Subash Sarbabiddya

খরা রাতের বৃষ্টি
===========
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা

পেপার-ওয়েটটা টুপ করে টেবিল হতে গড়িয়ে পড়ল নিচে। ভয়ে চমকে উঠল মুগ্ধ। চেয়ারটা পেছনে ঠেলে এটি তুলে আবারও টেবিলের ওপর রাখল। সামনে দাঁড়ানো দুই জন পুলিশ। একজনের কাঁধে বন্দুক। অন্যজনের হাতে হ্যান্ডকাফ। হ্যান্ডকাফঅলা পুলিশ সদস্যটি বলল- তুমি কি মুগ্ধ?
– হুম। আমিই মুগ্ধ। আপনারা কি কারো খোঁজে এসেছেন?
– একদম তাই।
– আমি এই ব্যাচেলর রুমে থাকি। একটা চেয়ারও নেই যে, আপনাদের বসতে দিই। এই ভাঙা চৌকিতে কষ্ট করে বসেন।
– আমরা বসতে আসিনি। তোমার বিরুদ্ধে একটা হত্যা মামলার ওয়ারেন্ট আছে। হুকুম তালিম করতে এসেছি।
– বুঝি নাই স্যার। আমাকে..
– হুম। তোমাকেই।
– আমার অপরাধ, স্যার?
– আগে থানায় চলো। এরপর বলছি।
মুগ্ধর চোখে-মুখে আচমকা বিস্ময় আর আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। টেবিলে রাখা কাঁচের পেপার-ওয়েটটার দিকে সে তাকিয়ে রইল। এর নিচে চাপা পড়ে আছে তার সাজানো জীবনটা। বিড় বিড় করে বলল, যে ছেলেটি জীবনে কোনোদিন মশা, মাছি মারেনি তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা! একটু সাহস সঞ্চয় করে দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে বলল- স্যার, আপনাদের নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি..
ভুল শুদ্ধ কোর্ট দেখবে। আমরা হচ্ছি হুকুমের গোলাম।
কথা শেষ হতে না হতেই ওদের একজন মুগ্ধর কলার চেপে ধরল। টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলো। বাইরের দিকে চোখ যেতেই মুগ্ধর চোখ গেল একটি পিক-আপের দিকে। এটির গায়ে লেখা ছিল-“পুলিশ”। মুগ্ধর জানার আর অবশিষ্ট রইল না, সে পুলিশের জালে আটকা পড়েছে।

বাড়িতে তার বৃদ্ধ বাবা-মা থাকে। তাদেরকে এই সংবাদটা পৌঁছাবে সেই সুযোগটাও তারা দিল না। ধাক্কা মেরে গাড়িতে তুলে নিলো। মিনিট দশেক পর তাকে বহনকারী পিকআপখানা থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ইতিমধ্যে তার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হলো।

ওই দুই পুলিশ সদস্য গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে বড়বাবুর দফতরে নিয়ে গেল। বড় বাবুর হাতে তখন বিদেশী সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী শূন্যে ভাসিয়ে তিনি মুগ্ধর দিকে এক নজর দেখে নিলেন। এরপর দুই পুলিশ সদস্যকে আদেশ দিলেন- “এই হারামজাদারে চার নম্বর লকারে ঢুকাও। একটু পর আমি আসছি।”

একটা অন্ধকার খুপরিতে প্রায় একঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। এরপর বড়বাবু ঢুকলেন, ওই দুই সদস্যকে নিয়ে। মুগ্ধর ওপর শারীরিক কোনো চাপ দেওয়া হলো না। কিন্তু মানসিক চাপ দেওয়া হলো পাহাড় সম। বড়বাবু তাকে একটি লিখিত কাগজ দেখিয়ে বললেন- “আগামীকাল তোমাকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে হবে। কাগজে যা লেখা আছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঠিক তাই বলবে। ব্যস, তাহলে দুই-চারদিন পর খালাস। আর যদি হিরো সাজার চেষ্টা করো, তবে জেলের ভেতরেই জীবন শেষ”।
মুগ্ধ এক নজরে কাগজটার দিকে চেয়ে নিলো। কাগজটাতে লেখা আছে- সে নিজের মুখে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা একটা স্বীকারোক্তি।

পরদিন দুপুর বেলা। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের একটি বন্ধ কামরায় মুগ্ধকে দাঁড় করানো হলো। ঘরের ভেতরে কোনো পুলিশ নেই। নিয়ম অনুযায়ী, জবানবন্দি দেওয়ার আগে পুলিশের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তিনঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। টেবিলে বসে আছেন মধ্যবয়সী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব এবাদ উল্লাহ।
তিনি চশমাটা ঠিক করে মুগ্ধর দিকে তাকালেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, “এই ছেলে, তুমি কি জানো ১৬৪ ধারা কী?”
– “হ্যাঁ স্যার জানি।”

– “তবে এটাও সত্য যে, তুমি এই জবানবন্দি দিতে আইনগতভাবে বাধ্য নও। যদি তুমি এখন অপরাধ স্বীকার করো, তবে এই জবানবন্দি তোমার বিরুদ্ধেই আদালতে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হবে। তোমার শাস্তি হতে পারে। এবার বলো, তুমি কি স্বেচ্ছায় কিছু বলতে চাও?”

কামরার বাইরে করিডোরে সাব-ইন্সপেক্টর সেলিম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মুগ্ধর মনে হলো, সে দেয়াল ভেদ করে সেলিম সাহেবের নিষ্ঠুর চোখ দুটো দেখতে পাচ্ছে। ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শরীর জুড়ে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, আজ যদি সে এই মিথ্যা মেনে নেয়, তবে সারাজীবনের জন্য সে অপরাধী হয়ে যাবে। তার বাবা-মায়ের মুখ ছোট হবে।

ম্যাজিস্ট্রেট আবারও বলল, “তুমি কি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিবে?”
মুগ্ধ জানে, তার দু দিকেই বিপদ। সত্য বললে রিমান্ডে নিয়ে তাকে মেরে ফেলবে। মিথ্যা বললে অন্ততঃ তার প্রাণটা বাঁচবে। ওদের শেখানো পথেই তাকে যেতে হবে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, “হ্যাঁ স্যার। রাকিব যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল, তখনই তাকে আমি পেটে ছুরি ঢুকিয়ে খুন করি।
– রাত তখন কটা ছিল?

– স্যার, সম্ভবত ৯ টা। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দে ওর চিৎকার কেউ শোনেনি। আমি খুন করে রিকশা নিয়ে পালিয়ে যাই।”
ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দি লিখে নিলেন। পুলিশ ভাবল, তারা জিতে গেছে, মুগ্ধকে তারা জেলের সেলে পাঠিয়ে দিলো। মুগ্ধর রিমান্ডের ভয় কেটে গেল।
প্রায় ছয়টি মাস কেটে গেল মুগ্ধর। কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকার জীবনে প্রথম দিকে সে চরম হতাশায় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু একদিন তার ভাগ্য সহায় হলো। সেলে তার সাথে থাকা অন্য এক কয়েদি আসামি মুগ্ধর সব কথা শুনে আশ্বস্ত করল। সেই আসামিই মুগ্ধকে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর খোঁজ দিল এবং তার সাথে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করে দিল।

মুগ্ধ যখন সেই আইনজীবীর মুখোমুখি হলো, তখন সে অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে আবিষ্কার করল- ফৌজদারী আদালতের এই আইনজীবী আর কেউ নয়, তার স্কুল বেলায় হারিয়ে যাওয়া বন্ধু সমীর। স্কুল বেলার বন্ধুকে এমন বিপদে দেখে আইনজীবী বন্ধুটি জানপ্রাণ দিয়ে লড়ার প্রতিজ্ঞা করল। মুগ্ধ তাকে চুপিচুপি পুরো ঘটনার পেছনের আসল সত্য এবং পুলিশের জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের ক্লু-বুঝিয়ে দিলো।

এরপর আদালতে আবারও আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হলো। বন্ধু সমীর অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে আবহাওয়া অফিসের একটি প্রত্যয়িত সরকারি রিপোর্ট আদালতে পেশ করল। রিপোর্টে পরিষ্কার দেখা গেল- ঘটনার দিন, অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট তারিখে পুরো শহরে তীব্র খরা ছিল এবং গত এক মাসের মধ্যে ওই রাতে কোনো বৃষ্টিই হয়নি।
আদালতের বিজ্ঞ বিচারক পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, একজন মানুষ যদি সত্যিই খুন করত, কখনো সে বলতো না যে বৃষ্টির মধ্যে সে ওই ছেলেটিকে খুন করেছে। এই ‘বৃষ্টির গল্প’ আসামি ইচ্ছে করেই বানিয়েছে। আইন অনুযায়ী ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে যদি কোনো একটি বড় তথ্যের অসংগতি থাকে যা বাস্তব প্রমাণের সাথে মেলে না, তবে পুরো জবানবন্দিটিই আদালত “স্বেচ্ছায় ও সত্য নয়” বলে বাতিল করে দেয়।

বিচারক তৎক্ষণাৎ পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হন যে তারা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে এই জবানবন্দি লিখিয়েছে। মুগ্ধর রিমান্ড বাতিল হয় এবং মামলাটি অন্য একটি নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থার কাছে স্থানান্তরিত হয়।
অতঃপর মুক্তির স্বস্তি নিয়ে মুগ্ধ ধীরে ধীরে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল।

২৬ আগষ্ট ২০২৬ইং

0 Comments

Subash Sarbabiddya

কপাল যখন চরকি বাজি
==================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
নিয়তির চাকা কখন কোন দিকে ঘোরে, তা বোঝা বড় দায়। গত এক সপ্তাহ ধরে আমার কপালটাও যেন এক অবাধ্য চরকি বাজি, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছে। দুঃখের মাঝেও যে এত কৌতুক লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমার এই পোড়া কপাল না হলে বোধহয় জানাই হতো না।

সেদিন এক অলস দুপুরে বাজারে গিয়েছিলাম। এক মৎস্য ব্যবসায়ীর ড্রামে জ্যান্ত মাছের রূপালী রূপ আর চঞ্চল লাফালাফি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। তিন সাড়ে তিন কেজি ওজনের এক বিশাল রুই মাছ! এই ধরণের মাছ আমার গিন্নির ভারী পছন্দের। মনে মনে ভাবলাম, পকেটের অবস্থা তো আজ বেশ ভারী আছে। একটা না হয় কিনেই নিই! তাছাড়া এমন তরতাজা রূপালি ইলিশের মতো চকচকে রুই তো সবসময় চোখেও পড়ে না। আর যখন পড়ে, তখন পকেটের শূন্যতার কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসায় ফিরতে হয়। আজ যখন সুযোগ এসেছে, হাতছাড়া করা অন্যায় হবে।

মাছ বিক্রেতার সামনে আরও কয়েকটি মাছ সাজানো ছিল। আমি একটু রসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, রুইয়ের দাম কত? “বিক্রেতা যেন কোনো গূঢ় রহস্যের জাল বুনছিল, উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “মরা না জ্যান্ত?”আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললাম, “জ্যান্ত কত আর মরার দাম কত? “বিক্রেতা একগাল হেসে বলল, “মরা তিনশ পঞ্চাশ। জ্যান্ত নিলে একদাম চারশ।”

গিন্নি যখন পছন্দ করে, তখন জ্যান্তটাই নেওয়া যাক- এই ভেবে চড়া দামেই মাছটা কিনে নিলাম।
সাড়ে তিন কেজির সেই ছটফটে জ্যান্ত মাছ নিয়ে ছুটে গেলাম নিখিলের কাছে। নিখিল আমাদের পূর্ব পরিচিত, সে মাছ কাটে। ব্যাগ থেকে মাছটি যখন বের করল, দেখি কি- মাছটির কোনো নড়াচড়া নেই! কয়েক মিনিটের মধ্যে পটল তুলেছে!

আমি অবাক হয়ে বললাম, “ভাই কাহিনী কী? জ্যান্ত মাছ নিলাম, কয়েক মিনিটের মধ্যে মরেই গেল! “মাছ কাটুনি নিখিল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হতাশার সুরে বলল, “ভাইয়া, এসব ড্রামের মাছ কখনও নিয়েন না। হারামজাদারা পানিতে মেডিসিন মিশায় রাখে। এইসব মাছ যতক্ষণ পানিতে থাকে, ততক্ষণ জ্যান্ত থাকে, এরপর ইতিহাস!
চৌদ্দশ টাকার মাছ, একশ পঁচাত্তর টাকা জ্যান্ত থাকার ট্যাক্স দিলাম!” এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না।
মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কী আর করা! মাছটি কুটিয়ে বাসায় চলে এলাম।
তবে কপালের চরকি বাজি এখানেই থামল না।

দুইদিন পর গিন্নির সঙ্গে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলাম। ধুমধাম করে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যখন বিদায় নেব, তখন ঘটল আসল বিপর্যয়। জুতো রাখার জায়গায় সবার জুতো জোড়ায় জোড়ায় সুন্দরভাবে সাজানো আছে। সবার জুতো আছে, কিন্তু আমার একটি জুতো গায়েব! সবাই মিলে দীর্ঘ খোঁজাখুঁজি করলাম, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। অতঃপর বাকিটা ফেলে খালি পায়ে বাসায় ফিরে এলাম।

গতকাল অফিসে আসছিলাম। বাসে ওঠার পর কন্ডাক্টর ভাড়া চাইল। আমার কাছে কোনো ভাঙতি ছিল না। অগত্যা ভাড়া দেওয়ার সময় একটি বিশ টাকার কচকচে নোট তাকে দিলাম। কন্ডাক্টর মুখ কুঁচকে বলল, তার কাছে খুচরা ভাঙতি নেই। আমি প্রতিবাদের সুরে বললাম, “বিশ টাকার নোট দিলাম। তুমি আটটাকা রেখে অবশিষ্ট বারো টাকা ফেরত দেবে। এর জন্য খুচরা লাগবে কেন?”

কন্ডাক্টর আমার কোনো কথা না শুনে বাসের ভিড়ের মধ্যে চলে গেল। ইতিমধ্যে আমি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেলাম। বাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় ওই কন্ডাক্টর একটি মলাট দশ টাকার নোট আমার হাতে গুঁজে দিল।
দশ টাকার নোটটির একটা অংশ নেই! কিছু বলার আগেই বাস ছেড়ে দিল। নোটটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।

একদিকে সাড়ে তিন কেজি মাছের পেছনে একশ পঁচাত্তর টাকার ভুয়া ‘লাইভ ট্যাক্স’ দিলাম। অন্যদিকে চোর বাবাজী আমার এক পায়ের জুতো নিয়ে আমাকে ‘একপেয়ে ল্যাংড়া’ বানিয়ে ছাড়ল। আর সবশেষে এই বাসের কন্ডাক্টর আমার অবশিষ্ট বারো টাকার জায়গায় এক ছেঁড়া নোট দিয়ে খাঁটি ‘বাঁশ’ ডলে দিল! নিয়তির এমন নিখুঁত ও ত্রিমুখী চপেটাঘাত এর আগে আমি কখনো খাইনি।

নোটের ছেঁড়া অংশের দিকে তাকিয়ে বুকফাটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বললাম- “কপাল যখন চড়কির মতো ঘোরে, তখন মানুষের জ্যান্ত মাছও স্রেফ ইতিহাস হয়ে যায়, আস্ত জুতো জোড়া হয়ে যায় একলা পথিক, আর দশ টাকার নোটও নিজের অঙ্গ বিসর্জন দিয়ে বিদায় নেয়!”
১৭ আগষ্ট ২০২৬ইং

0 Comments

Subash Sarbabiddya

শীতরাতের একটি কম্বল
ও
এক যন্ত্রনাক্লিষ্ট বৃদ্ধা
==================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
শীতের স্নিগ্ধ ভোর। চারদিকে ঘন কুয়াশার মায়া। এর ফাঁক গলিয়ে, দু’চারটি পরিবহন হেড লাইটের আলো জ্বালিয়ে, দুই পাশের পিচঢালা পথ মাড়িয়ে এগিয়ে যায়-আসে। অদৃশ্য হয়।
নগরীর এই পথটির মাঝখান বরাবর সদ্য নির্মিত একটি উড়ালসেতু। বিশালতার ঢেউ তোলে এগিয়ে গেছে দীর্ঘ ষোল কিলোমিটার পথ।
এটির নিচে একটি স্তম্ভের সামান্য অংশ দখলে নিয়ে তার সাথে দড়ি বেঁধে, দু’দিকে দুটো ইট বিছিয়ে এবং হলুদ রঙের একটি জীর্ণ ব্যানার ছাউনি বানিয়ে অস্থায়ী আবাসন গড়ে তুললেন সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধা এই নগরীতে উদ্বাস্তু। জগত সংসারে তাঁর কেউ নেই। পূর্বে ছিল কিনা একমাত্র তিনি এবং স্বয়ং ঈশ্বর ছাড়া অন্য কেউ জানার কথা নয়।
দীর্ঘ বছর আগে রেলস্টেশনের আশ-পাশ এলাকায় এই বৃদ্ধাকে দেখা যেত। শরীর তখন হৃষ্টপুষ্ট ছিল। একই বয়সী কিংবা তার চেয়ে কম বয়সী আরও কিছু মহিলা তাঁর সহযাত্রী ছিল। ওইসব মহিলা এখন তাঁর সাথে নেই। হয়তো ভাগ্যের নিমর্মতায় আশ্রয়হীন হয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ওরা অন্য কোথাও ঠাঁই নিয়েছে।
শরীরে রূপ আর যৌবনের জৌলুশ যখন ছিল, কৃষ্ণ গহ্বরে থেকে তা বিক্রি হতো। সেসব রূপ আর যৌবন এখন অতীতে ফিরেছে। দেহ-মনে নেমে এসেছে চরম দুর্বিষহ যন্ত্রণার খড়গ।
বলা চলে, বৃদ্ধা বয়সের তুলনায় রোগে-শোকে নুইয়ে পড়েছে বেশ। দেহ-মন কখনও সখনও সচল হয়ে উঠলে, লাঠিখানাকে সঙ্গী করে, কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বেরিয়ে পড়েন। কখনও আবার বিদ্রোহ করে বসলে শুয়ে-বসে রাত, দিন পার করেন।
সেদিন ছিল শুক্রবার। ভোর চারটার কাছকাছি। হর্ণের বিকট শব্দে আচমকা ঘুম ভাঙে বৃদ্ধার। চোখ মেলে মাথা তোলেন। এদিক-ওদিক তাকান। কী সর্বনাশ! আঁতকে উঠলেন তিনি।
গতরাতে দু’জন তরুণ এসেছিল তাঁর কাছে। তরুণদ্বয় কলেজ ছাত্র। কী শীত, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা! তারা মানবিক কাজ ফেরি করে।
হাড় কাঁপানো শীতে বৃদ্ধাকে জবুুথবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখে একটি ভারী,অথচ নরম তুলতুলে বস্তু চড়িয়ে দেয় তাঁর গায়ে। বৃদ্ধা কী যে খুশি হলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
বৃদ্ধার স্মরণে এলো, যাওয়ার সময় ওই তরুণদের একজন নরম কন্ঠে বলেছিল -খালা,ও খালা।
বৃদ্ধা বললেন- কও বাবা।
– সামনে আমাদের ইন্টার ফাইনাল। একটু দোয়ায় রাখিয়েন।
বৃদ্ধা খুশি মনে তাদের মাথায় হাত ছোঁয়ালেন। এবং বললেন- কী কথা যে কও বাবা! দোয়া করুম না ক্যান? এক্কেরে খাসদিলে করুম।
এসব কথা ভাবনায় এলে, বৃদ্ধা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন। হন্য হয়ে দুর্লভ বস্তুটি খোঁজে ফিরলেন। নাঃ! কোথাও ওই বস্তুটির খোঁজ মিলল না। বৃদ্ধার মেজাজ গেল বিগড়ে।
যত রকমের অশ্লীল বাক্য এই নষ্ট সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সেসব অশ্লীল বাক্যগুলো তাঁর মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল বারবার,বারবার। নিজেকে কোনোভাবেই স্বস্তি দিতে পারছিলেন না তিনি। কী করবে এই মুহূর্তে? মাথায় কাজ করছিল না। অতঃপর লাঠিখানা তুলে নেন হাতে। বিছানা ছেড়ে নেমে এলেন রাস্তায়। ধীরে পায়ে খট খট শব্দ তুলেন। শীতের ঘন কুয়াশায় অদৃশ্য হন।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।

4 Comments
  • স
    সরকার অরুণ যদু

    সুন্দর পোস্ট

    Reply · 8 months ago
  • স
    সরকার অরুণ যদু

    সুন্দর পোস্ট

    Reply · 8 months ago
  • স
    সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা

    অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন। প্রাণিত হলাম খুব।

    Reply · 8 months ago
  • A
    Admin

    @Subash Sarbabiddya – খুব ভালো লাগলো স্যার আপনার লেখাটি ।

    Reply · 8 months ago

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...