জেমস ম্যাকফারসন (১৭৩৬–১৭৯৬)
জেমস ম্যাকফারসনের ওসিয়ান কাব্য মূলত দীর্ঘ মহাকাব্যিক রচনা — Fragments of Ancient Poetry (১৭৬০), Fingal (১৭৬১) এবং Temora (১৭৬৩)। এগুলো পরিমিত গদ্যে (measured prose) লেখা, যেখানে বীরত্ব, মেলানকলি, প্রকৃতির সublimity এবং হারানো গৌরবের গান বাজে। নিচে এই রচনাগুলো থেকে নির্বাচিত সংক্ষিপ্ত স্তবক ও অংশগুলোকে স্বতন্ত্র কবিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলো।
১. ওসিয়ানের গান
(Fragments of Ancient Poetry থেকে)
ওসিয়ান গায়, মালভিনার কানে তার গান,
পুরোনো দিনের বীরের কথা, হারানো যুদ্ধের গান।
বাতাস বয়ে যায় পাহাড়ের চূড়া থেকে,
আমার কণ্ঠস্বর শুধু প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে আনে।
২. ফিঙ্গালের বীরত্ব
(Fingal, Canto I)
ফিঙ্গাল দাঁড়িয়ে আছে, ঝড়ের মতো শক্তিশালী,
তরবারি হাতে, শত্রুর দিকে চোখ রাখা।
তার চোখে আগুন, বুকে সাহসের ঝড়,
একা সে লড়ে যায় — বীরের এই গৌরব অমর।
৩. হারানো যৌবনের শোক
(Temora থেকে)
আমার যৌবন চলে গেছে, বন্ধুরা সব হারিয়েছে,
এখন শুধু ছায়া থেকে গেছে — ওসিয়ান একা।
পুরোনো গান গাই, কিন্তু কেউ শোনে না আর,
শুধু বাতাস আর পাহাড় আমার সঙ্গী হয়।
৪. কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়
(Fragments of Ancient Poetry)
কুয়াশা ঢেকে রেখেছে পাহাড়ের চূড়া,
ঝড় বয়ে যায়, গাছপালা কাঁপে ভয়ে।
দূরে শোনা যায় যোদ্ধাদের চিৎকার,
প্রকৃতি নিজেই যেন গান গায় — মৃত্যুর সুরে।
৫. যোদ্ধার ভূত
(Fingal)
রাতের অন্ধকারে উঠে আসে ভূতের ছায়া,
পুরোনো যোদ্ধা, যে লড়েছে ফিঙ্গালের পাশে।
সে বলে, “আমি এখনো যুদ্ধ করি স্বপ্নে,
কিন্তু জেগে উঠলে শুধু শূন্যতা পাই হাতে।”
৬. মৃত বন্ধুর শোক
(Fragments of Ancient Poetry — Oscar-এর মৃত্যু)
অস্কার পড়ে আছে মাটিতে, রক্তে ভেজা,
তার তরবারি পাশে, চোখ বন্ধ চিরকালের জন্য।
ওসিয়ান কাঁদে, “তুমি চলে গেলে, বন্ধু,
আমার গান এখন শুধু তোমার জন্যই বাজে।”
৭. প্রকৃতির মেলানকলি
(Temora)
পাহাড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, নদী বয়ে যায়,
কিন্তু সব কিছুতেই যেন শোকের ছায়া পড়ে।
পুরোনো দিনের হাসি আর গান সব হারিয়ে গেছে,
শুধু বাতাস ফিসফিস করে — “সবই অতীত।”
৮. যুদ্ধের পর শান্তি
(Fingal)
যুদ্ধ শেষ, রক্ত মাটিতে মিশে গেছে,
বীরেরা শুয়ে আছে — কেউ জিতেছে, কেউ হেরেছে।
ওসিয়ান গায় তাদের গান, যাতে তারা বেঁচে থাকে,
কিন্তু হৃদয়ে শুধু শূন্যতা আর ক্লান্তি থাকে।
৯. মালভিনার স্মৃতি
(Temora — Ossian to Malvina)
মালভিনা, তুমি চলে গেছ, আমার পাশে আর নেই,
তোমার হাসি আর কণ্ঠস্বর শুধু স্মৃতিতে আছে।
আমি গাই তোমার জন্য, পুরোনো প্রেমের গান,
কিন্তু বাতাস ছাড়া কেউ আর শোনে না আমার গান।
১০. ওসিয়ানের শেষ গান
(Fragments of Ancient Poetry — সমাপনী ভাব)
আমি ওসিয়ান, শেষ কবি এই পুরোনো জাতির,
আমার গান শেষ হয়ে আসছে — সবকিছু ম্লান।
পাহাড়, বাতাস, নদী — সবই সাক্ষী থাকবে,
যে একদিন বীরেরা ছিল, আর তাদের গান ছিল অমর।
এই সংক্ষিপ্ত কবিতাগুলো ম্যাকফারসনের ওসিয়ান রচনার মূল সুর — বীরত্বের গৌরব, হারানো যৌবনের শোক, প্রকৃতির রহস্য এবং মেলানকলি — তুলে ধরে। যদিও মূল রচনা দীর্ঘ, এই অংশগুলো স্বতন্ত্রভাবে পাঠযোগ্য এবং ইউরোপকে চমকে দেওয়া সেই আবেগ ধারণ করে।
ওসিয়ানের মহাকাব্য দিয়ে ইউরোপকে চমকে দেওয়া ছদ্ম-প্রাচীন গেলিক কবি
জেমস ম্যাকফারসন ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটল্যান্ডের এক বিতর্কিত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক। তিনি ১৭৬০-এর দশকে Fragments of Ancient Poetry, Fingal এবং Temora নামে যে কবিতাগুলো প্রকাশ করেন, সেগুলোকে তিনি তৃতীয় শতাব্দীর গেলিক কবি ওসিয়ানের (Ossian) প্রাচীন মহাকাব্য বলে দাবি করেছিলেন। এই “অনুবাদ” ইউরোপজুড়ে সংবেদন সৃষ্টি করে। গ্যেটে, নেপোলিয়ন, হার্ডার থেকে শুরু করে ব্লেক, স্কট পর্যন্ত অনেকেই মুগ্ধ হন। তবে পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয় যে এগুলো মূলত ম্যাকফারসনের নিজের রচনা — কিছু প্রকৃত গেলিক খণ্ডাংশের উপর ভিত্তি করে ভারীভাবে সম্প্রসারিত ও সৃজনশীলভাবে পুনর্গঠিত। এই ছদ্ম-প্রাচীন কাব্য ইউরোপীয় রোমান্টিক আন্দোলন, সেল্টিক পুনর্জাগরণ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে ওঠে।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
১৭৩৬ সালের ২৭ অক্টোবর ইনভারনেস-শায়ারের ব্যাডেনক অঞ্চলের রুথভেনে জন্মগ্রহণ করেন জেমস ম্যাকফারসন। এটি একটি গেলিকভাষী এলাকা, রুথভেন ব্যারাকের কাছে। পরিবারের জ্যাকোবাইট সংযোগ ছিল — তাঁর চাচা ইউয়েন ম্যাকফারসন ১৭৪৫ সালের জ্যাকোবাইট বিদ্রোহে অংশ নেন এবং কুলোডেনের যুদ্ধের পর নয় বছর লুকিয়ে ছিলেন। এই পটভূমি ম্যাকফারসনের পরবর্তী সাহিত্যিক কাজে স্কটিশ হাইল্যান্ডের প্রাচীন গৌরব ও মেলানকলির প্রতিফলন ঘটায়।
শিক্ষা ও প্রথম সাহিত্যকর্ম
১৭৫২-৫৩ সালে কিংস কলেজ, অ্যাবারডিনে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে মারিশাল কলেজে (যা পরে অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হয়) যান। সেখানে তিনি সিজারের Commentaries পড়েন এবং জার্মানিক উপজাতি ও রোমান সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে আগ্রহী হন। সম্ভবত ১৭৫৫-৫৬ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি ৪,০০০ লাইনেরও বেশি কবিতা লেখেন। ১৭৫৮ সালে ছয় ক্যান্টোর মহাকাব্য The Highlander প্রকাশ করেন — পরে এটি দমন করার চেষ্টা করেন।
কলেজ শেষ করে রুথভেনে ফিরে স্কুল শিক্ষকতা এবং প্রাইভেট টিউটর হিসেবে কাজ করেন। মফ্যাটে নাট্যকার জন হোমের সঙ্গে পরিচয় হয়। হোমকে তিনি হাইল্যান্ডস ও পশ্চিমা দ্বীপপুঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা গেলিক কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখান, যার মধ্যে ছিল The Death of Oscar।
ওসিয়ান কবিতার আবির্ভাব
১৭৬০ সালে জন হোমের উৎসাহে ম্যাকফারসন Fragments of Ancient Poetry collected in the Highlands of Scotland প্রকাশ করেন — ১৫টি শোকগাথা (laments)। এগুলো ছিল সুরেলা, পরিমিত গদ্যে লেখা। এর মধ্যে The Death of Oscar অন্তর্ভুক্ত ছিল। The Scots Magazine ও The Gentleman’s Magazine-এ উদ্ধৃতি প্রকাশিত হলে সারা ব্রিটেনে আগ্রহ জাগে। হিউ ব্লেয়ার আরও গবেষণার জন্য সাবস্ক্রিপশন তুলে দেন।
ম্যাকফারসন পশ্চিম ইনভারনেস-শায়ার, স্কাই, নর্থ উইস্ট, সাউথ উইস্ট, বেনবেকুলা ও মাল দ্বীপে ঘুরে গেলিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। ক্যাপ্টেন মরিসন ও রেভারেন্ড গ্যালির সাহায্যে অনুবাদ করেন।
১৭৬১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় Fingal, an Ancient Epic Poem in Six Books — ওসিয়ান রচিত বলে দাবি করা মহাকাব্য। ১৭৬৩ সালে আসে Temora। ১৭৬৫ সালে সংকলিত The Works of Ossian। তিনি দাবি করেন এগুলো তৃতীয় শতাব্দীর গেলিক কবি ওসিয়ানের (আইরিশ কিংবদন্তির ওইসিন, ফিওন ম্যাক কামহেলের পুত্র) রচনা, যিনি তাঁর পিতা ফিঙ্গালের (ফিওন) বীরত্বগাথা গেয়েছেন।
শৈলী ও বিষয়বস্তু: পরিমিত গদ্য (measured prose), গভীর মেলানকলি, প্রকৃতির সublimity, যুদ্ধ, ভূত-প্রেত, বীরত্ব ও হারানো গৌরবের বর্ণনা। আইরিশ ও স্কটিশ ঐতিহ্যের মিশ্রণ। এটি ক্লাসিক্যাল মহাকাব্যের বিকল্প হিসেবে “প্রিমিটিভ” সেল্টিক কাব্যকে তুলে ধরে।
সত্যতা বিতর্ক ও বিতর্ক
প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ জাগে। আইরিশ ঐতিহাসিক চার্লস ও’কনর কালানুক্রমিক ভুল, নামের অসঙ্গতি এবং অসম্ভাব্যতা নির্দেশ করেন। স্যামুয়েল জনসন A Journey to the Western Islands of Scotland (১৭৭৫)-এ স্পষ্টভাবে বলেন যে ম্যাকফারসন খণ্ডাংশ পেয়ে একটি রোমান্স রচনা করেছেন। হিউ ব্লেয়ার এর সত্যতায় বিশ্বাস করতেন এবং গবেষণায় অর্থ দিয়েছিলেন।
বিতর্ক ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত চলে। ম্যালকম লেইং History of Scotland (১৮০০)-এ এগুলোকে আধুনিক জালিয়াতি বলে প্রমাণ করেন। ১৮০৭ সালে প্রকাশিত “মূল গেলিক” সংস্করণ পরে লুডভিগ ক্রিশ্চিয়ান স্টার্ন দেখান যে সেগুলো ইংরেজি থেকে পিছনের দিকে অনুবাদ। ম্যাকফারসনের গেলিক জ্ঞান অপূর্ণ ছিল এবং তিনি দাবি করা পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে তিনি কিছু প্রকৃত মৌখিক গেলিক ঐতিহ্য ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু সেগুলোকে নাটকীয়ভাবে সম্প্রসারিত ও পুনর্গঠিত করেছেন।
অন্যান্য সাহিত্যকর্ম
১৭৭৫ সালে প্রকাশ করেন Original Papers, containing the Secret History of Great Britain from the Restoration to the Accession of the House of Hanover। লর্ড নর্থের সরকারকে সমর্থন করে বেতনভুক্ত লেখক হিসেবে কাজ করেন। ১৭৭৬ সালে The Rights of Great Britain লেখেন, যেখানে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাকে “খালি বক্তৃতা” বলে উড়িয়ে দেন।
রাজনৈতিক জীবন ও সরকারি চাকরি
১৭৬৪ সালে ফ্লোরিডার পেনসাকোলায় গভর্নর জর্জ জনস্টোনের সচিব হিসেবে যান। ১৭৬৬ সালে ফিরে আসেন এবং পেনশন বজায় রাখেন। আর্কটের নবাবের লন্ডন এজেন্ট হিসেবে লাভজনক পদ পান। ১৭৮০ সালে ক্যামেলফোর্ড থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন (১৭৯৬ সাল পর্যন্ত)। সরকারি গোপনীয় পেনশনের তালিকায় নাম ছিল। ধনী হয়ে ওঠেন।
ব্যক্তিগত জীবন
ইনভারনেস-শায়ারে বেলভিল (বা বালাভিল) এস্টেট কিনে নেন। অসংখ্য অবৈধ সন্তান ছিল। এস্টেটের উত্তরাধিকারে “ম্যাকফারসন অব বেলভিল” উপাধি বাধ্যতামূলক করেন। হাইল্যান্ড ক্লিয়ারেন্সে অংশ নেন — ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করে জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং স্থানের নাম বদলান (যেমন রাইটস → বেলভিল)।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
পরবর্তী বছরগুলোতে ফোইনেস, এটেরিশ ও ইনভারনাহেভেনের জমি অর্জন করেন। ১৭৯৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলভিলে ৫৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত হন (কবরস্থান কেনা হয়েছিল বলে কথিত)।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
ওসিয়ান কাব্য ইউরোপীয় রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। গ্যেটে The Sorrows of Young Werther-এ অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত করেন। হার্ডার, নেপোলিয়ন (যিনি যুদ্ধে কপি বহন করতেন এবং ইনগ্রেসকে পেইন্টিং করতে বলেছিলেন), ব্লেক, ওয়াল্টার স্কট, মেন্ডেলসন প্রমুখ প্রভাবিত হন। এটি সেল্টিক পুনর্জাগরণ, লোককথা সংগ্রহ (গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়, কালেভালা), এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। স্টাফার দ্বীপের গুহার নাম “ফিঙ্গাল’স কেভ” হয়।
যদিও জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত, ম্যাকফারসনের কাজ প্রাচীন সেল্টিক সংস্কৃতিকে ইউরোপের সামনে তুলে ধরে এবং রোমান্টিকতার “প্রিমিটিভ”, Sublimity ও মেলানকলির আদর্শ গড়ে তোলে। আজও তিনি সাহিত্য ইতিহাসের এক রহস্যময় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় — যিনি একটি জাতির হারানো কণ্ঠস্বরকে পুনর্নির্মাণ করে সমগ্র ইউরোপকে মুগ্ধ করেছিলেন।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে সাহিত্য কীভাবে ইতিহাস, জাতিসত্তা ও কল্পনার সীমানা অতিক্রম করতে পারে।