অদৃশ্য কোনো নিয়তির কাছে, আমিও তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম আমার সমস্ত হৃদয়।
নদী আমার পানি গ্রহণ করেছিল ঠিকই কিন্তু আমাকে আর গ্রহণ করেনি।
তারপর একদিন সে চলে গেল।
কোথায় গেল জানি না।
হয়তো অন্য কোনো নদীর দেশে।
হয়তো আজ সে দাঁড়িয়ে থাকে দানিয়ুবের নীল শীতের পাশে, হয়তো হাডসনের ধূসর জলে তার চুল উড়ে যায় একা একা, হয়তো লীফি নদীর তীরে কুয়াশাভেজা সন্ধ্যায় সে ধীরে ধীরে হাঁটে অচেনা মানুষের ভিড়ে।
আর আমি ভাবি,
সেইসব বিদেশি নদীর জলে কখনও কি সে আমার মুখ দেখতে পায়?
কোনো ঢেউ কি তাকে মনে করিয়ে দেয় কার্তিকের সেই বিকেল, হাঁড়িধোঁয়ার নিঃশব্দ তীর, আর এক মানুষকে, যে আজও দু’হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে এক মুঠো জল ফিরে পাবার আশায়?
রাত গভীর হলে এখনও আমি শুনতে পাই— হাঁড়িধোঁয়ার স্থির জলে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে-
“হাত পাতো…”
আর তখন আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে একটি নদী ভেঙে পড়ে।
~ কোয়েল তালুকদার
তোমারে দাও, আশা পূরাও, তুমি এসো কাছে।