কবি রবি বাঙালি’র একগুচ্ছ প্রেম- বিরহের কবিতা
অভিমানী কষ্ট
রবি বাঙালি
মেঘের পিঠে মেঘ জমেছে, আকাশ করে ভারী,
বুকের ভেতর অভিমানে বানায় বসত বাড়ি।
বৃষ্টি হয়ে ঝরবে না সে,ধূসর কুয়াশাতে—
অন্ধকারে রাখছে ঘিরে আমায় দিনেরাতে।
একটি দীর্ঘশ্বাস যে আমার ভাঙছে পাঁজরের হাড়,
শতাব্দীর এই বাষ্প যেন নামায় অন্ধকার
নীরবতা নয়কো এটা,প্রলয় আসার আগে—
থমথমে এই মেঘের রূপ যে অন্তরেতে জাগে।
প্রলয় তবু আসে না কো,ভাঙছে ভেতরের মন,
নীরবে এই অস্তিত্ব যে ক্ষইছে সারাক্ষণ।
নদী যেমন বাধা পেয়েও থামায় না তার পথ,
কষ্ট আমার বইছে তেমন, ভাঙছে মনোরথ।
মোহনা তার নেইকো জানা,মিলবে না সা|গরে,
নিজের খাদের গভীর তলে হারিয়ে শুধু মরে।
পাথরে তার আঘাত লাগে,কান্না শোনে না কেউ,
সবাই দেখে বয়ে চলা,ভাঙন জাগায় যে ঢেউ।
তীরের ভাঙন বড় একাকী, নিভৃত সেই ধ্বনি,
জীবনের শেষ বিকেলে আজ চলেছি ধাপ গুনি।
স্মৃতির আঘাতে নরম মাটি হারায় প্রতিনিয়ত,
অতল শূন্য গহ্বরে তা তলিয়ে যায় যে কত!
শান্ত বাইরে,কিন্তু ভেতর ঘুমায় আগ্নেয়গিরি,
উত্তপ্ত সেই তরল লাভা ফুটছে ফিরি ফিরি।
বাইরে এসে পোড়ায় না সে,গলিয়ে দেয় যে বুক,
ভেতরের এই দেয়াল খসার নেইকো কোনো যে সুখ।
শিরায় শিরায় তীব্র জ্বালা,দহন অসহ্য অতি,
নিজ আগুনে ছাই হওয়াতে আবেগেরই এ গতি।
ছাই হওয়ার সুখটুকুও সহজে মেলে না আর,
লাভা শীতল হয় না কভু,ফুরোয় না অন্ধকার।
জলপ্রপাতে বিশ্বাস ভাঙে আছড়ে আছড়ে পড়ে
অনন্তকাল চলছে পতন বুকটা ক্ষত করে।
বাইরে থেকে দৃশ্যটি তো দেখতে বড়ই ভালো,
নিচের পাথর জানে কেবল হারায় তাহার আলো।
অশ্রুবিন্দু চোখের কোণে থমকে থাকে খাড়া,
ভেতরে তাই আছড়ে পড়ে জলপ্রপাতের ধারা।
রঙ বেরঙের ক্যানভাসেতে এই কষ্টের অবয়ব,
ধূসর মেঘ আর নীল নদীতে জাগছে যে কলরব।
অগ্নিবর্ণ লাভা আর ওই সাদা জলের ফেনা,
দীর্ঘশ্বাসের ছন্দে আমার কষ্টগুলো চেনা।
রচনাকাল : ১২ জুন,২০২৬ খ্রি.।
অসমাপ্ত প্রেম আগামী বসন্তে
– রবি বাঙালি
এ জন্মে তোমার হাত ছুঁয়েও ছোঁয়া হলো না,
ওপাড়ের চলে যাওয়া পথে শুধু চেয়ে থাকা।
এঁকে দিল এক অভেদ সীমানা,
ভাগ্যের নিষ্ঠুর রেখা।
এ জন্মে তোমার- আমার প্রেম নাই বা হলো,
তাতে কি এ প্রেমের মহিমা চিরতরে হারায়?
তোলা থাকল মহাকালের খামে-
মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়।
উথাল-পাথাল করা সেই প্রথম বসন্তে-
পরজন্মে বাঁধিব দুয়ারে ষোড়শ যৌবনে।
আমি আবার তোমা প্রেমে পড়ব-
বারণহীন কারণে-অকারণে।
এ জন্মের বেদনা,শূন্যতা ভুলে অকারণ
তোমার বুকেই থিতু হবে অবাধ্য এ মন।
সেদিন শুধু হবে রূপকথার –
ভয়হীন মধু আলাপন।
তুমি শুধু অপেক্ষা করো সেই নব ভোরের,
আমি আসবো ফিরে,সব গ্লানি মুছিয়া ভবের।
শুধু তোমা হতে, অনন্তকালের
অথবা অন্য জন্মের।
রচনাকাল : ৫ জুলাই, ২০২৬ খ্রি.।
অন্য রকম সুখ
রবি বাঙালি
তুমি খোঁজো সুখ যে কেবল অর্থ কড়ি সোনাতে,
আমার সুখটা মনের রঙে স্মৃতির পাতা বোনাতে।
পদ পদবী তোমার কাছে শ্রেষ্ঠ ভবে অমূল্য,
আমার কাছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অতুল্য।
রূপের জাদুই টানছে তোমায় দেখায় মায়া মরিচী,
গুণের আলোয় আঁধার কাটাই চোখে মাখি সুরুচি।
চাকচিক্যের ওই ঝলকানিতে জুড়ায় তোমার দু’টি চোখ,
আমার কেবল সরলতায় সুবাসিত জগত হোক।
বিলাসিতার রঙ্গলিলায় তোমার সুখের মন্ত্রণা,
দৈন্যতারই চাদর মোড়াই আমার সকল যন্ত্রণা।
মডার্ণ স্রোতে ভাসিয়ে দাও তোমার জীবন ভেলাতে,
শালীনতার মধুরতায় মাতাই ভবের খেলাতে।
তুমি ছোট শহর জুড়ে ব্যস্ত কাজের ধারাতে,
আমি ছুটি মেঘের দেশে আকাশ পানে হারাতে।
তোমার দুচোখ স্বপ্ন বোনে অট্টালিকা প্রাসাদে,
আমার এ মন কুঁড়ে ঘরে ব্যাকুল প্রিয়ার আল্লাদে।
তুমি খোঁজো কোলাহলে প্রশংসা আর করতালি,
সুখ লভিতে নিজকে পোড়াই অন্যের ঘরে দ্বিপজ্বালি।
এক ভুবনের দুই মেরুতে সমান্তরাল দু’টিমন
সুখের খোঁজে বেহুশ মনে চলছি ছুটে সারাক্ষণ।
রচনাকাল: ১৯ জুলাই, ২০২৬ খ্রি.
অসীম শূন্যতা
– রবি বাঙালি
কখনো মন ভুলে একবার ফিরে আসো যদি,
তখন দেখতে আমার চোখে বহে গেছে নদী।
যে চোখে মোর ছিল আঁকা লাল-নীল স্বপ্নের ওই ঢেউ,
সে চোখে আজ মহাপ্লাবন, দেখে না তো – তা কেউ ।
মন ভেঙ্গে হায়!পাড়ি দিলে সুখবিভরের ডানায়,
আজ আমি কূল নাহি হেরি সেইসব স্মৃতির মায়ায়।
বুকের ভেতর একলা কাঁদে ওরে মোর মন পাখি,
জলোধারায় ধরে তারে শুধু বেঁধে রাখি?
যদি জানতে কি বেদনায় কাটে আমার এই রাত,
খুঁজে বেড়ায় আঁধারে শুধু তোমার চেনা সেই হাত।
একবার ফিরে এসে যদি ছুঁয়ে দিতে এই হাত,
মুহূর্তেই লীন হয়ে যেত নিঃস্ব অন্তহীন রাত।
তুমি নেই, তাই চারিপাশে অসীম শূন্যতার গান,
চিতার দীর্ঘ এই প্রহরে নীরবে ছাই এই প্রাণ।
যদি ফিরো তবে কোনো এক গোধূলি বেলায়,
দেখবে এ মন ভেসে গেছে একাকীত্বের ভেলায়।
রচনাকাল : ৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রি.।
নৈঃশব্দে ঝড়
রবি বাঙালি
সাঁতৈল বিলে ভর দুপুরে
শাপলা তোলার দিনটা,
শাপলার মালা গলায় দিলে
লাজে ভরত মুখটা।
রোজ বিকেলে আমার সাথে
কুতকুতিটা খেলতে,
খেলার ছলে চোখে চোখে
মনের কথা বলতে।
জোনাক জ্বলা জোছ্না রাতে
খেজুর পাটি পাড়তে,
সেথায় বসে আড্ডার ফাঁকে
বুকে মাথা রাখতে।
মাঝে মাঝে গাঙ পাড় হতে
আমার ডিঙায় চড়তে,
মাঝ গাঙেতে ডুবা দিতে
ভিজে গায়ে ধরতে।
নাকের ওপর ঘামের বিন্দু
চোখেই তোমার পড়তে,
নাকের ডগায় মুচড়ে দিয়ে
বউ কপালে বলতে।
সে সব দিনের কত স্মৃতি
নৈঃশব্দে আজ টানছে,
তোমারও কি আমার মতো
অতীত ঝড়ে ভাঙছে?
রচনাকাল : ১ জুলাই, ২০২৬ খ্রি.।
দূরত্বে বেধেছি ঘর
রবি বাঙালি
যতই তুমি যাও যে চলে, দূর সীমানাপারে,
ততই বেশি কড়া নাড়ো, মনের বদ্ধ দ্বারে।
চোখের আড়াল হলেই বুঝি,বুকের ভেতর জাগে—
তোমার স্মৃতি জড়ায় থাকে, গভীর অনুরাগে।
চেনা পথের প্রতি মোড়ে, চেনা রোদের আলোয়,
তোমার ছায়া খুঁজে ফিরি, মন্দে কিংবা ভালোয়।
যতটা পথ বাড়িয়ে দাও,আমাদের এই মাঝে,
ততটাই সুর বেজে ওঠে আমার নীরব সাঁঝে।
আকাশের ওই দূর নীলিমায়,লক্ষ তারার মেলা,
তোমার কথা মনে পড়ায়, হয় না গোনার খেলা।
ভাবছ বুঝি দূরে গিয়ে, তুমি হয়েছো পর?
দূরত্বেই যে আজ বেঁধেছি,তোমার আমার ঘর।
রচনাকাল : ২৪ জুন,২০২৬ খ্রি.।
অনন্তের প্রথম স্পর্শ
রবি বাঙালি
সেদিন যখন প্রথম তোমার আঙুল ছুঁয়েছিল আঙুল,
হঠাৎ থমকে গিয়েছিল চেনা জগতের তাবৎ হুলস্থুল।
কোনো নতুনত্বের চমক ছিল না সেই ছোঁয়ায়,
ছিল এক অদ্ভুত চেনা শান্তি, যা যুগ যুগান্তরকে জড়ায়।
মনে হলো, এই হাত আমার ভীষণ চেনা,মায়া জড়ানো,
কত শত বসন্ত পেরিয়েও এর স্পর্শ যায়নি ভোলানো।
যেন কোনো এক আদিম পৃথিবীর শেষ প্রান্তরে,
আমরা হেঁটেছিলাম এভাবেই, হাত রেখে পরস্পরে।
এ তো শুধু এক মুহূর্তের আকস্মিক বন্ধন নয়,
এ যেন এক ফেলে আসা জন্মের পরম পরিচয়।
কোটি বছরের চেনা কোনো এক নিভৃত আলয়,
যেখানে লুকিয়ে ছিল আমাদের একাত্মতার সঞ্চয়।
আজকের এই ছোঁয়া কেবলই এক পুনর্মিলন,
সময়ের ওপারে লিখে রাখা এক শাশ্বত লিখন।
তুমি আমার নতুন কেউ নও, তুমি আমার সেই চিরন্তন,
যাকে হারানোর পর, এই জন্মে আবার খুঁজে পেল মন।
রচনাকাল : ১৫ জুন, ২০২৬ খ্রি.।