আমি বহুবর্ণা
কলমেঃ তনুশ্রী ঘোষ
জন্মের কিছু সময় পরই আমার আপন জনেদের প্রথম সম্ভাষণ ছিল— ‘বাবার মতো রং পায়নি মেয়ে’।
চাপা গুঞ্জনে শব্দগুলো তখন বুঝতে পারিনি,
তবু হাত পা ছুঁড়ে তাঁদের অভিনন্দন জানিয়ে ছিলাম।
তবে ঠানদি,পিসিমনিরা,পড়শি কাকিমা জ্যেঠিমারা ওভাবে বলেন নি,
তাঁরা সুন্দর ভাবে গুছিয়ে বলেছিলেন,না-না ‘উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা’।
কেউ কেউ আবার
‘মা কালী’ বলে আদর করেছিলেন।
এসব কথা আমার মায়ের কাছে শোনা। কারণ মাও যে আমার মতো
এসব শুনেই অভ্যস্ত।
কৈশোরে নাচের ক্লাসেও দেখতাম বিশেষ কিছু চরিত্র আমার জন্য নির্ধারিত ছিল।
যেমন, হিরুডাকাত,অসুর,নন্দী ভৃঙ্গী,কালী,সাঁওতালি আদিবাসী ইত্যাদি।
আবার বড় হয়েও বিশেষ কিছু চরিত্র যেমন, শাপমোচনের অরুণেশ্বর,চিত্রাঙ্গদার কুরূপা, চন্ডালিকা,শ্যামা,এগুলোই আমার জন্য নির্ধারিত ছিল।
ঈশ্বরকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছি এই চ্যালেঞ্জিং এবং অত্যন্ত প্রিয় চরিত্রগুলোর জন্য আমি নির্বাচিত হতাম বলে।
তবি মনে হোত,কেন কমলিকা নয়,কেন অর্জুন নয়,সুরূপা নয়,দেবদূত নয়, মদনদেব নয়,দুর্গা নয়!
কেন এসব চরিত্রে আমাকে ভাবা হোত না?
এও জানি সেই বিশেষ কারণটা।
‘আমি কালো’- সেটা আমার কাছে শাপে বর হয়েছিল ঠিকই,তবে আমার প্রতি তাদের সমস্যাটা বুঝতে পারতাম খুব।
ছোটবেলায় যখন বার বার শুনেছি,’ওকে একটু বেশী করে ক্রিম মাখাও’,
-যাতে ফর্সা লাগে,তখনি ভেবে নিয়েছি জীবনের প্রতিপদেই আমাকে একটু বেশীর দিকে ঝুঁকে চলতে হবে।
কারণ,আমার গায়ের রং সমাজের চোখে প্রশংসনীয় নয়।
তবে আমার ভালবাসার মানুষটি বড় উদার।
আমার কালো হরিণচোখ আর কন্ঠমাধুর্যে তিনি বিহ্বল ছিলেন।
তাঁর কথায় কথায় শুধু কৃষ্ণকলির চক্ষু বর্ণনা—‘তুমি আমার শুধু কৃষ্ণকলি নওগো সখী,তুমি যে আমার কথাকলি,আমার হৃদয় মাঝে কমলকলি।’
শুধু শাড়ি বা পোষাক কেনার সময় আমার কমপ্লেকশানে কোনটা মানাবে সেটা মনে করাতে ভুলতেন না।
এমনিতে বড়ই উদার, আধুনিক মনস্ক স্বামী আমার।
পার্টিতে যাওয়ার আগে বার বার মনে করিয়ে দিতেন,মুখটা ভাল করে পালিশ করে নিতে।বাজারের কোন্ ক্রিম মাখলে সাদা হওয়া যায়, আমাকে আরো ফর্সা দেখাবে, আমাকে লাস্যময়ী সুন্দরী রূপে প্রেজেন্ট করানো যাবে,- তা আনতে কসুর করেননি কোনদিন।
তাঁর হাইপ্রোফাইল লাইফ স্টাইলের সাথে কৃষ্ণকলির কালো বরণ যে বড়ই বেমানান।
কালো হরিণ চোখের মাধুর্য ততদিনে তলানীতে।
এমনই বড় উদার,সমাজ সংস্ককারক,বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব স্বামী আমার ছেলের বিয়ের জন্য উজ্জ্বল গৌর বর্ণা,সুশ্রী গৃহকর্ম নিপুণা পাত্রীর বিজ্ঞাপণ দিতে ভোলেন না।
গুরুদেব আপনি কো’ন ভাবনা থেকে কৃষ্ণকলিকে এঁকেছিলেন কোন ভাবনা থেকে কালো মেয়ে নন্দরাণীর মনস্তাপ এঁকেছিলেন তা বিশ্লেষণ করা এ অধমের পক্ষে সম্ভব নয় এক অনির্বচনীয় রোমান্টিসিজম-এর প্রতীক এই কৃষ্ণকলি
শুধু কি কাব্যিক কল্পনা?
নাকি সত্যিই আপনার মনেও অবচেতনে নিহিত ছিল কালো সাদার দ্বৈরথ?
নাকি আমাদের সমাজে চিরকাল কালো মেয়ের প্রতি যে অবজ্ঞা ও অবহেলা বর্ষিত হয় আপনি তাকে আপন অনুরাগের ছোঁয়ায় আলোকিত করে এক বিপরীত প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত করে সাহিত্যে অমরতা দান করেছেন।
এক বিশেষ কোন বার্তা দিতে চেয়েছিলেন সমাজের প্রতি?
আজো কৃষ্ণকলি–নন্দরাণীরা কেঁদে চলেছে নিভৃতে একা।
স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয়েছে স্ব স্ব ক্ষেত্রে গুণি তথাকথিত কালো বুদ্ধিমতী মেয়েদেরও।
আমরা সুন্দরী বিপাসা বসু,কাজল,নন্দিতা দাশ আন্তর্জাতিক ফ্যাসান ডিজাইনার মাশাবা গুপ্তা এমনকি লতা মঙ্গেসকর আাশা ভোঁসলের মতো কিংবদন্তী সরস্বতীর বরপুত্রীদেরও জানি যাদের গায়ের রং ফর্সা নয়। তাতে কী এসে গেল?
তবু এমন কথা হয়, ‘মেয়েটি কালো হলেও বেশ সুন্দরী,’মেয়েটি কালো হলেও বেশ পড়াশোনায় ভাল’–যেন কালোর সাথে পড়াশোনায় ভাল হওয়ায় বা সুন্দরী হওয়ার মধ্যে কোন বিরোধ আছে।
বাবা মায়ের চিন্তা কালো মেয়ের জন্য বেশ কিছুটা বাড়তি টাকা রাখতে হবে বিয়ের জন্য।
সন্তান কালো হয়ে জন্মেছে বলে আজও বিয়ের বাজারে কালো মেয়েরা উপেক্ষিতই।
আমায় যে যাই বলুক, আমি কিন্তু জানি, আমিই সেই মেয়ে যে কিনা পৃথিবীর আদি মানুষের প্রতিভূ।
হ্যাঁ, আমি কালো,আমি রবী ঠাকুরের কৃষ্ণকলি আমি জয় গোস্বামীর সেই সেলাই দিদিমনি। আমি ঐ আদিবাসী মেয়েটা,ঐ কেরলিয়ান, ঐ দলিত মেয়েটি। বারাক ওবামা, নেলসন মেন্ডেলা, ঐ ক্লাইভ লয়েড,গ্যারী সোবার্স, মাশাবা সবাই কালো জন হেনরী কালো।আর ফ্লয়েড কালো।
যে বর্ণ বিদ্বেষ আমার ঘরে সেই বর্ণ বৈষম্যের শিকার ঐ হেনরী, ঐ ফ্লয়েড,মাত্র ৮মিনিট ৪৬ সেকেন্ড সময় একজন কৃষ্ণাঙ্গকে শেষ করে দেওয়া যায় সহজে, যুগ যুগ ধরে সারা পৃথিবীতে চলে আসছে এই সংক্রমিত বর্ণবিদ্বেষ,পদলেহিত অত্যাচার।
কত সহজে আমার মতো বর্ণের মেয়েদের মনোবল ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হয় তা আমি জানি।
ছোটবেলা থেকেই তার আপনজনেরদের কাছেই সে জেনে যায় এই পরিবার এই সমাজ থেকে সে কিছুটা আলাদা।
তবু আমি গর্বিত আমি কালো। আমি আমার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, প্রসারতা,মতাদর্শ থেকে একচুলও সরে আসি নি।আমাকে কেউ দমাতে পারেনি,কখনো আপোস করিনি।
আমি আপন আলোয় উদ্ভাসিত আদি রস, কালো।
হ্যাঁ আর এটাই মানুষের আদি ও অকৃত্রিম রং আমি আদি অনন্ত আমি উজ্জ্বল,আমি আপন আলোয় ঝলমল,আমি কণকবর্ণা।
আমি সিলেকটিভ্ মিউটেশান এর ফসল, যা আমার মা জানতো না; সেটা আমি জানি।
সবই যে সেই মেলানিন মেলানিন।
*আমি জানি আমি ব্যক্তিত্বময়ী। জীবনে যা কিছু প্রয়োজন, ইচ্ছে তা আমি নিজেই অর্জন করতে শিখেছি।
আমি আমার মনের শক্তিতে বিশ্বজয় করতে পারি,মানুষকে ভালবাসতে পারি মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি। কখনোই নিজের জন্য চোখের জল ফেলিনি।পাশে থেকেছি অসহায় মানুষের।
আমার জন্মও এক মানবীর জঠর হতে।আমি একজন ‘মানুষ’। আমি একজন ‘নারী’ আমি আমার চেতনার রঙে উদ্ভাসিত,আমি উদ্বেলিত’।
হ্যাঁ আমি কৃষ্ণবর্ণা , আমি শ্যামবর্ণা,আমি শ্বেত বর্ণা, আমি কণক বর্ণা
এবং অবশ্যই —-বহুবর্ণা।।
সাবধান সমাজ, সাবধান হোয়াইট হাউস। একদিন এই কালো মানুষই বাঙ্কারে পাঠিয়ে দেবে তোমাদের।
তখন তোমরাই বলবে, —-‘আই কান্ট ব্রিদ্’-‘আই কান্ট ব্রিদ্।।