Suchandra Bose

শিকড়ের স্বাধীনতা
সুচন্দ্রা বসু

অরণ্য স্থানীয় একটি বন সংরক্ষণ দলের সঙ্গে কাজ করে। সে খাঁচার ভিতর কালো লোমশ ভালুক দেখে জিজ্ঞেস করল, “এটা এখানে কেন?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের প্রবীণ বিরসা মুর্মু বললেন, “উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকদিন মানুষের কাছে ছিল। এবার ওকে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”
ঠিক তখনই অরণ্যের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। গ্রামের মেলায় এমন ভালুককে ডুগডুগির তালে হাঁটতে দেখেছিল সে। তখন বুঝতে পারেনি, সেই ‘নাচ’-এর আড়ালে কতটা ভয় আর অসহায়তা লুকিয়ে থাকে।
ভালুকটির নাম রাখা হয়েছিল মহুয়া—গ্রামের শিশুরা নামটি দিয়েছিল।
মহুয়া ছিল একটি স্লথ বিয়ার।
বিরসা দূর থেকে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জঙ্গলই ওর আসল ঘর।”
অরণ্য চুপ করে রইল। মহুয়াও তখন জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ছিল।
একদিন অরণ্য বিরসাকে জিজ্ঞেস করল,
এতদিন মানুষের বন্দিদশায় থাকার পর
মহুয়া কি এখন জঙ্গলে থাকতে পারবে?”
বিরসা কিছুক্ষণ ভালুকটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“পারবে। তবে সময় লাগবে।”
দিন যেতে লাগল। মহুয়া ধীরে ধীরে খাঁচার বাইরে গাছপালার দিকে চেয়ে থাকত। বাতাসে নতুন কোনও গন্ধ পেলেই মাথা তুলত।
একদিন ভোরে বন দপ্তরের কর্মীরা এসে মহুয়াকে জঙ্গলের একটি নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।
অরণ্যের চোখ আনন্দে ভরে উঠল।
সেটি ছিল অভয়ারণ্যের এমন একটি অংশ, যেখানে মানুষের যাতায়াত খুব কম। চারদিকে গাছ, ঝোপ আর ছোট জলাশয়। সেখানে কিছুদিন মহুয়াকে নজরে রাখবে। ধীরে ধীরে তাকে জঙ্গলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বিরসা দূর থেকে দেখে শুধু বললেন,
“এবার ও নিজের ঘরে ফিরছে।”

বনকর্মীরা মহুয়ার খাঁচাটা জঙ্গলের সেই নিরাপদ জায়গায় গিয়ে খাঁচার দরজা খুলে দিলেন ।
মহুয়া প্রথমে বেরোল না। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা বাইরে বের করল।
সামনে মাটির ওপর শুকনো পাতা। পাশে বড় একটা গাছ। দূরে জলের শব্দ।
মহুয়া এক পা এগোল।
তারপর আরেক পা।
হঠাৎ সে থেমে মাটির গন্ধ নিল। গাছটার গায়ে নাক ঠেকাল। তারপর মাথা তুলে চারপাশে তাকাল।অরণ্য আর বিরসা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
অরণ্য বলল, “ জায়গাটা ওর ভালো লেগেছে।”
বিরসা হাসল, “এটা তো ওর নিজের জায়গা।”
মহুয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কিছুদূর গিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকাল। তারপর ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
আজ সে নিজের ইচ্ছেমতো হাঁটছে দেখে অরণ্য খুশী।
বিরসা বললেন, এখন থেকে জঙ্গলই ওর ঘর।”
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামে ফিরে অরণ্য দেখল, শিশুরা উঠোনে বসে মহুয়ার গল্প করছে।
একজন বলল, “মহুয়া কি আবার আমাদের কাছে আসবে?”
অরণ্য হেসে বলল, “হয়তো আসবে না।”
“কেন?”
“কারণ এবার ও স্বাধীন।”
বিরসা পাশে বসে ছিলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “কাউকে ভালোবাসলে সবসময় তাকে কাছে রাখতে হয় না। কখনও কখনও তাকে তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে হয়।”
পরদিন সকালে অরণ্য আবার জঙ্গলের দিকে গেল। বিরসাও সঙ্গে ছিলেন।
বিরসা বললেন, “এই জঙ্গল আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। মহুয়া ফুল, শালপাতা, কাঠ, ওষুধ—সবই। কিন্তু আমরা জানি, জঙ্গল থেকে যা নিই, তার সবটাই আমাদের নয়।”
অরণ্য বলল, “মানে?”
“মানে, জঙ্গলে শুধু মানুষ থাকে না। মহুয়ার মতো প্রাণীরও ঘর আছে। সেই ঘরটাকে বাঁচিয়ে রাখাও আমাদের দায়িত্ব।”
সেদিন গ্রামের মানুষদের মধ্যে এই কথাই ছড়িয়ে পড়ল। শিশুরা শিখল, বন্য প্রাণী দেখলে তাদের কাছে যাওয়া যাবে না, খাবার দেওয়া যাবে না। জঙ্গলে আগুন লাগানো যাবে না। গাছ কাটার আগে ভাবতে হবে, সেই গাছের ওপর আর কত প্রাণীর জীবন নির্ভর করে।
বিরসার স্ত্রী ফুলমতি বললেন, “আমাদের পুরোনো লোকেরা এসব জানত। এখনকার ছেলেমেয়েদের আবার শেখাতে হবে।”
সন্ধ্যায় গ্রামের উঠোনে সবাই জড়ো হল। বয়স্করা পুরোনো গল্প বললেন। মহুয়া ফুল দিয়ে কীভাবে খাবার তৈরি হয়, কোন গাছের পাতা কাজে লাগে, কোন ঋতুতে জঙ্গলে কী পাওয়া যায়—শিশুরা মন দিয়ে শুনল।
অরণ্য বুঝতে পারল, এ শুধু একটা ভালুককে বাঁচানোর গল্প নয়।
জঙ্গলকে বাঁচিয়ে রাখা মানে এই মানুষগুলোর জীবনকেও বাঁচিয়ে রাখা।
আর মহুয়াকে নিজের জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া মানে তাকে শুধু স্বাধীনতা দেওয়া নয়—তার নিজের পৃথিবীটাকেও সম্মান করা।
দূরে তখন জঙ্গলের ভিতর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
পাতা নড়ল।
সবাই চুপ করে তাকিয়ে রইল।
কেউ জানে না, মহুয়া কোথায় আছে।
তবু বিরসা মৃদু হেসে বললেন,
“ও আছে। নিজের মতো আছে। এইটুকুই তো চাই।”
অরণ্য জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হল, স্বাধীনতার আসল অর্থ হয়তো আজই সে বুঝতে পারল।
যে যার নিজের পৃথিবীতে নিরাপদে বাঁচতে পারা—সেটাই স্বাধীনতা।
কয়েক সপ্তাহ পরে এক সকালে বন দপ্তর থেকে অরণ্যের কাছে খবর এল—মহুয়া এখন বেশ ভালো আছে।
খবরটা শুনে অরণ্য সোজা বিরসার বাড়িতে গেল।
“কাকা, মহুয়া ভালো আছে।”
বিরসার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“তাহলে ও সত্যিই নিজের ঘর চিনে নিয়েছে।”
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের শিশুরা মহুয়া গাছের নিচে বসেছিল। ফুলমতি তাদের পুরোনো একটি গল্প শোনাচ্ছিলেন—কীভাবে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এই জঙ্গলের সঙ্গে মিলেমিশে জীবন কাটাতেন।
একটি শিশু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “মহুয়া কি আমাদের মতোই এই জঙ্গলের বাসিন্দা?”
বিরসা বললেন, “হ্যাঁ। তবে ওর নিজের নিয়মে।”
শিশুটি আবার বলল, “তাহলে আমরা কি ওর বন্ধু?”
বিরসা হেসে বললেন, “বন্ধু হতে হলে ওকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে।”
সবাই চুপ করে গেল।
দূরে সন্ধ্যার অন্ধকারে জঙ্গল ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছিল।
অরণ্য ভাবল, একসময় মানুষ মহুয়াকে খাঁচায় রেখে তার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। আজ মানুষই তাকে সেই স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু শুধু মহুয়াকে মুক্ত করলেই তো দায়িত্ব শেষ হয় না। তার জঙ্গলটাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কারণ জঙ্গল হারালে মহুয়ার আবার বন্দি হওয়ার ভয় থাকবে। আর জঙ্গল হারালে এই গ্রামের মানুষও হারাবে তাদের বহু বছরের জীবন, সংস্কৃতি আর স্মৃতি।
বিরসা ধীরে ধীরে বললেন,
“মনে রাখিস, শিকড় শুধু গাছের থাকে না। মানুষেরও থাকে। আর যার শিকড় কেটে দেওয়া হয়, সে যত দূরেই যাক, নিজের জায়গাটা খুঁজতে থাকে।”
অরণ্য জঙ্গলের দিকে তাকাল।
মহুয়া হয়তো সেখানে কোথাও আছে।
দেখা যাচ্ছে না।
রাত নামল।
দূরের জঙ্গলে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যে কোথাও মহুয়া নিজের নতুন জীবনের পথ খুঁজে নিচ্ছিল।
কোনও দড়ি নেই।
কোনও খাঁচা নেই।
কোনও ডুগডুগির শব্দ নেই।
শুধু নিজের অরণ্য।
নিজের মতো করে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা।
জঙ্গলের গভীরে, মানুষের চোখের আড়ালে, মহুয়া নিজের মতো করে হাঁটতে থাকল।
তার পথ এবার তার নিজের।
সেই পথের নাম—স্বাধীনতা।

0 Comments