নির্জন নিসর্গের ঘ্রাণ
কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে ঘনবনের নির্জনে নাম না-জানা বনফুল, আর বন ঘুঘুদের ভীড়ে বিভূতিভূষণ কে খুব মনে পড়ে! আরণ্যকের কূর্চি আর পথের পাঁচালীর অপু-দূর্গা এইসব বনের আধো আলোছায়ায় কখনো হাঁটে, কখনো আম আটির ভেঁপু মুখে এদিক ওদিক দৌড়ে যায়! নিসর্গের নানা গলিঘুপচিতে ভেসে ওঠে ভাঁটফুল, আকন্দ আর বনতুলশীর মিষ্টি ঘ্রাণ!
এই বাংলায়, বাংলাদেশে কেবল দুজন মানুষ ছিলেন গন্ধের কারবারি, মাজুল মহাজন! জীবনানন্দ দাস আর বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়! বাংলার নদীনালা, খালবিল, হিজলতমাল আর পাখপাখালির গন্ধ শুকে শুকে বুনেছেন রূপসী বাংলার একহারা ঘ্রানের চাদর! এই চাদরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে দু:খীনি মায়ের শাড়িউপচানো মূখর মমতার ঘ্রাণ! আরণ্যকের, রূপসী বাংলার পাতায় পাতায় ছড়ানো আছে এই গন্ধমেদুর ঘ্রানের সওদা!! শীতের ভোরে কিংবা উদাস বিকেলে বাংলার খালবিলনদীবনজংগলে মিহি কুয়াশার মতো গলে গলে পড়ে এইসব ঘ্রান আর মায়ার বিভূতি!
কবি এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝখানে শব্দের ভূমিকা কম্পূটারের ইন্টারফেসের মতো! শব্দের কোন আইকনে কতটুকু চাপ দিলে রূপ রস গন্ধ চিত্রময় প্রকৃতি তার ডালা খুলে নিজেকে উন্মোচিত করবে, তা ঠিক করে কবি তার অসাধারন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ব্যবহারের মাধ্যমে! কবি এবং প্রকৃতি কে একসূত্রে বাধার এই বৈবাহিক যজ্ঞের দূতিয়ালিতে শব্দকে নিতে হয় ঘটকের ভুমিকা! কিন্তু কবির, কোন চিন্তার পালকে পেখম মেলবে আরাধ্য বনময়ূরী, সেই মহার্ঘ, সেই অন্বিষ্ট শব্দের খোঁজ কবিকেই করতে হয়! কবি তাই সকাল দুপুর রাত এক ধরনের ঘোরে থাকেন, নিজের কল্পনাকে প্রকৃতির বিহ্বলতায় রাঙাতে খোজেন শব্দ-যাদু, যাদুর শব্দ!!
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার, বিকেল ৪ টা
ধানমন্ডি ঢাকা ©রাগিব রেকিশি
জীবনানন্দের পরাবাস্তব কুয়াশা আর বিভূতিভূষণের মাটির কাছাকাছি থাকা আরণ্যক রূপ—দুজনের আত্মাকে আপনি এক বিন্দুতে মেলালেন অপূর্ব মুন্সিয়ানায়।
অসাধারণ গদ্যশৈলী! নির্জন নিসর্গের এমন ঘ্রাণমেদুর রূপ বহু যুগ পর বাংলা গদ্যে আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।
লেখাটি শুধু পড়া নয়, যেন চোখ বুজে ভাঁটফুল, আকন্দ আর ভেজা মাটির ঘ্রাণ নেওয়া। শব্দের এমন দৃশ্যমান ও ঘ্রাণময় বুনন খুব কম দেখা যায়।
কাপ্তাইয়ের বন থেকে শুরু করে জীবনানন্দের কুয়াশা হয়ে কবির শব্দসন্ধান—পুরো লেখাটাই যেন বিশুদ্ধ সাহিত্যের এক স্নিগ্ধ উদযাপন।
প্রতিটি বাক্যে এত মায়া, এত মিহি কুয়াশার মতো আবেশ জড়িয়ে আছে যে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার পরও রেশ বহুক্ষণ থেকে যায়।
জীবনানন্দ আর বিভূতিভূষণকে ‘গন্ধের কারবারি, মাজুল মহাজন’ বলাটা অসাধারণ এক অন্তর্দৃষ্টি! বাংলার প্রকৃতি যে কেবল দেখার নয়, তীব্র অনুভবের ও ঘ্রাণের—তা চমৎকারভাবে মনে করিয়ে দিলেন।
প্রকৃতি আর কবির মাঝে শব্দকে কম্পিউটারের ‘ইন্টারফেস’ বা ‘আইকন’-এর সাথে তুলনা করার উপমাটি একেবারে অভিনব এবং আধুনিক! গভীর এক ভাবনার প্রকাশ।
“কবি আর প্রকৃতির বৈবাহিক যজ্ঞে শব্দই ঘটক—উপমাটির গভীরতা মুগ্ধ করার মতো। শব্দ ছাড়া তো এই অপার্থিব সৌন্দর্যকে স্পর্শ করার আর কোনো সাঁকো নেই।”