Nazmul Islam Faruque

রবিউল আউয়াল: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়

কুরআন, হাদিস ও সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

রবিউল আউয়াল এলেই মুমিনের হৃদয়ে এক অপার্থিব আলো জ্বলে ওঠে। স্মৃতির দুয়ার খুলে যায়; হৃদয়ের আকাশে ভেসে ওঠে সেই মহামানবের স্মৃতি, যাঁর আগমনে অন্ধকার পৃথিবী পেয়েছিল আলোর দিশা, পথহারা মানবতা পেয়েছিল পথের সন্ধান, নিপীড়িত মানুষ পেয়েছিল মর্যাদার স্বীকৃতি এবং বিভ্রান্ত হৃদয় পেয়েছিল তার রবের পরিচয়।

তিনি আমাদের প্রিয় নবী, আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

তাঁকে জানতে হলে কেবল ইতিহাসের পাতা উল্টালে চলবে না; ফিরে যেতে হবে কুরআনের বাণীতে, ডুব দিতে হবে হাদিসের বর্ণনায় এবং দেখতে হবে সালফে সালেহীনের জীবন ও ভালোবাসার আয়নায়। কুরআন তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে রহমত, আদর্শ, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী ও আলোকবর্তিকা হিসেবে। হাদিস তাঁর চরিত্রকে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলেছে। আর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন তাঁর ভালোবাসাকে রূপ দিয়েছেন আনুগত্য, সম্মান ও অনুসরণের মহিমান্বিত জীবনে।

কুরআনের আলোকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়

১. তিনি আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবী

মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—

“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।”

—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪০

এ আয়াত তাঁর নবুয়তের চূড়ান্ততার ঘোষণা। তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না। তাঁর রিসালাত পূর্ণাঙ্গ, তাঁর আদর্শ চূড়ান্ত এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার জন্য পথনির্দেশের উৎস।

২. তিনি বিশ্বজগতের জন্য রহমত

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোত্র বা ভূখণ্ডের জন্য ছিল না। তাঁর রিসালাতের পরিধি সমগ্র সৃষ্টিজগতকে পরিব্যাপ্ত করেছে।

আল্লাহ বলেন— “আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”

—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭

তিনি এসেছিলেন মানুষের হৃদয় থেকে অন্ধকার দূর করতে, জুলুমের শৃঙ্খল ভাঙতে, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে এবং মানুষকে তার স্রষ্টার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে।

৩. তিনি উত্তম আদর্শ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”

—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১

তাঁর জীবন শুধু পড়ার জন্য নয়—অনুসরণের জন্য। তাঁর হাসিতে আদব, তাঁর নীরবতায় প্রজ্ঞা, তাঁর কথায় সত্য, তাঁর আচরণে সৌন্দর্য এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে মুমিনের জন্য রয়েছে পথনির্দেশ।

৪. তাঁর চরিত্র ছিল মহান

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুলের চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন—

“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”

—সূরা আল-কলম, ৬৮:৪

মানব ইতিহাসে অসংখ্য নেতা এসেছেন, অসংখ্য দার্শনিক এসেছেন, অসংখ্য সংস্কারক এসেছেন; কিন্তু যার চরিত্রকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা মহান বলে ঘোষণা করেছেন, তাঁর মর্যাদা যে কত ঊর্ধ্বে—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

৫. তিনি ছিলেন উম্মতের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু

আল্লাহ বলেন—

“তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের দুর্ভোগ তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণকামী; আর মুমিনদের প্রতি তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।”

—সূরা আত-তাওবা, ৯:১২৮

এ আয়াতে যেন তাঁর হৃদয়ের দরজা আমাদের সামনে খুলে দেওয়া হয়েছে। উম্মতের দুঃখ ছিল তাঁর দুঃখ, উম্মতের কল্যাণ ছিল তাঁর চিন্তা, উম্মতের নাজাত ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা।

৬. তিনি ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী

আল্লাহ বলেন—

“হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।”

—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪৫

তিনি মানুষকে জানিয়েছেন আল্লাহর রহমতের সুসংবাদ এবং সতর্ক করেছেন অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে। তাঁর দাওয়াত ছিল ভয় ও আশার ভারসাম্যে গড়া—যেখানে মানুষ আল্লাহকে ভয় করবে, আবার তাঁর রহমত থেকেও নিরাশ হবে না।

৭. তিনি ছিলেন আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকিত প্রদীপ

আল্লাহ বলেন—

“এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারীরূপে এবং আলোকিত প্রদীপরূপে।”

—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪৬

অন্ধকার রাতে একটি প্রদীপ যেমন পথিককে পথ দেখায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন তেমনি মানবতার সামনে হেদায়াতের পথ আলোকিত করেছে।

৮. তাঁর আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।”

—সূরা আন-নিসা, ৪:৮০

তাই নবীপ্রেম শুধু অনুভূতির বিষয় নয়; তাঁর আনুগত্য ঈমানের দাবি। তাঁর সুন্নাহকে জীবন থেকে দূরে রেখে তাঁর ভালোবাসার দাবি পূর্ণ হতে পারে না।

৯. তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত

আল্লাহ বলেন—

“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।”

—সূরা সাবা, ৩৪:২৮

তাঁর বার্তা কোনো ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ নয়। তাঁর দাওয়াত আরবের মরুভূমি পেরিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার জন্য পথনির্দেশ হয়ে থাকবে।

হাদিসের ভাষায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়

কুরআন যেখানে তাঁর মহিমান্বিত পরিচয় ঘোষণা করেছে, হাদিস সেখানে তাঁর জীবনকে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলেছে।

সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে শুধু দূর থেকে দেখেননি; তাঁরা তাঁর সঙ্গে হেঁটেছেন, বসেছেন, খেয়েছেন, সফর করেছেন, যুদ্ধ করেছেন, কেঁদেছেন, হেসেছেন। তাঁরা তাঁর প্রতিটি আচরণকে ভালোবাসার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন।

তাই হাদিসের পাতা খুললেই যেন আমরা দেখতে পাই—একজন মহান নবী, অথচ কত বিনয়ী; একজন বিশ্বনেতা, অথচ কত কোমল; একজন রাষ্ট্রপ্রধান, অথচ কত সরল; একজন বিজয়ী, অথচ কত ক্ষমাশীল; একজন শিক্ষক, অথচ কত মমতাময়।

১. তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—

“তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৬

কী গভীর একটি পরিচয়! কুরআন তাঁর কাছে শুধু পাঠের গ্রন্থ ছিল না; কুরআনের শিক্ষা তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল। কুরআনের দয়া ছিল তাঁর আচরণে, ন্যায়বিচার ছিল তাঁর সিদ্ধান্তে, ক্ষমা ছিল তাঁর ব্যবহারে এবং আল্লাহভীতি ছিল তাঁর অন্তরে।

২. তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ

হযরত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ প্রায় দশ বছর তাঁর সেবা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তাঁকে বিরক্তি প্রকাশ করে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য তাঁকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেননি।

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১০

এ যেন নেতৃত্বের অনুপম শিক্ষা—মানুষকে সংশোধন করতে হবে, কিন্তু তার হৃদয় ভেঙে নয়; ভুল ধরিয়ে দিতে হবে, কিন্তু তাকে অপমান করে নয়।

৩. তিনি ছিলেন দয়ার সাগর

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬০১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৯

তিনি দয়ার কথা শুধু বলেননি; তাঁর জীবন ছিল দয়ার জীবন্ত ব্যাখ্যা। দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি, অসহায়ের প্রতি মমতা, শিশুর প্রতি স্নেহ, দুর্বলদের প্রতি কোমলতা—সবকিছুতেই ফুটে উঠেছে তাঁর রহমতের ছায়া।

৪. শিশুদের প্রতি ছিল অসীম মমতা

একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ইবনু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চুমু দিলেন। এক ব্যক্তি বলল, তার দশটি সন্তান আছে, অথচ সে তাদের কাউকেই চুমু দেয়নি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—

“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৮

শিশুর প্রতি স্নেহকে তিনি দুর্বলতা মনে করেননি; বরং এটিকে মানবিকতার সৌন্দর্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

৫. তিনি ছিলেন পরিবারের জন্য সর্বোত্তম

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।”

—জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫

একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র বাইরের মানুষের কাছে নয়, ঘরের মানুষের সঙ্গে তার আচরণেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। এই মানদণ্ডেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অনন্য।

৬. তিনি ছিলেন ক্ষমা ও মহানুভবতার প্রতীক

তাঁর জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত কষ্ট, অপমান ও আঘাতের জবাবে তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার পথ বেছে নিয়েছেন।

হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ব্যক্তিগত কারণে কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতেন না। তিনি কোনো নারী বা খাদেমকেও নিজ হাতে আঘাত করেননি।

—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮

ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া—এটাই তাঁর মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৭. তিনি ছিলেন অতুলনীয় দানশীল

হযরত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। রমজানে তাঁর দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। তিনি কল্যাণ দানে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও অধিক উদার ছিলেন।

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬

তাঁর দান শুধু অর্থে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান, দিয়েছেন ভালোবাসা, দিয়েছেন সময়, দিয়েছেন সান্ত্বনা এবং দিয়েছেন জান্নাতের পথে চলার দিশা।

সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন—এই নেককার পূর্বসূরিদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ভালোবাসার সর্বোচ্চ কেন্দ্র এবং অনুসরণের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁদের জীবন ছিল তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা, অপরিসীম সম্মান এবং সুন্নাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১. আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু: ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয়

হিজরতের সময় গারে সওরের ঘটনায় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—

“দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৮১

এখানে একদিকে সাহাবির ভালোবাসা, অন্যদিকে নবীজির সাহস ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার অনুপম দৃশ্য ফুটে ওঠে।

২. উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু: ভালোবাসার পূর্ণতা

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে নিজের প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, নিজের প্রাণের চেয়েও আমাকে বেশি ভালোবাসতে হবে। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এখন আপনি আমার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—

“এখন, হে উমর।”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬৬৩২

এ শিক্ষা অত্যন্ত গভীর—নবীপ্রেম ঈমানের এমন একটি দাবি, যেখানে নিজের প্রবৃত্তি ও স্বার্থের ওপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা প্রাধান্য পায়।

৩. আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু: সেবার দশ বছরে যে ভালোবাসা

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রায় দশ বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবা করেছেন। এত দীর্ঘ সান্নিধ্যের পরও তাঁর মুখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কঠোরতার অভিযোগ নেই।

বরং তাঁর স্মৃতিতে নবীজি ছিলেন কোমলতা, সৌজন্য ও মমতার প্রতীক।

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১০

৪. আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা: এক বাক্যে পূর্ণ পরিচয়

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সেই অমর মন্তব্য—

“তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৬

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়ের জন্য এর চেয়ে গভীর ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কল্পনা করা কঠিন।

৫. আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু: সাহস ও নেতৃত্বের প্রতীক

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তে সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্রয় নিতেন।

—মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৩৪৭

তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ, কিন্তু সত্যের প্রশ্নে পাহাড়ের মতো দৃঢ়। তাঁর কোমলতা ছিল রহমত; তাঁর দৃঢ়তা ছিল ন্যায়ের রক্ষাকবচ।

রবিউল আউয়ালের আহ্বান: পরিচয় থেকে অনুসরণে

রবিউল আউয়াল আমাদের শুধু আনন্দের স্মৃতি দেয় না; এটি আমাদের সামনে একটি প্রশ্নও রাখে—

আমরা কি সত্যিই আমাদের প্রিয় নবীকে চিনি?

তাঁর নাম জানি, কিন্তু তাঁর আদর্শ কতটুকু জানি?

তাঁর প্রতি ভালোবাসার কথা বলি, কিন্তু তাঁর সুন্নাহ কতটুকু মানি?

তাঁর প্রশংসা করি, কিন্তু তাঁর চরিত্র কতটুকু নিজের জীবনে ধারণ করি?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রকাশ হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা।

তিনি সত্যবাদী ছিলেন—আমাদেরও সত্যবাদী হতে হবে।

তিনি ক্ষমাশীল ছিলেন—আমাদেরও ক্ষমা করতে হবে।

তিনি দয়ালু ছিলেন—আমাদেরও মানুষের প্রতি দয়া করতে হবে।

তিনি পরিবারের কাছে উত্তম ছিলেন—আমাদেরও পরিবারে উত্তম হতে হবে।

তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন—আমাদেরও শিশুদের প্রতি স্নেহশীল হতে হবে।

তিনি দুর্বল ও অসহায়ের পাশে দাঁড়াতেন—আমাদেরও মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।

তিনি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি—আমাদেরও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় হতে হবে।

এটাই হবে রবিউল আউয়ালে আমাদের নবীপ্রেমের সবচেয়ে সুন্দর ও অর্থবহ প্রকাশ।

উপসংহার

কুরআনের ভাষায় তিনি আল্লাহর রাসুল, সর্বশেষ নবী, বিশ্বজগতের রহমত, উত্তম আদর্শ, মহান চরিত্রের অধিকারী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকিত প্রদীপ।

হাদিসের ভাষায় তিনি দয়ার সাগর, ক্ষমার প্রতীক, পরিবারের আদর্শ, শিশুদের স্নেহময় অভিভাবক, অসহায়ের আশ্রয়, বিনয়ের প্রতিমূর্তি, দানশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং উম্মতের পরম কল্যাণকামী।

আর সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ঈমানের প্রাণ, ভালোবাসার সর্বোচ্চ কেন্দ্র, সুন্নাহর পথপ্রদর্শক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার শ্রেষ্ঠ অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

তাঁর পরিচয় যত গভীরভাবে জানা যায়, হৃদয় তত নত হয়। তাঁর জীবন যত বেশি পড়া যায়, নিজের জীবনকে তত বেশি সংশোধনের প্রয়োজন অনুভূত হয়। তাঁর চরিত্র যত বেশি আবিষ্কার করা যায়, ততই বোঝা যায়—মানবতার জন্য আল্লাহর এই রহমত কত অসীম, কত অনুপম, কত মহিমান্বিত।

তাই রবিউল আউয়ালের প্রকৃত আহ্বান হোক—

নবীপ্রেম শুধু হৃদয়ে নয়—চরিত্রে।
নবীপ্রেম শুধু কথায় নয়—কর্মে।
নবীপ্রেম শুধু স্মরণে নয়—অনুসরণে।
নবীপ্রেম শুধু আবেগে নয়—সুন্নাহর আনুগত্যে।

হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়ে আপনার প্রিয় হাবিব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন। তাঁর সুন্নাহকে আমাদের জীবনের আলো বানিয়ে দিন। তাঁর চরিত্রের সৌন্দর্য আমাদের চরিত্রে ফুটিয়ে তুলুন। তাঁর আদর্শে আমাদের পরিবার, সমাজ ও জীবনকে সাজিয়ে দিন। কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআত লাভের সৌভাগ্য দান করুন।

আমিন।

লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
nazmulislam19122@gmail.com

0 Comments

প্রতিটি লেখাই কি অমর ?