সাহিত্য ও সাহিত্যিক

জন হাওয়ার্ড পেইন (৯ জুন ১৭৯১ – ১০ এপ্রিল ১৮৫২)

নোট ১:
জন হাওয়ার্ড পেইন ১৭৯১ সালের ৯ জুন নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি ইস্ট হ্যাম্পটনে কাটান, যেখানে তাঁর দাদুর ঔপনিবেশিক বাড়ি ছিল। বাবা উইলিয়াম পেইন ছিলেন বক্তৃতাশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও কবিতার প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। পারিবারিক আর্থিক সংকট তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি দায়িত্বশীল করে তোলে।

নোট ২:
পেইনের মা সারাহ ইসাকস ইস্ট হ্যাম্পটনের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবার পরে বোস্টনে চলে যায়। বাবা তাঁকে উচ্চারণ ও অভিব্যক্তিতে প্রশিক্ষণ দেন। কিন্তু মঞ্চে যাওয়ার ইচ্ছা দেখে বাবা চিন্তিত হতেন। শৈশবেই পেইন সামরিক দল গঠন করে বোস্টন কমনে প্যারেড করতেন। এতে তাঁর নেতৃত্বগুণ প্রকাশ পায়।

নোট ৩:
১৪ বছর বয়সে পেইন নিজে থেকে থিয়েটার সমালোচনা পত্রিকা The Thespian Mirror প্রকাশ করেন। এটি নিউ ইয়র্ক ইভনিং পোস্ট-এ পুনর্মুদ্রিত হয়। সম্পাদক তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন। এক ধনী ব্যক্তির সাহায্যে তিনি ইউনিয়ন কলেজে পড়ার সুযোগ পান। ছাত্রজীবনে তিনি The Pastime পত্রিকাও সম্পাদনা করেন।

নোট ৪:
মায়ের মৃত্যু ও বাবার আর্থিক সর্বনাশের পর ১৬ বছর বয়সে পেইন কলেজ ছেড়ে দেন। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৮০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের পার্ক থিয়েটারে Young Norval চরিত্রে অভিনয় করে তিনি তাৎক্ষণিক সাফল্য পান। সংবাদপত্র তাঁর সৌন্দর্য ও প্রতিভার প্রশংসা করে।

নোট ৫:
পেইন আমেরিকার প্রথম অভিনেতা যিনি হ্যামলেট চরিত্রে অভিনয় করেন। রোমিও চরিত্রে এলিজা পো-র বিপরীতে অভিনয় করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোরসহ বিভিন্ন শহরে সফর করেন। তবে থিয়েটার থেকে পারিশ্রমিক পাওয়া তাঁর জন্য সবসময় কঠিন ছিল।

নোট ৬:
১৮১৩ সালে পেইন ইংল্যান্ডে যান। যুদ্ধের কারণে লিভারপুলে দুই সপ্তাহ বন্দি থাকার পর তিনি লন্ডনে পৌঁছান। তিনি ছিলেন প্রথম আমেরিকান অভিনেতা যিনি ড্রুরি লেন ও কভেন্ট গার্ডেন মঞ্চে সফলভাবে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয় লন্ডনের দর্শকদের মুগ্ধ করে।

নোট ৭:
লন্ডনে পেইন অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লেখা ও প্রযোজনায় মনোনিবেশ করেন। ফরাসি নাটক অনুবাদ করে ইংরেজি মঞ্চে উপযোগী করে তোলেন। স্যাডলার্স ওয়েলস থিয়েটার পরিচালনা করেন, যদিও এটি আর্থিকভাবে ব্যর্থ হয়। তিনি ওয়াশিংটন আরভিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।

নোট ৮:
১৮২৩ সালে পেইন Clari; or the Maid of Milan অপেরেটা রচনা করেন। এতে তিনি নিজের ছাত্রজীবনের লেখা একটি কবিতাকে গানে রূপ দেন — “হোম! সুইট হোম!”। সুর দেন স্যার হেনরি বিশপ। কভেন্ট গার্ডেনে প্রথম পরিবেশিত হয়ে গানটি তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নোট ৯:
“হোম, সুইট হোম” গানটি ১ লাখ কপি শীট মিউজিক বিক্রি হয়। প্রকাশকরা প্রচুর লাভ করেন। কিন্তু দুর্বল চুক্তির কারণে পেইন খুব সামান্যই আর্থিক লাভ পান। গানটি আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় উভয় পক্ষের সৈন্যদের প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট লিংকনও এটি খুব পছন্দ করতেন।

নোট ১০:
পেইন কখনো বিয়ে করেননি। লন্ডনে তিনি মেরি শেলির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আকর্ষণ অনুভব করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেন। “যতদিন অর্থ ছিল, ততদিন তিনি রাজপুত্রের মতো জীবন কাটাতেন” — সমসাময়িকরা এমন মন্তব্য করেছেন। তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি কম ছিল।

নোট ১১:
১৮৩৫-৩৬ সালে পেইন চেরোকি প্রধান জন রসের অতিথি হয়ে জর্জিয়ায় যান। তিনি চেরোকি ভাষা, সংস্কৃতি ও পুরাণ সংগ্রহ করেন। ইন্ডিয়ান রিমুভাল নীতির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। জর্জিয়া গার্ড তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এক সৈন্য “হোম, সুইট হোম” গাইতে গাইতে তাঁকে চিনতে পারে।

নোট ১২:
১৮৪২ সালে প্রেসিডেন্ট জন টাইলার পেইনকে তিউনিসের মার্কিন কনসাল নিযুক্ত করেন। তিনি অবহেলিত কনস্যুলেট সংস্কার করেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করেন। ১৮৪৬ সালে প্রত্যাহার করা হলেও ১৮৫১ সালে তিনি পুনরায় নিযুক্ত হন। তিউনিসেই তাঁর শেষ জীবন কাটে।

নোট ১৩:
১৮৫২ সালের ১০ এপ্রিল তিউনিসে দীর্ঘ অসুস্থতার পর পেইন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সেন্ট জর্জেস প্রটেস্ট্যান্ট সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়। ১৮৮৩ সালে ডব্লিউ. ডব্লিউ. কর্কোরানের উদ্যোগে তাঁর দেহাবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়। নিউ ইয়র্ক সিটি হলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়।

নোট ১৪:
৯ জুন ১৮৮৩ সালে পেইনের দেহাবশেষ ওক হিল সিমেট্রি, ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে পুনঃসমাহিত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট চেস্টার এ. আর্থারসহ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। গায়কদল “হোম, সুইট হোম” গান পরিবেশন করে। এটি ছিল তাঁর ৯১তম জন্মবার্ষিকী।

নোট ১৫:
ইস্ট হ্যাম্পটনের পৈতৃক বাড়িটি আজ “Home Sweet Home Museum” নামে সংরক্ষিত। ১৮৭৩ সালে ব্রুকলিনের প্রসপেক্ট পার্কে তাঁর ব্রোঞ্জ বাস্ট স্থাপিত হয়। ১৯৭০ সালে তিনি Songwriters Hall of Fame-এ অন্তর্ভুক্ত হন। তাঁর লেখা গান আজও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।

নোট ১৬:
পেইন ওয়াশিংটন আরভিং, লর্ড বায়রন, কোলরিজ ও তালমার মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি অনেক নাটক লিখেছেন — Brutus, Julia সহ। ওয়াশিংটন আরভিংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি নাটক রচনা করেন। তাঁর রচনায় রোমান্টিক ভাবধারা প্রকাশ পায়।

নোট ১৭:
“হোম, সুইট হোম” গানটি শুধু স্বদেশপ্রেমের প্রতীক নয়, এটি পরিবার ও স্নেহের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। গৃহযুদ্ধের সময় উত্তর ও দক্ষিণ — উভয় পক্ষের সৈন্যরা এটি গাইত। লিংকন পুত্রের মৃত্যুর পর বারবার এই গান শুনতে চাইতেন। আজও এটি ইংরেজি গানের ইতিহাসে অমর।

নোট ১৮:
পেইন চেরোকি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও পুরাণ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছিলেন। তাঁর সংগৃহীত উপাদান আজ নিউবেরি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। তিনি “দশ হারানো গোত্র” তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন, যদিও পরবর্তীকালে এটি ভুল প্রমাণিত হয়। তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসনীয়।

নোট ১৯:
পেইনের জীবন ছিল প্রতিভা ও দুর্দশার মিশ্রণ। তিনি অসাধারণ সৃজনশীল ছিলেন, কিন্তু আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বল। লন্ডনে সাফল্যের পরও তিনি বারবার আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৮৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। তবু তিনি সৃষ্টিতে অবিচল ছিলেন।

নোট ২০:
জন হাওয়ার্ড পেইনের “হোম, সুইট হোম” আজও বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর জীবন শেখায় — সৃষ্টি মানুষকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখে। অভিনেতা, নাট্যকার, কবি ও কূটনীতিক হিসেবে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। তাঁর গান আজও স্বদেশের ডাকে সাড়া দেয়।


অভিনেতা-কবি, নাট্যকার এবং বিশ্ববিখ্যাত গান “হোম, সুইট হোম”-এর অমর রচয়িতা

জন হাওয়ার্ড পেইন ছিলেন ১৯শ শতাব্দীর এক অনন্য প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব — অভিনেতা, নাট্যকার, কবি, সাংবাদিক, নাট্য সমালোচক এবং কূটনীতিক। তিনি প্রায় দুই দশক লন্ডনের মঞ্চ জয় করে নিয়েছিলেন এবং আমেরিকান থিয়েটারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর নাম আজ সবচেয়ে বেশি চিরস্মরণীয় একটি সরল, হৃদয়স্পর্শী গানের জন্য — “হোম! সুইট হোম!”। এই গান শুধু স্বদেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠেনি, আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় উভয় পক্ষের সৈন্যদের মুখে মুখে ফিরেছে, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের প্রিয় গান ছিল এবং আজও ইংরেজি-ভাষী বিশ্বে এটি অন্যতম জনপ্রিয় ব্যালাড।

জন্ম, শৈশব ও পরিবার

৯ জুন ১৭৯১ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন হাওয়ার্ড পেইন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নয় সন্তানের মধ্যে ষষ্ঠ (সাত পুত্রের একজন)। পিতা উইলিয়াম পেইন ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ বক্তৃতাশিক্ষক (elocution teacher), যিনি ম্যাসাচুসেটসের পুরনো পরিবারের সন্তান। মাতা সারাহ ইসাকস (Sarah Isaacs) ছিলেন ইস্ট হ্যাম্পটনের (East Hampton, Long Island) অধিবাসী।

পরিবার প্রথমে ইস্ট হ্যাম্পটনে বাস করত। সেখানে পিতা ক্লিনটন অ্যাকাডেমিতে (Clinton Academy) শিক্ষকতা করতেন। জনের শৈশবের অনেক সময় কেটেছে দাদুর পুরনো ঔপনিবেশিক বাড়িতে (James Lane-এর সেই ঘরটি আজ “Home Sweet Home Museum” নামে সংরক্ষিত)। পরে পরিবার বোস্টনে চলে যায়। পিতা তাঁকে উচ্চারণ ও অভিব্যক্তিতে প্রশিক্ষণ দিতেন, কিন্তু মঞ্চে যাওয়ার ইচ্ছা দেখে আতঙ্কিত হতেন।

শিক্ষা, প্রতিভার বিকাশ ও অভিনয়ের প্রতি টান

ছোটবেলা থেকেই জন অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন। ১৩-১৪ বছর বয়সে তিনি নিজে থেকে থিয়েটার সমালোচনা পত্রিকা The Thespian Mirror প্রকাশ করেন (১৮০৫)। এটি নিউ ইয়র্ক ইভনিং পোস্ট-এ পুনর্মুদ্রিত হয়। সম্পাদক উইলিয়াম কোলম্যান তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং এক ধনী ব্যক্তির সাহায্যে তাঁকে ইউনিয়ন কলেজ (Union College, Schenectady)-এ পড়ার সুযোগ করে দেন (১৮০৬)। সেখানে তিনি ছাত্র পত্রিকা The Pastime সম্পাদনা করেন।

কিন্তু ১৮০৭ সালে মায়ের আকস্মিক মৃত্যু এবং পিতার আর্থিক সর্বনাশ ঘটলে ১৬ বছর বয়সী জন কলেজ ছেড়ে দেন। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে তিনি মঞ্চজীবন বেছে নেন — পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

আমেরিকান মঞ্চে উজ্জ্বল অভিষেক

২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮০৯ সালে নিউ ইয়র্কের পার্ক থিয়েটারে (Park Theatre) জন “Young Norval” চরিত্রে অভিনয় করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন (জন হোম-এর Douglas নাটকে)। সংবাদপত্র তাঁর সৌন্দর্য ও প্রতিভার প্রশংসায় ভরে যায়। তিনি বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, রিচমন্ড ও চার্লসটনে সফর করেন। রোমিও চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে এলিজা পো (এডগার অ্যালান পো-র মা)-এর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি আমেরিকান অভিনেতা হিসেবে প্রথম হ্যামলেট চরিত্রে অভিনয় করেন বলে কথিত আছে।

সাফল্য সত্ত্বেও থিয়েটার থেকে পারিশ্রমিক পাওয়া কঠিন ছিল। এ সময় তিনি সংক্ষিপ্তভাবে Athenaeum নামে একটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেন।

ইংল্যান্ডে যাত্রা: প্রথম আমেরিকান অভিনেতা লন্ডন মঞ্চে

১৮১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে (১৮১২-এর যুদ্ধের সময়) জন লিভারপুলে পৌঁছে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক থাকেন। মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যান। তিনি ছিলেন প্রথম আমেরিকান অভিনেতা যিনি ব্রিটিশ মঞ্চে (Drury Lane ও Covent Garden) সফলভাবে অভিনয় করেন। প্রদেশগুলোতেও (লিভারপুল, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ডাবলিন) তিনি প্রশংসিত হন। প্যারিসেও গিয়েছিলেন।

লন্ডনে তিনি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ, মেরি শেলি (ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর লেখিকা), ওয়াশিংটন আরভিং (তাঁর সঙ্গে বাস করতেন), লর্ড বায়রন ও ফ্রাঁসোয়া-জোসেফ তালমার মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশা করেন। মেরি শেলির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত রোমান্টিক আকর্ষণও ছিল, কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন যে শেলি আরভিংকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নাট্য রচনা, অনুবাদ ও প্রযোজনায় মনোনিবেশ করেন। ফরাসি নাটক অনুবাদ করে ইংরেজি মঞ্চে উপযোগী করে তোলেন। স্যাডলার্স ওয়েলস থিয়েটার পরিচালনা করেন (যা আর্থিকভাবে ব্যর্থ হয়)।

“হোম, সুইট হোম!” — অমর সৃষ্টি

১৮২২-২৩ সালে পেইন কভেন্ট গার্ডেনের পরিচালক চার্লস কেম্বলকে কয়েকটি নাটক বিক্রি করেন। তার মধ্যে একটি গল্পকে তিনি রূপান্তরিত করে অপেরেটা Clari; or the Maid of Milan (ক্লারি, বা মিলানের কুমারী) তৈরি করেন। এতে তিনি নিজের ছাত্রজীবনের লেখা একটি কবিতাকে গানের আকারে রূপ দেন — “Home! Sweet Home!”।

সুর দেন স্যার হেনরি বিশপ (Sir Henry Bishop), যিনি একটি সিসিলিয়ান/ইতালীয় লোকসুর (Sicilian Air) থেকে এটি গ্রহণ/রূপান্তর করেন। ১৮২৩ সালে কভেন্ট গার্ডেনে প্রথম পরিবেশিত হয়। গানটি তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া জাগায়। শীট মিউজিকের ১ লাখ কপি বিক্রি হয়, প্রকাশকরা প্রথম বছরেই £২,১০০ নিট লাভ করেন। কিন্তু পেইন — দুর্বল চুক্তি ও ব্যবসায়িক অদূরদর্শিতার কারণে — খুব সামান্যই লাভবান হন।

গানটি আমেরিকায় ১৮২৩ সালের অক্টোবরে ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম গাওয়া হয়। গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-৬৫) এটি উত্তর ও দক্ষিণ — উভয় পক্ষের সৈন্যদের প্রিয় গান হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট লিংকন পুত্র উইলির মৃত্যুর পর বারবার এটি শুনতে চাইতেন এবং ১৮৬২ সালে অ্যাডেলিনা পাত্তিকে হোয়াইট হাউসে গাইতে বলেছিলেন।

(একটি জনশ্রুতি: ইতালি ভ্রমণকালে পেইন এক গ্রাম্য মহিলাকে এই সুর গাইতে শুনে মুগ্ধ হন এবং স্বরলিপি করে নেন।)

অন্যান্য সাহিত্যকর্ম ও সহযোগিতা

পেইন অসংখ্য নাটক লিখেছেন — Julia; or the Wanderer (১৮০৮), Brutus (১৮১৮, বেশ সফল), এবং ওয়াশিংটন আরভিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি নাটক। তিনি ফরাসি নাটকের অনুবাদক ও অভিযোজক হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। কবিতা লিখতেন, পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। চেরোকি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, পুরাণ ও ইতিহাস নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছিলেন (যদিও “দশ হারানো গোত্র” তত্ত্বটি পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়)।

চেরোকি অভিজ্ঞতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

১৮৩৫-৩৬ সালে জর্জিয়ায় চেরোকি প্রধান জন রস-এর অতিথি হয়ে তিনি তাঁদের সংস্কৃতি সংগ্রহ করেন। ইন্ডিয়ান রিমুভাল (Trail of Tears)-এর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। জর্জিয়া কর্তৃপক্ষ তাঁকে ও রসকে গ্রেপ্তার করে (এক সৈন্য “হোম, সুইট হোম” গাইতে গাইতে তাঁকে চিনতে পারে এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়)। তাঁর সংগৃহীত উপাদান আজ নিউবেরি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত।

কূটনৈতিক জীবন: তিউনিসের কনসাল

১৮৪২ সালে প্রেসিডেন্ট জন টাইলার তাঁকে তিউনিস (Tunis)-এর মার্কিন কনসাল নিযুক্ত করেন (গানের খ্যাতি এতে সাহায্য করেছিল বলে অনেকে মনে করেন)। তিনি অবহেলিত কনস্যুলেট সংস্কার করেন, স্থানীয় সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং তিউনিসের ইতিহাস লেখার পরিকল্পনা করেন। ১৮৪৬ সালে প্রত্যাহার করা হয়। ১৮৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ১৮৫১ সালে প্রেসিডেন্ট মিলার্ড ফিলমোরের আমলে পুনরায় নিযুক্ত হন এবং ১৮৫১ সালের মে মাসে তিউনিসে ফিরে যান।

শেষ জীবন, মৃত্যু ও চিরস্মরণ

১৮৫২ সালের ১০ এপ্রিল (কিছু সূত্রে ৯ এপ্রিল) তিউনিসে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেন্ট জর্জেস প্রটেস্ট্যান্ট সিমেট্রিতে সমাহিত হন। ১৮৮৩ সালে ধনকুবের ডব্লিউ. ডব্লিউ. কর্কোরানের উদ্যোগে তাঁর দেহাবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়। নিউ ইয়র্ক সিটি হলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত রাখা হয় (হাজার হাজার মানুষ শ্রদ্ধা জানান)। ৯ জুন ১৮৮৩ (তাঁর ৯১তম জন্মবার্ষিকী) ওক হিল সিমেট্রি (Oak Hill Cemetery), ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে পুনঃসমাহিত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট চেস্টার এ. আর্থার, মন্ত্রিসভা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন। মেরিন ব্যান্ড বাজিয়েছিল এবং গায়কদল “হোম, সুইট হোম” গেয়েছিল।

১৮৭৩ সালে ব্রুকলিনের প্রসপেক্ট পার্কে তাঁর ব্রোঞ্জ বাস্ট স্থাপিত হয়। ইস্ট হ্যাম্পটনের পৈতৃক বাড়িটি “Home Sweet Home Museum” হিসেবে সংরক্ষিত। ১৯৭০ সালে তিনি Songwriters Hall of Fame-এ অন্তর্ভুক্ত হন।

ব্যক্তিত্ব ও উত্তরাধিকার

পেইন ছিলেন আকর্ষণীয়, উদার, বোহেমিয়ান স্বভাবের। “যতদিন অর্থ ছিল, ততদিন তিনি বোহেমিয়ান রাজপুত্রের মতো জীবন কাটাতেন” — সমসাময়িকরা এমন মন্তব্য করেছেন। ব্যবসায়িক বুদ্ধি কম থাকায় তিনি সবসময় আর্থিক সংকটে থাকতেন। কখনো বিয়ে করেননি।

তাঁর “হোম, সুইট হোম” আজও স্বদেশ, পরিবার ও স্নেহের প্রতীক হয়ে আছে। এটি শুধু একটি গান নয় — এটি একটি সর্বজনীন আবেগের নাম। জন হাওয়ার্ড পেইনের জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রতিভা ও সৃষ্টি মানুষকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখে, এমনকি জীবনে অনেক কষ্ট ও অর্থের অভাব থাকলেও।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...