আলফঁস দ্য লামার্তিন (Alphonse Marie Louis de Prat de Lamartine, ১৭৯০–১৮৬৯)
আলফঁস দ্য লামার্তিন (১৭৯০–১৮৬৯)
১. আলফঁস দ্য লামার্তিন ১৭৯০ সালের ২১ অক্টোবর ফ্রান্সের মাকোঁ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রাদেশিক অভিজাত পরিবারের সন্তান। বাবা রাজতন্ত্রপন্থী ছিলেন এবং বিপ্লবের সময় কারাগারে বন্দি হন। মা গভীর ধর্মপ্রাণা ছিলেন। শৈশব কাটে মিলি এস্টেটে। এই পরিবেশ তাঁর কাব্যিক সংবেদনশীলতা গড়ে তোলে।
২. লামার্তিন বেলে-এর জেসুইট কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি ক্লাসিক সাহিত্য, ধর্ম এবং উদার চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসেন। শৈশব থেকেই তিনি চাতোব্রিয়াঁ, রাসিন, দান্তে ও শেকসপিয়র পড়তেন। নেপোলিয়নের যুগে রাজতন্ত্রপন্থী পরিবার হওয়ায় সামরিক চাকরি করতে পারেননি। এই অলসতা তাঁকে সাহিত্যের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. তাঁর কাব্যিক প্রতিভা গড়ে ওঠে প্রকৃতি, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার মিলনে। তিনি ফরাসি কবিতায় ক্লাসিক্যাল শুষ্কতা ভেঙে ব্যক্তিগত আবেগের নতুন ধারা আনেন। রোমান্টিকতার প্রথম সারির কবি হিসেবে তিনি প্রকৃতিকে আত্মার আয়না করে তোলেন। তাঁর কবিতায় সময়, স্মৃতি ও ক্ষতির গভীর অনুভূতি ফুটে ওঠে।
৪. ১৮১৬ সালে আইক্স-লেস-বাঁ-এ জুলি চার্লসের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবন বদলে দেয়। জুলির অসুস্থতা ও ১৮১৭ সালে মৃত্যু তাঁকে গভীর বেদনায় ফেলে। এই ক্ষতিই তাঁর বিখ্যাত কবিতা “ল্য লাক”-এর অনুপ্রেরণা হয়। প্রেম ও হারানোর বেদনা তাঁর কাব্যের মূল সুর হয়ে ওঠে।
৫. ১৮২০ সালে তিনি ইংরেজ মেয়ে এলিসা বার্চকে বিয়ে করেন। এলিসা ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে শৈশবে মারা যায়। মেয়ে জুলিয়া ১০ বছর বয়সে ১৮৩২ সালে বৈরুতে মারা যায়। এই ট্র্যাজেডি তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও লেখায় গভীর প্রভাব ফেলে।
৬. ১৮২০ সালে প্রকাশিত মেডিটেশন পোয়েটিক তাঁকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে। এই গ্রন্থ ফরাসি রোমান্টিক কবিতার যুগান্তকারী সূচনা করে। এতে ব্যক্তিগত আবেগ, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ধর্মীয় অনুভূতির মিলন ঘটে। গ্রন্থটি পাঠকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে এবং তাঁকে রোমান্টিক আন্দোলনের নেতা করে।
৭. “ল্য লাক” কবিতায় লামার্তিন সময়কে থামতে বলেন। তিনি প্রেমিক-প্রেমিকার সুখের মুহূর্ত ধরে রাখতে চান। শেষাংশে তিনি প্রশ্ন করেন—অতীতের দিনগুলোর ঢেউয়ের ওপর কি কখনো নোঙর ফেলা যায়? এই কবিতা রোমান্টিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে এবং আজও অমর।
৮. বিবাহের পর তিনি কূটনৈতিক চাকরিতে যোগ দেন। নেপলসে ফরাসি দূতাবাসে সচিব হিসেবে কাজ করেন। কূটনীতি তাঁর সাহিত্যচর্চায় বাধা দেয় না। বরং বিদেশ ভ্রমণ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে। ১৮২৯ সালে তিনি ফরাসি একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন।
৯. হারমোনি পোয়েটিক এ রিলিজিয়োজ (১৮৩০) গ্রন্থে তিনি ধর্মীয় উদ্দীপনা প্রকাশ করেন। জোসেলিন (১৮৩৬) ও লা শ্যুত দ্যু আঁজ (১৮৩৮) মহাকাব্যিক খণ্ডাংশ। এগুলোতে পতিত দেবদূত ও ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কাহিনি আছে। তাঁর কবিতা ক্রমশ দার্শনিক গভীরতা পায়।
১০. ১৮৩২-৩৩ সালে তিনি প্রাচ্য ভ্রমণে যান। গ্রিস, লেবানন, সিরিয়া ও পবিত্র ভূমি দেখেন। এই ভ্রমণের বিবরণ ভোয়াজ আঁ ওরিয়ঁ (১৮৩৫) গ্রন্থে লেখা হয়। ভ্রমণ ছিল আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অংশ। কিন্তু সেখানেই তিনি কন্যা জুলিয়াকে হারান।
১১. কন্যার মৃত্যু তাঁর ধর্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। তিনি ধীরে ধীরে প্যান্থেইস্ট বা দেবতাবাদী হয়ে ওঠেন। তবু তাঁর লেখায় আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান থেকে যায়। প্রকৃতি ও মানবিকতার মিলনে তিনি নতুন আধ্যাত্মিকতার সন্ধান করেন। এটি তাঁর পরবর্তী কাব্যে প্রতিফলিত হয়।
১২. ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। জুলাই রাজতন্ত্রের সমালোচক ছিলেন। ১৮৩৩ সালে বার্গ থেকে ডেপুটি নির্বাচিত হন। “সোশ্যাল পার্টি” গঠন করে সামাজিক সংস্কারের পক্ষে কথা বলেন। শ্রমিকদের অধিকার ও শান্তিবাদ তাঁর আদর্শ ছিল।
১৩. তিনি শ্রমিক শ্রেণির সমর্থক হয়ে ওঠেন। ১৮৩৭ সালে আরও বামপন্থী অবস্থান নেন। সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তাঁর বক্তৃতা জনগণকে প্রভাবিত করে। রাজনীতিতে তিনি আদর্শবাদী ছিলেন, বাস্তব রাজনীতির চেয়ে নীতির পক্ষে দাঁড়াতেন।
১৪. ১৮৪৭ সালে হিস্টোয়ার দেজ জিরন্ড্যাঁ প্রকাশ করেন। এই ইতিহাস গ্রন্থ জিরন্ডিনদের প্রশংসা করে। গ্রন্থটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এবং বিপ্লবী চেতনা জাগায়। এটি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে এবং ১৮৪৮ সালের বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৫. ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে তিনি অস্থায়ী সরকারের কার্যত প্রধান হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সার্বজনীন ভোটাধিকার ও দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৬. ২৫ ফেব্রুয়ারি হোটেল দ্য ভিলের বারান্দায় তিনি বিখ্যাত ভাষণ দেন। লাল পতাকার বিরুদ্ধে ত্রিবর্ণ পতাকা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ান। বলেন, ত্রিবর্ণ বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার প্রতীক, লাল পতাকা শুধু রক্তের। এই ভাষণ ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা হিসেবে ত্রিবর্ণকে স্থায়ী করে।
১৭. জুনের দিনগুলোতে শ্রমিক বিদ্রোহ দমনের পর তিনি ক্ষমতা হারান। ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পান। ১৮৫১ সালে লুই নেপোলিয়নের অভ্যুত্থানের পর রাজনীতি থেকে সরে আসেন। আদর্শবাদী রাজনীতি তাঁকে ব্যর্থতার মুখে ফেলে।
১৮. শেষ জীবনে আর্থিক সংকটে পড়েন। ঋণের বোঝা বহন করতে গিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেন। গ্রাজিয়েলা, রাফায়েল ও ইতিহাস গ্রন্থ লেখেন। কুর ফ্যামিলিয়ে দ্য লিতেরাচ্যুর পত্রিকা চালান। স্ত্রীর মৃত্যুর পর একাকীত্ব বাড়ে। তবু সৃজনশীলতা অব্যাহত থাকে।
১৯. ১৮৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে দারিদ্র্যের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ৭৮ বছর বয়সে তিনি প্রায় বিস্মৃত হয়ে যান। কিন্তু তাঁর কাব্য ও রাজনৈতিক আদর্শ ইতিহাসে স্থান করে নেয়। মৃত্যুর পর তাঁর অবদান পুনর্মূল্যায়িত হয়।
২০. লামার্তিন ফরাসি রোমান্টিক গীতিকাব্যের আবেগময় পথিকৃৎ। তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতাকে কবিতায় নতুন মাত্রা দেন। “ল্য লাক” আজও অমর। রাজনীতিতে তিনি গণতন্ত্র ও মানবতাবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর জীবন সাহিত্য ও আদর্শের অনন্য সমন্বয়।
ফরাসি রোমান্টিক গীতিকাব্যের আবেগময় পথিকৃৎ
আলফঁস দ্য লামার্তিন ছিলেন উনিশ শতকের ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কবি, ঐতিহাসিক, ঔপন্যাসিক এবং রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ফরাসি রোমান্টিক আন্দোলনের প্রথম সারির কবি হিসেবে পরিচিত এবং আধুনিক ফরাসি গীতিকাব্যের (lyric poetry) আবেগময়, ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ধারার পথিকৃৎ। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির গভীর অনুভূতি, প্রেমের বেদনা, সময়ের অপরিবর্তনীয় প্রবাহ, স্মৃতির মধুর-বেদনাদায়ক মিশ্রণ এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে। ১৮২০ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ মেডিটেশন পোয়েটিক (Méditations poétiques) ফরাসি কবিতায় রোমান্টিক যুগের সূচনা করে এবং তাঁকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে। “ল্য লাক” (Le Lac / দ্য লেক) তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা, যা আজও ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা হিসেবে বিবেচিত।
লামার্তিন শুধু কবি ছিলেন না; তিনি ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, অস্থায়ী সরকারের কার্যত প্রধান হন এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হন। তবে শেষ জীবনে আর্থিক সংকটে পড়ে তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ছিল আবেগ, সৃজনশীলতা, রাজনৈতিক আদর্শবাদ এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির অসাধারণ সমন্বয়।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
১৭৯০ সালের ২১ অক্টোবর ফ্রান্সের বারগান্ডি অঞ্চলের মাকোঁ (Mâcon) শহরে জন্মগ্রহণ করেন আলফঁস মারি লুই দ্য প্রা দ্য লামার্তিন। তিনি ছিলেন প্রাদেশিক অভিজাত পরিবারের সন্তান। বাবা পিয়ের দ্য লামার্তিন রাজতন্ত্রপন্থী (royalist) ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসের রাজত্বকালে (Reign of Terror) তিনি কারাগারে বন্দি হন, কিন্তু গিলোটিনের হাত থেকে রক্ষা পান। মা আলিস দ্য লামার্তিন গভীর ধর্মপ্রাণা ছিলেন; তিনি রুশোর চিন্তাধারার সঙ্গে ক্যাথলিক ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন এবং ছেলের প্রাথমিক ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শৈশব কাটে পরিবারের মিলি (Milly) এস্টেটে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র পুত্রসন্তান। শৈশবেই তিনি পড়াশোনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি ফেনেলোঁ, ভলতেয়ার, রাসিন, তাসো, দান্তে, পেত্রার্ক, শেকসপিয়র, শাতোব্রিয়াঁ এবং ওসিয়ানের রচনা পাঠ করতেন। ১৮০৩-১৮০৮ সালের দিকে তিনি বেলে (Belley)-এর জেসুইট কলেজে পড়াশোনা করেন। যদিও জেসুইটরা তখন ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিল, কলেজটি তখনও চালু ছিল। এখানে তিনি উদার ক্যাথলিক চিন্তাধারা এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন।
নেপোলিয়নের যুগে রাজতন্ত্রপন্থী পরিবার হওয়ায় সামরিক বা কূটনৈতিক চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। ১৮১১ সালে ইতালি ভ্রমণ করেন। ১৮১৪ সালে বুরবোঁ রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে লুই অষ্টাদশের রাজকীয় দেহরক্ষী বাহিনীতে (Gardes du Corps) যোগ দেন। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের “শত দিন” (Hundred Days)-এর সময় সুইজারল্যান্ডে নির্বাসিত হন। ওয়াটারলুর পর সামরিক জীবন ত্যাগ করেন।
প্রেম, অনুপ্রেরণা ও সাহিত্যিক সূচনা
লামার্তিনের জীবনে প্রেম ও ক্ষতি গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ১৮১২ সালে ইতালিতে এক শ্রমজীবী মেয়ে আন্তোনিয়েলার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন (যা পরবর্তীকালে গ্রাজিয়েলা উপন্যাসে রূপ পায়)। ১৮১৬ সালে স্বাস্থ্যের কারণে আইক্স-লেস-বাঁ-এর স্পায় যান। সেখানে বিখ্যাত চিকিৎসকের স্ত্রী জুলি চার্লসের সঙ্গে পরিচয় হয়। জুলির অসুস্থতা ও ১৮১৭ সালে মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। এই ক্ষতিই তাঁর প্রথম বড় কাব্যগ্রন্থের অনুপ্রেরণা হয়।
১৮২০ সালে তিনি ইংরেজ মেয়ে মারিয়া অ্যান (এলিসা) বার্চকে বিয়ে করেন। এলিসা ছিলেন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। একই বছর তিনি কূটনৈতিক চাকরিতে যোগ দেন (নেপলসে ফরাসি দূতাবাসের সচিব) এবং মেডিটেশন পোয়েটিক প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থটি ফরাসি সাহিত্যে সাড়া ফেলে দেয়। এতে অন্তর্ভুক্ত “ল্য লাক” কবিতাটি সময়, স্মৃতি ও হারানো প্রেমের অমর প্রতীক হয়ে ওঠে।
“ল্য লাক” (Le Lac) কবিতার সারাংশ ও গুরুত্ব
কবিতাটি ল্যাক দ্যু বুরজে (Lac du Bourget) হ্রদের তীরে বসে লেখা। এতে কবি সময়কে থামতে বলেন যাতে প্রেমিক-প্রেমিকা আরও কিছুক্ষণ সুখ অনুভব করতে পারে। শেষাংশে তিনি প্রশ্ন করেন—আমরা কি কখনো অতীতের দিনগুলোর ঢেউয়ের ওপর নোঙর ফেলতে পারব? এই কবিতা রোমান্টিকতার মূল সুর—ব্যক্তিগত আবেগ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মিলন এবং ক্ষণস্থায়ী সুখের বেদনা—প্রকাশ করে।
প্রধান সাহিত্যকর্ম ও শৈলী
লামার্তিনের কবিতার বৈশিষ্ট্য: আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, সংগীতময় ছন্দ, প্রকৃতির প্রতীকী ব্যবহার এবং গভীর আধ্যাত্মিকতা। তিনি ক্লাসিক্যাল কবিতার কৃত্রিমতা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যক্তিগত অনুভূতিকে কেন্দ্র করে নতুন ধারা তৈরি করেন।
প্রধান রচনাবলি:
- মেডিটেশন পোয়েটিক (১৮২০) — যুগান্তকারী সাফল্য।
- নুভেল মেডিটেশন পোয়েটিক (১৮২৩)।
- হারমোনি পোয়েটিক এ রিলিজিয়োজ (Harmonies poétiques et religieuses, ১৮৩০) — ধর্মীয় ও দেবতাবাদী উদ্দীপনায় ভরা।
- জোসেলিন (Jocelyn, ১৮৩৬) — এক যুবকের ধর্মীয় জীবন ও প্রেমের দ্বন্দ্বের কাহিনি (বৃহত্তর “Les Visions” মহাকাব্যের অংশ)।
- লা শ্যুত দ্যু আঁজ (La Chute d’un ange / The Fall of an Angel, ১৮৩৮) — পতিত দেবদূতের কাহিনি।
- ভোয়াজ আঁ ওরিয়ঁ (Voyage en Orient, ১৮৩৫) — ১৮৩২-৩৩ সালের গ্রিস, লেবানন, সিরিয়া ও পবিত্র ভূমি ভ্রমণের বিবরণ। এটি শুধু ভ্রমণকাহিনি নয়, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের দলিল।
- গ্রাজিয়েলা (Graziella, ১৮৫২) — প্রথম প্রেমের গল্প অবলম্বনে উপন্যাস।
- হিস্টোয়ার দেজ জিরন্ড্যাঁ (Histoire des Girondins, ১৮৪৭) — ফরাসি বিপ্লবের জিরন্ডিন দলের ইতিহাস; এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়।
১৮২৯ সালে তিনি ফরাসি একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন।
প্রাচ্য ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
১৮৩২-৩৩ সালে লামার্তিন পরিবারসহ প্রাচ্য ভ্রমণে যান। উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম ও নতুন খ্রিস্টধর্মীয় দর্শনের সন্ধান। কিন্তু বৈরুতে ১৮৩২ সালের ৭ ডিসেম্বর তাঁদের একমাত্র জীবিত সন্তান জুলিয়া (১০ বছর বয়সী) মারা যান। এই ক্ষতি তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ধীরে ধীরে প্যান্থেইস্ট (সর্বেশ্বরবাদী) বা দেবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকতে থাকেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভোয়াজ আঁ ওরিয়ঁ-এ লিপিবদ্ধ হয়, যা ওরিয়েন্টালিস্ট সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
রাজনৈতিক জীবন ও ১৮৪৮ বিপ্লব
১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের পর লামার্তিন সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। তিনি জুলাই রাজতন্ত্রের (July Monarchy) সমালোচক ছিলেন। ১৮৩৩ সালে বার্গ (Bergues) থেকে ডেপুটি নির্বাচিত হন। “সোশ্যাল পার্টি” গঠন করেন এবং পরে আরও বামপন্থী হয়ে ওঠেন। তিনি সামাজিক সংস্কার, শ্রমিকদের অধিকার, শান্তিবাদ এবং গির্জা-রাষ্ট্র বিচ্ছেদের পক্ষে কথা বলতেন।
১৮৪৭ সালে হিস্টোয়ার দেজ জিরন্ড্যাঁ প্রকাশিত হলে তাঁর জনপ্রিয়তা চরমে ওঠে। ১৮৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে তিনি অস্থায়ী সরকারের অন্যতম প্রধান হন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সার্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকার প্রবর্তন এবং ফরাসি উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে ছিলেন।
সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা: ১৮৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হোটেল দ্য ভিলের বারান্দায় তিনি লাল পতাকার বিরুদ্ধে ত্রিবর্ণ পতাকা রক্ষার জন্য ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “ত্রিবর্ণ পতাকা বিশ্বজুড়ে প্রজাতন্ত্র ও সাম্রাজ্যের সঙ্গে, আপনাদের স্বাধীনতা ও গৌরবের সঙ্গে ঘুরেছে; লাল পতাকা শুধু চ্যাম্প-দ্য-মার্সে ঘুরেছে, জনগণের রক্তে মাখা হয়ে।” এই ভাষণ ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা হিসেবে ত্রিবর্ণকে স্থায়ী করে।
জুনের দিনগুলোতে (June Days) শ্রমিক বিদ্রোহ দমনের পর তিনি ক্ষমতা হারান। ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি সবচেয়ে কম ভোট পান। ১৮৫১ সালে লুই নেপোলিয়নের অভ্যুত্থানের পর রাজনীতি থেকে সরে আসেন।
পরবর্তী জীবন, আর্থিক সংকট ও মৃত্যু
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর লামার্তিন আর্থিকভাবে ধ্বংসপ্রায় হয়ে পড়েন। বোনদের ভাতা দেওয়া, সম্পত্তি বিক্রি এবং জীবনযাপনের ব্যয় তাঁকে ঋণের জালে ফেলে। তিনি লেখালেখি করে ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেন। কুর ফ্যামিলিয়ে দ্য লিতেরাচ্যুর (Cours familier de littérature) নামে মাসিক পত্রিকা চালান। নতুন করে ইতিহাস ও উপন্যাস লেখেন। স্ত্রী এলিসা ১৮৬৩ সালে মারা যান। শেষ জীবনে তিনি আবার ক্যাথলিক ধর্মের দিকে ঝুঁকেছিলেন বলে কিছু সূত্রে উল্লেখ আছে।
১৮৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে ৭৮ বছর বয়সে দারিদ্র্যের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
লামার্তিন ফরাসি রোমান্টিকতার “আবেগময় পথিকৃৎ” হিসেবে চিরস্মরণীয়। তাঁর ব্যক্তিগত, সৎ ও সংগীতময় কবিতা পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করে—পল ভার্লেন, সিম্বলিস্ট কবিরা এবং এমনকি লিও টলস্টয়ও তাঁকে প্রশংসা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি গণতন্ত্র, শান্তি ও মানবতাবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ত্রিবর্ণ পতাকা রক্ষা এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক।
তিনি প্রকৃতিকে মানুষের আত্মার আয়না হিসেবে দেখেছেন, সময়ের প্রবাহকে দার্শনিকভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং প্রেম ও ক্ষতিকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন। আজও “ল্য লাক” পাঠ করলে পাঠক সময়, স্মৃতি ও হারানো প্রেমের গভীর অনুভূতিতে আপ্লুত হয়।
লামার্তিনের জীবন প্রমাণ করে যে, সাহিত্য ও রাজনীতি, আবেগ ও আদর্শ একসঙ্গে চলতে পারে—যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ক্ষতি ও আর্থিক দুর্দশা তাঁকে ছায়া দিয়েছিল। তিনি ছিলেন সত্যিকারের রোমান্টিক: স্বপ্নদ্রষ্টা, আবেগপ্রবণ, আদর্শবাদী এবং গভীরভাবে মানবিক।