সাহিত্যের ক্লাসঘর

Memory
স্মৃতি
Oliver Goldsmith

হে স্মৃতি, তুমি প্রতারক প্রিয়জন,
তুমি সবসময় অনুরোধ জানাও, অহংকারী।
পুরনো আনন্দগুলোকে বারবার ফিরিয়ে আনো,
আর অতীতকে ব্যথায় পরিণত করো।

তুমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন আসো,
হারানো মুখগুলোকে আমার সামনে তুলে ধরো।
যারা চলে গেছে, যারা আর ফিরবে না,
তাদের হাসি, তাদের কথা — সব ফিরিয়ে আনো।

তুমি আমাকে দেখাও সেই দিনগুলো,
যখন সবকিছু ছিল সবুজ আর সুন্দর।
তুমি দেখাও সেই মানুষগুলোকে,
যারা একসময় আমার জীবনের অংশ ছিল।

কিন্তু সেই সঙ্গে তুমি দেখাও
তাদের চলে যাওয়ার বেদনাও।
যে আনন্দ একদিন ছিল,
আজ তা শুধু দুঃখ হয়ে ফিরে আসে।

হে স্মৃতি, তুমি কেন এত নিষ্ঠুর?
কেন তুমি শুধু সুন্দর দিনগুলোই ফেরাও না?
কেন তুমি সঙ্গে নিয়ে আসো সেই শূন্যতা,
যা কখনো পূর্ণ হবে না?

তবু আমি জানি — তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না।
তুমি ছাড়া অতীত মরে যাবে,
তুমি ছাড়া যারা চলে গেছে, তারা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তাই আমি তোমাকে সহ্য করি — যদিও তুমি ব্যথা দাও।

The Haunch of Venison
হরিণের উরু মাংস
Oliver Goldsmith

একদিন এক বন্ধু আমাকে পাঠাল
হরিণের এক টুকরো উরু মাংস।
সুন্দর, মোটা, রসালো — দেখেই মনে হলো
একটি ভালো খাবারের আমন্ত্রণ।

আমি ভাবলাম, এত বড় মাংস একা খাব কী করে?
তাই ডেকে পাঠালাম কয়েকজন বন্ধুকে।
তারা এলো হাসিমুখে, খুশি হয়ে,
আর বলল — “কী সুন্দর উপহার!”

মাংস রান্না হলো, টেবিল সাজানো হলো,
সবাই বসল গল্প করতে করতে।
প্রথমে কেটে দেওয়া হলো ছোট ছোট টুকরো,
তারপর আরও কাটা হলো, আরও কাটা হলো।

একজন বলল — “একটু আর দাও তো”,
আরেকজন বলল — “এই অংশটা আমার পছন্দ”।
তৃতীয়জন বলল — “এত ভালো মাংস আর পাবে না”,
চতুর্থজন শুধু চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিল।

মাংস কমতে লাগল, প্লেট খালি হতে লাগল,
আর আমার মনে হতে লাগল —
এই উপহারটা কি সত্যিই আমার জন্য ছিল,
নাকি এটা ছিল সবার জন্য?

শেষ পর্যন্ত যখন শুধু হাড় আর থুড়ো রইল,
তখন সবাই তৃপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
কেউ বলল — “আজকের খাবার সত্যিই অসাধারণ ছিল”,
আরেকজন বলল — “তোমার বন্ধু খুব ভালো মানুষ”।

আমি হাসলাম, কিন্তু মনে মনে ভাবলাম —
উপহার দেওয়া সহজ, কিন্তু সেটা রাখা কঠিন।
বন্ধুরা যখন আসে, তখন মাংস কমে যায়,
আর যখন তারা চলে যায়, তখন শুধু স্মৃতি থেকে যায়।

Song from She Stoops to Conquer
(Tony Lumpkin-এর গান)
Oliver Goldsmith

টনি লাম্পকিনের গান

শিক্ষকরা মাথা ঘামাক ব্যাকরণ নিয়ে,
অর্থহীন নিয়ম আর পড়াশোনা নিয়ে।
আমি দৃঢ়ভাবে বলছি — ভালো মদ
মানুষের বুদ্ধিকে করে আরও তীক্ষ্ণ।

বইয়ের পাতায় যত জ্ঞান থাকুক না কেন,
তা কি মদের গ্লাসের মতো আনন্দ দেয়?
যখন বন্ধুরা মিলে বসে গান গায়,
তখন বইয়ের চেয়ে মদ অনেক বেশি দেয়।

শিক্ষকরা বলুক যত কথা,
আমি বলি — এক গ্লাস ভালো অ্যালে
মানুষকে শেখায় জীবনের আসল স্বাদ,
যা কোনো বই কখনো শেখাতে পারে না।

তাই আসো, বন্ধুরা, গ্লাস তুলে নাও,
ভুলে যাও সব দুঃখ-কষ্ট আর চিন্তা।
জীবন ছোট, তাই যতদিন আছে,
চলো মদ খাই, গান গাই, আর আনন্দ করি!

Retaliation
প্রতিশোধ
(মরণোত্তর প্রকাশিত, বন্ধুদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক)
Oliver Goldsmith

এই কবিতাটি Goldsmith-এর জীবনের শেষ দিকে লেখা। এক রাতের ভোজসভায় তাঁর বন্ধুরা (বিশেষ করে David Garrick) তাঁকে নিয়ে কিছু তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলেন। Goldsmith সেই মন্তব্যের জবাবে এই ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লেখেন, যেখানে তিনি নিজের বন্ধুদের (Samuel Johnson, David Garrick, Joshua Reynolds, Edmund Burke প্রমুখ) মজার ও তীক্ষ্ণ চরিত্রচিত্রণ করেছেন। কবিতাটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।

যখন আমি মারা যাব, তখন আমার বন্ধুরা যা বলবে,
তার আগেই আমি তাদের সম্পর্কে কিছু বলে যাই।
যারা আমাকে নিয়ে মজা করেছে, তাদের জন্য
আমিও একটু মজা করে যাই — মৃত্যুর আগেই।

Samuel Johnson-এর জন্য:

এখানে শুয়ে আছে ডক্টর জনসন,
যিনি নৈতিকতা নিয়ে অনেক কথা বলতেন।
তাঁর মাথায় ছিল বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার,
কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল কখনো কখনো কঠিন।
তিনি সবাইকে শাসন করতেন, কিন্তু নিজেকে কম।
তাঁর কথা ছিল ভারী, তাঁর হাসি ছিল বিরল।
তবু তিনি ছিলেন সত্যিকারের মহৎ —
যদিও তাঁর মহত্ত্ব ছিল কাঁটার মতো।

David Garrick-এর জন্য:

এখানে শুয়ে আছে ডেভিড গ্যারিক,
যিনি মঞ্চে ছিলেন রাজা, কিন্তু বাইরে ছিলেন শিশু।
তিনি সবাইকে হাসাতে পারতেন, কিন্তু নিজে কম হাসতেন।
তাঁর জীবন ছিল অভিনয়ের খেলা —
এক মুহূর্তে রাজা, পরের মুহূর্তে ভিখারি।
তিনি সবার প্রশংসা চাইতেন, কিন্তু কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না।
তাঁর প্রতিভা ছিল অসাধারণ, কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল ছোট।

Joshua Reynolds-এর জন্য:

এখানে শুয়ে আছে স্যার জোশুয়া রেনল্ডস,
যিনি রং দিয়ে মানুষের চেহারা আঁকতেন।
তিনি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন,
কিন্তু কারও সঙ্গে খুব গভীর হতেন না।
তাঁর চিত্রকলা ছিল সুন্দর, তাঁর জীবন ছিল সুন্দর,
কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল একটু দূরে — যেন ছবির মতো।

Edmund Burke-এর জন্য:

এখানে শুয়ে আছে এডমন্ড বার্ক,
যিনি কথা বলতেন আগুনের মতো।
তাঁর বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ, তাঁর বাক্য ছিল ঝড়ের মতো।
তিনি সবকিছু নিয়ে তর্ক করতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত
তিনি নিজের কথাতেই বিশ্বাস করতেন।
তাঁর প্রতিভা ছিল বিশাল, কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল অস্থির।

The Gift
উপহার
Oliver Goldsmith

বলো তো, নিষ্ঠুর আইরিস, সুন্দরী দুষ্টু মেয়ে,
প্রিয় অর্থপিপাসু সুন্দরী,
প্রতি বছর আমি তোমাকে কী উপহার দেব,
যা আমার কর্তব্য প্রকাশ করবে?

দেব — তবে পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপ নয়,
কিংবা ফ্যাশনের গোলাপ-কুঁড়িও নয়।
এমন ক্ষণস্থায়ী উপহার শুধু দেখায়
একটা অস্থায়ী আবেগ।

তোমাকে দেব এমন কিছু, যা এখনো দেওয়া হয়নি,
যা কম আন্তরিক নয়, বরং আরও ভদ্র।
তোমাকে দেব — হায়! অতি মোহনীয়া,
তোমাকে দেব — শয়তানকে!

An Elegy on the Glory of Her Sex, Mrs. Mary Blaize
মিসেস মেরি ব্লেজ-এর গৌরবে এলিজি
Oliver Goldsmith

সবাই মিলে শোক প্রকাশ করো,
ম্যাডাম ব্লেজের জন্য দুঃখ করো।
যিনি কখনো একটি ভালো কথাও পাননি —
তাঁর প্রশংসাকারীদের কাছ থেকে।

গরিব মানুষ কখনো তাঁর দরজা পেরিয়ে যেত না,
আর সবসময় পেত তাঁর দয়া।
তিনি সব গরিবকে উদারভাবে ধার দিতেন —
যারা একটি বন্ধক রেখে যেত।

তিনি পাড়াপ্রতিবেশীদের খুশি করার চেষ্টা করতেন,
তাঁর আচার-ব্যবহার ছিল অদ্ভুত মোহনীয়।
আর তিনি কখনো দুষ্ট পথে চলতেন না —
শুধু যখন তিনি পাপ করতেন।

গির্জায় তিনি নতুন রেশম আর সাটিন পরে যেতেন,
তাঁর কোমরের হুপ ছিল বিশাল আকারের।
তিনি কখনো নিজের বেঞ্চিতে ঘুমাতেন না —
শুধু যখন তিনি চোখ বন্ধ করতেন।

তাঁর প্রেমের জন্য লাইন পড়ত, আমি বলছি,
কুড়িজনের বেশি যুবক।
রাজা নিজেও তাঁর পিছনে হাঁটতেন —
যখন তিনি সামনে হাঁটতেন।

কিন্তু এখন তাঁর সম্পদ আর জাঁকজমক সব চলে গেছে,
তাঁর আশ্রিতরা সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
ডাক্তাররা যখন তাঁকে মৃত অবস্থায় পেলেন —
তাঁর শেষ রোগটাই ছিল প্রাণঘাতী।

আসুন আমরা গভীর দুঃখে শোক করি,
কারণ কেন্ট স্ট্রিট বলতে পারে —
যদি তিনি আরও এক বছর বেঁচে থাকতেন,
তাহলে আজ তিনি মারা যেতেন না।

An Elegy on the Death of a Mad Dog
একটি পাগলা কুকুরের মৃত্যুতে এলিজি
(হাস্যরসাত্মক)
Oliver Goldsmith

ভালো মানুষ সবাই, যে কোনো শ্রেণির হও,
আমার এই গানে একটু কান দাও।
যদি দেখো গানটি খুবই ছোট হয়ে গেছে,
তাহলে তোমাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখবে না।

ইজলিংটন শহরে ছিল একজন মানুষ,
যার কথা সবাই বলত —
সে যখনই প্রার্থনায় যেত,
তখনই সে এক ধার্মিক পথে চলত।

তার ছিল নরম, দয়ালু হৃদয়,
বন্ধু আর শত্রু — সবাইকে সে সান্ত্বনা দিত।
প্রতিদিন সে নগ্নদের বস্ত্র পরিয়ে দিত,
যখন সে নিজের পোশাক পরত।

আর সেই শহরেই একটি কুকুর ছিল,
যেমন সব শহরেই থাকে —
মিশ্রজাতির, কুকুরছানা, শিকারি কুকুর,
আর নিম্ন শ্রেণির কুকুরও ছিল।

প্রথমে এই কুকুর আর মানুষ বন্ধু ছিল।
কিন্তু যখন একটা ঝগড়া শুরু হলো,
কুকুরটা নিজের স্বার্থের জন্য
পাগল হয়ে গেল আর মানুষটাকে কামড়ালো।

চারপাশের সব রাস্তা থেকে
আশ্চর্য হয়ে প্রতিবেশীরা ছুটে এল।
তারা শপথ করে বলল — কুকুরটা পাগল হয়ে গেছে,
এত ভালো মানুষকে কামড়াতে!

ক্ষতটা দেখতে লাগছিল ভয়ংকর আর দুঃখজনক,
প্রত্যেক খ্রিস্টানের চোখে।
আর তারা যখন বলছিল কুকুরটা পাগল,
তখন বলছিল — মানুষটা বাঁচবে না।

কিন্তু শীঘ্রই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল,
যা দেখিয়ে দিল সবাই মিথ্যা বলছিল।
মানুষটা কামড় থেকে সেরে উঠল,
আর মরে গেল সেই কুকুরটাই!

The Traveller
পর্যটক
Oliver Goldsmith (১৭২৮–১৭৭৪)

দূর দেশে ঘুরে বেড়াই আমি, পথের পথিক হয়ে,
দেখি নানা দেশ, নানা মানুষ, নানা রীতি-নীতি।
কখনো ফ্রান্সের সমতলে, কখনো ইতালির পাহাড়ে,
কখনো সুইজারল্যান্ডের বরফে, কখনো হল্যান্ডের সমুদ্রতীরে।

প্রতিটি দেশে মানুষ খুঁজে সুখ — নিজের মতো করে।
কেউ বলে সুখ ধনে, কেউ বলে সুখ ক্ষমতায়,
কেউ বলে সুখ স্বাধীনতায়, কেউ বলে সুখ সরল জীবনে।
আমি দেখি — সব দেশেই মানুষ এক, শুধু পথ ভিন্ন।

ফ্রান্সে দেখি বিলাস আর রাজকীয় জাঁকজমক,
মানুষ হাসে, নাচে, গান করে — কিন্তু অন্তরে শূন্যতা।
সেখানে ধনী আরও ধনী হয়, গরিব আরও গরিব,
আর সুখ যেন পালিয়ে যায় সেই জাঁকজমকের আড়ালে।

ইতালিতে দেখি প্রাচীন গৌরবের ধ্বংসাবশেষ,
সুন্দর শিল্প, সুন্দর প্রকৃতি — কিন্তু মানুষ দাস।
যারা একদিন বিশ্ব শাসন করত, আজ তারা পরাধীন,
তাদের সুখ যেন অতীতের স্মৃতিতে আটকে আছে।

সুইজারল্যান্ডে দেখি সরলতা আর স্বাধীনতার জয়,
গরিব মানুষও মাথা উঁচু করে চলে, কারও দাস নয়।
পাহাড়ের কঠিন জীবন তাদের শক্ত করেছে,
তাদের সুখ ছোট, কিন্তু সত্যি — হৃদয় থেকে উৎসারিত।

হল্যান্ডে দেখি বাণিজ্য আর পরিশ্রমের ফসল,
মানুষ কাজ করে, সঞ্চয় করে, নিরাপদ জীবন গড়ে।
কিন্তু সেখানেও সুখ যেন হিসাবের খাতায় বাঁধা,
স্বাধীনতা আছে, কিন্তু আনন্দ কম — যেন যান্ত্রিক।

আর আমার নিজের দেশ — ইংল্যান্ড…
সেখানে আছে স্বাধীনতা, আছে আইন, আছে বাকস্বাধীনতা।
কিন্তু সেখানেও মানুষ অস্থির, অসন্তুষ্ট, দুঃখী।
কেন? কারণ সুখ বাইরে নয় — সুখ মানুষের ভেতরে।

আমি দেখেছি — যে দেশে মানুষ নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট,
সেখানেই সুখ বেশি। যে দেশে মানুষ শুধু চায় আর চায়,
সেখানে সুখ পালিয়ে যায়। ধন, ক্ষমতা, বিলাস — সবই মায়া।

আমি একা পথ চলি। কোনো দেশই আমার নয় পুরোপুরি।
আমার হৃদয় ছড়িয়ে আছে সব দেশে, সব মানুষের মাঝে।
আর শেষে বুঝতে পারি — সত্যিকারের সুখ খুব সাধারণ।
একটু শান্তি, একটু ভালোবাসা, একটু সন্তুষ্টি — এটাই যথেষ্ট।

ওহে পথিক! তুমি যেখানেই যাও, যা-ই দেখো,
মনে রেখো — মানুষ সব জায়গায় এক।
তার দুঃখ এক, তার আশা এক, তার সুখের সন্ধান এক।
শুধু পথ ভিন্ন, গন্তব্য এক — সেই গন্তব্য হলো শান্তি।

The Deserted Village
পরিত্যক্ত গ্রাম
Oliver Goldsmith (১৭২৮–১৭৭৪)

মধুর অবার্ন, সমতলের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম,
যেখানে স্বাস্থ্য আর প্রাচুর্য ছড়িয়ে পড়ত শ্রমিকের মাঝে,
যেখানে হাস্যোজ্জ্বল বসন্ত প্রথম আসত আলিঙ্গন করে,
আর বিদায়ী গ্রীষ্ম তার শেষ ফুলগুলো দেরিতে ঝরাত।

সেখানে গ্রামের মানুষের হাসি ছিল স্বাভাবিক,
শিশুরা খেলত মাঠে, বৃদ্ধরা বসত গাছতলায়।
সেখানে দারিদ্র্যও ছিল, কিন্তু ছিল না অপমান,
প্রত্যেকের ঘরে ছিল শান্তি, প্রত্যেকের হৃদয়ে ছিল আশা।

কিন্তু আজ সেই গ্রাম নেই। নেই সেই হাসি, নেই সেই শান্তি।
ধনীরা এসেছে, গ্রামকে বাগান বানিয়েছে নিজের বিলাসের জন্য।
কৃষককে তাড়িয়ে দিয়েছে, তার জমি কেড়ে নিয়েছে,
আর সেই জমিতে এখন শুধু ফুল আর ঝর্ণা — মানুষ নেই।

আমি সেই গ্রাম চিনতাম। ছোটবেলায় এসেছি এখানে।
দেখেছি সেই বৃদ্ধ শিক্ষককে, যিনি গ্রামের সব শিশুকে পড়াতেন।
তাঁর কড়া চোখ আর নরম হৃদয় — দুটোই ছিল সবার চেনা।
শিশুরা তাঁকে ভয় করত, কিন্তু ভালোবাসতও।

দেখেছি সেই গ্রামের পাদ্রিকে — সরল, দয়ালু, নিঃস্বার্থ।
তিনি গরিবদের পাশে দাঁড়াতেন, ধনীদেরও শাসন করতেন।
তাঁর বাড়িতে সবসময় খাবার আর আশ্রয় ছিল অভাবীর জন্য।
আজ সেই পাদ্রিও নেই, সেই বাড়িও নেই — সব শূন্য।

আজ গ্রামের রাস্তায় শুধু নীরবতা।
কোনো শিশুর হাসি নেই, কোনো মায়ের গান নেই।
শুধু কয়েকটা পুরনো ঘর দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা অবস্থায়,
যেন অতীতের ছায়া এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ধনীরা বলে — এটাই উন্নতি।
গ্রাম উজাড় করে বাগান বানানো, কৃষককে শহরে তাড়ানো — এটাই অগ্রগতি।
কিন্তু আমি জানি, এই “উন্নতি” মানুষকে ধ্বংস করছে।
গ্রাম ছাড়া দেশ বাঁচে না, কৃষক ছাড়া জাতি বাঁচে না।

যারা এখন শহরে গিয়ে দরিদ্র হয়েছে,
তারা সেই পুরনো গ্রামের কথা মনে করে কাঁদে।
সেখানে ছিল তাদের শৈশব, ছিল তাদের স্বপ্ন,
ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের কবর — আজ সব হারিয়ে গেছে।

আমিও একদিন এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছি।
দূর দেশে ঘুরেছি, অনেক কিছু দেখেছি।
কিন্তু সেই সুখ আর কোথাও পাইনি,
যা একসময় এই অবার্ন গ্রামে পেয়েছিলাম।

এখন আমি ফিরে এসেছি।
কিন্তু যা খুঁজছিলাম, তা আর নেই।
শুধু ধ্বংসস্তূপ, শুধু নীরবতা, শুধু স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতি আমাকে কাঁদায় — আজও কাঁদায়।

ওহে অবার্ন! তুমি ছিলে আমার শৈশবের স্বর্গ।
তোমার মাঠ, তোমার নদী, তোমার গাছ — সব ছিল প্রিয়।
আজ তুমি পরিত্যক্ত। তোমার মানুষ চলে গেছে।
শুধু আমি এসেছি — তোমার শেষ স্মৃতি হয়ে।

অলিভার গোল্ডস্মিথ (Oliver Goldsmith, ১৭২৮–১৭৭৪)

আইরিশ বংশোদ্ভূত ইংরেজ সাহিত্যিক, কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারের বিস্তারিত জীবনকথা

অলিভার গোল্ডস্মিথ ছিলেন আঠারো শতকের ইংরেজ সাহিত্যের অন্যতম প্রিয় ও বহুমুখী লেখক। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও ইতিহাসবিদ — সবকিছুই ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনাগুলো হলো “The Vicar of Wakefield” (উপন্যাস), “She Stoops to Conquer” (নাটক) এবং “The Deserted Village” (কবিতা)।

তিনি ছিলেন Samuel Johnson-এর সাহিত্যিক গোষ্ঠীর (The Club) একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর লেখায় সরলতা, হাস্যরস, মানবিক দুর্বলতা ও সামাজিক সমালোচনার সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়। জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার, অপব্যয়ী এবং আর্থিকভাবে সবসময় সংকটে। মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিভা আরও বেশি স্বীকৃত হয়।

শৈশব ও পারিবারিক জীবন (১৭২৮–১৭৪৫)

অলিভার গোল্ডস্মিথ জন্মগ্রহণ করেন ১৭২৮ সালের ১০ নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি লংফোর্ডের প্যালাস (Pallas) গ্রামে। তাঁর বাবা চার্লস গোল্ডস্মিথ ছিলেন একজন প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক (Church of Ireland)। পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত, কিন্তু সংখ্যায় বড় — অলিভার ছিলেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।

শৈশবে তিনি ছিলেন কুৎসিত, খাটো এবং বোকা বলে পরিচিত। তাঁর মুখে বসন্তের দাগ ছিল এবং তিনি খুব কম কথা বলতেন। পরিবারে তাঁকে “নির্বোধ” বলে উপহাস করা হতো। কিন্তু তাঁর মধ্যে এক ধরনের সরলতা ও সংবেদনশীলতা ছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।

বাবার মৃত্যুর পর পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এই দারিদ্র্য ও অবহেলা গোল্ডস্মিথের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা তাঁর লেখায় গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতি হিসেবে দেখা যায়।

শিক্ষা ও প্রাথমিক সংগ্রাম (১৭৪৫–১৭৫৬)

১৭৪৫ সালে গোল্ডস্মিথ ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে (Trinity College, Dublin) ভর্তি হন। সেখানে তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। ১৭৪৯ সালে তিনি ব্যাচেলর অফ আর্টস (BA) ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজ জীবনে তিনি প্রায়ই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তেন।

পরবর্তীকালে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে এডিনবার্গ (Edinburgh) এবং পরে লিডেন (Leiden) যান। কিন্তু কোনো জায়গাতেই তিনি সফলভাবে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। তিনি ইউরোপে ঘুরে বেড়ান এবং অনেক কষ্ট ভোগ করেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে।

১৭৫৬ সালে তিনি লন্ডনে আসেন। সেখানে তিনি প্রথমে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন, কিন্তু সফল হননি। রোগীরা তাঁর কুৎসিত চেহারা দেখে আস্থা রাখত না। ফলে তিনি লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হন।

সাহিত্যিক জীবনের সূচনা ও সংগ্রাম (১৭৫৭–১৭৬৪)

লন্ডনে গোল্ডস্মিথ প্রথমে বইয়ের দোকানদারদের জন্য “হ্যাক রাইটার” (ভাড়াটে লেখক) হিসেবে কাজ করেন। তিনি অনুবাদ, সংকলন ও বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতেন। এই সময় তিনি প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে ছিলেন।

১৭৬২ সালে তাঁর “The Citizen of the World” প্রকাশিত হয়। এটি চীনা দার্শনিকের চোখ দিয়ে ইংরেজ সমাজের ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। এই বইটি তাঁকে কিছুটা পরিচিতি এনে দেয়।

১৭৬৪ সালে তিনি “The Traveller” নামে একটি দীর্ঘ দার্শনিক কবিতা প্রকাশ করেন। এটি তাঁর প্রথম বড় সাহিত্যিক সাফল্য। কবিতাটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে সমাজ ও সুখের তুলনামূলক আলোচনা করে।

সাফল্যের শীর্ষে (১৭৬৬–১৭৭৩)

১৭৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস “The Vicar of Wakefield”। এটি একটি সরল, আবেগপূর্ণ ও হাস্যরসাত্মক উপন্যাস, যেখানে এক গ্রাম্য যাজকের পরিবারের সুখ-দুঃখের কাহিনি বলা হয়েছে। বইটি প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয় এবং আজও পঠিত হয়।

১৭৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা “The Deserted Village”। এতে তিনি গ্রামীণ জীবনের ধ্বংস, ধনীদের বিলাসিতা ও কৃষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। কবিতাটি সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

১৭৭৩ সালে মঞ্চস্থ হয় তাঁর সবচেয়ে সফল নাটক “She Stoops to Conquer”। এটি একটি হাস্যরসাত্মক নাটক, যেখানে ভুল বোঝাবুঝি ও প্রেমের জটিলতা দেখানো হয়েছে। নাটকটি আজও মঞ্চে অভিনীত হয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও স্বভাব

গোল্ডস্মিথ ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দয়ালু। তিনি যা পেতেন, তা প্রায়ই গরিবদের দিয়ে দিতেন। অর্থের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অপব্যয়ী ও অদূরদর্শী। ফলে সবসময় ঋণে জর্জরিত থাকতেন।

তিনি Samuel Johnson, David Garrick, Joshua Reynolds, Edmund Burke প্রমukh-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। Johnson তাঁকে খুব ভালোবাসতেন এবং বলতেন, “Goldsmith was a man of genius.” তবে গোল্ডস্মিথের অদ্ভুত আচরণ ও কথাবার্তার জন্য অনেকে তাঁকে নিয়ে মজা করতেন।

তিনি কখনো বিয়ে করেননি। তাঁর জীবন ছিল একাকী ও সংগ্রামী, যদিও বন্ধুদের ভালোবাসা তিনি পেয়েছিলেন।

শেষ জীবন ও মৃত্যু (১৭৭৪)

১৭৭৪ সালের ৪ এপ্রিল লন্ডনে গোল্ডস্মিথ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪৫ বছর। মৃত্যুর কারণ সম্ভবত কিডনির রোগ বা সংশ্লিষ্ট জটিলতা।

মৃত্যুর সময় তিনি প্রচণ্ড ঋণে ছিলেন। তাঁর বন্ধুরা (বিশেষ করে Johnson) তাঁর শেষকৃত্যের খরচ বহন করেন। তাঁকে টেম্পল চার্চইয়ার্ডে সমাহিত করা হয়।

উত্তরাধিকার

জীবদ্দশায় গোল্ডস্মিথ সাফল্য পেলেও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য পাননি। মৃত্যুর পর তাঁর রচনাগুলো আরও বেশি জনপ্রিয় হয়। তিনি আজও ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রিয় লেখক হিসেবে বিবেচিত হন।

তাঁর লেখায় সরলতা, হাস্যরস ও মানবিকতা এমনভাবে মিশেছে যে, পাঠক সহজেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। “The Deserted Village” আজও গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। “She Stoops to Conquer” আজও মঞ্চে জীবন্ত।

অলিভার গোল্ডস্মিথ ছিলেন একজন সরল হৃদয়ের, উদার ও প্রতিভাবান লেখক, যিনি জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু তাঁর লেখায় মানুষকে হাসিয়েছেন ও ভাবিয়েছেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, প্রতিভা সবসময় আর্থিক সাফল্য আনে না, কিন্তু চিরকালের জন্য বেঁচে থাকে।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...