তুমি আমার ধ্রুবতারা
ভার্সিটি লাইব্রেরীতে বসে পড়াশোনা করেছিল রিয়াদ।
লাইব্রেরীতে তখন ৫/৬ জন ছাত্রছাত্রী ছিলো। তাও আবার রিয়াদ যেখানে ছিল তার অন্য সাইডে। যেখানে রিয়াদ বসে ছিল সেখানে আর কেউ ছিল না শুধু একাই ছিল। ঠিক তখনই পাশ থেকে কেউ এসে বলে— কি করছিলে রিয়াদ? রিয়াদ চমকে উঠে পেছনে তাকিয়ে দেখে অরনী একগুচ্ছ হাজারী গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিয়াদ বিরক্তিসহকারে বলল, কি করছি দেখতে পাচ্ছিস না। এইভাবে আচমকা জিজ্ঞেস করার কি আছে? অরনী পাশে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। ভয় পেয়েছিলি নাকি? রিয়াদ বলল, একদম না। ভয় পাওয়ার কি আছে। অরনী বলল, না মানে আচ্ছা যাক বাদ দে। তোর জন্য এই ফুলগুলো নিয়ে আসলাম। সুন্দর না। রিয়াদ বলল, তোর লাফালাফি, ঘুরেবেড়ানো ছাড়া ছাড়া কি আর কাজ নেই। এত বড় হয়েছিস তাও বাচ্চামি স্বভাবগুলো যায় না তোর। কোন জঙ্গল থেকে নিয়ে আসলি এইগুলা। অরনী অভিমানী সুরে বলল, ওহহ এখন তো আমার স্বভাব তোর বাচ্চামীই মনে হবে। প্রপোজ করার সময় তো ঠিকই বলেছিস যে তোর এই বাচ্চামী স্বভাব দেখেই তোর প্রেমে আমি পড়েছি। এখন কই গেল সেই কথা। এখন আমায় বলছে আমি নাকি লাফালাফি করে বেড়াই। তুই আমার সাথে আর কথা বলবিনা। তোর সাথে আমার ব্রেকআপ। রিয়াদ হাসতে হাসতে বলল, ম্যাডাম আপনি কিছু ভুলে গেছেন আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ঠিক ১ মাস আগে। আজ আমাদের বিয়ের ১ মাস পূর্ণ হলো। কাগজ কলমে আপনাকে আমি বৈধভাবে আমার করে নিয়েছি। শুধুই আমার। আপনার উপর অধিকার শুধুই আমার। আর আপনি কি ভুলে গেছেন কাবিন নামায় অর্থ ছাড়াও নিজেকেই লিখিতভাতে সপে দিয়েছি আপনার কাছে। এখন আমার দায়িত্ব তো আপনাকেই নিতে হবে।এখন ব্রেকআপ বললে তো চলবে না। আর এখন কিন্তু আমি আপনার প্রেমিক নই আপনার কাগজে-কলমে লিখিত স্বামী। রিয়াদ অরণীর হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, এই হাত যখন ধরেছি তা তো আর ছাড়ার জন্য না। অরণী বলে, হয়েছে হয়েছে। এসব পাম আমায় দিতে হবে না। রিয়াদ বলল, আচ্ছা Sorry, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? অরণী বলে, ভেবে দেখতে হবে। ঠিক তখনি রিয়াদ প্যান্টের পকেট থেকে কিছু একটা বের করে আর নিচে বসে অরণীর পা টা নিজের হাঁটুর উপর রাখে। অরণী বলে, আরে কি করছিস তুই। রিয়াদ বলে, চুপ। একদম কথা বলবি না। এরপর রিয়াদ একটা পায়েল অরণীর পায়ে আলতো করে পরিয়ে দেয়। আর বলে অরণী – তোর সাথে পরিচয়টা আমার ভার্সিটির প্রথম দিনে হয়েছিল। যখন তুই আর আমি দুজনেই এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। তবে তোর সাথে যে আমার এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হবে এটা কখনোই ভাবিনি। সত্যিটা, প্রথম প্রথম তোর ঐ বাচ্চামো স্বভাবগুলো আমার খুব বিরক্ত লাগতো। তবে পরে তোর ঐ স্বভাবগুলোই আমায় আকৃষ্ট করতো। তোকে এইভাবে হাসতে দেখে অজান্তেই কেন জানি হাসি পেত। এরপর অনার্স ২য় বর্ষের মাঝামাঝি আমি তোকে আমার মনের কথাগুলো বলি। তবে তোকে বলার আগেই আমি আমার বাবা-মাকে বলে রেখেছিলাম। কারণ আমি কোনো হারাম রিলেশনে যেতে চাইনি। ভালোবাসা শব্দটাকে অপবিত্র করতে চাইনি। আর তোকে সেদিন বুকে অনেক সাহস নিয়ে এই কথাগুলো বলেছিলাম কারণ এর আগে কোনো মেয়েকে এসব কথা বলা তো দূরে থাক কারো দিকে কু-নজরে তাকাইনি পর্যন্ত। তো এরপর তুই আমায় একসেপ্টও করে নিয়েছিলি। ঐদিন হয়তো আমার থেকে খুশি আর কেউ ছিল না।তারপর তোর বাড়িতে আমাদের বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালাম এবং ওনারাও রাজি হলেন। আমাদের বলা হলো দ্বিতীয় বর্ষের exam টা দাও তারপর না হয় তোমাদের বিয়েটা ঠিক করব। এখন না হয় কাবিন করে রাখি। আমরা সেটা মেনে নিলাম। কাবিন হলো। আর শুরু হলো আমাদের ভালোবাসার যাত্রা। তোকে আরো ভালো করে বুঝতে শিখলাম। তোর হাত ধরে ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াতাম। কত সুন্দর মুহূর্তই না কাটিয়েছি আমরা। তাই না। তবে সমস্ত সুন্দর মুহূর্ত আমরা হালাল ভাবে কাটিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়েটাও হয়ে গেল। আজ তোকে একটা কথা বলি শোন। অ তোর এই পাগলামো স্বভাবটাটে আমি আজও ডুবে আছি। আমার এখনো মনে হয় আমি যেন কোনো এক ঘোরে ডুবে আছি।এটা থেকে কোনোদিন বের হতে চাইনা। তুই আমার ভালো লাগা ছিলিনা, তুই হলি আমার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন তোর এই হাতের স্পর্শ আমি পেতে চাই। অরনী বলল, এবার আপনি উঠবেন না নিচেই বসে থাকবেন? রিয়াদ উঠে আমার অরনীর পাশের চেয়ারটায় বসল। এবার টেবিলের উপর কুনুইয়ে ভর দিয়ে গালে হাত রেখে গানের এক কলি গাইতে লাগল —
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা ॥
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা ॥
তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে,
তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা।
কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা ॥
অরনী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে শুনল। এরপর রিয়াদকে বলল, চোখটা বন্ধ কর তো। রিয়াদ বলল,কেন?অরনী বলল আমি বলছি বলে।বন্ধ কর , তাড়াতাড়ি। রিয়াদ আর কোনো কথা না বলে চোখ বন্ধ করে নিল।অরনী নিজের মুখটা রিয়াদের কানের কাছে নিয়ে বলল, ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি তোকে। এটা বলেই নিজের ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া রিয়াদের গালে বসানোর সাথে সাথেই দৌড়ে লাইব্রেরী থেকে বের হয়ে চলে গেল। মনে হচ্ছিল অরনী যেন এখন আর রিয়াদের মুখোমুখি হতে চাইছেনা লজ্জায়। অরনীর আলতো ঠোঁটের স্পর্শে রিয়াদ যেন শিউরে উঠেছে। তবে খুশিও হয়েছে। আর হাসতে হাসতে বিড়বিড় করল, পাগলী মেয়ে একটা।রিয়াদের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মুচকি হাসি আর চোখের মুগ্ধতা জানান দিচ্ছিল—এই পাগলী মেয়েটার ভালোবাসাতেই সে আজীবন বন্দী থাকতে চায়।অবনীর রেখে যাওয়া সেই আলতো ছোঁয়া আর লাইব্রেরির শান্ত বাতাস মিলে যেন রিয়াদের চারপাশে এক মায়াবী ভালোবাসার জগৎ তৈরি করে দিল।
সময়ের স্রোতে সব বদলালেও, কিছু ভালোবাসা ফুরোবোর নয়।