খরা রাতের বৃষ্টি
===========
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
পেপার-ওয়েটটা টুপ করে টেবিল হতে গড়িয়ে পড়ল নিচে। ভয়ে চমকে উঠল মুগ্ধ। চেয়ারটা পেছনে ঠেলে এটি তুলে আবারও টেবিলের ওপর রাখল। সামনে দাঁড়ানো দুই জন পুলিশ। একজনের কাঁধে বন্দুক। অন্যজনের হাতে হ্যান্ডকাফ। হ্যান্ডকাফঅলা পুলিশ সদস্যটি বলল- তুমি কি মুগ্ধ?
– হুম। আমিই মুগ্ধ। আপনারা কি কারো খোঁজে এসেছেন?
– একদম তাই।
– আমি এই ব্যাচেলর রুমে থাকি। একটা চেয়ারও নেই যে, আপনাদের বসতে দিই। এই ভাঙা চৌকিতে কষ্ট করে বসেন।
– আমরা বসতে আসিনি। তোমার বিরুদ্ধে একটা হত্যা মামলার ওয়ারেন্ট আছে। হুকুম তালিম করতে এসেছি।
– বুঝি নাই স্যার। আমাকে..
– হুম। তোমাকেই।
– আমার অপরাধ, স্যার?
– আগে থানায় চলো। এরপর বলছি।
মুগ্ধর চোখে-মুখে আচমকা বিস্ময় আর আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। টেবিলে রাখা কাঁচের পেপার-ওয়েটটার দিকে সে তাকিয়ে রইল। এর নিচে চাপা পড়ে আছে তার সাজানো জীবনটা। বিড় বিড় করে বলল, যে ছেলেটি জীবনে কোনোদিন মশা, মাছি মারেনি তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা! একটু সাহস সঞ্চয় করে দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে বলল- স্যার, আপনাদের নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি..
ভুল শুদ্ধ কোর্ট দেখবে। আমরা হচ্ছি হুকুমের গোলাম।
কথা শেষ হতে না হতেই ওদের একজন মুগ্ধর কলার চেপে ধরল। টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলো। বাইরের দিকে চোখ যেতেই মুগ্ধর চোখ গেল একটি পিক-আপের দিকে। এটির গায়ে লেখা ছিল-“পুলিশ”। মুগ্ধর জানার আর অবশিষ্ট রইল না, সে পুলিশের জালে আটকা পড়েছে।
বাড়িতে তার বৃদ্ধ বাবা-মা থাকে। তাদেরকে এই সংবাদটা পৌঁছাবে সেই সুযোগটাও তারা দিল না। ধাক্কা মেরে গাড়িতে তুলে নিলো। মিনিট দশেক পর তাকে বহনকারী পিকআপখানা থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ইতিমধ্যে তার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হলো।
ওই দুই পুলিশ সদস্য গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে বড়বাবুর দফতরে নিয়ে গেল। বড় বাবুর হাতে তখন বিদেশী সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী শূন্যে ভাসিয়ে তিনি মুগ্ধর দিকে এক নজর দেখে নিলেন। এরপর দুই পুলিশ সদস্যকে আদেশ দিলেন- “এই হারামজাদারে চার নম্বর লকারে ঢুকাও। একটু পর আমি আসছি।”
একটা অন্ধকার খুপরিতে প্রায় একঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। এরপর বড়বাবু ঢুকলেন, ওই দুই সদস্যকে নিয়ে। মুগ্ধর ওপর শারীরিক কোনো চাপ দেওয়া হলো না। কিন্তু মানসিক চাপ দেওয়া হলো পাহাড় সম। বড়বাবু তাকে একটি লিখিত কাগজ দেখিয়ে বললেন- “আগামীকাল তোমাকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে হবে। কাগজে যা লেখা আছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঠিক তাই বলবে। ব্যস, তাহলে দুই-চারদিন পর খালাস। আর যদি হিরো সাজার চেষ্টা করো, তবে জেলের ভেতরেই জীবন শেষ”।
মুগ্ধ এক নজরে কাগজটার দিকে চেয়ে নিলো। কাগজটাতে লেখা আছে- সে নিজের মুখে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা একটা স্বীকারোক্তি।
পরদিন দুপুর বেলা। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের একটি বন্ধ কামরায় মুগ্ধকে দাঁড় করানো হলো। ঘরের ভেতরে কোনো পুলিশ নেই। নিয়ম অনুযায়ী, জবানবন্দি দেওয়ার আগে পুলিশের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তিনঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। টেবিলে বসে আছেন মধ্যবয়সী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব এবাদ উল্লাহ।
তিনি চশমাটা ঠিক করে মুগ্ধর দিকে তাকালেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, “এই ছেলে, তুমি কি জানো ১৬৪ ধারা কী?”
– “হ্যাঁ স্যার জানি।”
– “তবে এটাও সত্য যে, তুমি এই জবানবন্দি দিতে আইনগতভাবে বাধ্য নও। যদি তুমি এখন অপরাধ স্বীকার করো, তবে এই জবানবন্দি তোমার বিরুদ্ধেই আদালতে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হবে। তোমার শাস্তি হতে পারে। এবার বলো, তুমি কি স্বেচ্ছায় কিছু বলতে চাও?”
কামরার বাইরে করিডোরে সাব-ইন্সপেক্টর সেলিম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মুগ্ধর মনে হলো, সে দেয়াল ভেদ করে সেলিম সাহেবের নিষ্ঠুর চোখ দুটো দেখতে পাচ্ছে। ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শরীর জুড়ে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, আজ যদি সে এই মিথ্যা মেনে নেয়, তবে সারাজীবনের জন্য সে অপরাধী হয়ে যাবে। তার বাবা-মায়ের মুখ ছোট হবে।
ম্যাজিস্ট্রেট আবারও বলল, “তুমি কি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিবে?”
মুগ্ধ জানে, তার দু দিকেই বিপদ। সত্য বললে রিমান্ডে নিয়ে তাকে মেরে ফেলবে। মিথ্যা বললে অন্ততঃ তার প্রাণটা বাঁচবে। ওদের শেখানো পথেই তাকে যেতে হবে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, “হ্যাঁ স্যার। রাকিব যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল, তখনই তাকে আমি পেটে ছুরি ঢুকিয়ে খুন করি।
– রাত তখন কটা ছিল?
– স্যার, সম্ভবত ৯ টা। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দে ওর চিৎকার কেউ শোনেনি। আমি খুন করে রিকশা নিয়ে পালিয়ে যাই।”
ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দি লিখে নিলেন। পুলিশ ভাবল, তারা জিতে গেছে, মুগ্ধকে তারা জেলের সেলে পাঠিয়ে দিলো। মুগ্ধর রিমান্ডের ভয় কেটে গেল।
প্রায় ছয়টি মাস কেটে গেল মুগ্ধর। কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকার জীবনে প্রথম দিকে সে চরম হতাশায় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু একদিন তার ভাগ্য সহায় হলো। সেলে তার সাথে থাকা অন্য এক কয়েদি আসামি মুগ্ধর সব কথা শুনে আশ্বস্ত করল। সেই আসামিই মুগ্ধকে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর খোঁজ দিল এবং তার সাথে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করে দিল।
মুগ্ধ যখন সেই আইনজীবীর মুখোমুখি হলো, তখন সে অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে আবিষ্কার করল- ফৌজদারী আদালতের এই আইনজীবী আর কেউ নয়, তার স্কুল বেলায় হারিয়ে যাওয়া বন্ধু সমীর। স্কুল বেলার বন্ধুকে এমন বিপদে দেখে আইনজীবী বন্ধুটি জানপ্রাণ দিয়ে লড়ার প্রতিজ্ঞা করল। মুগ্ধ তাকে চুপিচুপি পুরো ঘটনার পেছনের আসল সত্য এবং পুলিশের জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের ক্লু-বুঝিয়ে দিলো।
এরপর আদালতে আবারও আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হলো। বন্ধু সমীর অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে আবহাওয়া অফিসের একটি প্রত্যয়িত সরকারি রিপোর্ট আদালতে পেশ করল। রিপোর্টে পরিষ্কার দেখা গেল- ঘটনার দিন, অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট তারিখে পুরো শহরে তীব্র খরা ছিল এবং গত এক মাসের মধ্যে ওই রাতে কোনো বৃষ্টিই হয়নি।
আদালতের বিজ্ঞ বিচারক পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, একজন মানুষ যদি সত্যিই খুন করত, কখনো সে বলতো না যে বৃষ্টির মধ্যে সে ওই ছেলেটিকে খুন করেছে। এই ‘বৃষ্টির গল্প’ আসামি ইচ্ছে করেই বানিয়েছে। আইন অনুযায়ী ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে যদি কোনো একটি বড় তথ্যের অসংগতি থাকে যা বাস্তব প্রমাণের সাথে মেলে না, তবে পুরো জবানবন্দিটিই আদালত “স্বেচ্ছায় ও সত্য নয়” বলে বাতিল করে দেয়।
বিচারক তৎক্ষণাৎ পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হন যে তারা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে এই জবানবন্দি লিখিয়েছে। মুগ্ধর রিমান্ড বাতিল হয় এবং মামলাটি অন্য একটি নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থার কাছে স্থানান্তরিত হয়।
অতঃপর মুক্তির স্বস্তি নিয়ে মুগ্ধ ধীরে ধীরে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল।
২৬ আগষ্ট ২০২৬ইং