গাঙ ঘাবানোর ডাক
বাড়ির দক্ষিণে মাঠ—
ধানের গন্ধে ভরা প্রান্তর,
যেখানে বাতাসে ভেসে বেড়াতো চাপা হাসির সুর।
মাঠ পেরিয়ে গজারিয়া, ঠুনিভাঙা বিল—
জল মেখে, কচুরীপানার বেগুনী ফুল গুঁজে
আমরা সারা বছর মাছ ধরতাম।
জাল ছুঁড়ে দিতাম চটপট,
বশি বসিয়ে বসে থাকতাম প্রহরভরে।
সোনালী পুঁটি, রুই, শোল, টেংরা—
মাছের ঝাপটায় ভরে উঠতো বুকের ভেতর আনন্দ।
কিন্তু বদলে গেল সব—
বিল দখল হলো, বাঁধ হয়ে উঠল পুকুর।
পাঙাশ-তেলাপিয়ার বাজারি কাহিনীতে
দেশি মাছেরা হারিয়ে গেল আমাদের ভাষা থেকে।
তবু আজও মনে পড়ে—
“গাঙ ঘাবাইছে”—
একটা ডাকেই কেঁপে উঠতো গ্রাম,
ডেকচি, বদনা, খালুই ছুটতো নদীর দিকে।
উত্তরে কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় হাঁটু ডোবা কাদা—
আমরা ভেসে ভেসে হাঁটতাম, যেন প্রত্যেকে মাঝি।
পশ্চিমে শিমুলিয়া কান্দা—বাঁশের সাঁকো,
আর ওপারে নদীর দেশ, রুদ্রগ্রাম।
মূল গ্রামে দারোগাবাড়ি এক ইতিহাস,
তার ছায়ায় নজরুল পাঠাগার—
সেই বইয়ের গন্ধে আমরা প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম শব্দের।
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে বকের বাসা,
“বগা আলা” এক দারুণ বক শিকারের কৌশল,
গল্পে হারিয়ে যাওয়া সন্ধ্যা।
বন্ধুরা হাতে লাঠি, গলায় শিস—
সাহস নিয়ে ঢুকে পড়তাম জঙ্গলে।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা, পাকা কাঠাল,
পুকুরে সাঁতার, দুপুরে পিঠার গন্ধ,
ঈদের সকাল মানেই পাঞ্জাবি, কোলাকুলি,
জায়নামাজ হাতে দলবেঁধে ঈদগাহে।
আত্মীয়তার সেই আলো—
যা আজও শহরের কোনো বাতি ছুঁতে পারেনি।
হাটের দিন ছিল রাজ্য জয়—
গরুর গাড়িতে ধান, বাঁশ, হাঁস, শিশুর চিৎকার।
লোকেরা পাটের দরদামে তর্ক করত,
কিন্তু ফেরার পথে থাকত শুধু হাসির গল্প।
রেডিও বাজত ভোরে হামদ-নাতের সুর,
রাতে পল্লীগীতি, বাউল গান—
আমাদের ঘুম পাড়িয়ে স্বপ্নে নিতো দূরে,
যেখানে আমরা কখনো রাজপুত্র,
কখনো বিপ্লবী, কখনো শুধু কবি।
আজও সে মাঠ, সে গাঙ, সে পাঠাগার—
সব আছে কোনো না কোনোভাবে,
শুধু আমরা নেই সেইভাবে।
তবু “গাঙ ঘাবানোর ডাক”
এখনো বুকের মধ্যে নদীর মতো বাজে।
আমরা আজও সেই গ্রামের সন্তান,
যারা বাঁশঝাড়ের ফাঁকে হারানো নাম কাঁধে নিয়ে
এক মহাকাব্যিক জীবনচিত্র বয়ে চলেছি।