সাহিত্য ও সাহিত্যিক

রবার্ট সাউদে (Robert Southey, ১৭৭৪–১৮৪৩)

১. ব্লেনহাইমের বিজয়ের পর

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বসে বুড়ো কাসপার,
ছোট নাতি-নাতনি খেলে তার পাশে।
হঠাৎ পাওয়া গোলাকার খুলি হাতে,
বলল, “বিখ্যাত জয়ে পড়েছিল যে!”

“কেন লড়াই হয়েছিল, বলো দাদু?”
বুড়ো বলে, “ফরাসি-ইংরেজ, জয় ইংরেজের।
কী লাভ হয়েছিল শেষে? জানি না রে বাবা,
তবু সবাই বলে—বিখ্যাত বিজয়!”

হাজার হাজার মৃতদেহ পচে রোদে,
মা-শিশু পুড়ে মরেছে আগুনে-তরবারিতে।
তবু বুড়ো বলে, “এমনই হয় বিখ্যাত জয়ে…”
শিশুরা চুপ, চোখে বিস্ময় আর বেদনা।

২. ইনচকেপ রকের ঘণ্টা

শান্ত সমুদ্র, নিঃশব্দ বাতাস,
জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে যেন ঘুমিয়ে।
ঢেউয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিপদের পাথর—
ইনচকেপ রক, যার ঘণ্টা বাজত সতর্কতায়।

সদাচারী অ্যাবট বসিয়েছিলেন সেই ঘণ্টা,
ঝড়ে-ঝড়ে সাবধান করত নাবিকদের।
কিন্তু দুষ্ট জলদস্যু র‌্যালফ কেটে ফেলল ঘণ্টা,
ফেলে দিল সমুদ্রে—হাসতে হাসতে।

ঝড় এল যখন, অন্ধকারে ঘন,
র‌্যালফের জাহাজ ছুটে চলল সেই পাথরের দিকে।
কোনো সতর্কতা নেই, কোনো ঘণ্টার শব্দ নেই…
ন্যায়ের বিচারে ডুবে গেল দুষ্টের জাহাজ।

৩. বৃদ্ধের সান্ত্বনা

“তুমি বুড়ো, ফাদার উইলিয়াম,” বলে যুবক,
“মাথার চুল পেকে গেছে, তবু হাসি ঠোঁটে।
কী করে এত সুস্থ রইলে এই বয়সে?”
বুড়ো হেসে বলে, “আনন্দে, প্রেমে, আর সততায়।”

“যৌবনে আমি কখনো রাগ করিনি অকারণে,
মিথ্যা বলিনি, লোভ করিনি অপরের সম্পদে।
প্রতিদিন হেসেছি, গেয়েছি, ভালোবেসেছি জীবনকে—
এই সহজ নিয়মেই বুড়ো বয়স এসেছে আশীর্বাদ হয়ে।”

৪. দুষ্ট বিশপের শাস্তি

বিশপ হ্যাটো ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী, নিষ্ঠুর।
দুর্ভিক্ষে মানুষ মরে, সে খাদ্যশস্য লুকিয়ে রাখে।
একদিন তার শস্যাগারে ইঁদুরের দল ঢুকে পড়ে,
কামড়ে কামড়ে খায় তার শরীর—প্রতিশোধ নেয় প্রকৃতি।

সে পালায় টাওয়ারে, দরজা বন্ধ করে,
কিন্তু ইঁদুর সাঁতার কেটে আসে জল পেরিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বিশপের হাড়গোড় খেয়ে ফেলে ইঁদুরের দল—
দুষ্টের শাস্তি আসে অদৃশ্য হাতের টানে।

৫. মৃতদের সঙ্গে আমার দিনগুলি

আমার দিনগুলি মৃতদের সঙ্গে কেটে যায়,
চারপাশে পুরোনো গ্রন্থের সারি—মহান মনের সঙ্গীরা।
প্রতিদিন কথা হয় প্লেটো, হোমার, মিল্টনের সঙ্গে,
তাঁদের জ্ঞানে আমি ভরে উঠি, শান্ত হয়ে যাই।

যখন দুঃখ আসে, তাঁরা সান্ত্বনা দেয়,
যখন আনন্দ আসে, তাঁরা সঙ্গী হয়।
একদিন আমিও যাব তাঁদের কাছে চিরকালের জন্য,
কিন্তু রেখে যাব এই নাম—যা ধুলোয় মিশবে না।

৬. সেন্ট কেইনের জাদুকূপ

ওয়েলসের সেই পবিত্র কূপের কথা শোনো,
যেখানে প্রথমে যে পান করে—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কে বেশি ক্ষমতা পায়।
যদি স্ত্রী প্রথমে পান করে, সে হয় ঘরের রানি,
স্বামী হয় অনুগত—এমনই প্রাচীন কিংবদন্তি।

অনেক দম্পতি আসে সেই কূপের তীরে,
কেউ হাসে, কেউ ভয় পায় ভাগ্যের খেলায়।
প্রকৃতির এই ছোট্ট নিয়মে লুকিয়ে আছে বড় শিক্ষা—
ভালোবাসায় সমতা আর শ্রদ্ধাই সবচেয়ে বড় জাদু।

৭. থালাবার অভিযান (থালাবা দ্য ডেসট্রয়ারের ছায়ায়)

আরবের মরুভূমিতে এক তরুণ বীরের যাত্রা,
শয়তানি জাদুকরদের দুর্গের বিরুদ্ধে একাকী লড়াই।
পবিত্র তরবারি হাতে, হৃদয়ে ঈমানের আলো,
সে জয় করে অন্ধকার—আলোর পথ দেখায় সবাইকে।

৮. কেহামার অভিশাপ

হিন্দু পুরাণের ছায়ায় এক নিম্নবর্ণের যুবক,
সহ্য করে অপমান, কিন্তু হার মানে না।
অভিশাপ ভাঙতে সে লড়ে যায় স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে,
ধৈর্য আর সত্যের জোরে জয় করে অসম্ভব যুদ্ধ।

৯. ম্যাডকের স্বপ্ন

ওয়েলশ রাজপুত্র ম্যাডক সমুদ্র পেরিয়ে যায় দূরে,
নতুন ভূমিতে (আজটেকের দেশে) স্থাপন করে সভ্যতার বীজ।
বর্বরতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে,
খ্রিস্টীয় আলো ছড়ায়—স্বপ্নের নতুন জগৎ গড়ে।

১০. গ্রেটা হলের কবি

কেসউইকের পাহাড়-ঘেরা গ্রেটা হলে বসে সাউদে,
চারপাশে হাজারো বই, মাথায় প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের স্বপ্ন।
থালাবা, কেহামা, ম্যাডক—সব জন্মায় এখানেই,
লেক কবির কলমে জেগে ওঠে বিশাল বহিরাগত আখ্যান।


ব্রিটিশ লেক কবি যিনি বিশাল, বহিরাগত পুরাণকথাময় মহাকাব্যিক আখ্যান নির্মাণ করেছিলেন

রবার্ট সাউদে ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম প্রভাবশালী ইংরেজ সাহিত্যিক — কবি, ইতিহাসবিদ, জীবনীকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং বিতর্কিত চিন্তাবিদ। তিনি লেক পোয়েটস (Lake Poets) নামে পরিচিত সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, যাঁদের মধ্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও স্যামুয়েল টেলর কলরিজ সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৮১৩ সাল থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত — ত্রিশ বছর ধরে — তিনি যুক্তরাজ্যের কবি লরিয়েট (Poet Laureate) পদ অলংকৃত করেছিলেন।

তাঁর সবচেয়ে স্বতন্ত্র অবদান হলো বিশালাকার বহিরাগত পুরাণকথাভিত্তিক মহাকাব্যিক আখ্যান নির্মাণ। ইসলামী আরব্য-রাত্রির জগৎ, হিন্দু পুরাণ, ওয়েলশ কিংবদন্তি ও প্রাক-কলম্বীয় আমেরিকার কল্পনাকে তিনি ইংরেজি কাব্যে অভূতপূর্বভাবে মিশিয়েছিলেন। এই রচনাগুলো তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল এবং পরবর্তী রোমান্টিক কবিদের (বিশেষ করে পার্সি বিশ শেলি) প্রভাবিত করেছিল।

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা (১৭৭৪–১৭৯৩)

১২ আগস্ট ১৭৭৪ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে (Wine Street) জন্মগ্রহণ করেন রবার্ট সাউদে। পিতা রবার্ট সাউদে ছিলেন একজন লিনেন ব্যবসায়ী, যিনি আর্থিকভাবে অসফল ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যান। মাতা মার্গারেট হিল সাউদে। শৈশবে তিনি মূলত আত্মীয়দের কাছে বড় হন — বিশেষ করে এক উদ্ভট খালার তত্ত্বাবধানে। এই বিচ্ছিন্নতা ও আবেগ দমনের অভ্যাস তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

তিনি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াশোনা করেন (১৭৮৮–১৭৯২)। এখানেই তাঁর বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ পায়। তিনি The Flagellant নামে একটি ছাত্র পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং একটি প্রবন্ধে শারীরিক শাস্তি (flogging)-কে “শয়তানের উদ্ভাবন” বলে আক্রমণ করেন। এর ফলে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পরবর্তীতে তিনি অক্সফোর্ডের ব্যালিওল কলেজে ভর্তি হন (১৭৯৩) পবিত্র যাজকত্বের উদ্দেশ্যে (মামার ইচ্ছায়)। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণশীল পরিবেশ, গোঁড়ামি ও শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে। তিনি রুশো, ভলতেয়ার, গিবন ও টমাস পেইন-এর প্রভাবে রিপাবলিকান, ডিস্ট ও ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক হয়ে ওঠেন। অক্সফোর্ডে তিনি বেশিদিন থাকেননি।

কলরিজের সাথে বন্ধুত্ব ও প্যান্টিসোক্রেসির স্বপ্ন (১৭৯৪–১৭৯৫)

১৭৯৪ সালে সাউদে স্যামুয়েল টেলর কলরিজের সাথে পরিচিত হন। দুজনেই তরুণ, উদ্দীপ্ত, বিপ্লবী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ। তাঁরা একসঙ্গে The Fall of Robespierre (১৭৯৪) নামে একটি নাটক লেখেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল প্যান্টিসোক্রেসি (Pantisocracy) নামক ইউটোপীয় সম্প্রদায় গড়ার পরিকল্পনা। রবার্ট লাভেলসহ কয়েকজন বন্ধু মিলে আমেরিকার সাসকুয়েহানা নদীর তীরে একটি সমতাবাদী, সম্মিলিত কৃষি সম্প্রদায় গড়তে চেয়েছিলেন — যেখানে সম্পত্তি, শ্রম ও সুখ সমানভাবে ভাগ হবে। এই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অর্থাভাব ও ব্যক্তিগত মতভেদের কারণে ভেঙে যায়। তবে এটি সাউদের প্রথম যৌবনের আদর্শবাদের প্রতীক হয়ে থেকে যায়।

প্রথম বিবাহ, পরিবার ও প্রথম সাহিত্যিক সাফল্য

১৪ নভেম্বর ১৭৯৫ সালে সাউদে এডিথ ফ্রিকার (Edith Fricker)-কে বিয়ে করেন। এডিথের বোন সারা পরে কলরিজকে বিয়ে করেন। এডিথ ছিলেন অত্যন্ত অনুগত স্ত্রী ও মা। তাঁদের সংসারে বেশ কয়েকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের অনেকেই শৈশবে মারা যায় — এটি সাউদের জীবনে বারবার আঘাত হানে।

১৭৯৫ সালেই তিনি প্রথম কবিতার সংকলন প্রকাশ করেন (রবার্ট লাভেলের সাথে)। ১৭৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বড় কাব্যকর্ম জোয়ান অফ আর্ক (Joan of Arc) — যা ফরাসি জাতীয় বীরিনীর কাহিনি অবলম্বনে রচিত এবং তৎকালীন বিপ্লবী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। চার্লস ল্যাম্ব এই কাব্য সম্পর্কে অত্যন্ত প্রশংসা করে বলেছিলেন যে এটি একাই যুগের কাব্যিক অবক্ষয়ের অভিযোগ খণ্ডন করতে পারে।

একই সময়ে তিনি স্পেন ও পর্তুগাল ভ্রমণ করেন (১৭৯৬ ও ১৮০০–১৮০১)। এই অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় Letters Written During a Short Residence in Spain and Portugal (১৭৯৭) — তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গদ্য রচনা।

লেক জেলায় স্থায়ী বসবাস ও লেক পোয়েটস পর্ব (১৮০৩ onwards)

১৮০৩ সালে সাউদে পরিবারসহ কেসউইকের (Keswick) গ্রেটা হল (Greta Hall)-এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর (মৃত্যু পর্যন্ত) বাস করেন। এই বাড়িটি লেক জেলার (Lake District) সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত এবং এখানেই তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো জন্ম নেয়।

এখানে তিনি কলরিজের পরিত্যক্ত পরিবারেরও যত্ন নেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাথেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এই তিনজনকে একসঙ্গে লেক পোয়েটস বলা হয়। সাউদে এখানে অসাধারণ পরিশ্রমী জীবন যাপন করেন — বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেখেন এবং চিঠিপত্রের মাধ্যমে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন।

কবি লরিয়েট নিযুক্তি ও বিতর্ক (১৮১৩)

১৮১৩ সালে স্যার ওয়াল্টার স্কট কবি লরিয়েট পদ প্রত্যাখ্যান করলে সাউদেকে এই সম্মান দেওয়া হয়। তিনি এই পদ গ্রহণ করেন, কিন্তু এটি তাঁর জন্য মিশ্র আশীর্বাদ হয়ে ওঠে।

বিতর্ক:

  • ১৮১৭ সালে তাঁর যৌবনকালের র্যাডিক্যাল নাটক ওয়াট টাইলার (Wat Tyler, ১৭৯৪ সালে লেখা) গোপনে প্রকাশিত হয়। রাজনৈতিক শত্রুরা এটি ব্যবহার করে তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” প্রমাণ করতে চায়।
  • লর্ড বায়রন তাঁকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। The Vision of Judgement (১৮২১) কাব্যে সাউদের রচনার প্যারোডি করে বায়রন তাঁকে “Satanic School”-এর বিরোধী বলে বিদ্রূপ করেন। বায়রন সাউদেকে অর্থলোভী, সংকীর্ণমনা ও কপট বলে চিত্রিত করেন।
  • উইলিয়াম হ্যাজলিট The Spirit of the Age (১৮২৫)-এ লেখেন: “তিনি যৌবনে স্বাধীনতাকে প্রেমিকার মতো ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু পরে ‘বৈধতা’ নামক এক বয়স্কা ও সন্দেহজনক মহিলাকে বিয়ে করেছেন।”

সাউদে নিজেকে রক্ষা করে বলেছিলেন যে তিনি লক্ষ্য পরিবর্তন করেননি, শুধু উপায় বুঝতে শিখেছেন এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালোবেসে রক্ষা করতে শিখেছেন।

বিশাল বহিরাগত পুরাণকথাময় মহাকাব্যিক আখ্যান

সাউদের সবচেয়ে স্বতন্ত্র সৃষ্টি এই ধারায়:

  • থালাবা দ্য ডেসট্রয়ার (Thalaba the Destroyer, ১৮০১): ইসলামী-আরব্য পুরাণ ও জাদুকথার জগতে এক তরুণ মুসলিম বীরের শয়তানি জাদুকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এটি প্রাচ্যের রহস্যময়তা ও নৈতিক সংগ্রামের অসাধারণ চিত্রায়ণ।
  • দ্য কার্স অফ কেহামা (The Curse of Kehama, ১৮১০): হিন্দু পুরাণ অবলম্বনে রচিত। এক নিম্নবর্ণের (pariah) ধৈর্যশীল ব্যক্তির এক স্বৈরাচারী রাজার বিরুদ্ধে লড়াই। এটি নেপোলিয়ন-বিরোধী সংগ্রামের রূপক হিসেবেও পড়া যায় এবং শেলির Prometheus Unbound-কে প্রভাবিত করে।
  • ম্যাডক (Madoc, ১৮০৫): ওয়েলশ কিংবদন্তির রাজপুত্র ম্যাডকের কাহিনি, যিনি কথিত আছে প্রাক-কলম্বীয় আমেরিকায় (আজটেক অঞ্চলে) এসে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী ও খ্রিস্টীয় আদর্শের মিশ্রণ।
  • রোডেরিক, দ্য লাস্ট অফ দ্য গথস (Roderick, the Last of the Goths, ১৮১৪): ভিসিগথিক স্পেনের পতন ও মুরদের আক্রমণের কাহিনি। পেনিনসুলার যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত।

এছাড়া ছোট কবিতা “After Blenheim”, “The Inchcape Rock”, “The Cataract of Lodore” এবং বিখ্যাত শিশুতোষ গল্প “The Story of the Three Bears” (The Doctor গ্রন্থে, ১৮৩৭) তাঁর রচনা বলে পরিচিত।

গদ্য সাহিত্য ও ঐতিহাসিক রচনা

সাউদের গদ্য তাঁর কাব্যের চেয়ে আজও বেশি পঠিত ও প্রশংসিত। প্রধান গদ্যকর্ম:

  • The Life of Horatio, Lord Viscount Nelson (১৮১৩) — সবচেয়ে জনপ্রিয় জীবনী, এখনও ক্লাসিক।
  • The Life of Wesley; and Rise and Progress of Methodism (১৮২০)
  • History of Brazil (৩ খণ্ড, ১৮১০–১৮১৯)
  • History of the Peninsular War (৩ খণ্ড, ১৮২৩–১৮৩২)
  • Sir Thomas More; or, Colloquies on the Progress and Prospects of Society (১৮২৯)
  • The Doctor (৭ খণ্ড, ১৮৩৪–১৮৪৭) — অদ্ভুত, র‍্যাবেলেসীয় স্টাইলের মিশ্র গ্রন্থ।

তিনি অসংখ্য অনুবাদ (Amadis of Gaul, Chronicle of the Cid), সম্পাদনা এবং Quarterly Review-এর জন্য প্রবন্ধ লেখেন।

রাজনৈতিক মতামতের বিবর্তন

যৌবনে তিনি ছিলেন উগ্র রিপাবলিকান ও ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক। পরবর্তীকালে (বিশেষ করে ১৮০০-এর দশক থেকে) তিনি রক্ষণশীল (Tory) হয়ে ওঠেন — গির্জা, রাজতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমর্থক। তিনি সংসদীয় সংস্কার, ক্যাথলিক মুক্তি ও র‍্যাডিক্যাল আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। তবে কারখানার শ্রমিকদের দুর্দশা ও শিশু শ্রমের বিরুদ্ধেও কিছু সমালোচনা করেছিলেন। এই “বিশ্বাসঘাতকতা”র জন্য তিনি সমসাময়িক র‍্যাডিক্যালদের তীব্র সমালোচনার শিকার হন।

শেষ জীবন, দ্বিতীয় বিবাহ ও মৃত্যু

এডিথ ১৮৩৭ সালে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মারা যান। দীর্ঘদিনের চিঠিপত্রের বন্ধু ক্যারোলিন অ্যান বোলস (Caroline Anne Bowles)-কে ৪ জুন ১৮৩৯ সালে বিয়ে করেন। কিন্তু সাউদের ডিমেনশিয়া (মানসিক অবক্ষয়) ততদিনে গুরুতর আকার নিয়েছিল। বিয়ের পর সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়।

২১ মার্চ ১৮৪৩ সালে লন্ডনে স্ট্রোক করে তাঁর মৃত্যু হয় (বয়স ৬৮)। তাঁকে কেসউইকের ক্রসথওয়েট চার্চের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়, যেখানে তিনি চল্লিশ বছর ধরে উপাসনা করতেন। সমাধির উপর ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখা শিলালিপি আছে।

উত্তরাধিকার

সাউদে তাঁর জীবদ্দশায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন — “complete man of letters” বলে কলরিজ তাঁকে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর পরীক্ষামূলক কাব্য পরবর্তী প্রজন্মকে (বায়রন, শেলি, ব্রাউনিং, টেনিসন) প্রভাবিত করেছে। তবে আজ তাঁর মহাকাব্যগুলো কম পঠিত হয়; বেশি পঠিত হয় তাঁর গদ্য — বিশেষ করে Life of Nelson এবং কিছু ছোট কবিতা।

আধুনিক সমালোচনায় তাঁকে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে — তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, প্রাচ্যবিদ্যা, ঐতিহাসিক চেতনা ও সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ পরিশ্রমী স্রষ্টা, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লিখে গেছেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে বহিরাগত পুরাণকথার এক অনন্য দ্বার উন্মোচন করেছেন।

রবার্ট সাউদে — একজন কবি যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশাল, দূরের জগতের কাহিনি নিয়ে, এবং সেই স্বপ্নকে কাব্য ও গদ্যে অমর করে রেখে গেছেন।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...