শতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
শাহ্ জাহাঙ্গীর
মহাকালের বহমান স্রোতে শতবর্ষ এক ক্ষুদ্র ক্ষণমাত্র। কোনো কোনো জীবন এই স্বল্প পরিসরেই সময়ের গায়ে এমন এক স্থায়ী স্বাক্ষর এঁকে দিয়ে যায় যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অম্লান থাকে। বাংলা সাহিত্যাকাশে সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক নক্ষত্র। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের এই মহালগ্নে দাঁড়িয়ে পেছনের এক শতকের বাংলা কাব্যপ্রবাহের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। কী বিপুল দ্রোহ, আর কী গভীর মমতায় তিনি সাজিয়েছিলেন তাঁর পংক্তিমালা!
কল্লোল-উত্তর বাংলা কবিতায় যখন একধরনের নাগরিক ক্লান্তি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতাশা আর নিভৃত ব্যাকুলতার মেলা বসেছিল, ঠিক তখন উল্কাপিন্ডের মতো সুকান্তের আগমন। তিনি কবিতাকে নন্দনতাত্ত্বিক কারুকাজ বা কল্পনার দূরবর্তী নক্ষত্রলোক থেকে টেনে নামিয়েছেন রাজপথের রূঢ় বাস্তবের মাটিতে।
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝালসানো রুটি”
চাঁদের মতো সনাতন রূপকও তাঁর হাতে হয়ে ওঠে বুভুক্ষু মানুষের জঠরজ্বালার প্রতীক।’রানার’-এর ক্লান্ত পদক্ষেপের আড়ালে তিনি আঁকেন শ্রমজীবী মানুষের অবমূল্যায়িত জীবনের নিখুঁত কোলাজ আর ‘আঠারো বছর বয়স’-এ স্পন্দিত করে তোলেন যৌবনের দুর্জয় আত্মপ্রত্যয়কে।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে,অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে—সুকান্ত কি কেবল অতীতের কোনো বিপ্লবী অধ্যায়? উত্তর হলো—না। বিশ্বজুড়ে আজও শোষণ, বৈষম্য আর প্রাচুর্যের পাশে দারিদ্র্যের বৈপরীত্য। আজ যখন নতুন প্রজন্ম এক অবক্ষয়গ্রস্ত জীর্ণ পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিশা খোঁজে, তখন সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ তাদের চিরন্তন দিশারী হয়ে ওঠে:
”এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান…
চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর আবর্জনা পরিষ্কার করে যাব।”
শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আজ বাংলা কবিতার এই অনন্য অগ্নিপুরুষকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর কলম আজও আমাদের প্রাত্যহিক লড়াইয়ের অদম্য অনুপ্রেরণা।