ভার্জিল (খ্রিস্টপূর্ব ৭০–১৯ অব্দ), যাঁর পূর্ণ নাম পবলিয়াস ভার্জিলিয়াস মারো, হলেন প্রাচীন রোমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মহাকাব্য দ্য ইনীড (The Aeneid)-এর রচয়িতা হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হলেও, তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকের অন্যতম প্রধান সৃষ্টি ছিল এক্লগস (Eclogues) বা বুকলিকস (Bucolics)। এটি মূলত ঠিক ১০টি রাখালিয়া বা যাজকীয় কবিতার (Pastoral Poems) একটি সংকলন। খ্রিস্টপূর্ব ৪০-এর দশকে রচিত এই সংক্ষিপ্ত ও সুরময় কবিতাগুলো ল্যাটিন সাহিত্যের অন্যতম সুন্দর ও প্রভাবশালী নিদর্শন। এগুলো গ্রিক কবি থিওক্রিটাসের রাখালিয়া ঐতিহ্যের সাথে রোমান সমাজের ভূমি, নির্বাসন, প্রেম, রাজনীতি এবং এক নতুন স্বর্ণযুগের প্রত্যাশাকে চমৎকারভাবে মিশ্রিত করেছে।
ভার্জিলের সেই ১০টি বিখ্যাত এক্লগস-এর শিরোনাম এবং সেগুলোর মূল কাব্যিক অংশের বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
১. এক্লগ ১ – মেলিবোয়াস ও টিটিরাসের কথোপকথন
মূল ভাব: গৃহযুদ্ধের পর জমি বাজেয়াপ্তকরণ; যেখানে একজন রাখাল তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়, আর অন্যজনকে এক ক্ষমতাশালী “দেবতা” (সম্ভবত অক্টাভিয়ান) রক্ষা করেন।
হে টিটিরাস, ছড়ানো বিচ গাছের ছায়ায় শুয়ে শুয়ে,
তুমি তোমার ওই সরু বাঁশিতে বনের কাব্যদেবীর সুরেলা সাধনা করছ।
আর আমরা ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমাদের চেনা মিষ্টি মাঠ আর দেশের সীমানা;
আমরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছি; অথচ তুমি, টিটিরাস, এই শীতল ছায়ায় অলস সময় কাট can,
আর বনভূমিকে শিখিয়ে তুলছ কীভাবে প্রতিধ্বনিত করতে হয়—’রূপসী অ্যামারিলিস’।
২. এক্লগ ২ – অ্যালেক্সিসের প্রতি করিডনের প্রেম
মূল ভাব: একতরফা প্রেমের আকুতি; এক রাখাল এক সুঠাম তরুণের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসার বেদনা প্রকাশ করছে।
রাখাল করিডন তার প্রভুর প্রিয়পাত্র রূপবান অ্যালেক্সিসের প্রেমে ব্যাকুল হয়েছিল,
অথচ সে জানত না কোনো আশা আছে কি না।
তাই সে প্রতিনিয়ত ছুটে যেত ছায়ায় ঘেরা
সেই ঘন বিচ গাছের বনের মাঝে। সেখানে একা একা, নিষ্ফল কামনায়,
সে তার মনের সহজ কথাগুলো উজাড় করে দিত বন আর পাহাড়ের বুকে।
৩. এক্লগ ৩ – মেনালকাস ও ড্যামোয়েটাসের গানের লড়াই
মূল ভাব: দুই রাখালের মধ্যে এক প্রাণবন্ত এবং মাঝে মাঝে বেশ রূঢ় বা শ্লেষাত্মক গানের প্রতিযোগিতা।
ড্যামোয়েটাস: আমাকে বলো তো, এই ভেড়ার পালটি কার?
মেনালকাস: ড্যামোয়েটাস, তুমিই বলো, এই ভেড়াদের দল কার? এটা কি মেলিবোয়াসের?
ড্যামোয়েটাস: না, একদমই না, এটা এগন-এর; সেদিন এগনই এগুলো আমার জিম্মায় রেখে গেছে।
৪. এক্লগ ৪ – স্বর্ণযুগ (মেসিয়ানিক এক্লগ)
মূল ভাব: পশ্চিমা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কবিতা—এখানে এমন এক শিশুর জন্মের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যে পৃথিবীতে এক নতুন স্বর্ণযুগ নিয়ে আসবে।
হে সিসিলির কাব্যদেবী (মিউজ), এসো এবার একটু মহিমান্বিত সুরে গান গাই।
কুমায়েন ভবিষ্যদ্বাণীর সেই শেষ যুগ এবার শুরু হতে চলেছে:
শতাব্দীগুলোর সেই মহান চক্র যেন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে;
এখন ফিরে আসছে কুমারী ন্যায়দেবী (অ্যাস্ট্রেয়া), আর শুরু হচ্ছে স্যাটার্নের রাজত্ব:
এখন উপর আকাশ থেকে নেমে আসছে এক নতুন মানবজাতি।
৫. এক্লগ ৫ – ড্যাফনিসের জন্য শোকগাথা
মূল ভাব: দুই রাখাল মিলে কিংবদন্তি রাখাল ড্যাফনিস (যিনি কবিতা ও প্রকৃতির প্রতীক)-এর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছে।
মেনালকাস: হে মপসাস, যেহেতু আমাদের দেখা হয়েই গেল আর আমরা দুজনেই দক্ষ,
তুমি ওই সরু বাঁশিতে সুর তুলতে আর আমি কবিতার শ্লোক গাইতে;
তাহলে এসো না কেন, এই এলম আর হেজেল গাছের ঝোপের মাঝে আমরা বসি?
৬. এক্লগ ৬ – সাইলেনাসের গান
মূল ভাব: মদ্যপ স্যাটায়ার (অর্ধ-মানব, অর্ধ-ছাগল রূপী উপদেবতা) সাইলেনাস সৃষ্টিতত্ত্ব, উপকথা এবং কবিতার এক মহাজাগতিক গান গাইছে।
আমার প্রথম কাব্যদেবী সিসিলির ছন্দে গান গাওয়ার উপযোগী ছিল,
আর বনে-জঙ্গলে বসবাস করতে সে কখনো দ্বিধাবোধ করেনি।
আমি যখন রাজা আর যুদ্ধবিগ্রহের গান গাইতে গেলাম, তখন অ্যাপোলো আমার কান টেনে
সতর্ক করে বললেন: “টিটিরাস, একজন রাখালের কাজ হলো পুষ্ট ভেড়াদের চরানো,
আর সাধারণ, সরল গান গাওয়া।”
৭. এক্লগ ৭ – করিডন ও থার্সিসের গানের লড়াই
মূল ভাব: দুই রাখালের মধ্যে আরেকটি গানের প্রতিযোগিতা, যার বিচারক ছিলেন মেলিবোয়াস।
করিডন: হে ঝর্ণার জলপরী (নিম্ফ), নদীর প্রিয় কন্যারা,
যদি আমার গান আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকে, তবে আমার ভালোবাসাকেও সার্থক করে তুলুন।
৮. এক্লগ ৮ – ড্যামন ও আলফেসিবোয়াস
মূল ভাব: জাদুবিদ্যা এবং মরিয়া প্রেমের দুটি গান (একটি পুরুষের কণ্ঠে, অন্যটি নারীর কণ্ঠে)।
ড্যামন: হে ভোরের তারা, তুমি জেগে ওঠো আর নিয়ে এসো এক মনোরম দিন,
যখন আমি এক বিশ্বাসহীন প্রেমিকের দ্বারা প্রতারিত হয়ে, এই শান্ত তারাগুলোর কাছে আমার শেষ আকুতি উজাড় করে দিচ্ছি।
৯. এক্লগ ৯ – লাইসিডাস ও মোয়েরিস
মূল ভাব: দুর্ম Extraction বা অশান্ত সময়ে জমি হারানো এবং কবিতার ক্ষমতা (ও তার সীমাবদ্ধতা)।
লাইসিডাস: তুমি কোথায় যাচ্ছ, মোয়েরিস? শহরের দিকে?
মোয়েরিস: ওহ লাইসিডাস, আমরা এমন একটা দিন দেখার জন্য বেঁচে রইলাম—
যার ভয় আমরা কখনো করিনি; আজ এক অপরিচিত লোক এসে আমাদের জমি কেড়ে নিচ্ছে।
১০. এক্লগ ১০ – আরকাডিয়ায় গ্যালাস
মূল ভাব: এক কাল্পনিক যাজকীয় বা রাখালিয়া জগতে (Arcadia) প্রেম-কাতর কবি গ্যালাসের অবয়ব (এটি ভার্জিলের বন্ধু কর্নিলিয়াস গ্যালাসের প্রতি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য)।
হে আরেথুসা (জলদেবী), আমার এই শেষ সৃষ্টিটুকুতে আমায় সহায় হও:
আমার বন্ধু গ্যালাসের জন্য অল্প কিছু শ্লোক—তবে এমন শ্লোক, যা স্বয়ং লাইকরিসও যেন পাঠ করে।
এই ১০টি এক্লগস ভার্জিলকে রোমের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং তাঁর পরবর্তী দুই কালজয়ী সৃষ্টি—জর্জিকস এবং দ্য ইনীড-এর পথ প্রশস্ত করেছিল।
ভার্জিল (৭০–১৯ খ্রিস্টপূর্ব)
রোমান মহাকাব্যিক কবি – ঐতিহাসিক মহাকাব্য এনিডের রচয়িতা
পুবলিয়ুস ভেরগিলিয়ুস মারো (Publius Vergilius Maro), যিনি ইংরেজিতে ভার্জিল (Virgil) নামে পরিচিত, ছিলেন প্রাচীন রোমের সবচেয়ে মহান কবিদের একজন। তিনি ল্যাটিন সাহিত্যের তিনটি সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা — একলোগুয়েস (Eclogues), গেয়র্গিক্স (Georgics) এবং মহাকাব্য এনিড (Aeneid) — রচনা করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো এনিড, যা রোমান জাতির উৎপত্তি ও গৌরবের কাহিনী বর্ণনা করে এবং পশ্চিমা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হিসেবে বিবেচিত।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
ভার্জিল জন্মগ্রহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৭০ সালের ১৫ অক্টোবর আন্দেজ (Andes) গ্রামে, যা বর্তমান উত্তর ইতালির মানতুয়া (Mantua) শহরের কাছে অবস্থিত। তাঁর জন্মস্থান তখন ছিল সিসালপাইন গল (Cisalpine Gaul) নামক রোমান প্রদেশে।
তাঁর পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবার। বাবা ছিলেন জমির মালিক। শৈশব থেকেই ভার্জিল গ্রাম্য জীবন ও প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা অর্জন করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রথম রচনা
ভার্জিল ক্রেমোনা, মিলান এবং রোমে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি বক্তৃতা, দর্শন, গণিত ও চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। পরে নেপলসে (Naples) এপিকিউরীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন।
তাঁর প্রথম বড় রচনা একলোগুয়েস (বা বুকোলিক্স) — দশটি প্যাস্টোরাল (রাখালি) কবিতার সংকলন। এগুলো থিওক্রিটাসের গ্রিক প্যাস্টোরাল কবিতার অনুকরণে লেখা, কিন্তু এতে রোমের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই রচনার মাধ্যমে তিনি সম্রাট অগাস্টাসের (তখন অক্টাভিয়ান) দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
গেয়র্গিক্স — কৃষি ও প্রকৃতির কাব্য
খ্রিস্টপূর্ব ২৯ সালে প্রকাশিত গেয়র্গিক্স চারটি বইয়ের একটি শিক্ষামূলক (didactic) কাব্য। এতে কৃষি, গবাদি পশু পালন, মৌমাছি পালন এবং গাছপালার যত্ন নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। কিন্তু এটি শুধু শিক্ষামূলক নয় — এতে রোমের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের আহ্বান এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে।
এনিড — রোমের জাতীয় মহাকাব্য
ভার্জিলের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত রচনা এনিড। এটি ১২টি বইয়ের একটি মহাকাব্য। এর নায়ক ঈনিয়াস (Aeneas) — ট্রয়ের যুদ্ধের পর বেঁচে যাওয়া এক ট্রোজান যোদ্ধা, যিনি ইতালিতে এসে রোমান জাতির ভিত্তি স্থাপন করেন।
এনিড হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসির অনুকরণে লেখা, কিন্তু এর উদ্দেশ্য ছিল রোমান সাম্রাজ্যের গৌরব ও অগাস্টাসের শাসনকে বৈধতা দেওয়া। ভার্জিল এটি রচনা করতে প্রায় ১১ বছর সময় নেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
খ্রিস্টপূর্ব ১৯ সালে ভার্জিল গ্রিস ভ্রমণে যান। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ইতালি ফিরে আসেন। ২১ সেপ্টেম্বর, খ্রিস্টপূর্ব ১৯ সালে ব্রুন্দিজিয়াম (Brundisium) শহরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি এনিড অসম্পূর্ণ মনে করে ধ্বংস করে ফেলতে বলেছিলেন। কিন্তু সম্রাট অগাস্টাস তা রক্ষা করেন এবং প্রকাশ করার নির্দেশ দেন।
ভার্জিল শুধু একজন কবি নন, তিনি রোমান জাতীয় চেতনার প্রতীক। তাঁর এনিড রোমান সাম্রাজ্যের আদর্শ, ধর্ম, ইতিহাস ও ভাগ্যকে কাব্যিক রূপ দিয়েছে। মধ্যযুগে তাঁকে প্রায় “খ্রিস্টধর্মের পূর্বাভাসক” হিসেবে দেখা হতো (বিশেষ করে এনিডের চতুর্থ একলোগ)। দান্তে তাঁকে ডিভাইন কমেডি-তে পথপ্রদর্শক হিসেবে স্থান দিয়েছেন।
“ভার্জিল ছিলেন সেই কবি, যিনি ট্রয়ের ধ্বংস থেকে রোমের জন্মের মহাকাব্য রচনা করে রোমান সভ্যতাকে অমর করে রেখেছিলেন।”