A K SARKER SHAON

স্থির নই আমরা: পৃথিবী থেকে মহাবিশ্বের মহাযাত্রা
এ কে সরকার শাওন

দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে যখন আমরা সোফায় পিঠ ঠেকাই, তখন চারপাশটা কতই না শান্ত আর স্থির মনে হয়। জানালার বাইরে গাছটি নিশ্চুপ। টেবিল-চেয়ার যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। আমরাও যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছি। কিন্তু সত্যিই কি আমরা স্থির?
একদমই না।

আপনি যখন চুপচাপ সোফায় বসে এই লেখাটি পড়ছেন, তখনও পৃথিবীর সঙ্গে ঘুরছেন, সূর্যের চারদিকে ছুটছেন, সূর্যের সঙ্গে মিল্কিওয়ের বুক দিয়ে ছুটে চলেছেন। আবার আমাদের গ্যালাক্সিও বৃহত্তর মহাবিশ্বে গতিশীল।

ব্যাপারটি অনেকটা একটির ভেতর আরেকটি পুতুল রাখার মতো। রুশ নেস্টিং ডলের সবচেয়ে ছোট পুতুলটিকে যদি পৃথিবী ধরি, তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি গতি, তার সঙ্গে আরও বড় আরেকটি। এভাবে ধাপে ধাপে আমরা পৌঁছে যাই বিশাল মহাজাগতিক পরিসরে।

চলুন, পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে পৌঁছে যাই।

১. পৃথিবীর আহ্নিক গতি

আমাদের প্রথম যাত্রাটি সবচেয়ে পরিচিত। পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘুরছে। একবার ঘুরতে সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। এই ঘূর্ণনের কারণেই দিন ও রাতের পালাবদল ঘটে। বিষুবরেখায় পৃথিবীপৃষ্ঠের ঘূর্ণন গতি সেকেন্ডে প্রায় ০.৪৬ কিলোমিটার। অর্থাৎ বিষুবরেখায় বসে থাকা একজন মানুষ হয়তো ভাবছেন তিনি একেবারে স্থির। অথচ পৃথিবীর অক্ষের সাপেক্ষে প্রতি সেকেন্ডে তিনি প্রায় ৪৬০ মিটার পথ অতিক্রম করছেন। এখানেই গতির প্রথম মজা; গতি সবসময় কোনো কিছুর সাপেক্ষে মাপতে হয়।
২. পৃথিবীর বার্ষিক গতি
পৃথিবী শুধু নিজের অক্ষেই ঘুরছে না। একই সঙ্গে সূর্যের চারদিকেও ছুটছে। এই যাত্রার গড় গতি সেকেন্ডে প্রায় ২৯.৮ কিলোমিটার, সহজ হিসাবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার।
সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। এই পরিক্রমাই আমাদের বছরের ভিত্তি।
একটু কল্পনা করা যাক। আপনি এক সেকেন্ড চুপচাপ বসে রইলেন। এই এক সেকেন্ডেই পৃথিবীর সঙ্গে সূর্যের কক্ষপথ ধরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন! কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। যে সূর্যকে ঘিরে পৃথিবী ছুটছে, সেই সূর্য নিজেও স্থির নয়।
৩. সৌরজগতের গ্যালাকটিক পরিক্রমা
আমাদের সূর্য মিল্কিওয়ে ছায়াপথের শত শত বিলিয়ন নক্ষত্রের একটি। মিল্কিওয়ের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে রয়েছে স্যাজিটেরিয়াস এ-স্টার নামের একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। এর ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ।
তবে সূর্য শুধু এই কৃষ্ণগহ্বরটির আকর্ষণেই গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে এমন নয়। মিল্কিওয়ের নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা এবং বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য বস্তুর সম্মিলিত মহাকর্ষ এখানে কাজ করছে।
সূর্য তার পুরো পরিবার; পৃথিবীসহ আটটি গ্রহ, তাদের প্রাকৃতিক উপগ্রহ, বামন গ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু এবং অসংখ্য ছোট বস্তু; নিয়ে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরছে। এই গতির পরিমাণ সেকেন্ডে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার। এত দ্রুত ছুটেও মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সূর্যের সময় লাগে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ কোটি বছর। একে বলা হয় একটি গ্যালাকটিক বছর।
সূর্যের বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। অর্থাৎ জন্মের পর থেকে সে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে মোটামুটি ২০ বার প্রদক্ষিণ করেছে এবং এখন ২১তম প্রদক্ষিণের পথে রয়েছে। মানুষের হিসাবে সূর্যের বয়স ৪৬০ কোটি বছর। কিন্তু তার নিজের গ্যালাকটিক ক্যালেন্ডারে সে যেন মাত্র বিশটির মতো বছর পার করেছে!
৪. গ্যালাকটিক দোলন গতি
এবার আরও মজার একটি গতি। মিল্কিওয়েকে দূর থেকে দেখলে একটি বিশাল চ্যাপ্টা চাকতির মতো মনে হয়। সূর্য এই চাকতির মধ্যে কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করলেও তার পথ একেবারে সমতল নয়। গ্যালাক্সির মহাকর্ষের প্রভাবে সূর্য সময়ের সঙ্গে গ্যালাক্সির সমতলের এক পাশ থেকে অন্য পাশে ধীরে ধীরে ওঠানামা করে। অনেকটা ঢেউয়ের মতো।
এই উল্লম্ব গতির বর্তমান আনুমানিক মান সেকেন্ডে প্রায় ৭ কিলোমিটার। তবে এটি সবসময় একই থাকে না। দোলনের অবস্থানের সঙ্গে এর মানও পরিবর্তিত হয়। একটি গ্যালাকটিক বছরে সূর্য কয়েকবার এভাবে গ্যালাক্সির সমতলের ওপর-নিচে যাতায়াত করতে পারে। অর্থাৎ আমরা শুধু সামনে ছুটছি না। ছুটতে ছুটতে দুলছিও! এই গতিকে মহাজাগতিক নাগরদোলা বললেও খুব বেশি ভুল হবে না।
৫. লোকাল গ্রুপের মহাজাগতিক নৃত্য
মিল্কিওয়ে একা নয়। অ্যান্ড্রমিডা, ট্রায়াঙ্গুলাম এবং বহু ছোট গ্যালাক্সির সঙ্গে মিলে আমাদের মিল্কিওয়ে একটি মহাজাগতিক পরিবার তৈরি করেছে। এর নাম লোকাল গ্রুপ।
এই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের পারস্পরিক মহাকর্ষের প্রভাবে গতিশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্পর্কটি মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রমিডার। অ্যান্ড্রমিডা মিল্কিওয়ের দিকে দৃষ্টিরেখা বরাবর সেকেন্ডে প্রায় ১১০ কিলোমিটার বেগে এগিয়ে আসছে। তাহলে মিল্কিওয়ে কি এগোচ্ছে না? অবশ্যই এগোচ্ছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মহাকাশে মিল্কিওয়ের এমন কোনো একক ‘পরম গতি’ নেই, যা সব পরিস্থিতিতে একই হবে। কার সাপেক্ষে মিল্কিওয়ের গতি মাপছি, তার ওপর গতির মান নির্ভর করবে। অ্যান্ড্রমিডার ক্ষেত্রে আমরা বলছি, দুটি গ্যালাক্সির মধ্যকার দূরত্ব বর্তমানে যে হারে কমছে, তার দৃষ্টিরেখা বরাবর মান প্রায় ১১০ কিলোমিটার/সেকেন্ড।
অন্যদিকে মহাজাগতিক পটভূমির তুলনায় আমাদের লোকাল গ্রুপের সামগ্রিক গতির কথা আমরা পরের ধাপে জানব। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, কয়েকশ কোটি বছর পর মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রমিডার সংঘর্ষ প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু বিজ্ঞান কখনো স্থির নয়। নতুন পর্যবেক্ষণ ও উন্নত হিসাব বলছে, ভবিষ্যতে দুটি গ্যালাক্সির সরাসরি সংঘর্ষ নিশ্চিত নয়। আগামী এক হাজার কোটি বছরের মধ্যে তাদের সংঘর্ষের সম্ভাবনা প্রায় অর্ধেক। তারা কাছাকাছি এসে একে অপরকে পাশ কাটিয়েও যেতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মহাবিশ্বও আমাদের জন্য রহস্য রেখে দিয়েছে।
৬. মহাজাগতিক পটভূমির সাপেক্ষে গতি
এবার আমাদের যাত্রাকে আরও বড় পরিসরে দেখা যাক। মহাবিশ্বজুড়ে অত্যন্ত ক্ষীণ একটি প্রাচীন বিকিরণ ছড়িয়ে আছে। এর নাম মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি। এটি মহাবিশ্বের শৈশবের এক প্রাচীন আলোকচিহ্ন। এই পটভূমিকে একটি মহাজাগতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের বৃহৎ পরিসরের গতি পরিমাপ করা যায়। এর সাপেক্ষে আমাদের লোকাল গ্রুপের গতি সেকেন্ডে প্রায় ৬২৭ কিলোমিটার।
একটু থামুন। সংখ্যাটির বিশালতা অনুভব করার চেষ্টা করুন। এক সেকেন্ডে প্রায় ৬২৭ কিলোমিটার! ঢাকা থেকে কক্সবাজারের সরলরেখার দূরত্বের চেয়েও অনেক বেশি পথ; এক সেকেন্ডে! তবে এই বিশাল গতির জন্য শুধু একটি বস্তু বা অঞ্চল দায়ী নয়। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গ্যালাক্সিগুচ্ছ, অতিগুচ্ছ, ঘন অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত ফাঁকা অঞ্চলের সম্মিলিত মহাকর্ষ আমাদের মহাজাগতিক গতিকে প্রভাবিত করছে।
এই বৃহৎ কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রেট অ্যাট্রাক্টর নামে পরিচিত একটি ঘন অঞ্চল। গ্রেট অ্যাট্রাক্টর কোনো দৈত্যাকার একক কৃষ্ণগহ্বর নয়। এটি বিপুল পরিমাণ পদার্থসমৃদ্ধ একটি অঞ্চল, যার মহাকর্ষ আশপাশের বহু গ্যালাক্সির গতিকে প্রভাবিত করে।
৭. আমাদের বিশাল মহাজাগতিক ঠিকানা
লোকাল গ্রুপের বাইরেও আমাদের ঠিকানা আছে। আমাদের মহাজাগতিক অঞ্চলটি লানিয়াকিয়া নামে পরিচিত এক বিশাল অতিগুচ্ছ কাঠামোর অংশ। এর বিস্তার প্রায় ৫২ কোটি আলোকবর্ষ এবং এর মধ্যে প্রায় এক লাখ বড় গ্যালাক্সি রয়েছে। কিন্তু আরও বড় পরিসরে তাকালে দেখা যায়, গ্যালাক্সিগুলো মহাবিশ্বে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে নেই। তাদের বিন্যাস দেখতে অনেকটা বিশাল মাকড়সার জালের মতো। একে বলা হয় মহাজাগতিক জাল। কোথাও গ্যালাক্সির দীর্ঘ সারি, কোথাও বিশাল গ্যালাক্সিগুচ্ছ, আবার মাঝখানে রয়েছে প্রায় ফাঁকা বিরাট অঞ্চল। এই বিশাল কাঠামোর গঠন ও বিবর্তনে অদৃশ্য বস্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৮. পৃথিবীর ঠিকানা থেকে কসমিক ঠিকানা
এ কে সরকার শাওন শাওনাজ ভিলা → মেডিকেল রোড → উত্তরখান → ঢাকা → বাংলাদেশ → পৃথিবী → সৌরজগৎ → মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি → লোকাল গ্রুপ → ল্যানিয়াকিয়া সুপারক্লাস্টার → পিসেস–সেটাস সুপারক্লাস্টার কমপ্লেক্স → পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব → মহাবিশ্ব
একটি বাড়ির ঠিকানা লিখতে সাধারণত কয়েকটি শব্দই যথেষ্ট। বাড়ি, রাস্তা, এলাকা, শহর, দেশ; ব্যস, মানুষ আপনার অবস্থান বুঝে যায়।
কিন্তু সেই ঠিকানার শেষে যদি লেখা হয় মহাবিশ্ব, তখন গল্পটি আর সাধারণ থাকে না।
৯. অদৃশ্য বস্তুর রহস্য
গ্যালাক্সির ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একসময় অবাক হয়ে গেলেন। শুধু চোখে দেখা নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণার ভর দিয়ে গ্যালাক্সির বিভিন্ন অংশের গতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। বিশেষ করে গ্যালাক্সির বাইরের অংশের নক্ষত্র ও গ্যাস প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত ঘুরছিল।
এই পর্যবেক্ষণসহ আরও বহু প্রমাণ বিজ্ঞানীদের এমন এক অদৃশ্য পদার্থের ধারণার দিকে নিয়ে যায়, যা আলো ছড়ায় না, কিন্তু মহাকর্ষীয় প্রভাব সৃষ্টি করে। একে আমরা বলি ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু।
আমাদের মিল্কিওয়েও এমন এক বিশাল অদৃশ্য বস্তুর বলয়ের মধ্যে রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা। অর্থাৎ মহাবিশ্বে এমন কিছুও আছে— যাকে আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু তার প্রভাব দেখতে পাই।
১০. এবার আরও বড় বিস্ময়—মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হচ্ছে
এতক্ষণ আমরা ছয় ধরনের প্রধান গতির কথা জানলাম। এবার এমন একটি ঘটনা সামনে আসে, যা আগের ছয়টির চেয়েও আলাদা। মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। তবে কথাটির অর্থ এই নয় যে আমাদের শরীর, পৃথিবী, সৌরজগৎ কিংবা মিল্কিওয়ে এই প্রসারণের কারণে ক্রমাগত বড় হয়ে যাচ্ছে। বৃহৎ মহাজাগতিক স্কেলে মহাকর্ষে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ নয় এমন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যকার দূরত্ব সময়ের সঙ্গে বাড়ছে।
সহজভাবে বোঝার জন্য একটি বেলুনের গায়ে কয়েকটি বিন্দু আঁকার কথা ভাবা যায়। বেলুনটি ফুলতে থাকলে বিন্দুগুলো নিজেরা হেঁটে না গেলেও তাদের মধ্যকার দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহাবিশ্ব অবশ্য বেলুন নয়। উদাহরণটি শুধু ধারণাটি বোঝার জন্য।
আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বৃহৎ স্কেলে কোনো গ্যালাক্সি আমাদের থেকে যত দূরে, মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে তার দূরে সরে যাওয়ার হার সাধারণভাবে তত বেশি। তাহলে এটি কি আমাদের সপ্তম গতি? সহজ ভাষায় মহাজাগতিক যাত্রার সপ্তম স্তর হিসেবে একে আলোচনা করা যায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি; প্রথম ছয়টি বিভিন্ন কিছুর সাপেক্ষে আমাদের বা আমাদের মহাজাগতিক ঠিকানার গতি। সপ্তমটি সেই অর্থে আরেকটি সাধারণ গতি নয়; এটি বৃহৎ স্কেলে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ।
তাই সপ্তমটির জন্য সেকেন্ডে একটি নির্দিষ্ট বেগ লেখা সম্ভব নয়। দুটি মহাকর্ষীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের দূরত্ব কত, তার ওপর তাদের মধ্যে প্রসারণজনিত দূরে সরে যাওয়ার হার নির্ভর করে। তাই আমাদের গল্পটি আরও বিস্ময়কর। আমরা শুধু একটি চলমান মহাবিশ্বের যাত্রী নই; যে মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের এই যাত্রা, সেই মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরটিও প্রসারিত হচ্ছে।
এক নজরে মহাজাগতিক যাত্রা
ধাপ মহাজাগতিক ঘটনা গতি
১ পৃথিবীর নিজের অক্ষে ঘূর্ণন প্রায় ০.৪৬ কিমি/সেকেন্ড
২ পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ প্রায় ৩০ কিমি/সেকেন্ড
৩ সৌরজগতের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ প্রায় ২৩০ কিমি/সেকেন্ড
৪ গ্যালাকটিক সমতলের ওপর-নিচে সূর্যের দোলন বর্তমানে প্রায় ৭ কিমি/সেকেন্ড
৫ অ্যান্ড্রমিডার মিল্কিওয়ের দিকে আসার আপেক্ষিক গতি প্রায় ১১০ কিমি/সেকেন্ড
৬ মহাজাগতিক পটভূমির সাপেক্ষে লোকাল গ্রুপের গতি প্রায় ৬২৭ কিমি/সেকেন্ড
৭ মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ একটি নির্দিষ্ট কিমি/সেকেন্ড মান নেই
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। ০.৪৬ + ৩০ + ২৩০ + ৭ + ১১০ + ৬২৭ যোগ করে আমাদের মোট গতি বের করা যাবে না। কারণ এগুলো একই দিকে এবং একই মানদণ্ডের সাপেক্ষে মাপা গতি নয়। আর সপ্তমটি আগের ছয়টির মতো সাধারণ স্থানগত গতি নয়; এটি মহাবিশ্বের বৃহৎ পরিসরের সম্প্রসারণ।
১১. শেষ কথা
রাতে ঘুমানোর আগে একবার জানালার বাইরে তাকান। সবকিছু শান্ত। গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িগুলো স্থির। দূরের আকাশে তারাগুলোও যেন নিশ্চুপ। কিন্তু সেই শান্ত দৃশ্যের আড়ালে চলছে অকল্পনীয় এক মহাযাত্রা। আপনি পৃথিবীর সঙ্গে ঘুরছেন। পৃথিবীর সঙ্গে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছেন। সূর্যের সঙ্গে মিল্কিওয়ের বুক দিয়ে ছুটছেন। সেই যাত্রার মাঝেই গ্যালাক্সির সমতলের ওপর-নিচে দুলছেন।
মিল্কিওয়ে আবার প্রতিবেশী গ্যালাক্সিগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের বিশাল নৃত্যে অংশ নিচ্ছে। আমাদের লোকাল গ্রুপও মহাজাগতিক পটভূমির সাপেক্ষে সেকেন্ডে শত শত কিলোমিটার বেগে চলছে। আর সবশেষে সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যটি হলো; যে মহাবিশ্বের মধ্যে এত ছুটে চলা, সেই মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরটিও প্রসারিত হচ্ছে।
তাই ‘আমি স্থির হয়ে বসে আছি’; কথাটি কেবল আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সত্য। মহাজাগতিক সত্যটি অন্যরকম। আমরা পৃথিবী নামের এক নীল মহাকাশযানের যাত্রী। এই মহাকাশযানের সঙ্গে আমরা এক গতির ভেতর আরেক গতি, তার ভেতর আরও বৃহৎ গতির অংশ হয়ে মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছি। আর সেই মহাবিশ্বও থেমে নেই। তাই আকাশের দিকে তাকালে হয়তো মনে নতুন একটি প্রশ্ন জাগতে পারে— আমরা যদি এক মুহূর্তের জন্যও সত্যিকার অর্থে স্থির না থাকি, তবে এই মহাজাগতিক মহাযাত্রা শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

0 Comments

A K SARKER SHAON

মলাটের নিচে বাণিজ্যে বন্দী কবিতা: প্রকাশনা সিন্ডিকেট ও সমকালীন সাহিত্য-সংকট
এ কে সরকার শাওন

১. ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস মূলত কবিতাকেন্দ্রীক। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, কিংবা রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ হয়ে আধুনিক কাল; বাঙালীর চিন্তার মানচিত্র গড়ে উঠেছে কবিতার হাত ধরে। কবিতা সাহিত্যের চারটি রূপের মধ্যে আদিমতম রূপ। ছন্দ, তাল ও আবেগের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা হয়। কবিতা মানুষের সুখ, দুঃখ, প্রেম কিংবা বিদ্রোহের অনুভূতিকে খুব কম কথায় সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারে।

২. সাহিত্যের শক্তিশালী ধারা কবিতা:
ইংরেজ রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং পার্সি বিশি শেলি উভয়েই কবিতাকে সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতার শক্তির উৎস হিসেবে মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে একে “শক্তিশালী অনুভূতির এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে পি বি শেলি কবিতার শক্তিকে আরও ব্যাপক ও সামাজিক রূপ দিয়ে কবিদের “এই পৃথিবীর অঘোষিত আইনপ্রণেতা” বলে ঘোষণা করেছেন; কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা মানুষের কল্পনাশক্তি ও নৈতিক চেতনাকে জাগ্রত করে সমাজ ও চিন্তাজগতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই বিষয়ে আমি অনেক আগেই ‘সাহিত্য ও কবিতার কথা’ শিরোনামে একটি পাঠকপ্রিয় আর্টিকেল লিখেছিলাম।

৩. কবিতার অশনিসংকেত:
সমকালীন বইবাজারে সবচেয়ে অবহেলিত, অপাঙ্ক্তেয় এবং ‘অচল’ পণ্যটির নাম কবিতা। অমর একুশে বইমেলাসহ দেশের প্রধান বইবাজারগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার কবিতার বই প্রকাশিত হলেও সেগুলোর সিংহভাগেরই কোনো পাঠক নেই।

একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে এসে কবিতার বই না চলার পেছনে কেবল ‘পাঠকের অনীহা’ বা ‘ভিডিও মাধ্যমের দাপট’কে দায়ী করে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এর অন্তরালে জড়িয়ে আছে এক শ্রেণির প্রকাশকের অনৈতিক জালিয়াতি, সামাজিক পরিচিতির সংকটে ভোগা একদল পয়সাওয়ালা শৌখিন লেখক, ছদ্ম-লেখক, ভার্চুয়াল চৌর্যবৃত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার চরম অভাব। সমকালীন কবিতাচর্চার এই বহুমাত্রিক অবক্ষয় ও তার ভেতরের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে আমার একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক অনুসন্ধান।

৪. আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এবং ‘শো-পিস’ সংস্কৃতির উত্থান:
বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি দৃশ্যমান, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা কৃত্রিম পরিচিতির সংকট বলে আখ্যয়িত করেন। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত শ্রেণির একাংশ; যাদের অনেককে সামাজিক বাস্তবতায় ‘শো-পিস গৃহবধূ’ বা ড্রয়িংরুমের অভিজাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তারা নিজেদের সমাজে একটু ‘আলাদা’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়ে জাহির করতে কবিতাকে সবচেয়ে সস্তা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন সমাজে অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট থাকা এক শ্রেণির পেশাজীবী। কর্মজীবনের অলস পয়সা কিংবা ক্ষমতার গ্ল্যামারকে সাহিত্যের আঙিনায় স্থায়ী রূপ দিতে এরা রাতারাতি ‘কবি’ খেতাব কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

৫. ইচ্ছেমতো কবিতা ও চুরির সংস্কৃতি:
এই ছদ্ম-কবিদের নিজস্ব কোনো মেধা, পাঠাভ্যাস বা সৃজনশীলতার গভীরতা থাকে না। ফলে জন্ম নেয় ‘ইচ্ছেমতো শব্দ সাজিয়ে কবিতা’ বানানোর এক অদ্ভুত সংস্কৃতি। যখন নিজের মেধা দিয়ে কবিতা আসে না, তখন তারা আশ্রয় নেন চৌর্যবৃত্তির। অন্যের সৃষ্টিকে হুবহু বা কিছুটা পরিবর্তন করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা সাহিত্যের মৌলিকত্বকে বিষাক্ত করে তুলছে।

৬. অর্থলিপ্সু প্রকাশক ও ভাড়ায় খাটা রিভিউ সিন্ডিকেট:
এই মানহীনতার বাজারকে টিকিয়ে রাখছে এবং চাঙ্গা করছে প্রকাশনা খাতের একটি বড় সিন্ডিকেট। বাণিজ্যিক প্রকাশকদের একাংশের কাছে সাহিত্যের মানের চেয়ে লেখকের পকেটের সাইজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে যেকোনো রদ্দি বা মানহীন পাণ্ডুলিপি সুদৃশ্য মলাটে ছেপে দিতে এই প্রকাশকদের বিবেক বিন্দুমাত্র বাধে না।
বই প্রকাশের পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের অনৈতিক বিপণন বাণিজ্য:
পেইড মিডিয়া কভারেজ: প্রভাবশালী ও ছদ্ম-লেখকেরা নিজেদের পকেটের টাকা ঢেলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় বা অনলাইন পোর্টালে রঙিন প্রমোশনাল ফিচার ও বুক-রিভিউ করান।

ভাড়ায় খাটা রিভিউ রাইটার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদল ভাড়ায় খাটা ‘রিভিউয়ার’ বা সাহিত্যিক তোষামোদকারী তৈরি হয়েছে। এরা নির্দিষ্ট অংকের টাকা বা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এই সব জঞ্জাল মার্কা বইকে ‘কালজয়ী সৃষ্টি’ কিংবা ‘বছরের সেরা বই’ বলে প্রচার করে। এর ফলে সাধারণ ও সরল পাঠক বিভ্রান্ত হচ্ছেন। পাঠক যখন বুক-রিভিউ দেখে কৌতূহল নিয়ে সেই কবিতার বই কেনেন, তখন তারা প্রতারিত বোধ করেন। এই ধারাবাহিক প্রতারণার চূড়ান্ত ফল হলো; পাঠক সামগ্রিকভাবে সমকালীন কবিতার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন এবং চিরতরে কবিতার বই কেনা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

৭. অসাধু প্রকাশকের ছলচাতুরী এবং ‘সংখ্যা-প্রতারণা’
একজন সত্যিকারের বা নতুন কবির আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু প্রকাশক চরম ব্যবসায়িক জালিয়াতি চালাচ্ছেন। নতুন বা মাঝারি সারির লেখকদের কাছ থেকে সাধারণত ১০০০ কপি বই ছাপানোর পুরো খরচ অগ্রিম বুঝে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে, ডিজিটাল বা অফসেট প্রিন্টিংয়ের এই যুগে প্রকাশকেরা মাত্র ১০০ বা ২০০ কপি বই প্রিন্ট করে মেলায় বা দোকানে তোলেন।
এই সংখ্যা-প্রতারণার ক্ষতিকর দিকগুলো:
কৃত্রিম সংকট: বইমেলায় দু-চারদিন যাওয়ার পরই বলা হয় ‘বই শেষ’, যা আসলে এক ধরনের কৃত্রিম জনপ্রিয়তার ভাওতাবাজি।
রয়্যালটি চুরি: বইমেলা বা দোকানে প্রকৃতপক্ষে কত কপি বই বিক্রি হলো, তার কোনো সঠিক হিসাব লেখককে দেওয়া হয় না।
ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের অভাব: আধুনিক যুগেও প্রকাশনা খাতে কোনো সেন্ট্রাল বারকোড সিস্টেম বা স্বচ্ছ ডিজিটাল ট্র্যাকিং না থাকায় এই অন্ধকারের জালিয়াতি বছরের পর বছর আড়ালোই থেকে যাচ্ছে।

৮. ভার্চুয়াল চৌর্যবৃত্তি ও আইনি জটিলতা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপ ও পেজগুলো এখন কবিতা চুরির প্রধান অভয়ারণ্য। কোনো তরুণ বা উদীয়মান কবি একটি চমৎকার কবিতা পোস্ট করার পর মুহূর্তেই তা কপি-পেস্ট সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে। আমি নিজেই এর সাক্ষী। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে লেখার মাঝে জগলু লিখেছি। এরপর কথাসাহিত্যের দিকে পা বাড়িয়েছি।

মূল কবির নাম সম্পূর্ণ কেটে দিয়ে, কিংবা নিজের নাম বসিয়ে অন্যের কবিতা গ্রুপে গ্রুপে পোস্ট করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আমাদের দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা কপিরাইট আইন থাকলেও ইন্টারনেটের এই সুবিশাল সমুদ্রে লেখা চুরির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাওয়া একজন সাধারণ কবির পক্ষে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। কোনো শক্ত প্রতিরোধ না থাকায় এই ভার্চুয়াল চোরেরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং প্রকৃত লেখকেরা মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে লেখালেখিই ছেড়ে দিচ্ছেন।

৯. আড়ালে আলোর কবিরা: পৃষ্ঠপোষকতার হাহাকার
এই করপোরেট, ক্ষমতা ও অর্থকেন্দ্রিক সাহিত্য-বাজারের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক বা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল সত্যিকারের প্রতিভাবান কবিরা। যাদের পকেটে প্রকাশকের চাহিদা মেটানোর মতো লাখ টাকা নেই, তাদের মানসম্মত, কালোত্তীর্ণ পাণ্ডুলিপি বছরের পর বছর প্রকাশকদের টেবিলের ড্রয়ারেই কিংবা নীজের তোষকের তলায় অবহেলায় পড়ে থাকে।

কর্পোরেট স্পন্সরশিপ, রাষ্ট্রীয় অনুদান, বড় বড় সাহিত্য পুরস্কার কিংবা গণমাধ্যমের লাইমলাইট; সবই আজ ঘুরপাক খাচ্ছে প্রভাবশালী আমলা, পেশাজীবি বা বিত্তবানদের বৃত্তে। ফলে একজন দরিদ্র কিন্তু খাঁটি কবিকে আলোর বৃত্তে টেনে আনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা জাতীয় উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মেধার চেয়ে টাকার জোর যেখানে বড়, সেখানে কবিতা ডুকরে কাঁদে।

১০. উত্তরণের পথ: মেধার রাজত্ব ফিরিয়ে আনা:
কবিতা কোনো ড্রয়িংরুমের শো-পিস বা সামাজিক মর্যাদার সস্তা অলঙ্কার নয়; এটি একটি জাতির মননশীলতা ও আত্মিক বিকাশের আয়না। এই ভয়াবহ অবক্ষয় থেকে কবিতাকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বের কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
কঠোর গেটকিপিং ও সম্পাদনা পরিষদ: প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে পাণ্ডুলিপি নির্বাচনের জন্য সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ‘সম্পাদনা বোর্ড’ গঠন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
মুদ্রণ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকির মাধ্যমে প্রতিটি বইয়ের প্রিন্ট সংখ্যা (Run size) সুনির্দিষ্ট বারকোডের মাধ্যমে ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করা, যাতে পাঠক ও লেখক কেউ প্রতারিত না হন।
প্লাজিয়ারিজম আইন ও স্ক্রিনিং: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রকাশনা স্তরে লেখা চুরি ধরার আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা এবং কপিরাইট আইনকে আরও সহজ ও কার্যকর করা। প্রয়োজনে আলাদা আদালত গঠন করা যেতে পারে।
লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন: বাণিজ্যিক প্রকাশকদের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে সত্যিকারের লেখকদের নিজেদের উদ্যোগে, যৌথ অর্থায়নে স্বাধীন সাহিত্য পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন চর্চাকে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

১১. উপসংহার:
টাকার জোরে কেনা কাগজের মলাট সাময়িক চাকচিক্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা কখনো কালজয়ী সাহিত্যের মর্যাদা পায় না। যতক্ষণ না সাহিত্যের আঙিনাকে এই অর্থের সিন্ডিকেট, ছদ্ম-লেখক এবং ক্ষমতার দাপট থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ কবিতার বইয়ের এই আকাল ও পাঠক-খরা কাটবে না। কবিতার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার এই লড়াইয়ে সৎ লেখক, প্রকৃত পাঠক এবং বিবেকবান সমালোচকদের এখনই একজোট হয়ে সোচ্চার হতে হবে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা কে বাঁধবে

লেখক পরিচিতি:
কবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঝালকাঠি শহরে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এই লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস অতল জলে জলাঞ্জলি এবং কাব্যগ্রন্থ কথা-কাব্য, নীরব কথোপকথন ও আপন-ছায়া। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলা কসমিক উপন্যাস মস্তিষ্কে মহাকাশ, বাঁশফুল, ইংরেজি উপন্যাস Metacosm of Mind, ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Songs of Insane, গল্পগ্রন্থ মোমের শেষ শিখা, আরও আটটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর লিখা অটোফিকশন উপন্যাস ‘শাওনাজ আইল্যান্ড’ বর্তমানে প্রকাশনার টেবিলে রয়েছে।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...