হারানো স্মৃতি
রায় শর্মা
দেওয়ালে লাগানো পোস্টারটারের লেখা দেখে অঞ্জলি দেবী দাঁড়িয়ে পড়লেন নিজের মনেই পোস্টারে লেখা পড়তে লাগলেন কগজে লেখা রয়েছে মহামায়া বালিকা বিদ্যালয়ে একজন চতুর্থ শ্রেণির মহিলা কর্মচারী চাই। নিচে চোখ যেতেই অঞ্জলি দেবী দেখলেন আগামী কাল সকাল দশটায় দেখা করার কথা লেখা রয়েছে।অজ্ঞলি দেবীর বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই তবে মনের জোর এখনো কমেনি। স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে ধুপকাঠি বিক্রি করতে এখন আর মন চায়না,সারাদিনে হয়তা কুড়ি থেকে ত্রিশ টাকা কামাই হয়,ঘরে মা বাপ মরা পাঁচ বছরের নাতনি । দুবছর আগে এক পথ দূর্ঘটনায় অজ্ঞলি দেবীর একমাত্র মেয়ে আর জামাই মারা যায় তার পর থেকে এই ছোট বাচ্চার দায়িত্ব অজ্ঞলি দেবীর উপর। মুন্নী ক্রমেই বড় হচ্ছে তাই অজ্ঞলি দেবীর চিন্তার শেষ নেই। অজ্ঞলি দেবী মুন্নীর সম্পর্কে দিদিমা হলেও মা, বাবার চেয়েও বেশি। এখন নিজের আর মুন্নীর সারা মাসের খরচ অজ্ঞলি দেবী কোনো রকমে জোগাড় করেন, এবার মুন্নীকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে নতুন করে খরচ বেড়ে যাবে তাই কোনো নিশ্চিন্তের কাজ দরকার কিন্তু এই বয়সে কে দেবে তাকে কাজ,তবুও একটু আশা নিয়ে পোস্টারে লেখা স্কুলের নাম আর ফোন নম্বর একটা কাগজে লিখে নেন। রাতে সব কাজ শেষ করে মুন্নীকে ঘুম পারিয়ে অজ্ঞলি দেবী তার বহু পুরনো চামড়ার সুটকেস খুলে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে পাস করা তার মাধ্যমিকের মার্কশিট আর এডমিট কার্ড খুঁজে বার করেন,যে কাগজের রঙ আজ আর সাদা নেই হলটে রঙ ধরেছে। কাগজ গুলোর দিকে চেয়ে অজ্ঞলি দেবীর কত পুরনো কথা মনে আসে, নিজের অজান্তে চোখ দিয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ে। মনে পড়ে যেদিন ফাস্ট ডিভিশনে পাস করে রেজাল্ট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন সেদিন বাড়িতে উৎসব শুরু হয়েছিল কিন্তু অজ্ঞলি দেবীর লেখাপড়া আর এগোতে পারেনা, এর পরেই তাকে বাড়ির কথা মতো বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় আর লেখাপড়ায় ইতি টানতে হয়। অজ্ঞলি দেবী মনে মনে ভাবে আজ হয়তো পঞ্চাশ বছরের বাক্সে বন্দি কাগটা কাজে লাগতে পারে, পরিস্থিতি সামল দিতে মেয়েদের কতটা শিক্ষার দরকার আজ অজ্ঞলি দেবী বুঝতে পারেন তাই ঠিক করেন যতই কষ্ট হোক তার এই আদরের নাতনি কে সে শিক্ষিত করে তুলবেন। সকাল হতেই অজ্ঞলি দেবী নিজে তৈরি হয়ে নেয় দরকারি কাগজ একটা ব্যগে ভরে বেলা দশটার আগেই স্কুলে পৌছে যান।
দশটা বাজতেই বুঝতে পারেন এই কাজটা পাওয়া তার কপালে নেই, অজ্ঞলি দেবী ছাড়া আরো জনা দশেক মহিলা এই কাজের জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছে তাদের বয়স অজ্ঞলি দেবীর চেয়ে অনেক কম। যে সব মহিলারা এসেছে তারা নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ে আলোচনা করতে থাকে কিন্তু অজ্ঞলি দেবী একা এক কোনে বসে থাকেন তার কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছ করেনা, মনে সামান্য একটু আশা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। ইন্টারভিউ শুরু হয়ে যায় এক এক করে ডাক পড়ে যখন প্রায় সাত জনের ইন্টারভিউ শেষ হয় অজ্ঞলি দেবী ভাবে মিছিমিছি সে আশা করে বসে আছেন তারচেয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো তাকে কেন কাজ দেবে তার চেয়ে বয়সে ছোট অনেক মেয়েরা এসেছে আর তাদের শিক্ষাও বেশি, তাদের মধ্য কাউকে নিশ্চয়ই নেবে।আর মাত্র একজন বাকি এর পরেই অজ্ঞলি দেবীর পালা, কি জিজ্ঞাসা করবে অজ্ঞলি দেবী কিছুই ঠাওর করতে পারছেন না,একটা মেয়ে বাইরে আসতেই অজ্ঞলি দেবী একটু সাহস করে তাকে জিজ্ঞাসা করতে মেয়েটা হেসে বলে আপনি জেনে কি করবেন এই বয়সে আপনি চাকরি করবেন তার চেয়ে ভালো বাড়ি ফিরে যান, অজ্ঞলি দেবী ভাবেন ঠিক কথাই বলেছে মেয়েটা, এই বয়সে কাউকে কেউ কি চাকরি দেয়। সবার শেষে এবার অজ্ঞলি দেবীর ডাক আসে অজ্ঞলি দেবী ইতস্তত করতে থাকে একটু ভয় লাগে ভেতরে যাওয়ার জন্য তবুও সাহস করে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে। আজ ইন্টারভিউ বোর্ডে রয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এবং এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পিয়ালি সেন নিজে, আর অপর দুজন শিক্ষিকা। অজ্ঞলি দেবী সবাই কে হাত জোড় করে প্রণাম জানায়। প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালি সেন অজ্ঞলি দেবীকে সামনের চেয়ারে বসতে বলেন আর নিজে উঠে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা জল ওনার দিকে এগিয়ে দেন। অনেকক্ষণ বসে থাকার ফলে অজ্ঞলি দেবীর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। অজ্ঞলি দেবীর সামনে ঠান্ডা জলের গ্লাস হাতে পিয়ালি সেন বলেন আপনি জলটা খেয়ে নিন মা তারপর কথা হবে। অজ্ঞলি দেবী তার শীর্ণ হাতটা বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা নেন, তার কানে পিয়ালি সেনের মা ডাকটা বারবার বাজতে থাকে অজ্ঞলি দেবী পিয়ালি সেনর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মনে হয় তার মৃত মেয়ে যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।অজ্ঞলি দেবী মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে নেন,কিন্ত পিয়ালি সেনের চোখে ফাঁকি দিতে পারেনা। এবার পিয়ালি সেন নিজের চেয়ারে বসেন। অজ্ঞলি দেবী কিছু বলার অগেই পিয়ালি সেন বলেন মা আমি বুঝতে পারছি এই কাজটা আপনার খুব দরকার কিন্তু এই বয়সে আপনি পারবেন কি। এবার অজ্ঞলি দেবী বলেন তুমি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হলেও আমার মেয়ের মতো তুমি যখন আমাকে মা বলে ডেকেছ তোমার কাছে আমার কোনো কথা গোপন করার নেই। এরপর অজ্ঞলি দেবী তার জীবনের সমস্ত গল্প নাতনি মুন্নীর বিষয়ে সংসারে অভাবের কথা বলেন,সব শেষে তার বহু পুরনো রঙ চটা মাধ্যমিক পাসের সর্টিফিকেট দেখায় যা আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সুটকেস বন্দি হয়েছিল। এবার পিয়ালি সেন আর কথা না বাড়িয়ে অজ্ঞলি দেবীকে বলেন আপনি আগামী কাল থেকে আমার স্কুলে কাজে যোগ দিন,আগামীকাল আপনার সমস্ত কিছু লিখিত ভাবে পেয়ে যাবেন, তবে আমার একটা সর্ত আছে আগামীকাল আপনি যখন আসবেন আপনার নাতনিকে সাথে করে নিয়ে আসবেন ওকে এই স্কুলে ভর্তি করে নেওয়া হবে আর ওর লেখাপড়ার সমস্ত দায়িত্ব এই স্কুল বহন করবে। অজ্ঞলি দেবী উঠে এসে পিয়ালি সেনের মাথায় হাত রেখে বলেন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এই বাংলার প্রতি ঘরে যেন তোমার মতো সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। পিয়ালি সেন হাসতে হাসতে বলেন ঠিক আছে আপনি এবার বাড়ি যান,আগামীকাল ঠিক সময়ে নাতনিকে সাথে নিয়ে চলে আসবেন। অজ্ঞলি দেবী বেড়িয়ে যেতেই অপর দুজন শিক্ষিকা পিয়ালি সেনকে বলে বড়দি আপনি এই কাজটা কি ঠিক করলেন।প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালি সেন শুধু একটা কথা বলে উঠে পড়েন বলেন আমি মনে করি সবকিছুর উপরে মানুষের মানবিকতা আর কিছু না।
আগামীকাল থেকে সবার মতো মুন্নীও স্কুলে যেতে পারবে তাই অজ্ঞলি দেবী যতটা খুশি তারচেয়েও বেশি খুশি মুন্নী। রাত কেটে সকাল হতেই দিদা আর নাতনি তৈরি হয়ে নেয় আজ যে দুজনের স্কুলের প্রথম দিন। অল্পদিনের মধ্যেই প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালি সেন বুজতে পারে অজ্ঞলি দেবীর বয়স হলেও তার কাজের উৎসাহ একটুও কমেনি প্রতিটা কাজ নিজের ভেবে করেন। মুন্নী স্কুলে যেতে পেরে খুব খুশি মুন্নীর সাথে সাথে অজ্ঞলি দেবী গোটা স্কুলের মেয়েদের দিদা হয়ে গেছে। মেয়েদের যত রকম অসুবিধা নানা রকম আবদার অজ্ঞলি দেবী হাসিমুখে সামলাতে লাগলেন এখন মুন্নী একা তার নাতনি না গোটা স্কুলের মেয়েরা তার আপন সন্তান। দেখতে দেখতে কখন যে এতগুলো বছর কেটে গেছে কেউ বুঝতেই পারেনা। অজ্ঞলি দেবী একদিন হটাৎ সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন নাফেরার দেশে কিন্ত তার স্মৃতি চিরদিনের জন্য রয়ে গেল স্কুলের প্রতিটা কোনায় কোনায় এখন তার নামে স্কুলের গরীব মেধাবী ছাত্রীরা কলারশিপ পায়। অজ্ঞলি দেবী আশির কোঠায় পা দিয়ে স্কুল থেকে অবসর নেন আর তখন থেকেই প্রধান শিক্ষিকা পিয়লি সেন তার নামে কলারশিপ চালু করেন। পিয়ালি সেনের অফিস ঘরে অজ্ঞলি দেবীর ছবি টাঙানো থাকে প্রতিদিন তাকে ফুলের মালা পরানো হয় কারন অজ্ঞলি দেবী সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন বয়স যতই হোক কঠিন পরিস্থিতিতে হার না মেনে শিরদাড়া সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয় আর নারী শিক্ষার কতটা প্রয়োজন আছে। দিন কেটে যায় বছর ঘোরে দেওয়ালে টাঙানো কেলেন্ডারের পাতার পরিবর্তন হয়।আজ প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালি সেনের অবসর নেবার দিন, স্কুলের সব ছাত্রী শিক্ষিকা আরো অনেকে এসেছে পিয়ালি সেনকে বিদায় জানাতে,মুন্নীও এসেছে। সবার একটাই চিন্তা পিয়ালি সেন এই গুরু দায়িত্ব কাকে দিয়ে যাবেন,কিন্তু পিয়ালি সেন জানেন তার চোখে একজন আছে যে নিষ্ঠার সাথে এই গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারবে সে মীনাক্ষী গুপ্ত। পিয়ালি সেন স্টেজে উঠে সবার সামনে বলেন আজ আমি নিশ্চিন্ত মনে অবসর নিতে চলেছি কারন আমার নিজের হাতে গড়া এই স্কুলের গুরু দায়িত্ব পালন করবে মীনাক্ষী গুপ্ত যে কিনা একদিন এই স্কুলের ছাত্রী ছিল আমি তাকে স্টেজে আসতে অনুরোধ করছি,মুন্নী এগিয়ে গিয়ে পিয়ালি সেনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে পিয়ালি সেন মুন্নীকে বুকে জড়িয়ে ধরেন আর তখনি সবাই একসাথে করতালি দিয়ে মন্নীকে স্বাগত জানায়। মুন্নী আজ মীনাক্ষী গুপ্ত, মহামায়া বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। মীনাক্ষী গুপ্তকে প্রধান শিক্ষিকা পেয়ে ঘোটা স্কুলের ছাত্রী শিক্ষিকা সবাই খুশি। আজ থেকে মুন্নীর কর্ম জীবন শুরু যে স্কুলে মুন্নী একদিন দিদার হাত ধরে লেখাপড়া শুরু করেছিল আজ উচ্চশিক্ষা শেষে তার উপর এতো বড়ো গুরু দায়িত্ব পড়বে সে কোনদিন ভাবতেই পারেনি। এখন প্রধান শিক্ষিকার চেয়ারে মীনাক্ষী গুপ্ত বসে আছে তার টেবিলে সাজানো রয়েছে দুজনের ফটো একজন তার দিদা অজ্ঞলি দেবী যে সারা জীবন তাকে মানুষ করার জন্য যুদ্ধ করে গেছে আর একজন পিয়ালি সেন যে তার শিক্ষিকা গুরু এবং পথ প্রদর্শক। দুজনের ফটোতে মালা পরিয়ে মীনাক্ষী গুপ্ত মনে মনে প্রার্থনা করে তোমরা সবসময় আমার সাথে থেকো আমি যেন এই গুরু দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারি। মুন্নীর দুচোখ আনন্দে জল ভরে আসে।।