SANTANU GHOSH

প্রবন্ধ

“সমকালীন বাংলা কবিতায়: আমার কবিতার তিন দশক’

শান্তনু ঘোষ

সাহিত্যের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। ১৯৯০ সালের কাছাকাছি সময়ে লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলেও ১৯৯৩–৯৪ সাল থেকে সাহিত্য চর্চাকে জীবনের একটি নিরন্তর পথ হিসেবে গ্রহণ করি। সেই সময় শ্রদ্ধেয় স্যার এবং বিশিষ্ট কবি চিরপ্রশান্ত বাগচী মহাশয় নিরন্তর তেল ঢেলেছিলেন আমার সাহিত্যচর্চার প্রদীপে। সেই পথ আজও চলমান। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তিন দশকেরও বেশি সময় আসলে কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি অভিজ্ঞতা, পরিবর্তন, প্রত্যাখ্যান, ভালোবাসা, প্রাপ্তি, হারানো এবং অক্ষরের সঙ্গে এক দীর্ঘ সম্পর্কের ইতিহাস।
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দ থেকে শব্দের শরীরে’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। কাব্যগ্রন্থটির সমস্ত কবিতায় স্যার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন। ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন নারীবাদী কবি সম্মানীয় কৃষ্ণ বসু। আজও ভুমিকায় লেখা ওনার একটি লাইন আমার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আছে। এরপর ‘যুবক ও একটি মেয়ের মুখ’, ‘ভালোবাসা বিয়ের পিঁড়ি ছুঁয়ে’, ‘দূরত্ব মুছে ফেলি’, ‘ধুলো মাটি, কাশফুল’, ‘অক্ষরের অনুভূতি’, ‘ভাষা আমার, জন্মগত অধিকার’, ‘আলো ছোঁয়ার প্রকাশ ইচ্ছায়’, ‘একতারা’, ‘স্বপ্ন আঁকে নাগরিক চোখ’, ‘চোরাটান’, ‘শালিকের ঠোঁটে খড়কুটো’ এবং ‘আমি তোমাকে অসংখ্যবার ভালোবাসি’-সহ একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে গল্প ও অনুগল্পের মিলিত বই।
এই দীর্ঘ পথচলায় আমার কবিতা বিভিন্ন সময়ে নানা পত্রপত্রিকা ও সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। নবীনের স্বপ্ন, কাগজের নৌকা, শ্রুতি, প্রতিফলন, সাহিত্য সেতু, সোনার সংসার, নৌকা, নিউজ বাংলা, বিনোদন বিচিত্রা, যুব মানস,
আজকের সংবাদ দর্পণ, প্রসাদ, কলেজ স্ট্রিট, উৎসব, সাহিত্য মেলা, টার্মিনাস, রূপকথা, রোদ্দুর, নতুন আলোয় উল্টোরথ-সহ বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় আমার কবিতা ও অনুগল্প স্থান পেয়েছে। মুদ্রিত প্রকাশনার পাশাপাশি বর্তমানে আমার কিছু কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ অনলাইনেও পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।
তবে আমার কাছে প্রকাশের সংখ্যা কখনও কবিতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন নয়। একজন কবি কতগুলি কবিতা লিখলেন, কতগুলি বই প্রকাশিত হলো, কতগুলি সম্মাননা পেলেন—এসবের বাইরে আরও একটি প্রশ্ন থাকে: তাঁর কবিতা পাঠকের মনে কতটা স্থায়ী অনুভব তৈরি করতে পারল?
আমার কবিতার দিকে ফিরে তাকালে দেখি, শুরু থেকেই মানুষ আমার লেখার কেন্দ্রে থেকেছে। প্রেম, সম্পর্ক, পরিবার, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অভিমান—এসব ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি ধীরে ধীরে সমাজ ও সময় আমার কবিতার পরিসরকে প্রসারিত করেছে। মানুষের দুঃখ, বিশ্বাসভঙ্গ, সামাজিক বৈষম্য, অন্যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইতিহাসের প্রতি দায়বোধ এবং নাগরিক জীবনের নানা সংকট আমাকে বারবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে এনেছে।
আমার কাছে কবিতা কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়। কবিতা কখনও প্রশ্ন করে, কখনও প্রতিবাদ করে, কখনও নিজের কাছেই ফিরে যায়। আবার কখনও একটি ছোট্ট পারিবারিক দৃশ্য, একটি মায়ের মুখ, বাবার স্মৃতি, গ্রামের মাটি, কাশফুল, পাখির ঠোঁটে খড়কুটো কিংবা কোনো সম্পর্কের নীরব দূরত্ব—এসবও কবিতার জন্ম দিতে পারে। বড় কোনো ঘটনা ছাড়াও জীবনের ছোট ঘটনাগুলোর মধ্যে বড় সত্য লুকিয়ে থাকে—আমার কবিতা সেই সত্যটিকে খুঁজে নিতে চায়।
আমার কবিতার ভাষা মূলত সহজ ও কথ্য। দুরূহ শব্দ বা জটিল বাক্য নির্মাণের চেয়ে আমি এমন ভাষা বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, যে ভাষা সাধারণ পাঠক পড়ে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। তবে সময়ের সঙ্গে আমি বুঝেছি, সহজ ভাষা মানেই সরল কবিতা নয়। সহজ শব্দের মধ্যেও গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করা সম্ভব। বরং কবির অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো—কথাকে সহজ রেখে তার ভেতরে অন্য একটি অর্থের দরজা খুলে দেওয়া।
সমকালীন সময় আমাকে প্রতিবাদীও করেছে। চারপাশের অন্যায়, মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা, ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কিংবা ক্ষমতার অহংকার আমার কবিতায় কখনও সরাসরি এসেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আমার নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কবিতা কি শুধু বক্তব্যের বাহন? নাকি বক্তব্যকে শিল্পে পরিণত করাই কবিতার কাজ?
আমি মনে করি, প্রতিবাদ তখনই কবিতা হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল স্লোগান থাকে না; যখন তার সঙ্গে অনুভূতি, প্রতীক, চিত্রকল্প এবং মানুষের জীবন জড়িয়ে যায়। তাই নিজের কবিতার দিকে ফিরে তাকিয়ে আমি যেমন তার শক্তি দেখি, তেমনি সীমাবদ্ধতাও দেখতে চাই। কোনো কবিতায় বক্তব্য হয়তো বেশি সরাসরি হয়েছে, কোথাও হয়তো আরও সংযম দরকার ছিল। এই আত্ম সমালোচনাই একজন লেখককে পরবর্তী লেখার দিকে এগিয়ে দেয়।
আমার সাম্প্রতিক কবিতায় মাটি, শিকড়, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘ধুলো মাটি, কাশফুল’ কিংবা ‘শালিকের ঠোঁটে খড়কুটো’-র মতো নামের মধ্যেই সেই টান অনুভব করা যায়। দ্রুত বদলে যাওয়া নাগরিক জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে মাটির কাছে ফিরে যাওয়া আমার কাছে কেবল নস্টালজিয়া নয়; এটি নিজের অস্তিত্বের কাছে ফিরে যাওয়ারও একটি চেষ্টা।
তিন দশকের সাহিত্য জীবনে আরেকটি ভূমিকা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সম্পাদনা। বর্তমানে একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি একটি সাহিত্য ভিত্তিক ফেসবুক পেজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ‘প্রতিদিনের কবিতা’ ও ‘রবিবারের অনুগল্প’ প্রকাশের মাধ্যমে অন্য কবি ও লেখকদের লেখাও পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। নিজের লেখা প্রকাশের পাশাপাশি অন্যের লেখার জন্য একটি সাহিত্যিক পরিসর তৈরি করতে পারাটাকেও আমি সাহিত্যচর্চার অংশ বলে মনে করি।
তিন দশক পর আজ যখন নিজের কবিতার দিকে ফিরে তাকাই, তখন সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি অনুভব করি তা হলো—আমি এখনও শিখছি। সময় বদলেছে, পাঠকের রুচি বদলেছে, প্রকাশের মাধ্যম বদলেছে; মুদ্রিত পত্রিকার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম এসেছে। কিন্তু অক্ষরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বদলায়নি।
আমি জানি না আমার কবিতা সমকালীন বাংলা কবিতায় শেষ পর্যন্ত কোন অবস্থান তৈরি করবে। সেই মূল্যায়নের অধিকার পাঠকের, সমালোচকের এবং সময়ের। একজন লেখক নিজের জন্য যতই বিশেষণ নির্ধারণ করুন, শেষ পর্যন্ত তাঁর লেখাই তাঁর হয়ে কথা বলে।
তাই তিন দশকের এই পথের শেষে আমার কাছে কবিতা এখনও কোনো অর্জনের শিরোপা নয়। কবিতা এখনও আমার কাছে অনুসন্ধান—মানুষকে বোঝার, সময়কে বোঝার, নিজের ভিতরটাকে বোঝার। যে কারণে এত বছর পরও কলম থামেনি।
সাহিত্যের পথে আমার পথচলা তাই অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে আছে। প্রকাশিত বই, পত্রিকার পাতা, সম্মাননা কিংবা পরিচিতির বাইরে একজন কবির সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পরবর্তী কবিতাটি। সেই পরবর্তী কবিতাটিই হয়তো আবার আমাকে নতুন করে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনবে।
অক্ষরের প্রতি এই আস্থা নিয়েই আমার সাহিত্য যাত্রা অব্যাহত।

1 Comment

Santanu Ghosh

দেবত্ব

শান্তনু ঘোষ

কাশিপুরের উদ্যান বাটি।
ঠাকুর অসুস্থতা থেকে
কিছুটা সুস্থ হয়েছেন, বাগানে হাঁটছেন, হাঁটতে হাঁটতে গিরিশ চন্দ্রকে জিঞ্জাসা করেন: “তোমার কি মনে হয়, আমি কে?’
গিরিশচন্দ্র বলেন: ঈশ্বরের অবতার।

তারপর”তোমাদের চৈতন্য হোক’
এই বলে‌ সাড়া ফেলে দেন বঙ্গে
হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেন শিষ্যদের
মাথা -বুক‌-শরীর
চৈতন্য হলে পতনের ভয় থাকে না আর

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...