Subash Sarbabiddya

কপাল যখন চরকি বাজি
==================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
নিয়তির চাকা কখন কোন দিকে ঘোরে, তা বোঝা বড় দায়। গত এক সপ্তাহ ধরে আমার কপালটাও যেন এক অবাধ্য চরকি বাজি, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছে। দুঃখের মাঝেও যে এত কৌতুক লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমার এই পোড়া কপাল না হলে বোধহয় জানাই হতো না।
সেদিন এক অলস দুপুরে বাজারে গিয়েছিলাম। এক মৎস্য ব্যবসায়ীর ড্রামে জ্যান্ত মাছের রূপালী রূপ আর চঞ্চল লাফালাফি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। তিন সাড়ে তিন কেজি ওজনের এক বিশাল রুই মাছ! এই ধরণের মাছ আমার গিন্নির ভারী পছন্দের। মনে মনে ভাবলাম, পকেটের অবস্থা তো আজ বেশ ভারী আছে। একটা না হয় কিনেই নিই! তাছাড়া এমন তরতাজা রূপালি ইলিশের মতো চকচকে রুই তো সবসময় চোখেও পড়ে না। আর যখন পড়ে, তখন পকেটের শূন্যতার কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসায় ফিরতে হয়। আজ যখন সুযোগ এসেছে, হাতছাড়া করা অন্যায় হবে।
মাছ বিক্রেতার সামনে আরও কয়েকটি মাছ সাজানো ছিল। আমি একটু রসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, রুইয়ের দাম কত? “বিক্রেতা যেন কোনো গূঢ় রহস্যের জাল বুনছিল, উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “মরা না জ্যান্ত?”আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললাম, “জ্যান্ত কত আর মরার দাম কত? “বিক্রেতা একগাল হেসে বলল, “মরা তিনশ পঞ্চাশ। জ্যান্ত নিলে একদাম চারশ।”
গিন্নি যখন পছন্দ করে, তখন জ্যান্তটাই নেওয়া যাক- এই ভেবে চড়া দামেই মাছটা কিনে নিলাম।
সাড়ে তিন কেজির সেই ছটফটে জ্যান্ত মাছ নিয়ে ছুটে গেলাম নিখিলের কাছে। নিখিল আমাদের পূর্ব পরিচিত, সে মাছ কাটে। ব্যাগ থেকে মাছটি যখন বের করল, দেখি কি- মাছটির কোনো নড়াচড়া নেই! কয়েক মিনিটের মধ্যে পটল তুলেছে!
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ভাই কাহিনী কী? জ্যান্ত মাছ নিলাম, কয়েক মিনিটের মধ্যে মরেই গেল! “মাছ কাটুনি নিখিল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হতাশার সুরে বলল, “ভাইয়া, এসব ড্রামের মাছ কখনও নিয়েন না। হারামজাদারা পানিতে মেডিসিন মিশায় রাখে। এইসব মাছ যতক্ষণ পানিতে থাকে, ততক্ষণ জ্যান্ত থাকে, এরপর ইতিহাস!
চৌদ্দশ টাকার মাছ, একশ পঁচাত্তর টাকা জ্যান্ত থাকার ট্যাক্স দিলাম!” এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না।
মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কী আর করা! মাছটি কুটিয়ে বাসায় চলে এলাম।
তবে কপালের চরকি বাজি এখানেই থামল না।
দুইদিন পর গিন্নির সঙ্গে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলাম। ধুমধাম করে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যখন বিদায় নেব, তখন ঘটল আসল বিপর্যয়। জুতো রাখার জায়গায় সবার জুতো জোড়ায় জোড়ায় সুন্দরভাবে সাজানো আছে। সবার জুতো আছে, কিন্তু আমার একটি জুতো গায়েব! সবাই মিলে দীর্ঘ খোঁজাখুঁজি করলাম, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। অতঃপর বাকিটা ফেলে খালি পায়ে বাসায় ফিরে এলাম।
গতকাল অফিসে আসছিলাম। বাসে ওঠার পর কন্ডাক্টর ভাড়া চাইল। আমার কাছে কোনো ভাঙতি ছিল না। অগত্যা ভাড়া দেওয়ার সময় একটি বিশ টাকার কচকচে নোট তাকে দিলাম। কন্ডাক্টর মুখ কুঁচকে বলল, তার কাছে খুচরা ভাঙতি নেই। আমি প্রতিবাদের সুরে বললাম, “বিশ টাকার নোট দিলাম। তুমি আটটাকা রেখে অবশিষ্ট বারো টাকা ফেরত দেবে। এর জন্য খুচরা লাগবে কেন?”
কন্ডাক্টর আমার কোনো কথা না শুনে বাসের ভিড়ের মধ্যে চলে গেল। ইতিমধ্যে আমি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেলাম। বাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় ওই কন্ডাক্টর একটি মলাট দশ টাকার নোট আমার হাতে গুঁজে দিল।
দশ টাকার নোটটির একটা অংশ নেই! কিছু বলার আগেই বাস ছেড়ে দিল। নোটটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
একদিকে সাড়ে তিন কেজি মাছের পেছনে একশ পঁচাত্তর টাকার ভুয়া ‘লাইভ ট্যাক্স’ দিলাম। অন্যদিকে চোর বাবাজী আমার এক পায়ের জুতো নিয়ে আমাকে ‘একপেয়ে ল্যাংড়া’ বানিয়ে ছাড়ল। আর সবশেষে এই বাসের কন্ডাক্টর আমার অবশিষ্ট বারো টাকার জায়গায় এক ছেঁড়া নোট দিয়ে খাঁটি ‘বাঁশ’ ডলে দিল! নিয়তির এমন নিখুঁত ও ত্রিমুখী চপেটাঘাত এর আগে আমি কখনো খাইনি।
নোটের ছেঁড়া অংশের দিকে তাকিয়ে বুকফাটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বললাম- “কপাল যখন চড়কির মতো ঘোরে, তখন মানুষের জ্যান্ত মাছও স্রেফ ইতিহাস হয়ে যায়, আস্ত জুতো জোড়া হয়ে যায় একলা পথিক, আর দশ টাকার নোটও নিজের অঙ্গ বিসর্জন দিয়ে বিদায় নেয়!”
১৭ আগষ্ট ২০২৬ইং

0 Comments

Subash Sarbabiddya

শীতরাতের একটি কম্বল

এক যন্ত্রনাক্লিষ্ট বৃদ্ধা
==================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
শীতের স্নিগ্ধ ভোর। চারদিকে ঘন কুয়াশার মায়া। এর ফাঁক গলিয়ে, দু’চারটি পরিবহন হেড লাইটের আলো জ্বালিয়ে, দুই পাশের পিচঢালা পথ মাড়িয়ে এগিয়ে যায়-আসে। অদৃশ্য হয়।
নগরীর এই পথটির মাঝখান বরাবর সদ্য নির্মিত একটি উড়ালসেতু। বিশালতার ঢেউ তোলে এগিয়ে গেছে দীর্ঘ ষোল কিলোমিটার পথ।
এটির নিচে একটি স্তম্ভের সামান্য অংশ দখলে নিয়ে তার সাথে দড়ি বেঁধে, দু’দিকে দুটো ইট বিছিয়ে এবং হলুদ রঙের একটি জীর্ণ ব্যানার ছাউনি বানিয়ে অস্থায়ী আবাসন গড়ে তুললেন সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধা এই নগরীতে উদ্বাস্তু। জগত সংসারে তাঁর কেউ নেই। পূর্বে ছিল কিনা একমাত্র তিনি এবং স্বয়ং ঈশ্বর ছাড়া অন্য কেউ জানার কথা নয়।
দীর্ঘ বছর আগে রেলস্টেশনের আশ-পাশ এলাকায় এই বৃদ্ধাকে দেখা যেত। শরীর তখন হৃষ্টপুষ্ট ছিল। একই বয়সী কিংবা তার চেয়ে কম বয়সী আরও কিছু মহিলা তাঁর সহযাত্রী ছিল। ওইসব মহিলা এখন তাঁর সাথে নেই। হয়তো ভাগ্যের নিমর্মতায় আশ্রয়হীন হয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ওরা অন্য কোথাও ঠাঁই নিয়েছে।
শরীরে রূপ আর যৌবনের জৌলুশ যখন ছিল, কৃষ্ণ গহ্বরে থেকে তা বিক্রি হতো। সেসব রূপ আর যৌবন এখন অতীতে ফিরেছে। দেহ-মনে নেমে এসেছে চরম দুর্বিষহ যন্ত্রণার খড়গ।
বলা চলে, বৃদ্ধা বয়সের তুলনায় রোগে-শোকে নুইয়ে পড়েছে বেশ। দেহ-মন কখনও সখনও সচল হয়ে উঠলে, লাঠিখানাকে সঙ্গী করে, কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বেরিয়ে পড়েন। কখনও আবার বিদ্রোহ করে বসলে শুয়ে-বসে রাত, দিন পার করেন।
সেদিন ছিল শুক্রবার। ভোর চারটার কাছকাছি। হর্ণের বিকট শব্দে আচমকা ঘুম ভাঙে বৃদ্ধার। চোখ মেলে মাথা তোলেন। এদিক-ওদিক তাকান। কী সর্বনাশ! আঁতকে উঠলেন তিনি।
গতরাতে দু’জন তরুণ এসেছিল তাঁর কাছে। তরুণদ্বয় কলেজ ছাত্র। কী শীত, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা! তারা মানবিক কাজ ফেরি করে।
হাড় কাঁপানো শীতে বৃদ্ধাকে জবুুথবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখে একটি ভারী,অথচ নরম তুলতুলে বস্তু চড়িয়ে দেয় তাঁর গায়ে। বৃদ্ধা কী যে খুশি হলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
বৃদ্ধার স্মরণে এলো, যাওয়ার সময় ওই তরুণদের একজন নরম কন্ঠে বলেছিল -খালা,ও খালা।
বৃদ্ধা বললেন- কও বাবা।
– সামনে আমাদের ইন্টার ফাইনাল। একটু দোয়ায় রাখিয়েন।
বৃদ্ধা খুশি মনে তাদের মাথায় হাত ছোঁয়ালেন। এবং বললেন- কী কথা যে কও বাবা! দোয়া করুম না ক্যান? এক্কেরে খাসদিলে করুম।
এসব কথা ভাবনায় এলে, বৃদ্ধা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন। হন্য হয়ে দুর্লভ বস্তুটি খোঁজে ফিরলেন। নাঃ! কোথাও ওই বস্তুটির খোঁজ মিলল না। বৃদ্ধার মেজাজ গেল বিগড়ে।
যত রকমের অশ্লীল বাক্য এই নষ্ট সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সেসব অশ্লীল বাক্যগুলো তাঁর মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল বারবার,বারবার। নিজেকে কোনোভাবেই স্বস্তি দিতে পারছিলেন না তিনি। কী করবে এই মুহূর্তে? মাথায় কাজ করছিল না। অতঃপর লাঠিখানা তুলে নেন হাতে। বিছানা ছেড়ে নেমে এলেন রাস্তায়। ধীরে পায়ে খট খট শব্দ তুলেন। শীতের ঘন কুয়াশায় অদৃশ্য হন।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।

4 Comments
  • সরকার অরুণ যদু

    সুন্দর পোস্ট

    Reply · 7 months ago
  • সরকার অরুণ যদু

    সুন্দর পোস্ট

    Reply · 7 months ago
  • সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা

    অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন। প্রাণিত হলাম খুব।

    Reply · 7 months ago
  • A
    Admin

    @Subash Sarbabiddya – খুব ভালো লাগলো স্যার আপনার লেখাটি ।

    Reply · 7 months ago