Mir Mosharraf Hossain

বাঙালি মুসলিম আধুনিক গদ্যের অগ্রদূত: উনিশ শতকে যখন মুসলিম সমাজে বাংলা ভাষার চেয়ে আরবি-ফারসি বা উর্দুর চর্চা বেশি ছিল, তখন তিনি প্রথম আধুনিক ধারার মানসম্মত বাংলা গদ্য রচনা করে মুসলিম লেখকদের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।

কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘বিষাদ-সিন্ধু’: কারবালার মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে রচিত তাঁর তিন খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস বিষাদ-সিন্ধু (১৮৮৫–১৮৯১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধ্রুপদী সৃষ্টি।

মুসলিম রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর রচিত ‘রত্নাবতী’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো মুসলিম লেখকের লেখা প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।

প্রথম মুসলিম নাট্যকার: ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত ‘বসন্তকুমারী’ রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে প্রথম মুসলিম নাট্যকারের মর্যাদা অর্জন করেন।

নীলকরদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ: ১৮৭৩ সালে তিনি রচনা করেন ব্যঙ্গাত্মক নাটক ‘জমিদার দর্পণ’। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ-এর মতোই এটি তৎকালীন নীলকর ও শোষক জমিদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক ঐতিহাসিক দলিল।

হরিনাথ মজুমদারের (কাঙাল হরিনাথ) শিষ্যত্ব: সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হয়েছিল প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক কাঙাল হরিনাথের অধীনে। তিনি হরিনাথের গ্রামবার্তা প্রকাশিকা এবং ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর-এ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন।

সম্পাদনা ও নিজস্ব সাময়িকী: গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমাজচিন্তাকে তুলে ধরতে তিনি নিজেই ‘আজিজননেহার’ (১৮৭৪) এবং ‘হিতকরী’ (১৮৯০) নামক দুটি বিখ্যাত পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ‘গোকোহিনূর’ বিতর্ক: হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে তিনি ‘গোকোহিনূর’ (১৮৮৮) প্রবন্ধটি লেখেন, যেখানে তিনি গরু কোরবানি না করে হিন্দু প্রতিবেশীদের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। তৎকালীন গোঁড়া রক্ষণশীলদের রোষানলে পড়ে তিনি এই নিয়ে মামলার মুখোমুখিও হয়েছিলেন।

ব্যতিক্রমী আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য: তাঁর রচিত ‘আমার জীবনী’ (১৯০৮-১৯১০) এবং স্ত্রী কুলসুম বিবির স্মৃতিতে লেখা ‘বিবি কুলসুম’ সমকালীন সমাজবাস্তবতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল।

বহুমুখী সাহিত্যপ্রতিভা: উপন্যাস ও নাটকের বাইরেও তিনি কবিতা, সঙ্গীত, ইতিহাস ও প্রহসন মিলিয়ে প্রায় ৩৫টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন; যেমন—উদাসীন পথিকের মনের কথা, গাজী মিঞার বস্তানী এবং সঙ্গীত লহরী

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মীর মোয়াজ্জেম হোসেন এবং মাতার নাম দৌলতন নেছা। শৈশবে গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার পর তিনি কুষ্টিয়া এবং কলকাতার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রথাগত শিক্ষা লাভ করেন।

কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা তিনি জীবিকার প্রয়োজনে ফরিদপুরের নবাব এস্টেট এবং দেলদুয়ারের জমিদারিতে ম্যানেজারি ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই কাঙাল হরিনাথের সংস্পর্শে এসে তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয়। তিনি হরিনাথ মজুমদারের গ্রামবার্তা প্রকাশিকা এবং ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর-এ নিয়মিত সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই আজিজননেহার (১৮৭৪) ও হিতকরী (১৮৯০) সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন।

সাহিত্যিক অবদান তিনি উনিশ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজে আধুনিক বাংলা গদ্যচর্চার ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম কেবল মুসলিম ঐতিহ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমকালীন সমাজবাস্তবতা ও শোষণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিল।

  • উপন্যাস: রত্নাবতী (১৮৬৯ — মুসলিম রচিত প্রথম বাংলা উপন্যাস), বিষাদ-সিন্ধু (১৮৮৫–১৮৯১ — তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কালজয়ী মহাকাব্যিক রচনা)।
  • নাটক ও প্রহসন: বসন্তকুমারী (১৮৭৩ — মুসলিম রচিত প্রথম নাটক), জমিদার দর্পণ (১৮৭৩ — নীলচাষ ও জমিদারদের অত্যাচারের বাস্তব চিত্র), এর উপায় কি
  • আত্মজীবনী ও ইতিহাস: আমার জীবনী, বিবি কুলসুম, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গাজী মিঞার বস্তানী

সমাজচেতনা ও শেষ জীবন তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পক্ষে আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। জীবনের শেষভাগ তিনি রাজবাড়ীর পদমদীতে অতিবাহিত করেন এবং ১৯১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...