Nawab Faizunnesa Choudhurani

উনিশ শতকের রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে যখন অধিকাংশ নারী চার দেয়ালের বন্দিদশায় জীবন কাটাতেন, ঠিক তখনই আত্মমর্যাদা, শিক্ষা ও সমাজসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪–১৯০৩)। তিনি কেবল একজন লেখিকা বা জমিদার ছিলেন না, ছিলেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নারী জাগরণের অন্যতম প্রথম কাণ্ডারি।

কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ের এক বনেদি জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আহমেদ আলী চৌধুরী ও মা আরফান্নেসা চৌধুরানী। তখনকার দিনে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর কোনো সুযোগ ছিল না; পর্দা প্রথাই ছিল সামাজিক রীতি। কিন্তু গৃহশিক্ষকের সহায়তায় অদম্য আগ্রহ নিয়ে ফয়জুন্নেসা আয়ত্ত করেন বাংলা, আরবি, ফারসি ও সংস্কৃতের মতো একাধিক ভাষা।

১৮৬০ সালে জমিদার মুহাম্মদ গাজীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলেও দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। স্বামীর সংসারে অসম আচরণ ও নিজের আত্মসম্মানবোধের কারণে তিনি আপস করেননি; দুই কন্যা আর্শাদুন্নেসা ও বদরুন্নেসাকে নিয়ে ফিরে আসেন পৈতৃক নিবাসে। পরবর্তীতে ১৮৮৩ সালে হোমনাবাদ এস্টেটের জমিদারি নিজের হাতে তুলে নেন। কঠোর পর্দা বজায় রেখেই তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও ন্যায়ের সঙ্গে প্রজাবৎসল শাসক হিসেবে জমিদারি পরিচালনা করেন।

সাহিত্যচর্চাতেও তিনি গড়েছিলেন এক ইতিহাস। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘রূপজালাল’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের কোনো মুসলিম নারীর লেখা প্রথম মুদ্রিত বই। গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে রচিত এই রূপক গ্রন্থে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তৎকালীন সমাজের পটভূমিতে নারীর আবেগ, ক্ষোভ ও মর্যাদাবোধের কথা। এ ছাড়া ‘সঙ্গীত সার’ ও ‘সঙ্গীত লহরী’র মতো রচনাতেও তাঁর সাহিত্য প্রতিভার ছাপ স্পষ্ট।

বেগম রোকেয়ার আন্দোলনের বহু আগেই তিনি বুঝেছিলেন শিক্ষার গুরুত্ব। তাই ১৮৭৩ সালেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়’। পিছিয়ে পড়া নারীদের চিকিৎসার জন্য ১৮৯৩ সালে স্থাপন করেন ‘ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল’। বিশুদ্ধ পানির জন্য দীঘি খনন, রাস্তাঘাট তৈরি ও বহু গরিব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন।

তাঁর এই অনন্য অবদানের জন্য ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার পক্ষ থেকে তাঁকে ভূষিত করা হয় ‘নওয়াব’ উপাধিতে—যার মাধ্যমে তিনি হন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী নওয়াব।

১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মহীয়সী নারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বিপুল সম্পদের সিংহভাগই দান করে যান জনকল্যাণমূলক ট্রাস্টে, যা আজও তাঁর উদারতা ও সমাজচেতনার সাক্ষ্য বহন করে।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...