Shah Jahangir

‎অনুদানের খসড়া
‎শাহ্ জাহাঙ্গীর

‎‎ফাইলটার ওপর লেখা ছিল—”বাউল সেবা সংঘ, প্রতিষ্ঠাকাল ২০১৮।” সংস্কৃতি অধিদপ্তরের করণিক আফজাল সাহেব ফাইলটা টেবিলে রেখে চশমাটা মুছলেন। এই নিয়ে তৃতীয় বছর এই সংগঠনের নামে অনুদান ছাড় হচ্ছে। তিনবারই কাগজ নিখুঁত। তিনি জানতেন, সই করলে কাজ শেষ—প্রশ্ন তোলার দায় তাঁর নয়। তবু এবার তিনি সরেজমিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাঁর চাকরিজীবনে সচরাচর নেননি।

‎‎ঠিকানায় লেখা বাড়িটা খুঁজে পাওয়া গেল না। থানা শহরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সংঘের “কেন্দ্রীয় কার্যালয়” একটা ওষুধের দোকানের ওপরতলায়।

‎‎মজিদ মিয়া বসে ছিলেন পুরনো টেবিলের পাশে। আফজাল সাহেব ভেবেছিলেন একজন প্রতারকের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু মজিদ মিয়ার কথায় কোনো অপরাধবোধ ছিল না।

‎‎”স্যার, আমিও এককালে গান গাইতাম। এখন শরীরে কুলায় না। ভাবলাম, কাগজে-কলমে হলেও বাউলগো নাম বাঁচায় রাখি। টাকাটা যে খারাপ জায়গায় যায়, তাও না—দুই-একজন বুড়া বাউলরে সাহায্যও করি মাঝেমইধ্যে।” তিনি একটা রসিদের খাতা বের করলেন, কিছু নাম আর সামান্য টাকার হিসাব লেখা।

‎‎আফজাল সাহেব বুঝলেন না, এটা প্রমাণ নাকি আরেকটা অভিনয়। “কতজন প্রকৃত বাউল আপনার সংঘের সদস্য?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

‎‎”সদস্য বলতে যা বোঝেন, সেইভাবে না, তয় আমি যাগো চিনি, তাগো নাম খাতায় লেখা আছে।”

‎‎সেই বিকেলেই তিনি নদীর ধারে একটা আখড়ায় পৌঁছালেন। উঠোনে একজন বৃদ্ধ বসে একতারার তার বাঁধছেন। নাম করিম বাউল। তার বাঁধা শেষ করে টুং করে বাজালেন, কান পেতে শুনলেন সুর ঠিক আছে কি না।

‎‎”বসেন,” তিনি বললেন। “চা হবে, তবে দুধ নাই।”

‎‎করিম বাউলের কোনো নিবন্ধিত সংগঠন নেই। বছরে দু-একটা মেলায় গান গেয়ে যা জোটে, তাই দিয়েই চলে । সরকারি অনুদানের কথা শুনে তিনি একতারাটা কোলে নিয়ে একটু হাসলেন।

‎‎”শুনছি বাবা। ফরম নাকি ভরতে হয়। আমি তো লেখাপড়া জানি না। যে লেখে দিবে, তার হাতেও তো কিছু গুঁজে দিতে হয়, সেইটা আমার নাই।”

‎‎তিনি দেয়ালের দিকে ইশারা করলেন। একটা পুরনো সাদাকালো ছবি টাঙানো। তিরিশ বছর আগে জেলা সদরে গান গাওয়ার ছবি, একতারা হাতে। “এইটাই আমার সার্টিফিকেট। কোনো অফিসে জমা দিই নাই কোনোদিন। কে নিব শুনি?”

‎‎সন্ধ্যা নামছিল। করিম বাউল চোখ বন্ধ করে সুর ধরলেন। গান শেষ হলে চোখ খুললেন। “কেমন লাগল?”

‎‎আফজাল সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না সহজে।

‎‎ফেরার পথে তাঁর মনে পড়ল, এই মাসেই ছেলের কলেজ ভর্তির টাকা লাগবে, আর প্রমোশনের ফাইলটা বছরখানেক ধরে ঝুলে আছে। যে ফাইলে প্রশ্ন তোলে, সে ফাইলের পেছনে সময় নষ্ট করে। এই কথাটা সহকর্মীরা প্রায়ই বলেন।

‎‎অফিসে ফিরে তিনি রিপোর্ট লিখলেন। মজিদ মিয়ার সংঘের নথি সংযুক্ত করলেন। 

‎ফাইলটা জমা দেওয়ার আগে একতারা হাতে করিম বাউলের ছবি তাঁর চোখে ভেসে উঠলো। 

‎‎আফজাল সাহেব কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন। তারপর ফাইলটার ওপর সিলমোহর বসালেন।

1 Comment
  • শাহ্ জাহাঙ্গীর

    লেখা জমা দিয়েছি। অনুগল্প : অনুদানের খসড়া।

    Reply · 21 hours ago