Md Nurnobi Islam Sumon

বিপ্লবের ক্যানভাস
মোঃ নুরনবি ইসলাম সুমন

বিকেলের আলোটা যখন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির বকুলতলার ওপর এসে তির্যকভাবে পড়েছিল, তখন সুমন চাদরে হাত মুছে শেষবারের মতো তার স্কেচখাতাটার দিকে তাকাল। চারপাশের বাতাসে তখনো একটা থমথমে ভাব। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় সেটা। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোনায় তখন চাপা উত্তেজনা, স্লোগানের প্রতিধ্বনি আর এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা।
সুমন ফাইন্যান্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র।

হিসাব-নিকাশের জটিল সমীকরণ তার পড়ার টেবিল জুড়ে থাকলেও, তার আসল বাস ছিল পেন্সিলের গ্রাফাইট আর চারকোল মাখা আঙুলের ডগায়। যখনই মনের ভেতর কোনো ঝড় উঠত, সে খাতায় স্কেচ করতে বসত। আর তার ঠিক পাশেই বসে একমনে কবিতার ডায়েরি ওল্টাচ্ছিল নূর। নূর তার সহপাঠী, একই সাথে পরম বন্ধু। নূরের স্বভাবটা সুমনের চেয়ে একদম আলাদা। সুমন যেখানে শান্ত, অন্তর্মুখী আর তুলির টানে কথা বলতে ভালোবাসে; নূর সেখানে চটপটে, বাগ্মী এবং ক্যাম্পাসের ডিবেটিং সোসাইটির চেনা মুখ। যেকোনো যৌক্তিক তর্কে নূরকে হারানো ছিল প্রায় অসম্ভব।
“কী আঁকলি রে সুমন?” নূর ডায়েরি থেকে চোখ তুলে সুমনের স্কেচবুকের দিকে তাকাল।

সুমন খাতাটা নূরের দিকে ঘুরিয়ে দিল। পেন্সিলের নিখুঁত শেডিংয়ে ফুটে উঠেছে একটি শার্ট পরা তরুণের অবয়ব, যার দুই হাত দুদিকে প্রসারিত, যেন বুক পেতে দিচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য বুলেটের সামনে। তরুণের চোখের দৃষ্টিতে কোনো ভয় নেই, আছে এক অসীম সাহসিকতা।
নূর শক্ত হয়ে গেল। স্কেচটার নিচে আঙুল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল, রংপুরের আবু সাঈদ… তাই না?

সুমন মাথা নাড়ল। তার চোখ দুটি ছলছল করে উঠল, “জানিস নূর, ১৬ জুলাইয়ের ওই ভিডিওটা দেখার পর থেকে আমি রাতে ঘুমাতে পারছি না। অ্যাকাউন্টিংয়ের ব্যালেন্স শিট মেলাতে গেলে বারবার মনে হয়, এই দেশের ন্যায়ের হিসাবটা কে মেলাবে? কীভাবে একজন মানুষ এতটা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারে?

নূর উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক অন্যরকম আগুন। সে সুমনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “সাঈদ একা দাঁড়ায়নি রে সুমন। সে আমাদের সবাইকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। এই যে তুই পেন্সিল দিয়ে এই বীরত্বকে ধরে রাখছিস, এটাও একটা লড়াই। কিন্তু এবার আমাদের শুধু খাতায় নয়, রাজপথে নামতে হবে। তুই জানিস, আগামীকাল আমাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি আছে?

সুমন একটু ইতস্তত করল। সে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। রাজনীতি বা মারামারি থেকে সবসময় দূরে থেকেছে। কিন্তু গত কয়েকদিনের ঘটনা তার ভেতরের চেনা পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। সে নূরকে বলল, “তুই তো ডিবেটে যুক্তি দিয়ে কথা বলিস নূর। কিন্তু রাজপথে যারা বুলেট চালাচ্ছে, তারা কি যুক্তি বোঝে?

নূর হাসল। একটু বিষণ্ণ, কিন্তু দৃঢ় হাসি। সে বলল, যুক্তির যখন অপমৃত্যু ঘটে সুমন, তখন প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করতে হয়। আর কবিরা তো সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম লাইনটা লেখে। চল, আজ হলের দিকে যাই। কাল সকালে অনেক কাজ।

দিনটি ছিল ১৮ জুলাই। ঢাকার আকাশ ভেঙে যেন আগুন ঝরছিল। কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সাধারণ মানুষের মনেও দোলা দিতে শুরু করেছে। তবে এর সাথে বাড়ছিল দমনপীড়ন।

ক্যাম্পাসের মেইন গেটের সামনে হাজারো শিক্ষার্থীর ভিড়। নূর সামনে থেকে স্লোগান দিচ্ছিল, আমার ভাই মরল কেন? প্রশাসন জবাব দাও! তার গমগমে কণ্ঠস্বর লাউডস্পিকার ছাড়াই দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। সুমনের কাঁধে একটা ব্যাগ, যার ভেতর কিছু আর্ট পেপার আর মোটা মার্কার পেন। সে ঠিক করেছে, সে মুখে স্লোগান দিতে না পারলেও তার মার্কার কথা বলবে।

হঠাৎ করেই পরিবেশ পাল্টে গেল। দূর থেকে টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ শোনা গেল। চারদিকে হুড়োহুড়ি, ধোঁয়া আর চোখ জ্বালা করা গ্যাস।

ছুটবি না কেউ! একসাথে থাকো! নূর চিৎকার করে সবাইকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেলমেট পরা কিছু বহিরাগত আর পুলিশ বাহিনী লাঠি ও শটগান নিয়ে ছাত্রদের ওপর চড়াও হলো।
সুমন দেখল, নূরের দিকে একটা কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুটে আসছে। সে চিৎকার করে নূরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সেলটি ঠিক তাদের পায়ের কাছে এসে তীব্র ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার করে দিল। সুমনের চোখ-মুখ জ্বলে উঠল, শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। নূর সুমনের হাত শক্ত করে ধরে একরকম টেনে হিঁচড়ে তাদের চেনা এক গলির ভেতর নিয়ে গেল।

একটি বন্ধ দোকানের সাটারের নিচে বসে দুজনে হাঁপাতে লাগল। সুমনের চোখে জল, কিন্তু সেটা শুধু টিয়ারশেলের কারণে নয়, তীব্র ক্ষোভে। সে তার ব্যাগ থেকে একটা লাল মার্কার বের করল। পাশের দেয়ালটায় তখনো কোনো পোস্টার পড়েনি। সুমন কাঁপতে থাকা হাতে দেয়ালের বুকে বড় বড় অক্ষরে লিখল: বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, এবার তোরা গদি ছাড়!

নূর সুমনের পিঠ চাপড়ে বলল, “বলেছিলাম না সুমন, তোর ভেতরের শিল্পীটা আসলে একজন বিপ্লবী। এই দেয়ালটাই আমাদের ক্যানভাস।”
সেই রাতেই সরকার সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল। পুরো দেশ এক লহমায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বাইরের পৃথিবী থেকে। এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকার গ্রাস করল শহরকে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতরেই মানুষের ক্ষোভের আগুন আরও তীব্র হতে শুরু করল।

পরের কয়েকটা দিন ছিল বিভীষিকাময়। কোনো ফেসবুক নেই, কোনো খবর নেই, শুধু ল্যান্ডফোনের ওপার থেকে আসা পরিচিতদের কান্নার আওয়াজ আর ছাদের ওপর চপারের অবিরাম আনাগোনা। কার্ফিউর কারণে ঘরের বাইরে বের হওয়া দায়।

নূর আর সুমন তখন একই মেসে আটকা পড়েছে। ল্যাপটপের চার্জ যতটুকু ছিল, সুমন সেটা ব্যবহার করে ডিজিটাল পোস্টার ডিজাইন করছিল। ইন্টারনেট নেই তো কী হয়েছে, পেনড্রাইভে করে এগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে যদি কোনোভাবে সুযোগ পাওয়া যায়।

সুমন ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা ডিজিটাল লেআউট তৈরি করছিল। ব্যাকগ্রাউন্ডে গাঢ় লাল আর কালো রঙের মিশেল, আর তার ওপর সাদা অক্ষরে লেখা: রক্তের বদলা রক্ত নয়, আমরা চাই শৃঙ্খল মুক্তি।

নূর খাটে শুয়ে ডায়েরিতে কলম চালাচ্ছিল। সে হঠাৎ বলল, “সুমন, একটা কবিতা শুনবি?”
বল,সুমনের চোখ স্ক্রিনেই রইল।
নূর পড়তে শুরু করল:

শব্দবিহীন এই আঁধারে, আমরা আছি জেগে,
আমাদের এই নীরবতা শোধ হবে মহাবেগে।
যে কলম আজ থমকে আছে ইন্টারনেটের তারে,
সে কলমই ইতিহাস লিখবে স্বৈরশাসকের দ্বারে।

সুমন ডিজাইন করা থামিয়ে নূরের দিকে তাকাল। নূর, তোর ভয় করে না রে? যেভাবে প্রতিদিন মৃত্যুর খবর আসছে… যদি আমাদেরও কিছু হয়ে যায়?

নূর উঠে বসল। তার মুখে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে বলল, ভয় তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি রে সুমন। কিন্তু যখন ভয়টা কেটে যায়, তখন মানুষ অপরাজেয় হয়ে ওঠে। তুই ফাইন্যান্সের ছাত্র, তুই তো জানিস হাই রিস্ক মানে হাই রিটার্ন। আমাদের এই দেশটার জন্য এখন সবচেয়ে বড় রিস্ক নেওয়ার সময় এসেছে। যদি আমরা এখন চুপ করে থাকি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না।
সুমন নূরের কথার গভীরতা অনুধাবন করতে পারল। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল, “আমরা হারব না নূর। এই রক্ত বৃথা যেতে পারে না।”

জুলাই গড়িয়ে আগস্ট এলো। আন্দোলন তখন এক দফা দাবিতে রূপ নিয়েছে স্বৈরশাসকের পদত্যাগ। সারা দেশ তখন একাট্টা। ৪ আগস্ট ঢাকার রাস্তায় যে রক্তগঙ্গা বয়ে গেল, তা দেখে মানুষের ভেতরের শেষ ভয়টুকুও দূর হয়ে গিয়েছিল। ৫ আগস্ট সকাল থেকেই ঢাকার আকাশে মেঘের আনাগোনা।

নূর আর সুমন সকাল সকালই রাজপথে নেমে এসেছিল। আজকের দিনটি অন্যরকম। আজ ‘মার্চ টু ঢাকা’। সারা দেশের মানুষ ঢাকার দিকে আসছে।

শহরের মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড, কাঁটাতার। কিন্তু জনতার ঢলের সামনে সেই কাঁটাতার খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল। নূর ও সুমন শাহবাগের দিকে এগোচ্ছিল। লাখ লাখ মানুষের স্লোগানে চারদিকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত।
সুমন, দেখ! নূর সামনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাল।

সুমন দেখল, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রিকশাচালক, গৃহিণী, বৃদ্ধ, শিশু সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত মুক্তির আনন্দ। তারা ছাত্রদের পানি খাওয়াচ্ছে, শুকনো খাবার তুলে দিচ্ছে। এই দৃশ্য সুমনকে স্তব্ধ করে দিল। যে সমাজকে সে স্বার্থপর ভাবত, সেই সমাজ আজ এক সুতোয় গাঁথা।

ঠিক দুপুর দুইটার দিকে খবরটা এলো। চারদিকে জনশ্রুতি ছড়াতে লাগল। একটু পরেই নিশ্চিত হওয়া গেল স্বৈরশাসক পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

এক মুহূর্তের জন্য পুরো শাহবাগ স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর… এক অভূতপূর্ব উল্লাস! মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। নূর সুমনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ফেলল। আমরা পেরেছি সুমন! আমরা পেরেছি!
সুমন নূরের পিঠে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ কেটে তখন এক ফালি কড়া রোদ এসে পড়েছে রাজপথে। সুমনের মনে হলো, এই রোদটা কতদিন পর এত উজ্জ্বল লাগছে।

গণঅভ্যুত্থানের কয়েকদিন কেটে গেছে। দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ঢাকা শহরের প্রতিটি নোংরা, ট্রাফিক জ্যাম আর দেয়ালগুলো পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিয়েছে তারা।
সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সামনের সেই বড় দেয়ালটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুমন আর নূর। সুমনের হাতে এবার মার্কার নয়, বড় ব্রাশ আর হরেক রঙের বালতি।

নূর বলল, কী আঁকবি এখানে?
সুমন হাসল। তুই যে কবিতাটা লিখেছিলি ওটার চারটে লাইন বল তো, আমি সেটাকে চিত্রে রূপ দেব।

নূর বুক ফুলিয়ে আবৃত্তি করল:
তরুণদের এই রক্তে লেখা বীরত্বের আখ্যান,
ইতিহাসের পাতায় রবে অমর, অক্ষয়, মহান।
নতুন ভোরের আলোয় এবার গড়ব সোনার দেশ,
বৈষম্যহীন সাম্যের চাদরে কাটবে দুঃখের রেশ।

সুমন ব্রাশে লাল আর সবুজ রং মেলাল। তারপর দেয়ালের ওপর আঁকতে শুরু করল এক নতুন বাংলাদেশের মানচিত্র, যেখান থেকে শেকল ছিঁড়ে একঝাঁক পায়রা উড়ে যাচ্ছে মুক্ত আকাশে। আর সেই মানচিত্রের নিচে নূরের অক্ষরের মতোই সুনিপুণভাবে লিখে দিল,

নূর সুমনের কাঁধে হাত রেখে বলল, আমাদের লড়াইটা কেবল শুরু হলো সুমন। এই দেয়াল যেমন সুন্দর করলাম, দেশটাকেও তেমনি সুন্দর করে গড়তে হবে। তুই তোর তুলি দিয়ে, আর আমি আমার শব্দ দিয়ে।

সুমন দেয়ালে শেষ টান দিয়ে বলল, হ্যাঁ নূর, এই ক্যানভাস আর কখনো মলিন হতে দেওয়া যাবে না।

বিকেলের সূর্যটা তখন তাদের দুজনের অবয়বকে দেয়ালে আঁকা সেই মুক্ত পায়রাগুলোর ডানার সাথে মিলিয়ে একাকার করে দিচ্ছিল। এক নতুন ভোরের সূর্য, যা তারা দুজনে মিলে ছিনিয়ে এনেছে।

Leave a Comment