দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অফ দ্য পপুলার মাইন্ড (১৮৯৫) — গুস্তাভ লে বঁ
উনিশ শতকের শেষলগ্নে, যখন ইউরোপ শিল্পায়ন, ভোটাধিকারের বিস্তার এবং সমাজতান্ত্রিক উত্থানের আশঙ্কায় লড়াই করছিল, তখন গুস্তাভ লে বঁ নামক এক ফরাসি পণ্ডিত একটি ছোট কিন্তু বিস্ফোরক বই প্রকাশ করেন। এটি পরবর্তী প্রজন্মের জনমানস বা গণ-আচরণ বোঝার ধরণকে আমূল বদলে দেয়। ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অফ দ্য পপুলার মাইন্ড’ (মূল ফরাসি নাম: Psychologie des Foules) সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত কাজ হিসেবে স্বীকৃত। লে বঁ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ব্যক্তি যখন কোনো ভিড় বা জনসমষ্টির অংশ হয়, তখন সে তার যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। পরিবর্তে, সে এক আদিম ‘যূথবদ্ধ মনে’র (Collective Mind) সাথে মিশে যায়, যা অবচেতন শক্তি, আবেগ এবং সংকেত দ্বারা পরিচালিত হয়। বইটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কৌতূহল নয়; বরং বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া, ভাইরাল ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সমাবেশের যুগে এর প্রাসঙ্গিকতা চমকপ্রদ।
গুস্তাভ লে বঁ কে ছিলেন?
গুস্তাভ লে বঁ (১৮৪১–১৯৩১) ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, নৃবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী। ১৮৬৬ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৮৭১ সালের রক্তক্ষয়ী ‘প্যারিস কমিউন’ প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বিপ্লবী জনতা এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি গভীরভাবে সন্দিহান করে তোলে। তাঁর উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়ার ভ্রমণগুলো তাঁকে বংশগতি এবং “জাতিগত চরিত্র” (Racial Character) সম্পর্কে বিশ্বাসী করে তোলে, যা ডারউইন ও হার্বার্ট স্পেন্সারের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
লে বঁ ছিলেন একজন রক্ষণশীল চিন্তাবিদ যিনি গণতন্ত্রের সমঅধিকারবাদকে অবিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন সভ্যতা এগিয়ে যায় মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী অভিজাত শ্রেণির প্রচেষ্টায়, সাধারণ জনগণের দ্বারা নয়। ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য সাইকোলজি অফ পিপলস’ বইটিতে তিনি জনমানসের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া “জাতিগত অবচেতন” বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেন। সাধারণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও, রক্ষণশীল রাজনীতি এবং গবেষণায় কঠোর অভিজ্ঞতাবাদের অভাবের কারণে ফরাসি একাডেমিক মহলে তিনি অনেকটা উপেক্ষিত ছিলেন।
মূল থিসিস: যূথবদ্ধ মনের জন্ম
লে বঁ-এর কেন্দ্রীয় দাবিটি সহজ কিন্তু বৈপ্লবিক: জনতা বা ভিড় মানেই কেবল কিছু মানুষের সমষ্টি নয়। যখন মানুষ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একত্রিত হয়, তখন একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক সত্তার উদ্ভব ঘটে যাকে তিনি “মানসিক ঐক্য” (Mental Unity) বলেছেন। এই অবস্থায় ব্যক্তির নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, যুক্তি এবং নৈতিকতা বিলুপ্ত হয়। লে বঁ-এর ভাষায়, ব্যক্তি “সভ্যতার সিঁড়ি থেকে কয়েক ধাপ নিচে নেমে যায়” এবং একজন “বর্বর” বা আদিম জীবে পরিণত হয় যে কেবল সহজাত প্রবৃত্তির বশবর্তী।
এই রূপান্তরটি তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে:
নামহীনতা (Anonymity): ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তি নিজেকে অদৃশ্য মনে করে এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ঝেড়ে ফেলে। ফলে সে এমন সব কাজ (সহিংসতা বা ধ্বংসলীলা) করতে দ্বিধাবোধ করে না যা সে একা থাকাকালীন কখনও করত না।
সংক্রমণ (Contagion): জনসমষ্টির মধ্যে আবেগ এবং ধারণাগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একজনের আতঙ্ক বা উত্তেজনা দ্রুত অন্যদের সংক্রমিত করে।
পরামর্শযোগ্যতা বা সংকেতবশ্যতা (Suggestibility): ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। সে অনেকটা সম্মোহিত অবস্থায় থাকে যেখানে কোনো ধারণা সরাসরি গ্রহণ করা হয় এবং তৎক্ষণাৎ কাজে পরিণত করা হয়।
বইয়ের গঠন ও মূল যুক্তি
বইটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:
১. প্রথম খণ্ড: জনতার মনস্তত্ত্ব: এখানে লে বঁ দেখিয়েছেন যে জনতা সবসময় আবেগী এবং অসহিষ্ণু হয়। তারা কোনো সূক্ষ্ম যুক্তি বোঝে না এবং কোনো নেতা বা আদর্শের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে। তাদের ভূমিকা মূলত ধ্বংসাত্মক; তারা সৃষ্টি করতে নয়, বরং ধ্বংস করতেই বেশি পারদর্শী।
২. দ্বিতীয় খণ্ড: জনতার মতামত ও বিশ্বাস: জনমানসে বিশ্বাস কীভাবে তৈরি হয় তা এখানে আলোচিত হয়েছে। লে বঁ-এর মতে, নেতারা যুক্তি দিয়ে নয়, বরং দৃঢ় ঘোষণা (Affirmation), পুনরাবৃত্তি (Repetition) এবং সংক্রমণ (Contagion)-এর মাধ্যমে সাফল্য পান। জনতাকে শাসন করার শিল্প হলো তাদের কল্পনাশক্তিকে প্রভাবিত করার শিল্প।
৩. তৃতীয় খণ্ড: শ্রেণিবিন্যাস: এখানে তিনি বিভিন্ন ধরণের জনতার (অপরাধী চক্র, জুরি বোর্ড, সংসদীয় সভা) উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এমনকি শিক্ষিত প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাও চাপের মুখে ভিড়ের মনস্তত্ত্বের কাছে নতি স্বীকার করে।
প্রভাব এবং উত্তরাধিকার
লে বঁ-এর এই বইটির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ‘গ্রুপ সাইকোলজি অ্যান্ড দ্য অ্যানালাইসিস অফ দ্য ইগো’ (১৯২১) রচনায় লে বঁ-এর ধারণাগুলো ব্যবহার করেন। বলা হয়ে থাকে, অ্যাডলফ হিটলার জেলবন্দি অবস্থায় এই বইটির জার্মান অনুবাদ পড়েছিলেন এবং নাৎসি প্রোপাগান্ডায় এর কৌশলগুলো প্রয়োগ করেছিলেন। আধুনিক জনসংযোগের (Public Relations) জনক এডওয়ার্ড বার্নেসও লে বঁ-এর তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
একুশ শতকে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ডিজিটাল ভিড়’ বা অনলাইনে গণ-হয়রানির (online pile-ons) ঘটনাগুলো লে বঁ-এর বর্ণিত নামহীনতা এবং মানসিক সংক্রমণের তত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
লে বঁ-এর কাজ ত্রুটিমুক্ত নয়। অনেক সমালোচক তাঁকে অভিজাততান্ত্রিক এবং গণতন্ত্রবিরোধী বলে আখ্যা দেন। তিনি সাধারণ মানুষকে যুক্তিহীন এবং সর্বদা একজন উচ্চতর নেতার মুখাপেক্ষী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এছাড়া তাঁর বর্ণবাদী এবং লিঙ্গবাদী মন্তব্যগুলো (যেমন জনতাকে নারীর মতো আবেগপ্রবণ বলা) সে সময়ের কুসংস্কারেরই প্রতিফলন। তিনি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার চেয়ে ঐতিহাসিক গল্পের ওপর বেশি নির্ভর করেছিলেন।
কেন আজও ‘দ্য ক্রাউড’ গুরুত্বপূর্ণ?
প্রকাশের ১৩০ বছর পরেও লে বঁ-এর সতর্কতা অত্যন্ত স্পষ্ট। আজকের মেরুকরণের রাজনীতি এবং অ্যালগরিদমিক ইকো-চেম্বারের যুগে আমরা বারবার দেখি কীভাবে ব্যক্তি তার বিচারবুদ্ধিকে সমষ্টিগত আবেগের কাছে বিসর্জন দিচ্ছে। লে বঁ হয়তো গণতন্ত্রের ভক্ত ছিলেন না, কিন্তু তিনি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে আধুনিক সমাজ ক্রমান্বয়ে যুক্তি বা ঐতিহ্যের চেয়ে ‘গণ-মনস্তত্ত্ব’ (Mass Psychology) দ্বারা বেশি পরিচালিত হবে। জনশক্তির এই প্রবল জোয়ারকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়—সেই চ্যালেঞ্জ আজও প্রাসঙ্গিক।