arif chowdhury

অলৌকিক বিশ্বাসের আলো
আরিফ চৌধুরী

মানুষের যত ভালোবাসা,স্বপ্ন,কল্পনার দিক দিগন্ত
সবই তারই মহীমা, এ জীবন সবই তারই আনত
ভালেবাসায় নত হয়, পরম প্রেমের বাণী উচ্চারিত হয়
এ মননের গভীরতায় যত কল্পনা,
সবই তার মহীমাময় আর্শীবাদ,
মানুষের অতি অল্পই আয়ুকাল,
জীবনের জীবন মৃত্যুর এক অধ্যায়,
এক জীবনের আলো- অন্ধকারের পথচলার দিশারী,
তারই সর্বোত্তম পরিকল্পনায়,
আনত হয় সকল চাওয়া – পাওয়া
মনের বিশ্বাস দৃঢ় হয় তারই আকুল করুণায়।

উদিত সূর্যের মতোই আমরা পাড়ি দেই
এক দিবস থেকে দিবস রজনীতে
প্রশস্ত মনের চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীর আলো, সৌন্দর্যের মুগ্ধ, রুপ, লাবণ্য, প্রকৃতির আলো- আঁধার
আমাদের আদি উৎসমূলে প্রোথিত জীবনে
বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হচ্ছে
মানুষের জীবনব্যাপী যে কালের যাত্রায়।

জীবনের অবনত সকল সৌরভ,বিভা,সৌম্যতা
মানুষের অন্তরের সকল স্রষ্টার প্রশংসার ধ্বনি
মুখে আমৃত্যু তার সকল আলো ছড়ানো বাণী
সকল প্রশংসাই তার।

মানুষ প্রতিদিন তার বিশ্বাসের দিকে আনত হয়
সত্য, সুন্দরের পবিত্রতায়,
জীবনকালের অপেক্ষার, অনন্তকালের যাত্রায়
তার ক্ষমার মহীমা,ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসায়
সকলই প্রশংসাই তার।

প্রতি মূহুর্তের জীবন, প্রতি মূহুর্তের মরণ
সব ভালোবাসার আধার,
সৃষ্টি ও বিনাশকালের ধারা,বিশাল বিস্তৃত পৃথিবীর
ভালো মন্দের বিচার, জবাবদিহি,
জীবন ও পরজীবনের সৎ কর্মশীলতা,কৃতকর্মের সফলতা,অটল বিশ্বাস,মমতা ভরা ভালোবাসা
সকলই প্রশংসাই তার।

বিস্ময়ের এই সমগ্র পৃথিবীর আলো বাতাসে
আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই মহানের
গৌরব ও মহীমা প্রকাশ করে
তার অটুট বিশ্বাসে,
মাতৃক্রোড়ে নতুন অভিষেক , ভালোবাসায় আগলে ধরা সকল মায়ার বাঁধন, তারই আদেশে,
দীর্ঘ জীবন,দীর্ঘ রজনীর ত্যাগের মহীমায় উজ্জ্বল
আলো ছড়ানো জীবনের পথচলা,
অনন্তলোকের পথচলার অভিযাত্রা,
সকল প্রশংসাই তারই।

২৬.৮.২০২৬..@

0 Comments

Arif Chowdhury

কবির জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধান্জলি
***************************-
সুকান্ত ভট্টাচার্য্য : কাল ও যুগের কন্ঠস্বর।
আরিফ চৌধুরী

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতার রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে ভোরের নক্ষত্রের মতো আর্বিভাব হয়েছিলো বাংলা কবিতায়।বাংলা কবিতার রবীন্দ্রোত্তর যুগের পরবর্তীতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তিরিশের সকল কবিদের পথ ধরে নব জীবনের একজন ঋত্বিক কবি হিসেবে আর্বিভূত হয়েছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আদর্শের প্রতি বিশ্বাস, আধুনিক যুগ চেতনায় জীবনের টানাপোড়েন, ও জটিল সময়ের নানান অসংগতি, ঘটনা প্রবাহ ও কবির সাবলীল রচনাশৈলী কবিতায় দেশ,কাল ও মানুষের নাগরিক জীবনবোধের গভীরতা, যন্ত্রণা সে সময় কবিকে আলোড়িত করেছে।
সে সময়ের কল্লোল যুগের অগ্রজ কবিদের কবিতায় দীক্ষিত হয়ে উঠেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য।
পরাধীন ভারতবর্ষে তথা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধারার আন্দোলনের সময়ে কবির আর্বিভাব যেনো কবি ব্যাক্তিত্বে ও গণ মানুষের নাগরিক জীবনের ন্যায্য দাবীর আন্দোলন, যুগ ব্যাপী মানুষের মানবতাবোধ কবির কবিতায় কবি প্রতিভার মৌলিকত্বতায় কবিকে অনন্য অসাধারণ পংক্তিতে কবিতা লেখায় উদ্ভুদ্ধ করেছিলো। কবিতা লেখার শুরুতেই কবি নতুন জীবন ও সমাজ মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা, সমাজ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন।

জীবনের টানাপোড়েনের শুরুতে তিনি মার্কসবাদী জীবন দর্শনের মধ্য খুঁজে পেয়েছিলেন তার কবি চেতনার সুগভীর সংহতি। সেই সত্যের উপলব্ধিতে কবি একটা যুগের প্রতিনিধি হয়ে কবিতায় বাস্তবতা, স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলেের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিজস্ব অন্তদৃষ্টিতে দেখার যে শক্তি কবি অর্জন করেছিলেন তা কবিতায় যেনো মশাল হয়ে জ্বলে জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কাব্য কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ কবিকে জাগিয়ে তুলেছে সৃষ্টি, চেতনার দীপ্ত পথচলায়। এক দিকে বিশ্বযুদ্ধের দামামা,খরা, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত,বিদ্যমান বিদ্রোহী চেতনা ও সংগ্রামমুখর সময়ে যুগসন্ধিক্ষণের পটভূমিকায় কবির কবিতা জন মানুষের চেতনাকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছিলো। তিনি যুগনসচেতন কবি ছিলেন বলেই তিনি সেই সময়ে দিন বদলের আহ্বান করেছিলেন কবিতায়। কাব্য জীবনের পরিপূর্ণতায় প্রবল আত্মবিশ্বাসে সমাজমুখী চেতনা ধারণ করা কবিতাগুলো কবিকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো।

যেমন দুর্ভিক্ষ পরবর্তী ইতিহাসের চেতনায় দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা কবিতা বোধন কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, উচ্চারিত হয়েছে।
যেমন:
“আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজন হারানোর শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবোই।
(বোধন- ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

কবি সুকান্ত রাজনৈতিক মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছিলেন নিজের বিশ্বাস থেকে।সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্টায় যে সকল কবি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একজন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। মার্কসবাদী আন্দোলনের মধ্য পরিপূর্ণ ভাবে আত্নবিশ্বাসী ছিলেন কবি। তাইতো আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করেছেন

” চলে যাব – তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জন্জাল্
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। “
(ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য্য)।

কবি রাজনীতিকে তার কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন। তার রাজনীতি আর্দশ ছিলো শোষণমুক্তির, সংগ্রামের ডাক,অধিকার আদায়ের দৃঢ় বিশ্বাসের ভিক্তিমূল। সেই সময়ের মমধ্য দিয়ে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা,মানবিক চেতনা কবিকে দিয়েছে বৈপ্লবিক ঔদ্বত্য,দুর্জয় সাহস ও চিন্তাশক্তিতে প্রবল বিশ্বাস।

তসইতো তিনি যুগ সচেতন, শ্রেণী সচেতন একজন কবি। জনগণের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাবোধ তার কবিতার অন্তঃপ্রাণ। কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্মাতাল সময়ে রাজনৈতিক মতবাদ কবির কবি সত্ত্বাকে চাপা দিতে পারেনি।কবি নিজের জীবনের সাথে বোঝাপড়া সেরে কবি আহবান জানালেন দেশের আপামর মানুষকে। তাইতো বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেছেন কবি।

“বাংলাার মাটি দুর্জয় খাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত”
(উদ্যোগ- পূর্বাভাস)।

কবি শোষিত, বঞ্চিত, মানুষের জীবনের কাছাকাছি ছুটে গেছেন,জনগণের প্রতি তার অন্তরের অর্ন্তগত গভীর সহানুভূতি তার কবিতাকে সাম্যবাদের আর্দশে অনুপ্রাণিত করে বাংলা কবিতায় এক অনিবার্ষ স্বাতন্ত্র্য ধারার সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক চেতনায় ও চিন্তাভাবনায় দীক্ষিত হয়ে কবি তার রক্তে শুনতে পেলেন সর্বহারা মানুষের আর্তনাদ। তাইতো ক্ষোভে তিনি উচ্চারণ করেছেন অসাধারণ কবিতায়-

‘ কবিতা তোমায় আজকে দিলাম ছুটি
ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
(হে মহাজীবন- ছাড়পত্র)।

কবি ছিলেন এক দুঃসাহসিক কবি। তার লেখনিতে ঝলসে ওঠা বৈপ্লবিক কবিতাগুলো পাঠ করে সমাজের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণের সঞ্চার। কবি একটি যুগের নির্মোহ প্রতিনিধি হয়ে সে সময়ের শোষকের স্বরুপকে উন্মোচিত করেছেন। বিদ্রোহ মুখর যুগের অশান্ত সময়ের কলরোল তার কবিতার ছিলো মর্মবাণী।
যুগ সচেতন কবি বলেই দিনবদলের আহবান জানাতে পেরেছেন তার কবিতায়। কবির কবিতায় স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধতার রেখায় ইতিহাসের জীবন্ত মিছিল হয়ে প্রতিফলিত হয়েছিলো।মানুষের জীবনকে নিজের অন্তদৃষ্টিতে দেখার ভাবনা কবির কবিতার প্রতিটি পংক্তি তে অনুরণিত হয়ে উঠেছে। কবি কবিতার মধ্য মশাল হয়ে জ্বলে নতুন জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া গ্রামে। অকাল প্রয়াত এ কবির জন্ম হয়েছিলো মহানগরী কলকাতায়। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০ শ্রাবণ,রবিবার,১৫ আগষ্টের১৯২৬ সালে। মৃত্যুবরণ করেন ১৩ মে ১৯৪৭,(২৯ বৈশাখ,১৩৫৪ বঙ্গাব্দে)।

কবি কবিতায় নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেন
কৃষকের কাস্তের প্রখরতা উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চেতনায়। জীবন সংগ্রামের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে শ্রেণী চেতনা তথা গণ আন্দোলনের জোয়ার তার সময়ে মুক্তির স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলো। তাইতো কবি মানুষের জীবনের মুক্তির আশ্রয়, স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রত্যয় দীপ্ত অহংকারের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করেছেন – “

“আমার পুরনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুধার আগুনে,
তাই দীপ্ত কাস্তে চেতন্য প্রখর-
যে কাস্তে ঝুঁলসাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রেমে”
(ফসলের ডাক- ছাড়পত্র)।

তিনি অত্যাচরী শাসকদের শোষণ ও নিপীড়ন যেমন দেখেছিলেন, তেমনি দেখেছিলেন উদ্ধত র্স্পধাকে ভেঙে পড়তে।জনগনের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন বলেই বস্তুজগতের সবকিছু মধ্য কবিতার বিষয়ককে খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম বিদ্রোহের ঘোষনার পাশাপাশি কবি সাম্রাজ্যেবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ও তার কলম থেমে থাকেনি।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের কবি খ্যাতি গড়ে উঠেছিলো কবির মৃত্যু’র পরেই। কবি জীবিতকালে কবির প্রথম বইটিও দেখে যেতে পারেননি ও বইটির নামকরণ ও করে যেতে পারেননি। বইয়ের প্রথম কবিতার নাম অনুসারে কবিতার বইয়ের নামকরণ করা হয়েছিলো ‘ছাড়পত্র’। বইটির নামকরণ ও ভূমিকা লিখেছিলেন প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং প্রচ্ছদ একেঁছিলেন বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায়। ছাড়পত্রের কবিতাগুলো ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ উন্মাতাল স্বদেশ,দেশভাগ,বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি, মন্বন্তর, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানান সংকটে নিয়ে লেখা।

বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে ছাড়পত্র যেনো এক নতুন চিন্তার ফসল। যাতে আছে আপোষহীন শ্রেণী সংগ্রামের ঘোষণা। বৃহত্তর মানব সমাজের কল্যাণকে তিনি সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ও নিজের আর্দশকে রক্তের গভীরে মিশিয়ে নিতে পেরেছিলেন বলেই সুকান্তের কবি প্রতিভা বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় ও কবি প্রতিবাদ, বিদ্রোহের এক মূর্ত প্রতীক।

চট্টগ্রাম ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতির হিরণগর্ভ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ পূর্বের আরাকান ও উত্তর পূর্বের ত্রিপুরাদের দখলিস্বত্ব কায়েমের রণকৌশলের ক্ষেত্র বারবার জনজীবনে এর প্রভাব পড়েছে। সমুদ্র বন্দর টেনে এনেছে দূর দূরান্তের বণিক ও নাবিকদের।
১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ আমল ও মোগল সুবেদার, পর্তুগিজদের ও ইংরেজদের প্রতাপ ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুতিকাগার চট্টগ্রামকে নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য উচ্চারণ করেন অনবদ্য প্রতিবাদী কবিতা। চট্টগ্রাম -১৯৪৩ শিরোনামে কবিতায় কবি বলে উঠেন:
” ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম-
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে,আনে আজ চেতনার দিন,
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম।
তাই আজো পাশবিকতার
দুঃসহ মহড়া চলে
তাই আজও শত্রুরা সাহসী
জানি আমি তোমার হৃদয়ে
অজস্র ঔদার্য আছে,জানি সুস্থ শালীনতা
জানি তুমি আঘাতে আঘাতে
এখনও স্তিমিত নও,জানি তুমি এখনও উদ্দাম-
হে চট্টগ্রাম”।
চট্টগ্রাম বাংলাভূমির ও বাঙালির হাজার বছরের শোষণ উৎপীড়নে ও নির্যাতন কবিকে দূর থেকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাইতো কবি উচ্চারণ করেছেন :
“তোমার প্রতিজ্ঞা, তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম।
আমার হৃপিন্ডে আজ তার লাল সাক্ষর দিলাম।”
(চট্টগ্রাম -১৯৪৩- সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

একজন কবিকে চেনা যায় কবির রচনাশৈলীর সৃষ্টির একাগ্রতা, ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প,ও লেখার মৌলিকতায়।কাব্য রীতির তুলনায় কবি ছিলেন শিল্প সচেতন,বাচনভঙ্গির সারল্য, তীব্রতা কবির কবিতাকে সার্থক করে তুলেছে। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের অবক্ষয়ী সমাজের জলন্ত ইতিহাস।
বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তার অকালমৃত্যু অক্ষয় বেদনা হয়ে থাকবে। সুকান্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্য প্রতিভার গুণে স্থায়ী আসন অধিকার করে থাকবেন শত শত বছর পরেও। সুকান্তের সমাজ সচেতন দৃষ্টিভংঙ্গী গণমুখী চেতনাবোধ, বজ্রকঠোর লেখনি বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে আজ সংযোজন করলো একটি নতুন অধ্যায়।
কবির জন্মশতবর্ষে কবিকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি।
১৮.৮.২০২৬
চট্টগ্রাম।

কবির জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধান্জলি
***************************-
সুকান্ত ভট্টাচার্য্য : কাল ও যুগের কন্ঠস্বর।
আরিফ চৌধুরী

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতার রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে ভোরের নক্ষত্রের মতো আর্বিভাব হয়েছিলো বাংলা কবিতায়।বাংলা কবিতার রবীন্দ্রোত্তর যুগের পরবর্তীতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তিরিশের সকল কবিদের পথ ধরে নব জীবনের একজন ঋত্বিক কবি হিসেবে আর্বিভূত হয়েছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আদর্শের প্রতি বিশ্বাস, আধুনিক যুগ চেতনায় জীবনের টানাপোড়েন, ও জটিল সময়ের নানান অসংগতি, ঘটনা প্রবাহ ও কবির সাবলীল রচনাশৈলী কবিতায় দেশ,কাল ও মানুষের নাগরিক জীবনবোধের গভীরতা, যন্ত্রণা সে সময় কবিকে আলোড়িত করেছে।
সে সময়ের কল্লোল যুগের অগ্রজ কবিদের কবিতায় দীক্ষিত হয়ে উঠেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য।
পরাধীন ভারতবর্ষে তথা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধারার আন্দোলনের সময়ে কবির আর্বিভাব যেনো কবি ব্যাক্তিত্বে ও গণ মানুষের নাগরিক জীবনের ন্যায্য দাবীর আন্দোলন, যুগ ব্যাপী মানুষের মানবতাবোধ কবির কবিতায় কবি প্রতিভার মৌলিকত্বতায় কবিকে অনন্য অসাধারণ পংক্তিতে কবিতা লেখায় উদ্ভুদ্ধ করেছিলো। কবিতা লেখার শুরুতেই কবি নতুন জীবন ও সমাজ মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা, সমাজ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন।

জীবনের টানাপোড়েনের শুরুতে তিনি মার্কসবাদী জীবন দর্শনের মধ্য খুঁজে পেয়েছিলেন তার কবি চেতনার সুগভীর সংহতি। সেই সত্যের উপলব্ধিতে কবি একটা যুগের প্রতিনিধি হয়ে কবিতায় বাস্তবতা, স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলেের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিজস্ব অন্তদৃষ্টিতে দেখার যে শক্তি কবি অর্জন করেছিলেন তা কবিতায় যেনো মশাল হয়ে জ্বলে জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কাব্য কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ কবিকে জাগিয়ে তুলেছে সৃষ্টি, চেতনার দীপ্ত পথচলায়। এক দিকে বিশ্বযুদ্ধের দামামা,খরা, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত,বিদ্যমান বিদ্রোহী চেতনা ও সংগ্রামমুখর সময়ে যুগসন্ধিক্ষণের পটভূমিকায় কবির কবিতা জন মানুষের চেতনাকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছিলো। তিনি যুগনসচেতন কবি ছিলেন বলেই তিনি সেই সময়ে দিন বদলের আহ্বান করেছিলেন কবিতায়। কাব্য জীবনের পরিপূর্ণতায় প্রবল আত্মবিশ্বাসে সমাজমুখী চেতনা ধারণ করা কবিতাগুলো কবিকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো।

যেমন দুর্ভিক্ষ পরবর্তী ইতিহাসের চেতনায় দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা কবিতা বোধন কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, উচ্চারিত হয়েছে।
যেমন:
“আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজন হারানোর শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবোই।
(বোধন- ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

কবি সুকান্ত রাজনৈতিক মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছিলেন নিজের বিশ্বাস থেকে।সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্টায় যে সকল কবি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একজন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। মার্কসবাদী আন্দোলনের মধ্য পরিপূর্ণ ভাবে আত্নবিশ্বাসী ছিলেন কবি। তাইতো আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করেছেন

” চলে যাব – তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জন্জাল্
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। “
(ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য্য)।

কবি রাজনীতিকে তার কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন। তার রাজনীতি আর্দশ ছিলো শোষণমুক্তির, সংগ্রামের ডাক,অধিকার আদায়ের দৃঢ় বিশ্বাসের ভিক্তিমূল। সেই সময়ের মমধ্য দিয়ে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা,মানবিক চেতনা কবিকে দিয়েছে বৈপ্লবিক ঔদ্বত্য,দুর্জয় সাহস ও চিন্তাশক্তিতে প্রবল বিশ্বাস।

তসইতো তিনি যুগ সচেতন, শ্রেণী সচেতন একজন কবি। জনগণের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাবোধ তার কবিতার অন্তঃপ্রাণ। কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্মাতাল সময়ে রাজনৈতিক মতবাদ কবির কবি সত্ত্বাকে চাপা দিতে পারেনি।কবি নিজের জীবনের সাথে বোঝাপড়া সেরে কবি আহবান জানালেন দেশের আপামর মানুষকে। তাইতো বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেছেন কবি।

“বাংলাার মাটি দুর্জয় খাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত”
(উদ্যোগ- পূর্বাভাস)।

কবি শোষিত, বঞ্চিত, মানুষের জীবনের কাছাকাছি ছুটে গেছেন,জনগণের প্রতি তার অন্তরের অর্ন্তগত গভীর সহানুভূতি তার কবিতাকে সাম্যবাদের আর্দশে অনুপ্রাণিত করে বাংলা কবিতায় এক অনিবার্ষ স্বাতন্ত্র্য ধারার সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক চেতনায় ও চিন্তাভাবনায় দীক্ষিত হয়ে কবি তার রক্তে শুনতে পেলেন সর্বহারা মানুষের আর্তনাদ। তাইতো ক্ষোভে তিনি উচ্চারণ করেছেন অসাধারণ কবিতায়-

‘ কবিতা তোমায় আজকে দিলাম ছুটি
ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
(হে মহাজীবন- ছাড়পত্র)।

কবি ছিলেন এক দুঃসাহসিক কবি। তার লেখনিতে ঝলসে ওঠা বৈপ্লবিক কবিতাগুলো পাঠ করে সমাজের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণের সঞ্চার। কবি একটি যুগের নির্মোহ প্রতিনিধি হয়ে সে সময়ের শোষকের স্বরুপকে উন্মোচিত করেছেন। বিদ্রোহ মুখর যুগের অশান্ত সময়ের কলরোল তার কবিতার ছিলো মর্মবাণী।
যুগ সচেতন কবি বলেই দিনবদলের আহবান জানাতে পেরেছেন তার কবিতায়। কবির কবিতায় স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধতার রেখায় ইতিহাসের জীবন্ত মিছিল হয়ে প্রতিফলিত হয়েছিলো।মানুষের জীবনকে নিজের অন্তদৃষ্টিতে দেখার ভাবনা কবির কবিতার প্রতিটি পংক্তি তে অনুরণিত হয়ে উঠেছে। কবি কবিতার মধ্য মশাল হয়ে জ্বলে নতুন জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া গ্রামে। অকাল প্রয়াত এ কবির জন্ম হয়েছিলো মহানগরী কলকাতায়। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০ শ্রাবণ,রবিবার,১৫ আগষ্টের১৯২৬ সালে। মৃত্যুবরণ করেন ১৩ মে ১৯৪৭,(২৯ বৈশাখ,১৩৫৪ বঙ্গাব্দে)।

কবি কবিতায় নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেন
কৃষকের কাস্তের প্রখরতা উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চেতনায়। জীবন সংগ্রামের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে শ্রেণী চেতনা তথা গণ আন্দোলনের জোয়ার তার সময়ে মুক্তির স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলো। তাইতো কবি মানুষের জীবনের মুক্তির আশ্রয়, স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রত্যয় দীপ্ত অহংকারের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করেছেন – “

“আমার পুরনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুধার আগুনে,
তাই দীপ্ত কাস্তে চেতন্য প্রখর-
যে কাস্তে ঝুঁলসাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রেমে”
(ফসলের ডাক- ছাড়পত্র)।

তিনি অত্যাচরী শাসকদের শোষণ ও নিপীড়ন যেমন দেখেছিলেন, তেমনি দেখেছিলেন উদ্ধত র্স্পধাকে ভেঙে পড়তে।জনগনের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন বলেই বস্তুজগতের সবকিছু মধ্য কবিতার বিষয়ককে খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম বিদ্রোহের ঘোষনার পাশাপাশি কবি সাম্রাজ্যেবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ও তার কলম থেমে থাকেনি।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের কবি খ্যাতি গড়ে উঠেছিলো কবির মৃত্যু’র পরেই। কবি জীবিতকালে কবির প্রথম বইটিও দেখে যেতে পারেননি ও বইটির নামকরণ ও করে যেতে পারেননি। বইয়ের প্রথম কবিতার নাম অনুসারে কবিতার বইয়ের নামকরণ করা হয়েছিলো ‘ছাড়পত্র’। বইটির নামকরণ ও ভূমিকা লিখেছিলেন প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং প্রচ্ছদ একেঁছিলেন বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায়। ছাড়পত্রের কবিতাগুলো ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ উন্মাতাল স্বদেশ,দেশভাগ,বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি, মন্বন্তর, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানান সংকটে নিয়ে লেখা।

বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে ছাড়পত্র যেনো এক নতুন চিন্তার ফসল। যাতে আছে আপোষহীন শ্রেণী সংগ্রামের ঘোষণা। বৃহত্তর মানব সমাজের কল্যাণকে তিনি সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ও নিজের আর্দশকে রক্তের গভীরে মিশিয়ে নিতে পেরেছিলেন বলেই সুকান্তের কবি প্রতিভা বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় ও কবি প্রতিবাদ, বিদ্রোহের এক মূর্ত প্রতীক।

চট্টগ্রাম ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতির হিরণগর্ভ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ পূর্বের আরাকান ও উত্তর পূর্বের ত্রিপুরাদের দখলিস্বত্ব কায়েমের রণকৌশলের ক্ষেত্র বারবার জনজীবনে এর প্রভাব পড়েছে। সমুদ্র বন্দর টেনে এনেছে দূর দূরান্তের বণিক ও নাবিকদের।
১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ আমল ও মোগল সুবেদার, পর্তুগিজদের ও ইংরেজদের প্রতাপ ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুতিকাগার চট্টগ্রামকে নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য উচ্চারণ করেন অনবদ্য প্রতিবাদী কবিতা। চট্টগ্রাম -১৯৪৩ শিরোনামে কবিতায় কবি বলে উঠেন:
” ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম-
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে,আনে আজ চেতনার দিন,
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম।
তাই আজো পাশবিকতার
দুঃসহ মহড়া চলে
তাই আজও শত্রুরা সাহসী
জানি আমি তোমার হৃদয়ে
অজস্র ঔদার্য আছে,জানি সুস্থ শালীনতা
জানি তুমি আঘাতে আঘাতে
এখনও স্তিমিত নও,জানি তুমি এখনও উদ্দাম-
হে চট্টগ্রাম”।
চট্টগ্রাম বাংলাভূমির ও বাঙালির হাজার বছরের শোষণ উৎপীড়নে ও নির্যাতন কবিকে দূর থেকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাইতো কবি উচ্চারণ করেছেন :
“তোমার প্রতিজ্ঞা, তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম।
আমার হৃপিন্ডে আজ তার লাল সাক্ষর দিলাম।”
(চট্টগ্রাম -১৯৪৩- সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

একজন কবিকে চেনা যায় কবির রচনাশৈলীর সৃষ্টির একাগ্রতা, ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প,ও লেখার মৌলিকতায়।কাব্য রীতির তুলনায় কবি ছিলেন শিল্প সচেতন,বাচনভঙ্গির সারল্য, তীব্রতা কবির কবিতাকে সার্থক করে তুলেছে। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের অবক্ষয়ী সমাজের জলন্ত ইতিহাস।
বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তার অকালমৃত্যু অক্ষয় বেদনা হয়ে থাকবে। সুকান্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্য প্রতিভার গুণে স্থায়ী আসন অধিকার করে থাকবেন শত শত বছর পরেও। সুকান্তের সমাজ সচেতন দৃষ্টিভংঙ্গী গণমুখী চেতনাবোধ, বজ্রকঠোর লেখনি বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে আজ সংযোজন করলো একটি নতুন অধ্যায়।
কবির জন্মশতবর্ষে কবিকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি।
১৮.৮.২০২৬
চট্টগ্রাম।

কবির জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধান্জলি
***************************-
সুকান্ত ভট্টাচার্য্য : কাল ও যুগের কন্ঠস্বর।
আরিফ চৌধুরী

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতার রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে ভোরের নক্ষত্রের মতো আর্বিভাব হয়েছিলো বাংলা কবিতায়।বাংলা কবিতার রবীন্দ্রোত্তর যুগের পরবর্তীতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তিরিশের সকল কবিদের পথ ধরে নব জীবনের একজন ঋত্বিক কবি হিসেবে আর্বিভূত হয়েছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আদর্শের প্রতি বিশ্বাস, আধুনিক যুগ চেতনায় জীবনের টানাপোড়েন, ও জটিল সময়ের নানান অসংগতি, ঘটনা প্রবাহ ও কবির সাবলীল রচনাশৈলী কবিতায় দেশ,কাল ও মানুষের নাগরিক জীবনবোধের গভীরতা, যন্ত্রণা সে সময় কবিকে আলোড়িত করেছে।
সে সময়ের কল্লোল যুগের অগ্রজ কবিদের কবিতায় দীক্ষিত হয়ে উঠেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য।
পরাধীন ভারতবর্ষে তথা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধারার আন্দোলনের সময়ে কবির আর্বিভাব যেনো কবি ব্যাক্তিত্বে ও গণ মানুষের নাগরিক জীবনের ন্যায্য দাবীর আন্দোলন, যুগ ব্যাপী মানুষের মানবতাবোধ কবির কবিতায় কবি প্রতিভার মৌলিকত্বতায় কবিকে অনন্য অসাধারণ পংক্তিতে কবিতা লেখায় উদ্ভুদ্ধ করেছিলো। কবিতা লেখার শুরুতেই কবি নতুন জীবন ও সমাজ মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা, সমাজ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন।

জীবনের টানাপোড়েনের শুরুতে তিনি মার্কসবাদী জীবন দর্শনের মধ্য খুঁজে পেয়েছিলেন তার কবি চেতনার সুগভীর সংহতি। সেই সত্যের উপলব্ধিতে কবি একটা যুগের প্রতিনিধি হয়ে কবিতায় বাস্তবতা, স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলেের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিজস্ব অন্তদৃষ্টিতে দেখার যে শক্তি কবি অর্জন করেছিলেন তা কবিতায় যেনো মশাল হয়ে জ্বলে জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কাব্য কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ কবিকে জাগিয়ে তুলেছে সৃষ্টি, চেতনার দীপ্ত পথচলায়। এক দিকে বিশ্বযুদ্ধের দামামা,খরা, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত,বিদ্যমান বিদ্রোহী চেতনা ও সংগ্রামমুখর সময়ে যুগসন্ধিক্ষণের পটভূমিকায় কবির কবিতা জন মানুষের চেতনাকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছিলো। তিনি যুগনসচেতন কবি ছিলেন বলেই তিনি সেই সময়ে দিন বদলের আহ্বান করেছিলেন কবিতায়। কাব্য জীবনের পরিপূর্ণতায় প্রবল আত্মবিশ্বাসে সমাজমুখী চেতনা ধারণ করা কবিতাগুলো কবিকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো।

যেমন দুর্ভিক্ষ পরবর্তী ইতিহাসের চেতনায় দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা কবিতা বোধন কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, উচ্চারিত হয়েছে।
যেমন:
“আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজন হারানোর শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবোই।
(বোধন- ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

কবি সুকান্ত রাজনৈতিক মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছিলেন নিজের বিশ্বাস থেকে।সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্টায় যে সকল কবি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একজন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। মার্কসবাদী আন্দোলনের মধ্য পরিপূর্ণ ভাবে আত্নবিশ্বাসী ছিলেন কবি। তাইতো আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করেছেন

” চলে যাব – তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জন্জাল্
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। “
(ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য্য)।

কবি রাজনীতিকে তার কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন। তার রাজনীতি আর্দশ ছিলো শোষণমুক্তির, সংগ্রামের ডাক,অধিকার আদায়ের দৃঢ় বিশ্বাসের ভিক্তিমূল। সেই সময়ের মমধ্য দিয়ে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা,মানবিক চেতনা কবিকে দিয়েছে বৈপ্লবিক ঔদ্বত্য,দুর্জয় সাহস ও চিন্তাশক্তিতে প্রবল বিশ্বাস।

তসইতো তিনি যুগ সচেতন, শ্রেণী সচেতন একজন কবি। জনগণের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাবোধ তার কবিতার অন্তঃপ্রাণ। কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্মাতাল সময়ে রাজনৈতিক মতবাদ কবির কবি সত্ত্বাকে চাপা দিতে পারেনি।কবি নিজের জীবনের সাথে বোঝাপড়া সেরে কবি আহবান জানালেন দেশের আপামর মানুষকে। তাইতো বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেছেন কবি।

“বাংলাার মাটি দুর্জয় খাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত”
(উদ্যোগ- পূর্বাভাস)।

কবি শোষিত, বঞ্চিত, মানুষের জীবনের কাছাকাছি ছুটে গেছেন,জনগণের প্রতি তার অন্তরের অর্ন্তগত গভীর সহানুভূতি তার কবিতাকে সাম্যবাদের আর্দশে অনুপ্রাণিত করে বাংলা কবিতায় এক অনিবার্ষ স্বাতন্ত্র্য ধারার সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক চেতনায় ও চিন্তাভাবনায় দীক্ষিত হয়ে কবি তার রক্তে শুনতে পেলেন সর্বহারা মানুষের আর্তনাদ। তাইতো ক্ষোভে তিনি উচ্চারণ করেছেন অসাধারণ কবিতায়-

‘ কবিতা তোমায় আজকে দিলাম ছুটি
ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
(হে মহাজীবন- ছাড়পত্র)।

কবি ছিলেন এক দুঃসাহসিক কবি। তার লেখনিতে ঝলসে ওঠা বৈপ্লবিক কবিতাগুলো পাঠ করে সমাজের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণের সঞ্চার। কবি একটি যুগের নির্মোহ প্রতিনিধি হয়ে সে সময়ের শোষকের স্বরুপকে উন্মোচিত করেছেন। বিদ্রোহ মুখর যুগের অশান্ত সময়ের কলরোল তার কবিতার ছিলো মর্মবাণী।
যুগ সচেতন কবি বলেই দিনবদলের আহবান জানাতে পেরেছেন তার কবিতায়। কবির কবিতায় স্বদেশের মানচিত্র, ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধতার রেখায় ইতিহাসের জীবন্ত মিছিল হয়ে প্রতিফলিত হয়েছিলো।মানুষের জীবনকে নিজের অন্তদৃষ্টিতে দেখার ভাবনা কবির কবিতার প্রতিটি পংক্তি তে অনুরণিত হয়ে উঠেছে। কবি কবিতার মধ্য মশাল হয়ে জ্বলে নতুন জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া গ্রামে। অকাল প্রয়াত এ কবির জন্ম হয়েছিলো মহানগরী কলকাতায়। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০ শ্রাবণ,রবিবার,১৫ আগষ্টের১৯২৬ সালে। মৃত্যুবরণ করেন ১৩ মে ১৯৪৭,(২৯ বৈশাখ,১৩৫৪ বঙ্গাব্দে)।

কবি কবিতায় নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেন
কৃষকের কাস্তের প্রখরতা উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চেতনায়। জীবন সংগ্রামের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে শ্রেণী চেতনা তথা গণ আন্দোলনের জোয়ার তার সময়ে মুক্তির স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলো। তাইতো কবি মানুষের জীবনের মুক্তির আশ্রয়, স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রত্যয় দীপ্ত অহংকারের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করেছেন – “

“আমার পুরনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুধার আগুনে,
তাই দীপ্ত কাস্তে চেতন্য প্রখর-
যে কাস্তে ঝুঁলসাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রেমে”
(ফসলের ডাক- ছাড়পত্র)।

তিনি অত্যাচরী শাসকদের শোষণ ও নিপীড়ন যেমন দেখেছিলেন, তেমনি দেখেছিলেন উদ্ধত র্স্পধাকে ভেঙে পড়তে।জনগনের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন বলেই বস্তুজগতের সবকিছু মধ্য কবিতার বিষয়ককে খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম বিদ্রোহের ঘোষনার পাশাপাশি কবি সাম্রাজ্যেবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ও তার কলম থেমে থাকেনি।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের কবি খ্যাতি গড়ে উঠেছিলো কবির মৃত্যু’র পরেই। কবি জীবিতকালে কবির প্রথম বইটিও দেখে যেতে পারেননি ও বইটির নামকরণ ও করে যেতে পারেননি। বইয়ের প্রথম কবিতার নাম অনুসারে কবিতার বইয়ের নামকরণ করা হয়েছিলো ‘ছাড়পত্র’। বইটির নামকরণ ও ভূমিকা লিখেছিলেন প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং প্রচ্ছদ একেঁছিলেন বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায়। ছাড়পত্রের কবিতাগুলো ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ উন্মাতাল স্বদেশ,দেশভাগ,বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি, মন্বন্তর, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানান সংকটে নিয়ে লেখা।

বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে ছাড়পত্র যেনো এক নতুন চিন্তার ফসল। যাতে আছে আপোষহীন শ্রেণী সংগ্রামের ঘোষণা। বৃহত্তর মানব সমাজের কল্যাণকে তিনি সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ও নিজের আর্দশকে রক্তের গভীরে মিশিয়ে নিতে পেরেছিলেন বলেই সুকান্তের কবি প্রতিভা বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় ও কবি প্রতিবাদ, বিদ্রোহের এক মূর্ত প্রতীক।

চট্টগ্রাম ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতির হিরণগর্ভ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ পূর্বের আরাকান ও উত্তর পূর্বের ত্রিপুরাদের দখলিস্বত্ব কায়েমের রণকৌশলের ক্ষেত্র বারবার জনজীবনে এর প্রভাব পড়েছে। সমুদ্র বন্দর টেনে এনেছে দূর দূরান্তের বণিক ও নাবিকদের।
১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ আমল ও মোগল সুবেদার, পর্তুগিজদের ও ইংরেজদের প্রতাপ ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুতিকাগার চট্টগ্রামকে নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য উচ্চারণ করেন অনবদ্য প্রতিবাদী কবিতা। চট্টগ্রাম -১৯৪৩ শিরোনামে কবিতায় কবি বলে উঠেন:
” ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম-
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে,আনে আজ চেতনার দিন,
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম।
তাই আজো পাশবিকতার
দুঃসহ মহড়া চলে
তাই আজও শত্রুরা সাহসী
জানি আমি তোমার হৃদয়ে
অজস্র ঔদার্য আছে,জানি সুস্থ শালীনতা
জানি তুমি আঘাতে আঘাতে
এখনও স্তিমিত নও,জানি তুমি এখনও উদ্দাম-
হে চট্টগ্রাম”।
চট্টগ্রাম বাংলাভূমির ও বাঙালির হাজার বছরের শোষণ উৎপীড়নে ও নির্যাতন কবিকে দূর থেকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাইতো কবি উচ্চারণ করেছেন :
“তোমার প্রতিজ্ঞা, তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম।
আমার হৃপিন্ডে আজ তার লাল সাক্ষর দিলাম।”
(চট্টগ্রাম -১৯৪৩- সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

একজন কবিকে চেনা যায় কবির রচনাশৈলীর সৃষ্টির একাগ্রতা, ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প,ও লেখার মৌলিকতায়।কাব্য রীতির তুলনায় কবি ছিলেন শিল্প সচেতন,বাচনভঙ্গির সারল্য, তীব্রতা কবির কবিতাকে সার্থক করে তুলেছে। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের অবক্ষয়ী সমাজের জলন্ত ইতিহাস।
বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তার অকালমৃত্যু অক্ষয় বেদনা হয়ে থাকবে। সুকান্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্য প্রতিভার গুণে স্থায়ী আসন অধিকার করে থাকবেন শত শত বছর পরেও। সুকান্তের সমাজ সচেতন দৃষ্টিভংঙ্গী গণমুখী চেতনাবোধ, বজ্রকঠোর লেখনি বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে আজ সংযোজন করলো একটি নতুন অধ্যায়।
কবির জন্মশতবর্ষে কবিকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি।
১৮.৮.২০২৬
চট্টগ্রাম।

0 Comments

প্রতিটি লেখাই কি অমর ?