অবাধ্য রাতের উপাখ্যান
=================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
রাত বারোটা বাজলেই তানিশার ঘরের দেয়ালঘড়িটার টিকটিক শব্দ কেমন যেন দ্বিগুণ জোরে বাজতে শুরু করে। এই শব্দটা আসলে ঘড়ির নয়, তার বুকের ভেতর জমে থাকা পুরনো স্মৃতির চাকার ঘূর্ণন।
টেবিলের ওপর রাখা আধপোড়া মোমবাতিটার দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালা দিয়ে আসা হিমেল হাওয়াটা তার চুলে দোলা দিয়ে গেল। জীবনটা আসলেই এক বহমান নদী। একটা সময় ছিল যখন আবিরের হাত ধরে সে ভাবত, এই পথ চলা বুঝি কখনো শেষ হবে না। কিন্তু নদীর জল যেমন এক কূলে ভেঙে অন্য কূলে গড়ে, আবিরও তেমনি এক বুক শূন্যতা দিয়ে নিজের মতো করে অন্য কূলে এক নতুন সংসার গড়ে নিয়েছে।
প্রথম প্রথম এই অবাধ্য রাতগুলো তানিশাকে গ্রাস করতে আসত। ফেলে আসা ভালো লাগা, ভালোবাসা আর শেষ বিকেলের সেই তীব্র কষ্টের মুহূর্তগুলো তাকে নিস্তব্ধ অন্ধকারে বন্দি করে ফেলত। মনে হতো, জীবনটা বুঝি এখানেই থমকে গেছে।
কিন্তু আজ তানিশা হাসল। মোমবাতির আলোটা নিভে যেতেই সে জানালার পর্দাটা টেনে দিল। দূরে, আকাশের এক কোণে অন্ধকারের বুক চিরে পুব আকাশে হালকা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। রাত যত গভীরই হোক না কেন, তা কেটে গিয়ে নতুন সকালের নতুন সূর্য উদিত হবেই।
তানিশা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে নিয়ে নিজের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “অতীতকে তো বদলাতে পারব না, কিন্তু এই নতুন সকালের আলোয় নিজেকে তো নতুন করে সাজাতে পারি।”
সে তার পড়ার টেবিলের ডায়েরিটা খুলল। শূন্য পাতায় নতুন এক কলমের টানে লিখতে শুরু করল তার আগামী দিনের নতুন স্বপ্নের কথা। নদী যেমন বাঁধ ভেঙে নিজের পথ খুঁজে নেয়, সে-ও আজ তার জীবনের নতুন স্রোতে ভাসতে প্রস্তুত।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা তার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা মেসেজ।
তানিশা মেসেজটা খুলল। সেখানে লেখা রয়েছে- “নিশু, আমি জানি তুমি এখনো ঘুমাওনি। আমার নতুন জীবনের নদীটা আসলে একটা মরুভূমিতে এসে ঠেকেছে। আমি আর পারছি না। আমি কি আবার তোমার কূলে ফিরে আসতে পারি?…. আবির।”
তানিশা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা মৃদু হাসল। ঘড়ির কাঁটা তখন ভোরের আলো ছোঁয়ার অপেক্ষায়। সে কোনো রিপ্লাই না দিয়ে নাম্বারটা চিরকালের জন্য ব্লক লিস্টে পাঠিয়ে দিল। বহমান নদী কখনো উল্টো স্রোতে বয় না।
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং।
0 Comments