Sudip Ghoshal

অগ্রগামী অপেরা
সুদীপ ঘোষাল

এক

পূর্ব বর্ধমান জেলার অজয়পাড়ের গ্রাম কেতুগ্রাম। গোপালবাবু অগ্রগামী যাত্রাগোষ্ঠীর পরিচালক। তিনি নিজেও ভালো অভিনয় করেন।
১৯৮০ সাল থেকে তপনবাবুর অপেরা,স্বপনবাবুর যাত্রাদল,বীণা দাশগুপ্তার যাত্রা দেখে গোপালবাবু অভিজ্ঞ হয়েছেন।তারও একটা আ্যামেচার যাত্রাদল আছে।কোথাও যাত্রা হচ্ছে শুনলে আর রক্ষা নেই।শিশিরবাবু,হেমন্তবাবু,স্বপনবাবু,তড়িৎবাবু,বুলুবাবু,অলোকবাবু,অমরবাবু ও আরও অনেকেই যাত্রাশিল্পে পারদর্শী। গোপালবাবু মধ্যমণি।
গোপালবাবু ও শিশিরবাবু যাত্রা বিশেষজ্ঞ। তিনি যুবকদের যাত্রাশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেন। অরিন্দম বলে, যাত্রা করে এখন পেট ভরবে। কেউ দেখবে না। শিশিরবাবু বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারলে এই শিল্প চলবে নিশ্চয়। অরিন্দম গোপালবাবু ও শিশিরবাবুর কাছে যাত্রাশিল্প সম্বন্ধে জানতে পারে অনেককিছু। অরিন্দম যাত্রার পাঠ নেয় গোপালবাবুর কাছে। গোপালবাবু বলেন, অষ্টাদশ শতকে(১৭০০ সাল) যাত্রা বাংলা ভূখণ্ডের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ। উনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল প্রসিদ্ধি পায়। সে সময় কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রানী, ইত্যাদি প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির অভিনয়ও প্রচলিত ছিল।
শিশিরবাবু বলেন, বিংশ শতকের শেষে এবং বিশশতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুকুন্দ দাশ। তার প্রকৃত নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর। তিনি বিক্রমপুর থেকে বরিশাল গিয়ে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী অশ্বিনী কুমারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুকুন্দ দাশ যাত্রার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেন। তিনি সমাজ সংস্কার মূলক বক্তব্য, পণপ্রথা, জাতিভেদে ইত্যাদির বিপক্ষেও বক্তব্য প্রচার কররেন। তিনি ‘স্বদেশী যাত্রা’র সূচনা করেন। সে কারণে তাকে কারাবন্দিও থাকতে হয়। মুকুন্দ দাশের প্রেরণায় আরও অনেক স্বদেশী যাত্রার দল গড়ে ওঠে। তারা গ্রামে গ্রামে যাত্রার প্রদর্শন করে দেশপ্রেমমূলক কাহিনি প্রচার করতে থাকে। সে সময় ঈশা খাঁ, প্রতাপচন্দ্র, বারো ভুঁইয়া, সোনাভান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ক্ষুদিরাম ও অন্যান্য বিপ্লবীর নামেও কাহিনি অভিনয় হতে থাকে। স্বদেশী যাত্রা একসময় ইংরেজ শাসকদের রোষানলে পড়ে।মুকুন্দ দাসের আগে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী নামে একজন পালাকার ‘স্বপ্নবিলাস’, ‘দিব্যোন্মাদ’, ‘বিচিত্রবিলাস’ পালা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। ১৮৬০-১৮৭৮ এর মধ্যে তার পালা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় এবং ঢাকাতেই প্রথম মঞ্চায়ন হয়। মনোমহন বসু নামেও আরেকজন পালাকার বেশ বিখ্যাত ছিলেন। নওগাঁজেলার ধামুরহাট থানার শ্রামপুর গ্রামে নফরউদ্দিন নামে আরেকজন পালাকার প্রথমে রাজনীতিকেন্দ্রিক পালা লিখে বেশ খ্যাতি পান। পরে তিনি মধুমালা, সাগরভাসা, কাঞ্চনবতী, বিন্দুমতি, পুষ্পমালা ইত্যাদি রূপকাথাভিত্তিক পালা লেখেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক মীরমোশাররফ হোসেনও পালা লিখেছেন। তিনি বেহুলা নিয়ে যাত্রাপালা লেখেন।গোপালবাবু বলেন, ঠিক সে সময় গ্রামে গঞ্জে বিষাদসিন্ধুর কাহিনি নিয়েও যাত্রা অভিনয় হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে যাত্রা পালা লেখা হতো।মানিকগঞ্জের ধানেশ্বরের আব্দুল করিম, নরসিংদির জালাল উদ্দিন, হিরেন্দ্র কৃষ্ণদাস, মুন্সিগঞ্জের আরশাদ আলী , ঢাকার কেরাণীগঞ্জের রফিকুল,পটুয়াখালির দুধল গ্রামের মাস্টার সেকেন্দার আলি, খুলনার ডুমুরিয়ার এম এ মজিদ (অগ্রদূত), ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের কফিল উদ্দিন ও মানিকগঞ্জ সদরের ডা. আবেদ আলীসহ অনেকেই সেসময় যাত্রা পালা লিখতেন।বিশ শতকে রূপবান-রহিম বাদশাহ, মালকা বানু, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, গুনাইবিবি, দুর্গামনি, কমলা রানীর বনবাস, কাজল রেখা, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী, সোনাভান, বীরাঙ্গনা সখিনা, গাজী কালু চম্পাবতী, বনবিবি ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়।১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনেক পালাকার ও যাত্রাদল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের লোকজ সংস্কৃতিকে কখনও সুনজরে দেখেনি।যাত্রাপালা ধর্মবিরোধী কাজ এমন ফতোয়াও জারি হয়েছে কখনও কখনও। অনেক গ্রামে ধর্মান্ধ গোষ্ঠি একত্রিত হয়ে অভিনয় বন্ধ করে দিয়েছে।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে অনেক যাত্রাদল নতুনভাবে গড়ে ওঠে। মাইকেল মধুসূদন, দেবদাস, রক্তাক্ত বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বিজয় এনেছি, মা মাটি মানুষ, সোনার বাংলা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন ফকির, ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অমলেন্দু বিশাস, জ্যোস্না বিশ্বাসসহ অনেক যাত্রাশিল্পী ছিলেন নামকরা। সত্তর দশকের শেষভাগ এবং বিশেষ করে আশির দশকে যাত্রাশিল্পে অবক্ষয় শুরু হয়। তখন যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশিত হতে থাকে। আবহমান কাল ধরে চলে আসা এই শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি হয় যাত্রার আসরে জুয়া ও অশালীন নাচের কারণে। যাত্রার আসরে সখী নৃত্য একসময় প্রচলিত ছিল যা কিছুটা অসংস্কৃত হলেও তাকে ঠিক অশালীন বলা যেত না। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রামগঞ্জে পর্নগ্রাফির প্রভাবে প্রিন্সেসের নাচের নামে যাত্রার আসরে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রার প্রিন্সেস, সখীনৃত্য ইত্যাদির নামে চলে অশালীন নৃত্য।শিশিরবাবু বলেন, আমি আপনার লেখা” যাত্রা “বইয়ে পড়েছি যাত্রাকে অশালীনতা থেকে মুক্ত করতে এবং যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে নতুন শতকে তৈরি হয় যাত্রা নীতিমালা। ২০১২ সালে যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এখনকার নামকরা যাত্রাদলগুলো হলো যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্টসংস্থা, মাগুরার চৈতালি অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙমহল অপেরা, ফরিদপুরের মধুচ্ছন্দা যাত্রা ইউনিট, নাটোরের পদ্মযাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট ইত্যাদি।
গোপালবাবু বলেন, বাঙালির বিনোদনের একটি প্রধান অনুসঙ্গ ছির যাত্রা পালা।‌ এর মধ্য দিয়ে শুধু বিনোদন নয় পুরাণ, ইতিহাস, লোকজ সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ চলতো।এখন সিনেমা, টেলিভিশনের কল্যাণে বিনোদনের রূপ পালটেছে। কিন্তু যাত্রার আবেদন গ্রামের মানুষের কাছে এখনও রয়েছে। রাতের পর রাত জেগে যাত্রার কাহিনি, অভিনয়, গানের মাধ্যমে লোকজ নীতিবোধ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে শিক্ষা নেয় দর্শকরা। যাত্রা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের অধিকতর পৃষ্ঠপোষকতা।ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় একটি গ্রামের নাম রূপাডিহি। সবুজ সবুজ গাছের মন কেড়ে নেওয়া শীতলতা মনমাতানো বিশুদ্ধ বাতাস আর শীতল জলের সংস্পর্শে এই রূপাডিহিতে প্রত্যেক লােকই যেন প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য ভুলে থাকতে। এই গ্রামে ছোট্ট একটি পাড়ায় অরিন্দমের বাস। অরিন্দম, অরিন্দম রায়। মদনমােহন রায়ের মেজ পুত্র অরিন্দম। আর দুই ছেলে বড়টির নাম সােহন, ছােট পুত্রের নাম শোভন। দুই কন্যা অনীতা আর দেবিকা। মদনমােহনের স্ত্রী সবিতাদেবী। সাতপাক ঘােরার পর থেকে বিলাসিতার মধ্যে কাটাতে পারেন নি সত্য, কিন্তু স্বামী, পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে তিনি শান্তিতেই থাকেন। মধ্যবিত্ত পরিবার বলা চলে। বড় পুত্র সােহন একটি বেসরকারী কারখানায় কর্মী আর মদনমােহন ছােট্ট একটি মুদির দোকানের মালিক। এই সামান্য আয়ের উপর নির্ভর করে সাত সদস্য বিশিষ্ট সংসারটি ‘সংসার সমুদ্রে কোনও রকমে হাল ঠিক রেখে চলছিল। আজ ২০ শে ফাল্গুন। মদনমোহনের বড় ছেলে সােহনের বিবাহ। রূপাডিহির পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা শুভঙ্কর গাঙ্গুলির বড় কন্যা মনীষার সঙ্গে ভালােবাসা ছিল সােহনের। তাছাড়া মদনমােহন ও শুভঙ্কর দুইজনে বরাবর একই সঙ্গে মেলামেশা করায় তাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। তারই পরিণতি এই বিবাহে, এই বন্ধনে। কিন্তু আশ্চর্য যে এই গােপন পরামর্শ সােহন এবং মনীষা কিন্তু ঘুণাক্ষরে জানতাে না। যখন মনীষা এগারাে বৎসরের তখন শুভঙ্করবাবু একবার কন্যাকে নিয়ে সােহনদের বাড়িতে আসেন মদনমােহনের সঙ্গে দেখা করার জন্যে। ষােল বৎসরের সােহন তখন। পড়াশােনায় ব্যস্ত। হঠাৎ সুন্দরী কিশােরী মনীষার দিকে নজর যাওয়াতে সেই চোখ আর ফিরতে পারেনি। ক্রমে সেই ভালােলাগা ভালােবাসায় পরিণত হয়। তারপর কত রাগ অনুরাগ, কথার পথ পেরিয়ে আজ সেই শুভদিন। উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনির মাঝে সকল চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে থেকেও সােহনের মা, বাবা কিন্তু ঈশ্বরের প্রার্থনায় মগ্ন! তারা চিন্তা করছিলেন কি করে বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তারা আজ কিছুটা সুখের মুখ দেখতে পাচ্ছেন। চিন্তা করছেন এইবার বৌমার হাতে সংসারের ভার অর্পণ করে সুখী হবেন মদনমােহন বলছিলেন সবিতাদেবীকে মনে পড়ে তােমার, একবার সােহন পুকুরে ডুবে গিয়েও বেঁচে গিয়েছিল। সবিতা দেবী বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, ওঃ তুমি সেই দুঃখের রাত্রির কথা আর বােলােনা, ওকথা শুনলে আমার কেমন ভয় করে। আজ শুভদিনে শুধু ঈশ্বরের কাছে সােহন আর বৌমার শুভ প্রার্থনা করি। ইত্যবসরে অরিন্দম। আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে গানটি আবৃত্তি করতে করতে এসে বলল মা শুধু দাদা আর বৌমা ভালাে থাকবে আর আমরা -সবিতা দেবী। কথার মাঝেই বলে উঠলেন, ওরে গাছের গোড়ায় জল দিলে কি আর কেউ গাছের ডগায় জল দেয়। তারা তাে একই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা। অরিন্দম মায়ের কথায় প্রীত হয়ে কাজের কথায় ফিরে এসে বাবাকে বললাে, বাবা আমাদের কাজ মােটামুটি শেষ। এখন তােমরা দুজনে কিছু খেয়ে নিলেই ব্যাস ফিনিস।রাত পোহালো। কেকিল ডাকলো। শােভন আজ সকালে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কার কত বয়স হলাে তারই হিসাব করছিলাে। চিন্তা করে দেখল তার বাবা ষাটে পা দিয়েছেন। মা একান্ন। আর বড়দি অনীতা বত্রিশ, তার বিয়ে হয়েছে আজ বছর দশেক হলাে। বড়দা ত্রিশ, বৌদি বাইশ, অরিন্দমদা চব্বিশ আর ছােটবােন দেবীকা সতের। শােভনের নিজের বয়স কুড়ি বৎসর দুই মাস। ভাবছে বয়স তাে ভালােই হল।এবার সাবধানে চলতে হবে।

দুই

সুন্দর চরিত্রের দাদা বৌদি আর দেব-দেবী পিতা মাতাকে ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছাও করে না শােভনের। শােভন যাচ্ছিল সােনা-দিঘি গ্রাম, তাদের গ্রামের পাশেই গ্রাম। এক মাইল দূরত্ব। সেখানে থাকে তার এক অন্তরঙ্গ কাকু অশােক। অশােকের মা বাবা সবাই আছে আর আছে এক বােন নাম অপর্ণা। সুন্দরী, তন্বী মেয়ে। অতি ভদ্র, লেখাপড়ার দিক থেকে খুবই ভালাে। অশােক বেশিরভাগ সময়ে শােভনের কাছে আসে, কিন্তু মাঝে মধ্যে তাে বন্ধুর বাড়ী যেতে হয় এই বলে শােভন তাদের বাড়ী যায়। শােভনের যাবার আরও একটি কারণ ছিল। তার হল অশােকের বাবার আন্তরিকতার আকর্ষণ। পদ্মপুকুরের পাড় ঘুরতেই একটা মিষ্টি কণ্ঠের আওয়াজ শােভনের এলাে। এই শােভনদা, যাচ্ছেন কোথায় আরে আরে এইদিকে তাকান, শােভন ঘুরে দেখে অপর্ণা সঙ্গে আর একটি মেয়ে। শােভন তাকে চেনে না। শােভনের অত পর্যবেক্ষণ করারও কোন প্রয়ােজন ছিল না বলে অপর্ণাকে বলল, “তােমাদের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম, অশােক ধরে আনল। “হ্যাঁ” ছােট্ট একটি উত্তর দিয়েই অপর্ণা বান্ধবীর সাথে কথা বলতে শুরু করল। শােভনও আপন পথে পা বাড়ালাে। দেবীকার সঙ্গে অপর্ণার হয়তাে কোন পরিচয় নেই। একদিন পরিচয় করিয়ে দিতে হবে চিন্তা করে শােভন একটি গান ধরলাে। অশােকের নাম ধরে ডাকতেই সে বেরিয়ে এলাে একটি কলম হাতে। দীর্ঘকায়, সুঠাম সবল একুশ বৎসরের এক যুবক অশােক। মুখে চাপ দাড়ি আর সুন্দর তার মুখের গড়ন। সম্পাদক হয়ে ঝামেলার অন্ত নেই মাইরি। এইমাত্র একটা রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকা শুরু করেছি, আর কে কি আবৃত্তি করবে, কে গান করবে এইসব ঠিক করে নিই।প্রোগ্রাম তৈরী করছিলাম আর কি। অশোকের বাবা মৃন্ময় মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে ধারে ধীরে তাদের দিকে আসতে দেখে দুই বন্ধু চুপ করে গেল। মৃন্ময় বাবু বলে উঠলেন, কি শোভন কেমন আছে? পড়াশুনা কেমন চলছে?শােভন তাড়াতাড়ি উঠে মৃণ্ময়বাবুকে প্রণাম করে বললাে, চলে যাচ্ছে কাকাবাবু একরকম। আর এবার তাে আমার সেকেণ্ড ইয়ার হল।

-হ্যাঁ তুমি আর অশােক তবে দুজনেই বি.এ. সেকেণ্ড ইয়ারে পড়াে। তবে কি জানাে পাশ কোর্সে পড়ে। এখন আর কোন কাজ হচ্ছে না শোভন। শােভন মৃম্ময়বাবুর কথায় সম্মতি জানিয়ে অন্য প্রসঙ্গ টানলাে।সে বললাে, কাকাবাবু এখন অপর্ণার শরীর কেমন? মৃন্ময় বাবু বললেন, তােমার বাবার থেকে আমি আট বছরের ছােট। তাও দেখ আমার শরীরের অবস্থা, এজমা রোগী। এখনই ভালাে, তখনই মন্দ। যাহােক তােমর তাহলে গল্প করাে আমি একটু ঘুরে আসি। আর, তুমি এখন আমাদের এখানে বড় একটা আসাে না তাে? আসবে, আসবে তােমার সাথে কথা বলে শান্তি পাই। এই কথা বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে গেলেন।

– তারপর তুই কি করছিস বল? বলে অশােক ভালাে করে বসলো। অশােক ভালাে করে বসলাে। কিন্তু শােভন বলে, চল রাস্তায় খেতে খেতে বলা যাবে, পাঁচটা বাজে। অগত্যা শোভনের কথায় রাজি হল। শোভন বলল, যাবার সময় কাকীমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। আর আপনাকে বললাম তোমাকে একদিন আমার বোনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। অনিল আজ অপর্ণাকে বললাে, আরে মশাই দেবীকা হচ্ছে আমার প্রিয় বান্ধবী। অরিন্দম দুপুরটা অভিনয় আর আবৃত্তির চর্চা করে কাটিয়ে দিলাে। চারটি ঘরের মধ্যে, একটি ঘর নিজের মতাে করে সাজিয়ে নিয়েছে এবং তা ব্যবহার করে। শুধুমাত্র কিছু সময় দিয়ে সে শুধু নিজের সাধনা চালিয়ে যায়। যতরকম অভিনয় সংক্রান্ত উপদেশমূলক বই আছে তার কোনটাই তার বাদ যায়নি। আবার মাঝে মধ্যে সে গােপালবাবুর কাছে.যায়। গােপালবাবু একজন সুদক্ষ অভিনেতা ও বিশেষজ্ঞ । তার কাছে গিয়েও অনেক উপকার হয় অরিন্দমের। কিন্তু মন তার বােঝে না। শুধুমাত্র অভিনয় শিখে একটা মানুষ তার সব আশা পূর্ণ করতে পারে। গােপালবাবু বলেন, অভিনয় সর্বপ্রথমে জ্ঞান দেয়, সম্মান দেয় আর তার সঙ্গে দেয় অর্থ। সেই অর্থই এখন প্রয়ােজন অরিন্দমের। দ্বাদশ শ্রেণি অবধি পড়ে আর পড়াশুনা হয়নি অরিন্দমের। কিন্তু অরিন্দম বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ এবং শান্ত প্রকৃতির। গোপালবাবু বলেন, অরিন্দম অভিনয় কখনও অভিনয় বলে নিও না। চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করাে, তারপর তােমার ভাব প্রকাশ করাে। | এইসব চিন্তা করতে করতে অরিন্দম প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাে আর ঠিক সেই মুহুর্তে বৌদি মনীষা এসে বললাে, ঠাকুরপাে এখনও তােমার অভিনয় সাঙ্গ হলাে না। এবার ওঠো জাগাে চেয়ে দেখাে, সম্মুখে রয়েছে এক পেয়ালা চা আর — ‘মাের মাতৃসমা স্নেহশীলা বৌদি।। বাব্বা! তুমি এতও পারাে বলে বৌদি কাজে চলে গেলেন। বিকালে এক কাপ চা। পেলে যেন অরিন্দম হাতে স্বর্গ পায়। কিন্তু আবার ভাবে এক কাপ চায়েরও দাম চল্লিশ পয়সা। অরিন্দম ভাবলাে চাকরী তাকে একটা জোগাড় করতেই হবে। আরে কি চিন্তা করছিস। চল। চল একটু ঘুরে আসা যাক, সুব্রত বললাে।

তিন

শিশিরবাবু বলেন, রাতের পর রাত জেগে বাংলার সাধারণ মানুষ কৃষক, তাঁতী, কামার ,কুমার, জেলে দেখেছে যাত্রায় কাহিনি আর মেতেছে পালা গানের সুরে। কখনো ভক্তি, কখনো ভালোবাসা, কখনো দেশপ্রেম তাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আবার সামন্ত রাজা, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষও যাত্রা দেখেছে। জমিদারবাবু তো আর সাধারণ প্রজার সঙ্গে যাত্রার আসরে গিয়ে বসবেন না। বরং তার প্রাসাদের নাটমণ্ডপেই বসবে যাত্রার আসর। জমিদারবাড়িতে থাকতো বিশাল নাটমণ্ডপ। সেখানেই যাত্রা, পালাগান, কীর্তনের আসর বসতো। চিক বা পর্দাঘেরা বারান্দায় বসতেন জমিদার গৃহিনী, রানীমা, পরিবারের নারী সদস্যরা। তারা চিকের আড়াল থেকেই দেখতেন যাত্রা পালা।যাত্রাপালার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। অষ্টম ও নবম শতকেও এদেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পুণ্ড্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখণ্ডে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। ধর্মীয় বা কোনো উৎসবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দটি এসেছে। এদেশে শিবের গাজন, রামযাত্রা,কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসী প্রচলিত ছিল। সেসময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি অভিনয় করে দেখানো হতো। সেখান থেকেই যাত্রার উৎপত্তি। নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর কৃষ্ণযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কৃষ্ণযাত্রায় মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, কৃষ্ণের বাল্যকাল, মা যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণর বাল্যক্রীড়া, কৃষ্ণের কংসবধ, মথুরা জয় ইত্যাদি কাহিনি অভিনয় ও গানের মাধ্যমে দর্শকদের পরিবেশন করা হতো। দর্শকরা তা দেখে ভক্তিরসে সিক্ত হতেন। রুক্মিণী হরণ নামে একটি কৃষ্ণযাত্রায় চৈতন্যদেব নিজেই অভিনয় করতেন। তিনি রুক্মিণী সাজতেন।জামাটা গায়ে দিয়ে জুতাে পরে বেরিয়ে পড়লাে বন্ধু সুব্রতর সঙ্গে। সুব্রত অরিন্দমের বন্ধু। সুব্রত ব্যানার্জী। সেও অভিনয় করে অরিন্দমের সঙ্গে। অভিনয়কে ভালােবাসে। কিন্তু তার ঘরের অবস্থা অরিন্দমের থেকে ভালাে। ফলে সে অভিনয়টাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় না। নদীর ধারে বসে বসে দুই বন্ধুতে অনেক গল্পই করলাে। তারা আবৃত্তি নিয়ে আলােচনা করল। অরিন্দম আবৃত্তি করে শােনাল সুকান্তের ঐতিহাসিক। “আজ এসাে তােমাদের ঘরে ঘরে পৃথিবীর আদালতের পারায়ানা নিয়ে।” তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। আর আপনাকে বললাম তোমাকে একদিন আমার বোনের সাথে পরিচয় কলি, সী। অনিন আজ গাল অপ্ণা বললাে, আরে মশাই দেবীকা হচ্ছে আমার প্রিয় বান্ধবী। অরিন্দন দুপুরটা অভিনয় আর আবৃত্তির চর্চা করে কাটিয়ে দিলাে। চারটি ঘরের মলো। একটি ঘর নিজের মতাে করে সাজিয়ে নি@েই তা ব্যবহার করে। শুধুমাত্র কিছe দিয়ে সে শুধু নিজের সাধনা চালিয়ে যায় যতরকম অভিনয় সংক্রান্ত উপদেশমূলক আছে তার কোনটাই তার বাদ যায়নি। আবার মাঝে মধ্যে সে গােপালবাবুর কাছে যায়। গােপালবাবু একজন সুদক্ষ অভিনেতা। তার কাছে গিয়েও অনেক উপকার অরিন্দমের। কিন্তু মন তার বােঝে না শুধুমাত্র অভিনয় শিখে একটা মানুষ তার সব আশা পূর্ণ করতে পারে। গােপালবাবু বলেন, অভিনয় সর্বপ্রথমে জ্ঞান দেয়, সম্মান দেয় আর তার সঙ্গে দেয় অর্থ। সেই অর্থই এখন প্রয়ােজন অরিন্দমের। দ্বাদশ শ্রেণি অবধি পড়ে আর পড়াশুনা হয়নি অরিন্দমের কিন্তু অরিন্দম বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ এবং শান্ত প্রকৃতির। গোপালবাবু বলেন, অরিন্দম অভিনয় কখনও অভিনয় বলে নিও না। চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করাে, তারপর তােমার ভাব প্রকাশ করাে। | এইসব চিন্তা করতে করতে অরিন্দম প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাে আর ঠিক সেই মুহুর্তে বৌদি মনীষা এসে বললাে, ঠাকুরপাে এখনও তােমার অভিনয় সাঙ্গ হলাে না। এবার ওঠো জাগাে চেয়ে দেখাে, সম্মুখে রয়েছে এক পেয়ালা চা আর — ‘মাের মাতৃসমা স্নেহশীলা বৌদি।। বাব্বা! তুমি এতও পারাে বলে বৌদি কাজে চলে গেলেন। বিকালে এক কাপ চা। পেলে যেন অরিন্দম হাতে স্বর্গ পায়। কিন্তু আবার ভাবে এক কাপ চায়েরও দাম চল্লিশ। পয়সা। অরিন্দম ভাবলাে চাকরী তাকে একটা জোগাড় করতেই হবে। আরে কি চিন্তা করছিস। চল একটু ঘুরে আসা যাক্। বন্ধু সুব্রত বললাে।কাছে গেছে ভোরে উঠে।অরিন্দম ভাবে চাকরি না হলে যাত্রাদল সে করবেই।

চার

আজ অরিন্দম বাড়িতে মা বাবাকে বলে গোপাল বাবুর গােপালবাবুকে আজ আশেপাশের পাঁচ ছয়টি গ্রাম থেকে একজন করে বা দুজন করে। নিয়ে আর নিজের গ্রাম থেকে আটজন অভিনেতাকে নিয়ে একটি বই মঞ্চস্থ করার। মনস্থ করলেন। তার জন্য তো মহড়ার প্রয়োজন। সেই মহড়ার শুরু আজ থেকে। গোপালবাবুর সেই পুরানো দিনের বাড়ি। বাড়ি বললে ভুল হবে। যেন এক বিরাট প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের সম্মুখে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। হয়ত এটা পূর্বের জমিদার বাড়ির সভাকক্ষ ছিল । গােপালবাবু একজন শিল্পী।তিনি সেই স্থানটিতেই মহড়ার বন্দোবস্ত করলেন। অেক জমায়েত ধনী ব্যক্তির। মহড়া দেবার স্থান নির্বাচিত হল সেই স্থানটিতেই হয়েছিল। যাদের ডাকা হয়েছিল তারা সকলের সম্মতিক্রমে ঠিক হলাে মহড়া দেবার কথাটি। প্রথমে নির্বাচন হল কোন বইটা মঞ্চস্থ করা যাবে। সর্বসম্মতিক্রমে ভবেশ ভট্টাচার্যের ‘দিন দিন প্রতিদিন’ সামাজিক পালাটি ঠিক হলো । মোটামুটি সকলেই জানে, অভয়পুরের সুদর্শন সান্যালের নাম অভিনয় জগতে মােটামুটি সকলে অভিনয় দেখে। তারা গােপালবাবু আর সুদর্শনকেই চেনে বেশি। তাছাড়া মহড়ায় সুদর্শনের সন্তোষজনক অভিনয় দেখে, গােপাল বাবু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে বলেছিলেন। গােপালবাবু নিজেও একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বাইরের শহর থেকে এসেছিলেন চারজন অভিনেত্রী। অরিন্দম একজন বেকার ছেলের চরিত্রে ছিল। যাত্রাগান অনুষ্ঠিত হওয়ার রাত্রিতে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে ছিল অরিন্দম। তার সকল রকম দরকারী জিনিসপত্র নিয়ে। উপস্থিত হলাে একদম গ্রীণ রুমে। গিয়ে দেখে গােপালবাবু ও শহরের অভিনেত্রীরা এবং সাজঘরের লােকেরা প্রত্যেকেই সময়মতাে উপস্থিত হয়েছেন। ধীরে ধীরে সকলেই এলাে। তারপর শুরু হলাে ‘মেক আপ। এদিকে দেবীকা বায়না ধরেছে শােভনের সঙ্গে সেও যাত্রা দেখতে যাবে। শােভন আমি এসে গেছি বলে প্রবেশ করলাে অশােক। শােভন জিজ্ঞাসা করলাে কি রেঅপর্ণাকে নিয়ে এলি না কেন?ওরা তিনজনে দেবীকা, শােভন আর অপর্ণা বেেিরয় পড়লাে যাত্রা দেখার জন্য। যাত্রাটি হচ্ছে গােপালবাবুর বাড়ির একটু দূরে যে জায়গাটি পড়ে আছে সেখানেই।

পাঁচ
অভিনয় সকলেরই ভালাে হয়েছে। প্রত্যেক গ্রামের অভিজ্ঞ লােকেরা সকলের। অভিনয়ের প্রশংসায় মুখর। কিন্তু সকলের উর্ধ্বে যেন অরিন্দম। অরিন্দম একা,ছেলের চরিত্রে যা অভিনয় করে গেল তা সত্যি সকলের মনে দাগ রেখে গেল। পরের দিন সকালে অরিন্দম দেখে তরুণ যুবকেরা তাকে গুরু বলছে। তপন বলল, গুরু পায়ের ধুলো দাও।
অরিন্দম বাড়িতে মা বাবাকে বলে গোপাল বাবুর বাড়ি গেল। গােপালবাবু আজ আশেপাশের পাঁচ ছয়টি গ্রাম থেকে একজন করে বা দুজন করে নিয়ে, আর নিজের গ্রাম থেকে আটজন অভিনেতাকে নিয়ে একটি বই মঞ্চস্থ করার মনস্থ করলেন। তার জন্য তো মহড়ার প্রয়োজন। সেই মহড়ার কাজ শুরু আজ থেকে। গোপালবাবুর সেই পুরানো দিনের বাড়ি। বাড়ি বললে ভুল হবে। যেন এক বিরাট প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের সম্মুখে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। হয়ত এটা পূর্বের জমিদার বাড়ির সভাকক্ষ ছিল । গােপালবাবু একজন সেই স্থানটিতেই। সেখানে জমায়েত ধনী ব্যক্তি। মহড়া দেবার স্থান নির্বাচিত হল। সেই স্থানটিতেই ডাকা হয়েছিল। যাদের ডাকা হয়েছিল তারা এলেন। অরিন্দদমের মনে কিন্তু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। গতকল রাত্রিতে অভিনয় করার সময় সে শুধু একটি দিকেই মনপ্রাণ রেখেছিল। সেখানে বসেছিলাে এক সুন্দরী তরুণী। অরিন্দম লক্ষ্য করেছিল তার সেই দুটি চোখ যেন কি অপরিসীম ব্যথায় জর্জরিত। যাত্রার শেষে অরিন্দম লক্ষ্য করেছিল সেই তরুণী শেষে গোপালবাবুর সঙ্গেই ঘরে ফিরেছিল। অরিন্দম আজ যেন তার সন্ধানে ব্যাকুল। সেইজনা সে চা খেয়েই বৌদিকে বলে ঘর থেকে বেরিয়েছে। বৌদি বলেছেন, দেখ ঠাকুরপাে, তোমাকে প্রকৃতিস্থ মনে হচ্ছে না। অরিন্দম ভাবে মেয়েদের চরিত্র কি বিচিত্র। পুরুষদের মনের কথা। তারা যেন দেশের চিত্রের মতো দেখতে পায়। | লেবু বাইরে দাড়িয়ে কিছু লােকের সাথে কথা বলছিলেন। প্রসঙ্গ সেই যাত্রাগান। গোপালবাবু অরিন্দমকে দেখে বললেন, আমার, তোমার সঙ্গে একটা দরকারী কথা আছে। তুমি একটু ঘরে বসো। অরিন্দম ঘরে বসে আর ভাবে কোথায় সেই তরুণীটি। এখানে তাে থাকে না। তাহলে থাকে কোথায়? অরিন্দমের হঠাৎ চোখে পড়ল ঘরটি বেশ সুন্দর ভাবে গােছানাে। সামনেই একটি রাধাকৃষ্ণের ফটো। তার পাশে মা কালি। দু চারটি মহাপুরুষদের বড় বড় বাঁধানাে চিত্র। মনে হল এটা গােপালবাবুর শােবার ঘর। খাটের পাশে টেবিলের উপর কতকগুলি মােটা আর একটি বাঁধানাে ফটো। ফটোটা হাতে নিয়ে অরিন্দম দেখলাে এই তো সেই তরুণীটি। শোভনের কলেজে আজ বাৎসরিক অনুষ্ঠানের প্রথম দিন। আজ মমতা শংকরের নাচের প্রোগ্রাম। বাড়তি একটা কার্ড শােভন সংগ্রহ করেছিলাে, বন্ধু বান্ধবদের বলে। বলা যায় না কেউ তাে বায়না ধরতে পারে এই ভেবে। এই কলেজে পড়ে শােভন, অশোক আর অপর্ণা।আগেই বলেছি শােভন অশােক সেকেন্ড ইয়ার বি.এ. আর অপর্ণা ক্লাস টুয়েলভ এ | অপর্ণাও দুটি কার্ড জোগাড় করেছে। সে মনস্থ করেছে তার বান্ধবী বীথিকাকে সঙ্গে নেবে।। বীথিকরা সােনাদিঘিতে থাকতাে না। যদিও তার জন্মস্থান এই গ্রাম | তারা থাকতাে লিলুয়ায়। আর গ্রামে থাকতেন তার কাকা। কাকা মারা যাওয়ার পর বীথিকার বাবা চাকরী ছেড়ে দিয়ে এই গ্রামেই এসেছেন। বর্তমানে বীথিকা তার বাবা আর আর মা এখানে থাকেন আর বড় দাদা ব্যাঙ্কে চাকরী করেন। বীথিকার বাবা অরুণ মুখার্জী আর মা রেবা দেবী। কলেজে গেছে শােভন, অশােক আর দেবীকা। অন্যদিকে অপর্ণা আর বীথিকা। অপর্ণা দেবীকাকে দেখেই বলে উঠলাে, আরে দেবী তােমার সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি, এসাে এসাে এইদিকে বসি। শােভন আর অশােকের সুবিধাই হল।

ছয়

শােভন অশােককে নিরালায় পেয়ে বীথিকার কথা জিজ্ঞাসা করলাে। শােভন একদিন সােনাদিঘী আসবার সময় অপর্ণার সঙ্গে একটি মেয়েকে দেখেছিল। সেই মেয়েটির সাথে এই মেয়েটির অনেক সাদৃশ্য আছে। তাই কৌতুহল বশে শােভন বললাে, অশােক অপর্ণার সাথে এই মেয়েটি কে? অশােক বীথিকার সমস্ত পরিচয় শােভনকে বললাে। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। সকলেই নৃত্যানুষ্ঠান দেখতে ব্যস্ত। কিন্তু শােভন বীথিকাকে প্রায় সর্বক্ষণই নিরীক্ষণ করল। অনুষ্ঠান শেষে বাসের সীটে একদিকে বীথিকা ও শােভন বসল । অন্যদিকে অশােক, দেবীকা ও অপর্ণা বসেছিলাে। শােভন বীথিকার সাথে কথা বলার অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারলাে না। বীথিকা অপর্ণার সঙ্গ হারাবার ফলে খুবই বিব্রত বােধ করল। কিন্তু শােভনের মতাে এতাে লাজুক ছেলে সে আর কখনও দেখেনি। কি সুন্দর তার চোখ, উন্নত ললাট। বীথিকা শােভনের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারলাে না। শােভনের সাথে চোখাচোখি হতেই লজ্জায় সে মুখ নীচু করল। কিছুক্ষণ পরেই রূপাডিহি এল। শােভন, দেবীকা নেমে পড়ল। দেবীকা, অপর্ণা ও অশােককে বিদায় জানালাে কিন্তু শােভন যেন সব ভদ্রতাই ভুলে গেল।শােভনদের বাড়ী দীর্ঘদিন আসা যাওয়ার ফলে অশােক ও শােভনের বােন দেবীকার সঙ্গে একটা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলাে যে সংবাদটি উভয়পক্ষের পিতামাতারা তথা গ্রামের লােক সকলেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।গতকাল রাত্রিতে বাড়িতে ফিরে এসে বীথিকার মন অজানা এক আনন্দে ভরে উঠলাে।
সেই রাত্রিতে সে রবীন্দ্র সংগীতের সুর গাইতে লাগলাে। “তোমার হল শুরু, আমার হল সারা “। বড় দাদা ঠাট্টা করে বললেন, কি রে আজ তাের কলেজ ফাংশান দেখে শিল্পী হবার সখ হল নাকি।

– হ্যাঁ বড়দা। সেইরকমই মনে হচ্ছে।

সকালে শয্যাত্যাগ করে কাজকর্ম কিছু করে প্রথমেই বীথিকা দেবীকার বাড়িতে গেল।

এত সকালে বীথিকাকে দেখে দেবীকা অবাক। বললাে, কি এত সকালে কি ব্যাপার? বীথিকা গতকাল রাত্রির সকল কথা বলে এবং শােভনের প্রতি তার আসক্তির কথা দেবীকাকে জানাল।। দেবীকা প্রত্যুত্তরে বললাে, ধীরে বন্ধু ধীরে। বীথিকা বাড়ীতে ফিরে এসে বিছানায় দুপুরে শুয়ে এক সুন্দর স্বপ্ন দেখলাে। দেখলাে শােভন তার সামনে দাঁড়িয়ে। শােভনের লাজুক লাজুক চোখ আর সুন্দর অবয়ব সে সামনে দেখতে পেল। কল্পনা করলাে মনে মনে সুন্দর এক জীবনের।

সাত
সে একদিন তাকে নিজের করে নিয়ে, তার ঘরে, তার মনে আশ্রয় দেবে। তার সবরকম সুখ স্বপ্ন সত্যি হয়। বীথিকা সেনকে নিয়ে যে স্বপ্ন সে রচনা করছে তাও হয়ত শত হবে। যদি তা পবিত্র হয় যদি সেটা খাঁটি হয়। অনেকে কি পেতে চায়। চাইলেই হয়ত পায় না। কিন্তু কিছু মানুষ তাে পায়। শােভনের প্রতি যে এখন, যে ভালোবাসা বীথিকার মনে জমে উঠেছে তা যদি একটু একটু করে শােভনের মনে জাগে তারপর কি তার স্বপ্ন সফল হবে না। একটু আশা, একটু বাঁচার ইচ্ছা এই আশাতে সংসার। সেই আশা বুকে রেখে বীথিকা শােভন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল জীবনজয়ের। গােপালবাবু যাত্রাদল গঠন করে গ্রামে এমনকি অনেক শহরে পর্যন্ত অভিনয় করে বেড়ান। তার দলের নাম এই অঞ্চলে সকলেরই পরিচিত। অভিনয় গােপালবাবুর পেশা ছিল না, নেশা ছিল। কিন্তু দলে অনেক বেকার ছেলে তথা দরিদ্র ঘরের ছেলে ছিল। তাই গােপালবাবু যাত্রাদলটিকে সুসংবদ্ধভাবে গড়ে তােলার জন্য একটি পেশাদার দল গঠন করতে চাইলেন। দলের প্রত্যেক সদস্য গােপালবাবুর এই সিদ্ধান্তে খুশী না হয়ে পারলেন না। বিশেষ করে অরিন্দমের মতাে বেকার ছেলেদের তাে কথাই নেই। গ্রামের নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যাত্রাদলের নাম রাখা হলাে, রূপা অপেরা। গােপালবাবু নিজের গ্রামে তার অর্থ দিয়ে একটি যাত্রাদল গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। দলের প্রত্যেককে অর্থ নেবার জন্য আপত্তি করলেন। কিন্তু গােপালবাবু বললেন, এটা পেশাদারী দল, তাই অর্থ নেবার মানসিকতা প্রথম থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

আট

যাত্রার দিন প্রথম থেকেই পরিচ্ছন্নভাবে পেশাদারী দলের মতাে সবকিছুর ব্যবস্থা করা হলাে। সকলেই ব্যস্ত, যেন এক মহাযজ্ঞ এক্ষণি শুরু হবে। গােপালবাবুর প্রধান শিষ্য অরিন্দম রায়, তাই অরিন্দম অভিনয় শুরু করার পূর্বে গােপালবাবুর চরণধূলি গ্রহণ করে। গােপালবাবু সবকিছু জ্ঞান অরিন্দমকে উজাড় করে ঢেলে দিতে চান। তিনি অরিন্দকে গড়তে চান মনের মতাে এক অভিনেতা হিসাবে। ভালাে অভিনয় করার মানসিকতা, যােগ্যতা অরিন্দমের সত্যিই আছে।। | গােপালবাবুর মতাে একজন দূরদর্শী মানুষের অনুমান কখনাে ভুল হতে পারে না। তাই পরের দিন সকলের মুখে মুখে এক নাম, এক ভাষা। অরিন্দমের সত্যি এমন মন ভােলানাে পাঠ জীবনে ভুলতে পারবাে না। অরিন্দম আপন মনে চলেছিলাে একটা কথা চিন্তা করতে করতে, যে ফটোটি অরিন্দম সেদিন দেখেছিলো তার কথা।

অরিন্দমের কাছে এল। চিন্তা করলো কে তাকে অভিনীত চরিত্রের নাম ধরে ডাকলো। পিছন ফিরে দেখ সেই মেয়েটি যাকে সে একবার যাত্রা করতে করতে দেখেছিলাে, আরে স্যার আপনার ছবি দেখেছিলাম । আপনার ব্যথা’ কথাটি বলেই চুপ করে গেল মেয়েটি।
অরিন্দম বলল – কিসের ব্যথা ছিল।কেন কাল রাত্রির কথা ভুলে গেলেন নাকি?

– আরে ওটা অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। মেয়েটি ধন্যবাদ বলে চলে যাচ্ছিলাে। অরিন্দম ডাকল।
-শুনুন একটা কথা বলুন মেয়েটি বলল। আপনাকে তাে চিনতে পারলাম না।
-আমি আপনার গুরুদেবের একমাত্র কন্যা। বাইরে ছিলাম। সাত দিন হল এসেছি। কথা বলেই মেয়েটি একপ্রকার দৌড়েই চলে গেল।
গােপালবাবুর মেয়ে আছে অরিন্দম জানতাে না তাই কৌতুহলবশত অতি গােপালবাবুর বাড়ি গেল। গােপালবাবুর বাড়িতে এতদিন অরিন্দম যাওয়া আসা করছে কিন্তু গােপালবাবুর সাংসারিক খবর সে কিছুই রাখতাে না। উচিতও নয় ভেতরে যাওয়ার। গােপালবাবুও তাকে কিছু বলার প্রয়ােজনবােধ করেন নি। অরিন্দম তার কাছে খুবই ঋণী কিন্তু তার সবরকম খবর না জানাতে সে লজ্জিত হল।
নয়
গােপালবাবু অরিকে দেখে তাকে আশীর্বাদ করলেন। বড় স্নেহের পাত্র অরিন্দম গােপালবাবুর কাছে। তিনি আদর করে অরি বলেন। একসময় সুযােগ বুঝে অরিন্দম অন্য প্রসঙ্গ টানলাে। বললাে, মাস্টারমশাই আপনার পরিবারে সদস্য কতজন?
-ওহাে তােমাকে বলাই হয়নি। আমার একটি মাত্র কন্যা আছে তার নাম…
– অপরূপা সেনগুপ্ত, বলে ঘরে প্রবেশ করলাে গােপালবাবুর কন্যা। ‘
-তুই কখন এলি মা?’ এত সকালে কোথায় গেছিলি?

-বাবা আমি আর মাসীমা যাত্রা দেখতে এসেছিলাম মাসীমা চলে গেলেন, কিছুতেই এলেন না, বললেন কাজ আছে।

-আমি চা করে আনছি বাবা বলে অপরূপা ভিতরে চলে গেল।
অরিন্দম কথাবার্তার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল। গােপালাবু বললেন, জানাে অরি অপরূপা খুব ছােট থাকতে, ওর মা মারা যায়, তারপর থেকে মাসীর কাছেই মানুষ। যা কিছু খরচ লাগে সবই আমি পাঠিয়ে দিই। যাতে আমার মেয়ে সুখে থাকে।।চা পান করতে করতে গােপালবাবু কন্যাকে অরিন্দমের পরিচয় দিন। তার পর সে অরিন্দমের সঙ্গে অপরূপার পরিচয় হয়েছে তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না গােপলাবাবু।অপরূপাকে সত্যিই অপরূপ লেগেছে অরিন্দমের। এত ফ্রাঙ্ক, মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। তার আন্তরিকতা অরিন্দমের হৃদয় প্রেমে সিক্ত করে তুলল। গােপালবাবুর বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে অরিন্দম গতরাত্রের উপার্জন করা টাকায় কিছু জিনিসপত্র কিনলো।ছেলের আয় করা টাকায় জুতাে জোড়া পেয়ে খুবই খুশী বাবা। বড় পুত্রের বিবাহ বছর খানেক হলাে হয়েছে, এবার মেজপুত্রের পালা। কিন্তু একটা চাকরী না হওয়া পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। তাই তারা চাকরীর খোঁজের জন্যে অরিন্দমকে বলল। | অরিন্দমের কিন্তু চাকরী সম্বন্ধে আর কোন চিন্তা হয় না। সে ভাবে যদি তাদের দলটি পাকাপােক্ত ভাবে গড়ে ওঠে তাহলে তার অর্থ উপার্জন করার কোন চিস্তাই নেই। সে অভিনয় কে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে চায়। আর চিন্তায়, শয়নে স্বপনে শুধু একটা মুখই অরিন্দমের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাকে নিয়ে কতরকম রং বেরঙের স্বপ্নে আশার মন্দির রচনা করে মনের মধ্যে। তাকে হৃদয়ে স্থান দেবার জন্য যেন তার মন আকুলি বিকুলি করে। সে হল অপরূপা।

সামনের জুন মাসে শােভনের ও অশােকের বি.এ. ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যে অশােক শােভনের বাড়ী সকালবেলা এসে দুপুরে খেতে যায় এবং পুনরায় দুটো নাগাদ এসে একেবারে রাত্রিবেলা ফিরে যায়। দুজনে একই সাথে শােভনের পড়ার ঘরে পড়াশুনা করে। একসাথে পড়াশুনা করার ফল সত্যি ভালাে। কারণ এতে আলােচনার ফলে একে অন্যকে বােঝাতে পারে। যাইহােক একরকম ভালোভাবেই দুজনের পড়াশুনা অগ্রসর হচ্ছিল। অশােক শােভনের কাছে পড়ার জন্যে আসত এটাই মুখ্য। কিন্তু সে আশা করতাে নিশ্চয় দেবীকার সঙ্গে তার দু একবার দেখা হবে, কথা হবে। কিন্তু বিগত একমাসে এক মিনিটের জন্যেও দেবীকার সঙ্গে অশোকের দুটি বাক্য বিনিময় কিংবা একটিও বাক্য বিনিময় হয়নি।অশোক যে ঘরে পড়াশুনা করত সেই ঘরে ভুলে একবারও প্রবেশ করত না। কারণ দেবীকার ভালোবাসার মর্ম, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করত। সে জানত পড়াশুনার জন্যে একাগ্রতা বিশেষ প্রয়োজন। যদি সে অশোকের সামনে যায় হয়ত বা তার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে। তার ফলেই অশোকের জীবনে উন্নতির বাধা হবে। অশােকের অনিষ্ট হওয়ার কথা চিন্তা করতে দেবীকার অন্তর ব্যথায় মুচড়ে উঠতাে। কিন্তু হায়রে ‘ভালােবাসার অন্য প্রান্ত, সে বুঝতাে না। অশােক ভাবতাে বারাে থেকে চোদ্দ ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের বাড়িতে থাকার ফলে দেবীকা হয়তাে নির্লজ্জ মনে করতাে। তাই অশােক একদিন শােভনকে বললাে এবার থেকে আমাদের বাড়ীতে যাওয়া তাের পালা। কারণ বাড়ীতে কয়েকদিন বাবা থাকছেন না। শােভনের কথাটির গুরুত্ব অশােকের কথায় সায় দিল। দেবীকা যদিও শােভনদের পড়ার ঘরে আসতাে না, কিন্তু অশােকের যাওয়া আসা সকলই লক্ষ্য করতাে আড়াল থেকে। আজ চার পাঁচদিন হলাে অশােক তাদের বাড়ি আসছে না। দেবীকা দাদাকে জিজ্ঞাসা করলাে, দাদা,অশােক আজকাল তাে আসছে না তাের কাছে পড়তে। দেবীকা জানতে পারল। শােভনই তাদের বাড়ী যায় কারণটাও জানলাে। কিন্তু দেবীকা বুঝল কারণ একটাই। তা হলাে অশােকের অভিমান। বৌদি জিজ্ঞাসা করল কি হলাে দেবী, দেবাদিদেব মহাদেবের হলাে কি?
দেবীকা উত্তর করে না। অশােক পরীক্ষার দুদিন পূর্বে কোথায় পরীক্ষার সেন্টার হবে আর সবরকম সংবাদ নিতে কলেজে যাচ্ছিল। বাসে উঠেই অশােক কলেজের এক বান্ধবীর দেখা পেল। বান্ধবীটি জিজ্ঞাসা করল আরে কেমন প্রিপারেশন হলাে? উত্তর দিতে গিয়ে অশােক হঠাৎ দেখলাে দেবীকা ও তার বৌদি লেডিজ সীটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দেবীকাকে দেখতে পেয়ে অশােক একটু উচ্চস্বরে বলল ‘মােটামুটি হচ্ছে। তােমার কেমন হচ্ছে বলাে। অশােক বান্ধবীটির সঙ্গে তুই তুকারি করেই কথা বলতাে। সেইজন্য বান্ধবীটি অবাক হলাে। কিন্তু পরক্ষণেই অশােকের ইশারা পেয়ে সব বুঝতে পেরে বললাে, আর বলাে না, খুব পরিশ্রম হচ্ছে। শরীর ভালাে যাচ্ছেনা। তােমার শরীর ভালাে তাে?হাঁ বহাল তবিয়তেই আছি, তুমি ডাক্তার দেখাচ্ছাে তাে, শরীরের যত্ন নিও। তােমার যদি শরীর খারাপ হয় তাহলে –

দেবীকা আর শুনতে পারছে না। বৌদির হাত ধরে টেনে নামিয়ে পরের বাসে সে বাড়ী ফিরলাে। বাড়ী ফিরে শুয়ে শুয়ে দেবীকা শুধু কেঁদেই সারাটাদিন কাটিয়ে দিল। শােকে , অপমানে তার সেদিন আত্মহত্যার ইচ্ছা হলো। কিন্তু বৌদির পরামর্শে সে নিজের
মনকে স্থির করল।অশােকের কাছে মাসখানেক পড়তে গিয়েছিলাে। আর তার মধ্যেই বীথিকার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল পরের দিন। | কথা বলেছিল বীথিকাই, বলেছিল শােভনদা আপনার পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। কোন মাস থেকে। শোভন বীথিকাকে আমার প্রাণের থেকেও যেন বেশী ভালাোবাসে

একটা কথা ভালােভাবেই জানে বীথিকা, তাকে কি পরিমাণ ভালােবাসে। তাই তাদের মধুর মিলনে কোন বাধা নেই। তারা পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলিত হয় সােনাদিঘির সেই বট গাছতলায়। তারা কথা বলে, গান গায় আর পূর্বের স্মৃতিচারণ আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে আরম্ভ করে রাজনীতি পর্যন্তও তাদের আলােচনা। খেলাধূলারও খবর রাখে বীথিকা। শুধুমাত্র কতকগুলি ভালােবাসার ছেঁদো কথা, তারা কেউই ভালােবাসে না। প্রেম যে কি তা তাদের ভালােভাবেই জানা আছে। প্রেম ছেলেখেলা নয় প্রেম তপস্যা। প্রেমের মাধ্যমেই ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়া যায়। সেটা হল মানবপ্রেম। প্রেম যখন সকল কামনা বাসনায় উর্ধে উঠে যায় তখন সেই প্রেম হয় সুন্দর শাশ্বত। অবিনশ্বর। তবে বাথিকা শােভনের প্রেম তাে কামনা বাসনায় শূন্য নয়। আবার শুধু কামনা বাসনাও নয়। সব থেকেও যেন কিছু নেই এই ভাব। তারা দুজনেই শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিবান। তারা জানে এই পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নেই তাদের বিচ্ছিন্ন করে। তাই তাদের মধ্যে ভালােবাসার কোন দ্বন্ধ নেই। তারা সবার সামনেই যেন বলে বেড়াতে চায় দেখ আমরা দুজনে কত সুখী, তােমরাও সুখী হও। বীথিকা। শােভন প্রেম দেখে প্রত্যেক তরুণ তরুণীর মনে ঈর্ষার উদ্রেক হয়। সেটা শুধু ঈর্ষা নয়। শ্রদ্ধা, ভালােবাসার প্রেমের সঠিক সংজ্ঞা। এতদিন যারা অন্ধকারে শুধু ঘুরে বেড়িয়েছে। আর প্রেম করেছে কিন্তু তার অর্থ বােঝেনি তারা আজ দুচোখ মেলে তাকিয়ে দেখে যেন এক নবজাগরণ। আজকাল যদি শোভন বীথিকাকে দুইদিন দেখতে না পায় শােভনের মতাে শক্ত যুবকের যেমন বুকটা ফেটে যায়। সে বােঝে তাদের এই বন্ধন ভালােবাসার বন্ধন।। বাধিকার কাছে যে প্রেরণা শােভন পায় তার তুলনা মেলা ভার, শােভন আজ যেন।কোন মহাপুরুষের পর্যায়ে। কলা অপেরা’ আজ বর্ধমানে এক ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে যাত্রা। বে। আরও একটি দল যাবে এবং সেই দলের যাত্রাটিই প্রথমে হবে।। করতে যাবে। সেখানে আরও এক আজ তাদের সঙ্গে যাবার জন্যে বায়না ধরেছে। তাছাড়া সে চাইছিল

যদি একবার অরিন্দম তাকে যাত্রা দেখতে যেতে বলে তাে খুব ভাল বাড়ী থেকে বাবা, মা, দাদা ও বৌদিকে প্রণাম করে তাড়াতাড়ি গােপালবাপুর বই। এসেছে। যাত্রা করতে যাওয়ার পূবে অরিন্দম গোপাল বাবুর কাছে আর একম দিয়ে নেয়।অরিন্দম এসেই দেখে অপরূপা সামনের বারান্দায় একটা চেয়ারে সে কি মনে করে অপরূপাকে জিজ্ঞাসা করল আপনি আমাদের যাত্রা দেখাতে যাকেন। অপরূপা জানতাে অরিন্দম ও তার মধ্যে যেন কোথায় একটা বলেন সে ধীরে গড়ে উঠেছে। অরিন্দমকে তার শুধু ভালাে লাগে তাই নয় ভালাে। কিন্তু অপরূপা একজন গম্ভীর প্রকৃতির মহিলা ছিল। সেদিন সে অরিনের অভিনয় দেখে সেইদিন থেকেই সে তার প্রেমে পড়ে যায়। সুদর্শন সান্যালের পরিচয় আপনারা জানেন। একজন ভালাে অভিনেতা বলে তার মনে গর্বের অন্ত ছিল না। সে দেখতে ভালো হলেও অন্তরটা তার ভালো ছিল। যেদিন থেকেঅরিন্দমের যাত্রা গানের নাম প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে সেইদিন থেকেই কেন অরিন্দম তার প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেনে তেন প্রকারেণ অরিন্দমের ক্ষতিই যেনতার প্রধান কাজ। সবসময় সে তার বদনাম করে বেড়ায়। অপরূপা অরিন্দমকে পরীক্ষা করার জন্যে প্রঘমে বললাে, না আজ শীরটা। ভালাে নেই। আজ বােধহয় যাওয়া হবে না। অরিন্দম এই প্রথম অপরূপার হাতে হাত দিয়ে দেখলাে তার উত্তাপ স্বাভাবিক। অপরূপার দুষ্টুমি বুঝতে পেরে সে চলে যাচ্ছিল। অপরূপা ডাকলাে, শােন অরিদা আমি যাব, তােমার সঙ্গে যাবাে। অরিন্দম এতটা প্রস্তুত ছিল না। আপরূপার মুখে ‘তুমি আমি শুনে যেন অপূর্ব অনুভূতিতে তার মন শিউরে উঠলাে। অরিন্দম বললাে, তাহলে আমরা প্রথম দলের যাত্রাই দেখতে যাবাে। অপরূপা এতে খুব খুশী হলাে। কারণ সে যাত্রা প্রেমিকা। বর্ধমানে ক্লাবের ছেলেদের কাছে পরের যাত্রাদলে প্রধান অভিনেতা হিসাবে পরিচি দেওয়াতে তারা অরিন্দমের ও অপরূপার সকল রকম সুব্যবস্থা করে দিল। তবে ব্যবহার খুবই ভালাে লাগলাে অরিন্দমের। তাদের সঙ্গে এসেছে আর একশ ) হলাে অরিন্দমের বন্ধু সুব্রত ব্যানার্জী। অরিন্দম যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছে। বামদিকে অপরূপা আর এ বন্ধুবর। অপরূপাকে একটা নিজের করে পাওয়ার জন্য সে কতকাল নিজেই জানে না অরিন্দম। প্রথম দলের যাত্রা শেষ। এবার ‘রূপা অপেরার যাত্রা। তাই অরিন্দম বলে অামি “তা হলে। আর অপরূপা পাশে আর একজন ভদ্রমহিলা যিনি ক্লাবের সম্পাদকের কন। অপম সেই ভ্র মহিলাকে অপরূপাকে একটু সঙ্গদান করার কথা বলে।এ দলে তাহলে এসেছে। সুদর্শন সান্যাল গোপালবাবু বললাে, দাদা অপককে দেখছি না তো গেল কোথায়? গােপালবাবু বললেন, অপরূপা অরিন্দমের খেআগে এসেছে। দাদা মেয়েকে একা একা ছেড়ে দেন। সুদর্শন বললাে গােপালবাবু প্রেমের সুরে বললেন, নিজের চরকায় তেল দাও তাে। ইতিমধ্যে অরিন্দম ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। সুব্রতও সঙ্গে আছে। সুব্রত সুশনকে মােটেই দেখতে পারে না। সে বরাবর বলতাে ঐ লােকটি একটি ধুরস্কর। খােপালবাবু অরিন্দমকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে অপরূপা কোথায় আছে? অরিন্দমের কাছে সব কথা শুনে গোপালবাবু কাজে লেগে গেলেন কারণ তিনি অরিন্দমের কথায় নিশ্চিন্ত হন। যাত্রা শুরু হলাে একের পর এক দৃশ্য এগােতে লাগলাে। কিন্তু আশ্চর্য্য যতবারই অরিন্দম যায় দর্শকরা হাততালিতে ভরিয়ে রাখে মঞ্চের আশপাশ। কিন্তু শেষ দৃশ্যে অরিন্দম মৃত্যু শখ্যায় যে অভিনয় দক্ষতা দেখানাে তা দেখে প্রতােক দর্শক বিহলচিত্তে রুখে মুহ্যমান হয়ে পড়লাে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ অরিন্দমকে পুরস্কার স্বরূপ দিলেন একটি ছোট্ট শিশু। আর একবার দর্শকদের হাততালি বেজে উঠলাে। যাত্রা শেষ হওয়ার পরক্ষণেই অরিন্দম ফিরে এলাে অপরূপার কাছে। অপরূপা অরিন্দমকে দেখে লজ্জাসরম ভূলে গিয়ে তাকে দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরলাে আর বললাে, তুমি এরকম আর কোনদিন করবে না। অরিন্দমের আনন্দে চোখে জল এলাে, সত্যিই পৃথিবীতে তার মূল্য আজ অনেক। সে তাকিয়ে দেখলাে চারপাশের দর্শকমণ্ডলী তখনও তাকে দেখবার ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবলাে আজ যাত্রা করে সে যে সুনাম পেল যে অভিনয় দক্ষতা দেখাতে পারলাে তা শুধু অপরূপার প্রেরণা আর গোপাল বাবুর নির্দেশনার পরিপক্ক মিষ্ট ফল।গোপালবাবু আজ আবার অরিন্দমকে যাত্রাশিল্পের কথা বলেন, বিশ্ব শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রজেন্দ্র কুমার দে’র (১৯০৭-৭৬) হাতে যাত্রা বিকশিত হয়ে পৌরাণিক পালার পাশাপাশি ঐতিহাসিক, লোককাহিনীভিত্তিক ও সামাজিক পালায়।পেশাদার যাত্রাদলের আবির্ভাবে যাত্রা হয়ে ওঠে গ্রাহ্য শিল্পমাধ্যম। আধুনিক নগর জীবণে যেমন থিয়েটার, গ্রামীণ জনপদে তেমনি ‘যাত্রা’ এখনো অন্যতম বিনোদন-মাধ্যম হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। স্থূলতা, গ্রাম্যতা ও অশ্লীলতার অভিযোগ এবং নানা নেতিবাচক ধারণা সত্ত্বেও যাত্রার প্রভাব ও বৈভবকে অস্বীকার করা যায় না।’ বাংলা শিল্প-সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই যাত্রার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন যাত্রায়।মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গিরীশ চন্দ্র ঘোষ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল ব্যক্তি জীবনেই যাত্রা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না, তাদের সাহিত্যকর্মেও ছিল যাত্রার উজ্জল উপস্থিতি।যাত্রাশিল্পী ও গবেষকরা মনে করেন, যাত্রা কেবল বিনোদন মাধ্যম নয়, লোকশিক্ষার বাহনও। নিরক্ষতার অনগ্রসর সমাজে যাত্রা পালন করছে ভ্রাম্যমাণ বিদ্যালয়ের ভূমিকাও।

রাজাবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দির বাসিন্দা যাত্রাশিল্পী কল্পনা ঘোষ (৫২)। শৈশব থেকেই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পুরো জীবনের অভিজ্ঞতা-স্মৃতি বলতে যা কিছু, তার সবই যাত্রাকে ঘিরেই।সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমী চত্বরে অনুষ্ঠিত একটি যাত্রা উৎসবে অংশ নিতে এসে এ প্রতিবেদককে জানালেন এ শিল্পের নানা সমস্যার কথা। যাত্রাশিল্পী কল্পনা ঘোষ বাংলানিউজকে জানান, শিশুকাল থেকে যাত্রাপালায় অভিনয় করছি। এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে ৩ ছেলে মেয়ে মানুষ করেছি। ভালবেসে এখনো ধরে রেখেছি যাত্রাভিনয়। বর্তমানে তরুণরা আর যাত্রাভিনয়ে আসতে চায় না। তরুণরা এগিয়ে আসলে এ শিল্পের উত্তরণ ঘটতো। এটি একটি ভাল মাধ্যম। এখানে শেখার অনেক কিছু রয়েছে। প্রাচীন শিল্পমাধ্যম যাত্রার ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয় ব্রিটিশ শাসনামলেই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দাবি উচ্চারিত হওয়ায় ব্রিটিশ শাসকরা বন্ধ করে দেয় মুকুন্দ দাশের স্বদেশী যাত্রা।পাকিস্তান আমলেও যাত্রাশিল্পটি রক্ষনশীল ও মৌলবাদীদের রোষানলে পড়ে। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ’র নির্দেশে বন্ধ করা হয় রূপবান যাত্রা। যাত্রাশিল্পীদের অভিযোগ, ১৯৭৫’র পর স্বাধীন দেশেই বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় যাত্রাকে নিয়ে শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। ১৯৯২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যাত্রা বন্ধে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে এই শিল্পের চলমান সংকট প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে জানান, যাত্রানুষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়, তার জন্য যাত্রাশিল্পীরা দায়ী নন।

একশ্রেণীর ভূঁইফোড় ও বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শকরা এর জন্য দায়ী। এরা কেউ পেশাদার যাত্রা প্রদর্শক না। আমরা একাধিকবার বলেছি, অশ্লীলতা যাত্রাশিল্পীরা করে না, কেউ করলে আমরা প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক অবগত করি তা বন্ধ করার জন্য। তারপরও পুরো দায়ভার এ শিল্পকেই বহন করতে হচ্ছে।তিনি জানান, ‘একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এ শিল্পের ওপর নির্ভর করে। নানা সময়ে এ শিল্পকে বন্ধ করে দেয়ার যে অপচেষ্টা হয়েছে তা মূলত: বাংলা সংস্কৃতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস।সরকারের কাছে আমরা এ শিল্প রক্ষায় নানা সময়ে আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা আবেদন জানাই। বর্তমান সরকার আমলে যাত্রাশিল্পের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি প্রণীত হলে এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা মনে করি।’মিলন কান্তি দে মনে করেন- যাত্রাশিল্পকে আরো বিকশিত রূপ দিতে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত নাট্যকাররা তেমন ভূমিকা রাখছেন না। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠিত নাট্যকাররা যাত্রাপালা লেখেন, আমাদের নাট্যকাররা যাত্রাপালা লেখেন না।এখানে তাই ভালমানের পালা রচিত হচ্ছে না। এ শিল্পের সামগ্রিক বিকাশের পথে এটিও একটি বড় বা‍ধা হিসেবে দেখেন মিলন দে।

দশ

দেবীকা যেদিন তার বৌদিকে নিয়ে মাঝপথে বাস থেকে নেমে পড়েছিল সেদিন থেকে অশােক নিজেকে অপরাধীর মতাে সবসময় নিজেকে দূরে দূরে সরিয়ে রাখতাে। একটু ভুলের জনাে পরস্পরের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি হয়তার জন্যে অনেক তো মাশুল গুনতে হয়। সে কথা বলার আগে মনে করি দুই বন্ধুকে। আজ শােভন এসেছে, অশােকের কাছে। তারা দুজনেই পরীক্ষা দিয়েছে। বর্তমানে যা অবস্থা মনে হয় বছর খানেকের মধ্যে না হলে বি.এ., বি.এস.সি,
পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয় না। এই খবরটুকু তাদের জানা বলেই তারা দুজনে যুক্তি করে কিছু করতে চায়। কিন্তু কি করবে তারা। বর্তমান বেকার যুগে কিই বা করার আছে। অনেক আলােচনার পর তারা ঠিক করলাে তারা দুজনে মিলে টিউটোরিয়াল হােম খুলে স্বল্প বেতনে শিক্ষাদান করবে। কিছুদিনের মধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। তারা রূপাডিহির ও সােনাদিঘির সপ্তম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে তাদের মনের কথা বললাে। কুড়িজন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে তারা শুরু করলো তাদের শিক্ষাদান। প্রত্যেকের কাছে পঁচিশ টাকা করে নিয়ে তাদের হিসেবে পাঁচশাে টাকার মতাে হবে। তারপর দুজনের ফিফটি ফিফটি। অশোক শােভনের টিউটোরিয়াল হােম ভালােভাবেই চলছে। এতে স্টুডেন্ট কল্যাণের ফলে তাদের দুই বন্ধুর সম্মান দুই গ্রামেই বেড়ে গেছে। দুজনের নম্রতা প্রত্যেক গ্রামবাসীর কাছে প্রশংসার বিষয়বস্তু ছিল। আর দুই বন্ধু অশোক ও শােভন তাদের নতুন ভাব দর্শনের স্রোতে ভেসে চললাে। ছােট ঘটনাটি ঘটলে হয়তাে অশােক দেবীকার মধ্যেকার সম্পর্কে কতখানি দৃঢ় তাহা বুঝা যেত না। অতি প্রত্যুষে উঠে অশোক শােভনের বাড়ি গেল আজ সুদীর্ঘ তিন মাস পরে। শােভনের বাড়িতে প্রবেশ করার আগেই অশােক, দেবীকা কে ফুল বাগানে দেখতে পেল। আড়ালে দাঁড়িয়ে অশোক তাকে নিরীক্ষণ করতে থাকলাে। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে দেবীকা ঘুরে দাঁড়াতেই অশােকের সঙ্গে চোখাচোখি হল। এক পলক তাকিয়েই দেবিকা ঘাড় নীচু করে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো, অশােক তাকে ডেকেও উত্তর পেল না। অশোক চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাসীমার অর্থাৎ সবিতা দেবীর ডাকে সচকিত হয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালাে। সীতা দেবী তাকে এতদিন না আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। অশোক আমতা আমতা করে কোনরকম শােভনের ঘরে প্রবেশ করল। প্রায় দু তিন ঘণ্টা পরে অশােক যখন শােভনের ঘর থেকে বাইরে এল তখন দেবীকা লাল পাড়ের শাড়ি পরে কলেজের পথে পা বাড়িয়েছে। বর্তমানে গলসি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। অশােক দেবীকার পিছু নিল। দেবীকা কিন্তু অনড়, অচল। সে ভুল করে একবারও অশােকের ডাকে সাড়া দিল না বা তাকাল না। অশােক কাতর স্বরে বারংবার বলতে শুরু করলাে। দেবীকা তুমি আমায় ভুল বুঝাে না। আমি তােমায় আমি তােমায় ভালােবাসি। পথের মাঝে তার ফলে সে সিনক্রিয়েট হলাে। তার প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ্য ছিল না অশোকের। পথযাত্রীরা প্রত্যেকে ভুল বুঝে অশোকের পথ রুদ্ধ করলো। অশোক পাঁচ ছয় ব্যক্তির বেড়া ভেঙ্গে দেবীকার কাছে যেতে চেষ্টা করলাে কিন্তু দেবীকা তার প্রতি ভ্রক্ষেপ মাত্র না করে বাসে উঠে আপন পথে এগিয়ে গেল। অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তির হাতে প্রহৃত হয়ে অশোকের হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হলাে সেই ক্ষতের দাগ নিশ্চিহ্ন হতে যুগ যুগ হয়তাে কেটে যাবে। তবু সে দেবীকার সামনে এ মুখ দেখাবে না। তার প্রতি বিন্দুমাত্র আসক্তি ও নেই।ও ভুলবে না,এই প্রতিজ্ঞা করলাে। অশােক ও শােভনের বি.এ. পরীক্ষার ফল ঠিক এক বৎসর দেড় মাস পর প্রকাশিত হল। অশােক ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করেছে আর শােভন ফরটি ফাইভ’ পারসেন্ট পেয়ে পাশ করেছে। শােভন গ্র্যাজুয়েট হওয়ার প্রথম খবর মা, বাবাকে দেওয়ার পর,বীথিকার বাড়ি গেলাে। কিন্তু বীথিকার পাশে বসে কে ওই তরুণী পিছন দিকে থেকে দেখার ফলে তাকে চেনা যাচ্ছে না। শােভন এগিয়ে না গিয়ে দুর থেকে ইশারা করে বীথিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাে। বীথিকা উঠেআসতে পাশের তরুণী ঘুরে বসে দেখলাে শােভনকে, আর দেখল শােভন ও বীথিকা ঘনিষ্ট অবস্থায় দাঁড়িয়ে। খুশির প্রথম চুম্বন আঁকলাে বীথিকার চিবুকে শােভন। তারপর…. আর দেখতে পারলাে না তরুণীটি। দৌড়ে বেড়িয়ে গেল সে। বীথিকা বান্ধবীকে ডেকে উঠলাে। এই অপর্ণা কোথায় যাচ্ছিস?স্তম্ভিত শােভন। এমনভাবে আঘাত দিতে চায়নি অপর্ণাকে। সে জানতাে অপর্ণা তাকে ভালােবাসে। কিন্তু শােভন যাকে একবার তার বােনের আসনে বসিয়েছে তাকে প্রেমিকার আসন দিতে পারেনি। এটা শােভনের নীতি বিরুদ্ধ। শােভনকে ধাক্কা দিয়ে বীথিকা সহজভাবে বলে উঠলাে, পূৰ্ব্ব প্রেমিকা বুঝি ?

আজ রবিবার। ১২ই জানুয়ারী। অশােক ও শােভন যৌথভাবে আজ একটি পার্টি দিয়েছে তাদের পাশ করার আনন্দ স্বরূপ। সেখানে নিমন্ত্রিত আছেন অনেকে। প্রথমত দুই পরিবারের সকল সদস্য এবং এ ছাড়া উভয় পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তি। যেমন গােপালবাবু ও মেয়ে অপরূপা আর বীথিকা ও তার পিতা অরুণ মুখার্জী ও মাতা রিয়া দেবী, অপর্ণা বীথিকার বন্ধুত্বের সূত্র ধরে।।

অশােক ও শােভন তাদের উভয়ের মিলিত টিউটোরিয়াল হােমের অর্থ খরচ করে,ব্যবস্থা করেছিলাে অতিথিদের জন্য, সবরকম ব্যবস্থা। সবসময় ভেসে আসছিল সংগীতের মিষ্টি সুর। সুদৃশ্য অলােকসজ্জা আর সুরুচিকর খাদ্য পরিবেশনের মাধ্যমে আসর জমে উঠেছিলাে। অরিন্দম ও অপরূপা একটি পপ সংগীত গাইতে তালে তাল নাচতে থাকে। তার সঙ্গে নাচতে থাকে উপস্থিত সকলে। শােভন ও অশােক একই সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে থাকে। – “যদি তাের ডাক শুনে ..”.

এরই মধ্যে চলতে থাকে আর একটি নাটক। দেবীকা অশোকের হৃদয়ের গভীর ক্ষতের কথা জানতে পেরেছে। সেই ক্ষতস্থানে প্রলেপ দেওয়ার জন্যে সে বারবার অশােকর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। অশােক আজ সেই অশোক নেই সে আজ দিশেহারা আজ সে একটু ড্রিংকসও করছে। ব্যথা হঠাৎ বুকে এসে অশোকের সঙ্গ দিতে শুরু করেছে। সে কোমর দোলাতে দোলাতে অশোকের কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছে। আর ঘন ঘন ক্যামেরার ফ্লাশ গর্জন করে চলেছে শােভনের হাত থেকে।।
শােভন, অপর্ণাকে পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে সােফায় বসল। অপর্ণা ঘরে বসে তার দাদা অশােকের সঙ্গে নাচছে, দেখছে কি সুন্দর ভঙ্গিমায় তার বান্ধবী বীথিকা তার দাদার সঙ্গে কতক্ষণ গান গাইছে। সে কেন পারছেনা। তাদের মানসিকতার, শিক্ষাদীক্ষার ফারাক মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাে। সে আরও বুঝতে পারলাে ভালােবাসা কোনদিন মরে না। সে তার আপন গতিপথে স্বতঃস্ফূর্তি ভাবে এগিয়ে চলে। সে কি করল, তার দাদা অশােকের চোখ তারই দিকে চেয়ে আছে। সে দাদার অন্তরের কথা যেন বুঝতে পারল। সে দ্রুত উঠে পড়ে দেবীকার পাশে দাঁড়াল। শােভন এ দৃশ্য উপভােগ করতে লাগল। দেবীকার পাশে দাঁড়ানাে মাত্র অপর্ণা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলাে। সে দেবীকাকে ডেকে বাইরে পূর্ণিমার আলাের মধ্যে বসল। দেবীকার মুখের এবং অশ্রুসজল চোখের ভাষায় অপর্ণা ব্যাপারটির গুরুত্ব উপলব্ধি করলাে।
রূপা অপেরার চাহিদা বেড়েই চলেছে। অপেরা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক হিসাবে গােপালবাবুর সুনাম চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়ে চলেছে। আজ পর্যন্ত অনেক নামীদামী অপেরার পার্টির থেকে রূপা অপেরাটির বৈশিষ্ট্য আলাদা। সুদর্শন সান্যাল বিশেষ লোক, যে কোনাে বইয়ের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতেন। কিন্তু অরিন্দম সে বিষয়ে কোনাে গুরুত্ব দিত না। গােপালবাবুর নির্বাচন মতাে সে অভিনয় করে যেত। অপেরার স্বার্থে গােপালবাবু কিছু পরিবর্তন করতে চাইলেন। কিন্তু সর্বপ্রথম তিনি বাধা পেলেন সুদর্শন সান্যালের কাছে। নিজেকে তিনি একজন বড়াে অভিনেতা বলে অহংকারে মত্ত ছিলেন। গােপালবাবুর মতে সুদর্শনবাবুর অভিনয়ের শিক্ষার অনেক অভাব ছিল। তিনি অরিন্দমকে প্রধান চরিত্রে মনােনীত করতে চাইলেন। কিন্তু সুদর্শন সান্যাল এই সুযােগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না।। গােপালবাবুকে কথা দিলেন যে এবার তিনি সাধ্যমত অভিনয় করে তার আসন পাকা করে নেবেন।
সান্যাল ধনী দুলালের পুত্র কিন্তু তার অর্থের প্রলােভন ছিল বেশী। সে। চেয়েছিল প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে বেশী উপার্জন করতে। গােপালবাবু সহৃদয় লোক। তিনি সুদর্শন সান্যালকে আর একটি সুযােগ দিলেন। অরিন্দমের কিন্তু কোনো বিকার নেই। গোপালবাবুই তার গুরুদেব।তার নির্দেশমতাে চলতে তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।।

যাইহােক ‘রূপা অপেরা’ দেড় বৎসর ব্যাপী রামকৃষ্ণ মিত্রের ‘সােনার সানাই।’ বইয়ের মহড়া দিল। অরিন্দম ছিল এক ছদ্মবেশী ভিক্ষুর অভিনয়ের। এবার রূপা অপেরা-র ডাক পড়েছে নদীয়ার একটি শহরে। রূপা অপেরার এখন দশ হাজার টাকা, পার নাইট রেট। বাসভর্তি অপেরা পার্টি হাজির ছিল সন্ধ্যা সাত ঘটিকায়। বই শুরু হবে নয় ঘটিকায়। অরিন্দম ও অপরূপা প্রথমত শহরটি একটু দেখার জন্যে বেরিয়েছে। পথমধ্যে এক মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়লাে তারা। একটি মােটর সাইকেল এসে তাদের রিক্সার সঙ্গে সংঘর্ষ বাধায়। এর ফলে অরিন্দম লাফিয়ে নেমে পড়লেও অপরূপা পায়ে ভীষণভাবে আঘাত লাগে। অরিন্দম কথা না বাড়িয়ে মােটর সাইকেল আরােহীর সাহায্যে রূপাকে নার্সিংহােমে নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের ছেড়ে দেন। | এদিকে গােপালবাবু অরিন্দমকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছেন। বই শুরু হতে আর আধ ঘণ্টা বাকী। কনসার্ট পড়ে গিয়েছে। কিন্তু অরিন্দমের পাত্তা নেই। অরিন্দমের দ্বিতীয় দৃশ্যে প্রবেশ। সুদর্শন সান্যাল এ সুযােগ হাত ছাড়া করলাে না। বারবার গােপালবাবুর কানে কুমন্ত্রণা দিতে থাকলাে গােপালবাবুর উপর দোষ চাপিয়ে বললাে আপনিই ওকে বাড়িয়ে মাথায় তুলেছেন নিজেকে অরিন্দম বড্ড বেশী বড় মনে করে। গােপালবাবু একে প্রেসারের রােগী ক্রমে তার ক্রোধ বেড়ে যাওয়াতে তার প্রেসার বাড়তে থাকলাে। অরিন্দম যখন এলাে তখন গ্রীন রুম সাইলেন্ট। অপরূপা এক পাশে বসে পড়লাে। অরিন্দম দ্রুত মেকআপ সেরে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করেলা। মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকায় অরিন্দম খুবই বিব্রত বােধ করতে থাকলাে, ফলে ডায়ালগ মিশ করল। সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন শােনা গেল। কোনওরকমে অরিন্দম মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলাে। অপরূপার কাছে এসে দাঁড়ালাে। অপরূপা অভয় দিলাে। উভয়ে তাকিয়ে দেখলাে সুদর্শন সান্যালের মৃদু হাসির ঝিলিক আর তার পার্শ্বে দন্ডায়মান হিরু এবং ব্যথিত গােপালবাবুকে। পরবর্তী দৃশ্যগুলিতে অরিন্দম মােটামুটি ভালাে অভিনয় করলাে কিন্তু অপরূপার অভিনয় ভালাে হল না। এদিকে সুদর্শন সান্যাল ফাঁকা মাঠে গােল দেওয়ার মতাে সেই রাত্রির শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পেল। অপরূপা ও অরিন্দম বিষন্ন চিত্তে বাসে উঠে পিছনের সীটে বসলাে। সুদর্শন সান্যাল ও গােপালবাবু বসলেন পিছনের সীটে। সুদর্শন সান্যালের ভালাে অভিনয়ের জন্যে অরিন্দম এবং অপরূপা কিন্তু তাকে শাবাসি দিতে ভুল করলাে না। কিন্তু সুদর্শন সান্যাল প্রত্যুত্তরে কিছুই বললাে না। এমন মনের বাসনা চরিতার্থ করার জন্য সাধনা লাগলাে। সাত দিন পরে সে গােপালবাবুর বাড়ি গিয়ে দেখে তিনি আলােচনায় ব্যস্ত। অপরুপা পাশের ঘরে। অরিন্দম ঘরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে গোপালবাবু পাশের চেয়ারে বসলাে। সান্যাল উঠে তখন পাশের ঘরে গেল। গোপালবাবু তিরস্কারের সুরে বলে উঠলেন, তোমার আর অভিনয় শেখা হলনা।” গােপালবাবুর এই কথাটি অরিন্দমের বুকে তীব্র তিরের মত বিদ্ধ হল। অরিন্দমের চোখ জল ছলছল করে উঠলাে। গােপালবাবু বলে যেতে লাগলেন অভিনয় করতে গেলে দায়িত্ববান হতে হয় এবং অনুশীলন করতে হয়। তােমার মধ্যে এই দুটোর কোনটাই দেখছি না। গােপালবাবুকে বিছানায় দেখে বলে উঠলাে, কাকাবাবু আপাতত এখন কেমন আছেন তার দেহে হাত দিয়ে দেখলাে অরিন্দম ‘হার্টবিট’ অনেক বেশি এবং উত্তাপ অস্বাভাবিক। কোন কথা না বলে অরিন্দম ডাক্তার ডাকতে চলে গেল। এসেই দেখে সুদর্শন সান্যাল ডাক্তার নিয়ে এসেছে। একা অপরূপা বিছানার পাশে বসে আছে। অরিন্দম ডাক্তারকে ফি দিয়ে বিদায় দিল। অপরূপা অরিন্দমকে দেখে উঠে এসে তার বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাে। তার কথা শুনে অরিন্দম জানতে পারল গােপালবাবু ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং তিনি চার মাসের বেশী বাঁচবেন না। | ‘রূপা অপাের পুনরায় চার রাত্রি যাত্রা করার ডাক পেলাে। অরিন্দম কিন্তু গােপালবাবুর শরীরের জন্যে যেতে চাইলেন না। সুদর্শন সান্যাল এখন পার্টির সকল দায়িত্ব নিয়েছে এবং সকলের দেখাশােনা করছে। গােপালবাবুর পরামর্শে এবং তার আদেশে শেষ পর্যন্ত অরিন্দম যেতে রাজী হলাে। কিন্তু সঙ্গে অপরূপা এবং গােপালবাবু যাবেন না, ফলে অরিন্দম ব্যথায় জর্জরিত।

এগারো

অশােক ও শােভন গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর থেকে দুই বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু দুজনের কারাের কোনাে চাকরী হয়নি। শুধুমাত্র তাদের টিউটোরিয়াল হােমের উন্নতি হয়েছে। তাদের এই হােম থেকে অনেক ছাত্র ফাস্ট ডিভিশনে মাধ্যমিক পাশ করেছে এমন কি দুই একজন ছাত্রছাত্রী স্টারও পেয়েছে। ফলে তাদের হােমের’ ছাত্রছাত্রী সংখ্যা এখন অনেক। দুইবেলা তারা হােম খােলে। সকাল সাত ঘটিকা থেকে দশ ঘটিকা এবং সন্ধ্যা সাড়ে ছয় থেকে নয় ঘটিকা পর্যন্ত। প্রত্যেক গ্রুপে তিরিশ জন করে ছাত্রছাত্রী থাকে দুইজনে পনেরজন করে প্রতি সপ্তাহে চারদিন শিক্ষাদান করে। শুধুমাত্র নব এবং দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীই এখন পড়াশুনা করে। দুইবেলায় মােট ৬০জন ছাত্রছাত্রী পঁচিশ টাকা করে দেয়। মােট দেড় হাজার টাকার মতাে মাইনে দেয়। এতে দুজনের মােটামুটি অপেশাদারি খুশী মন। দিন যায় এবং তাদের পড়াশুনার অভ্যাসও বজায় থাকে। এটাই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।তা হােক দেবিকা এবং অপর্ণা দুইজনেই এখন বারাে ক্লাসের গন্ডী পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। অপর্ণা তার দাদা অশােককে দেবীকার কথা এই প্রথম অশোক অপর্ণার মুখে দেবীকার কথা শুনে বুঝতে পারলাে দেবীকার অনুতাপের কথা। কিন্তু শুধু মনে পড়ে যায় সেদিনের অপমানের কথা। সেদিন রাস্তায় অশােক যেখানে ছােটো হয়েছিল জীবনে আর কোনদিন সেরূপ অপমানিত সে হয়নি। অতএব মনােবাসনা পূর্ণ হল না।

অপর্ণা দেবীকাকে একদিন তার বাড়ী নিয়ে এলাে। দেবীকা বাড়িতে প্রবেশ করেই দুচোখ দিয়ে শুধুমাত্র অশােককে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও অশােকের দেখা নেই। শেষে অধৈর্য হয়ে দেবীকা অপর্ণাকে তার দাদার কথা জিজ্ঞাসা করে। অপর্ণা দাদার ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে দেয়। দেবীকা ধীর পদক্ষেপে দৃঢ় চিত্তে জয়ের বাসনা নিয়ে দরজার দিকে এগােতে থাকে। প্রবেশের মুখেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দেখে বিছানায় অশােক ছটফট করছে আর বীথিকা তার পাশে বসে তার মাথায় হাত দিচ্ছে। দেবীকা আড়ালে সরে গিয়ে সব দেখতে লাগলাে। শুনতে পেল অশােক বলছে। ‘বীথিকা শােভন কেন এল না? ওকে এইসময় আমার বিশেষ দরকার। শােভন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আর তুমি তার ভাবী বধু, আমার বােন বীথিকা তুমি কত স্নেহশীলা, তুমি কত সুন্দর। বীথিকা অশােককে চুপ করিয়ে ডাক্তারের দেওয়া ঔষধ খেতে দেয়। ইতিমধ্যে শােভন এসে দেখে দেবীকা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। সে তাকে হাত ধরে নিয়ে ধরে প্রবেশ করে। অশােক দেবীকাকে দেখে চমকে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বীথিকা ও শোভন তাদের ঘরে বসিয়ে অপর্ণার ঘরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দেবীকা ডুকরে কেঁদে ওঠে। আর হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনায় ভঙ্গিতে অশােককে ডাকতে থাকে। অশােক দেবীকার দিকে আজ অনেকদিন পর তাকিয়ে দেখলাে, দেবীকা আগের থেকে অনেক সুন্দরী হয়েছে। দেবীকা একসাথে অনেক কথা বলতে চায় কিন্তু কিছুই। বলতে পারে না। শুধুমাত্র তাদের দুজনের হাত পরস্পরের হাতের মুঠোর মধ্যে থাকে। ইতিমধ্যে শােভন ও বীথিকা অশােকের কাছে এসেছে। কিন্তু অপর্ণা শােভনের বােন দেবীকাকে কোনমতে এবেলা বাড়ী যেতে দিল না। দেবীকার এই প্রথম অশােকদের বাড়ী থাকা।

অশােক যখন নিদ্রাচ্ছন্ন হল তখন অপর্ণা ও দেবীকা গৃহকর্মে যুক্ত হল। মাসীমা, মেসােমশায় অর্থাৎ অশােকের বাবা মা দুজনেই দেবীকাকে খুব ভালােবাসেন। দেবীকাকে কাছে পেয়ে তাদের আর আনন্দের সীমা নেই। দেবীকাকে কাছে বসিয়ে তারা গল্প করলেন। খাওয়া দাওয়া সারা হওয়ার পর দেবিকা আর একবার অশােকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে অশােক তাকে চুম্বনে সিক্ত করল। তাদের ভুল বােঝাবুঝির অবসান হল।অশােকের বিছানায় বসে দেবীকা তার মনের গভীরে আশঙ্কার জল ঢুকতে লাগল। হঠাৎ সে দেখলাে অশােক পৃথিবীতে নেই। সে নিঃসঙ্গ একাকী। পৃথিবীতে তবে থাকার আর কোন আশা আকাঙ্খা নেই। শুধুমাত্র মরুপ্রান্তর। দেখলাে অশােক ভেসে চলেছে অজানা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। তাকে ফেলে একা রেখে। হায়রে অবুঝ প্রেম। প্রেমের রূপ এরূপই হয়ে থাকে। যাকে তুমি আপন হৃদয়ের অন্তঃস্থলে ঠাঁই দিয়েছ তার অমঙ্গল চিন্তা আগে আসবে মনে, তবেই তােমার সার্থক ভালােবাসা। প্রিয় যখন কাছে থাকে তখন তাকে অবজ্ঞা কর না, প্রিয় দূরে গেলে প্রিয় আরও প্রিয় হয়ে ওঠে এই হল অবুঝ প্রেম।দেবীকার হঠাৎ মনে হল সে মৃত অশােকের পাশে বসে। সে ভয়ে আর্তনাদ করে ঘুমন্ত অশােককে জড়িয়ে ধরলাে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। ঘুমন্ত অসু্থ অশােক তখন স্বপ্ন দেখে গোলাপ ফুলের মত দেবীকার সুন্দর মনের। সে অনেক কিছুই দিল দেবীকাকে। দেবীকা নিশ্চিন্ত হল অশােক মরেনি।

অরিন্দম তার গতবারের অভিনয়ের বদনাম ঘুচিয়ে চার রাত্রিতেই সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান নিয়ে ফিরলেন। আর সঙ্গে নিয়ে ফিরলাে দশ হাজার টাকা। ফিরে এসে প্রথমেই অরিন্দম অপরূপার সঙ্গে দেখা করতে গেল। অপরূপা অরিন্দমকে দেখেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে অরিন্দমকে জড়িয়ে ধরলাে। অরিন্দম তার জয়ের কথা অপরূপাকে বলল তারপরে গােপালবাবুর কাছে গিয়ে শরীরের উত্তাপ এবং হার্টবিট দেখে অপরূপাকে অন্য ডাক্তার দেখাবার জন্য বললাে। অপরূপা অর্থের অভাবে অন্য ডাক্তার আনার ভরসা পাচ্ছিল না। অরিন্দম একথা বুঝতে পেরে নিজে গিয়ে কলকাতা থেকে বড় ডাক্তার নিয়ে এলাে।। যেদিন অরিন্দম কলকাতা থেকে ডাক্তার নিয়ে এলাে সেইদিন এসেই দেখতে পেল সুদর্শন সান্যালের ডাক্তার গোপালবাবুকে দেখছেন। অরিন্দম ডাক্তারবাবুকে অপরূপার ঘরে বসিয়ে রেখে তাকে আপ্যায়ণ করার জন্য অপরূপাকে বলল। সুদর্শন সান্যাল ডাক্তার নিয়ে চলে যাবার আগে ফি বাবদ টাকা অপরূপার কাছে নিতে আসে। সেদিন টাকা নিতে এসে অন্য আর একজনকে দেখে সুদর্শন সান্যাল অপরূপাকে বাইরে ডাকলাে। আর ঠিক সেইসময় সুদর্শন সান্যাল তার মনের বাসনা চরিতার্থ করার জন্য অপরূপাকে জড়িয়ে ধরে বলল “অপরূপা আমি তােমায়” কথা আর শেষ হতে হল না। অপরূপার চিৎকার অরিন্দম এসে সুদর্শন সান্যালের কেশ আকর্ষণ করে অপরূপার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলল। প্রত্যুত্তরে সুদর্শন সান্যাল কে থেকে ভোজালি বের করে অরিন্দমের প্রতি অগ্রসর হতে থাকল। আগত বাবু একটি লাঠি ছুড়ে অরিন্দমকে সূদর্শন সান্যালের থেকে রক্ষা করলেন। সুদর্শন সান্যাল সুযােগ বুঝে পালালো। কলকাতা থেকে আগত ডাক্তারবাবু তারপর রোগীর কাছে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী গোপালের শরীর পর্যবেক্ষণ করে বললেন একে ড্রাগ এডিকেটেড করা হয়েছে । এর প্রেসার একটু বেশি হলেও অন্য কোন কঠিন ব্যাধি নেই এবং পরিকল্পপনা মাফিক একে রোগী বানিয়ে রাখা হয়েছে। এর প্রেসার বাড়িয়ে,ওষুুুুধ না দিয়ে প্রতিদিন তাকে মেরে দেবার চক্রান্ত চলছিল। ভাক্তারবাবুকে ট্রেনে তুলে দেবার পর অরিন্দম সােজা নিজের বাড়ী গিয়ে কথামত ঔষধপত্র কেনার জন্য শহরে গেল। প্রায় আড়াই মাস ব্যাপী চিকিৎসার ফলে গােপালবাবু প্রায় স্বাভাবিক ও সুস্থ হয়ে উঠলেন এবং হাত ভরে অরিকে আশীর্বাদ করলেন। ঈশ্বরকে প্রণাম জানালেন এক বিরাট দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার জন্য।
গোপালবাবু আজ অরিন্দমকে বলছেন আগে তো যাত্রাদলের নারী পাওয়া যেত না তখন পুরুষ মানুষই নারী সেজে যাত্রাদল অভিনয় করত। পুরুষরা কিন্তু নারীর অভিনয় কম যেত না তারা বেশ সুন্দর অভিনয় করত। এমন অনেক পুরুষের নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেই নাম হয়েছে যাত্রা জগতে। তিনি আরও বলেন, নারীদের মঞ্চে আগমনের আগে যে সকল পুরুষ-অভিনেত্রী এদেশে ছিলেন তাদেরকে ‘রানী’ বলা হত। সেই রানীদের মধ্যে রেবতীরানী, হরিপদ বায়েন, নিতাইরানী, সুদর্শনরানী, সুধীররানী, ছবিরানী প্রমুখের অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
যাত্রা-গবেষক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের ধারণা যাত্রার জন্ম তৃতীয় শতকে। ডক্টর হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য মনে করেন যে দ্বাদশ শতকের আগেই যাত্রার জন্ম হয়েছে। দ্বাদশ শতকেই যাত্রার জন্ম এমন মতের সমর্থক প্রবোধবন্ধু অধিকারী, ডক্টর আশ্রাফ সিদ্দিকী, নাট্যকার মমতাজদদীন আহমেদ প্রমুখ। পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্রকুমার দে এবং সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করেন পঞ্চদশ শতকের আগেই যাত্রার জন্ম। নাট্যব্যক্তিত্ব অহীন্দ্র চৌধুরী অবশ্য পঞ্চদশ শতককেই যাত্রার জন্ম বলে চিহ্নিত করেছেন। ডক্টর সুরেশচন্দ্র মৈত্র, গবেষক কপিলা বাৎসায়ন, ডক্টর সুশীলকুমার দে, নাট্যকার মন্মথ রায়, নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস, ডক্টর প্রভাতকুমার দাস, ডক্টর প্রভাতকুমার গোস্বামী, ডক্টর মণীন্দ্রলাল কুণডু, ডক্টর সৈয়দ জামিল আহমেদ প্রমুখের ধারণা বিশ্লেষণ করলে যাত্রার জন্ম ষোড়শ শতক বলে প্রতীয়মান হয়।

নাট্যকার জিয়া হায়দার বলেছেন,- ‘অষ্টাদশ শতক থেকে, সম্ভবত তার আগে থেকেই ভ্রাম্যমাণ যাত্রাদল গড়ে ওঠে’। ডক্টর সেলিম আল দীন বলেছেন,-‘অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে যাত্রা কথাটার অর্থ সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই মূলত যাত্রা নাট্যাদি অর্থে পরিচিতি লাভ করে’। সেলিম আল দীনের এই মত মানলে যাত্রা এই আাধুনিককালের শিল্পআঙ্গিক বলে ভাবতে হয়। কিন্তু সেটি সম্ভবপর নয়। নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় তো বলেছিলেন,- ‘…এসব থেকে নিঃসংশয় হয়ে বোঝা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই নিয়মিত কৃষ্ণযাত্রার অভিনয় হতো এবং ভারতের সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছেই তা জনপ্রিয় ছিল’। এখানে আর সংশয় থাকে না। দ্বাদশ শতকের কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’কে যাত্রা-নাট কিংবা নাটগীত হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। ষোড়শ শতকের প্রথম দশকে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কৃষ্ণলীলার অভিনয়কে যাত্রাগান মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। যাত্রার জন্ম নিয়ে সকল অভিমতকে আমলে নিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, উৎসব-অর্থে যাত্রা-র উন্মেষ প্রাচীনকালে কিন্তু অভিনয়কলা-অর্থে যাত্রা-র উন্মেষ ষোড়শ শতকে, গ্রামীণ আসরে বা চাঁতালে। অষ্টাদশ শতকে যাত্রা চাঁতাল বা আসর থেকে উঠে আসে বাঁধামঞ্চে। অষ্টাদশ শতকের পর থেকে যাত্রা উৎসব কিংবা গীতাভিনয়ের আবরণ ঝেড়ে পরিণত হয় স্বতন্ত্র এক অভিনয়কলায়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশেই যাত্রা-র চলন, বিকাশ এবং প্রবাহ। আমরা জানি, যাত্রা-র জন্ম এই সমতটে। অর্থাৎ আমাদের বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডেই যাত্রা-র জন্ম। যাত্রা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। যাত্রা শুরুতে ছিল দেববন্দনার অংশ, কালে তা পৌরাণিক উপাখ্যান বয়ানের মাধ্যমে লোকশিক্ষার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। চারণকবি মুকুন্দ দাসের হাতে যাত্রা তার বিষয় ও উপস্থাপনার গুণে রূপান্তরিত হলো ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে। পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্রকুমার দে যাত্রাপালায় নিয়ে এলেন কাল্পনিক ইতিহাস, লোককাহিনী, জীবনী এবং সাম্প্রতিক সমাজিক উপাদান। যাত্রা হয়ে উঠলো সামাজিক বিনোদনের বিশাল মাধ্যম। এসব এখন জানা যায় ইন্টারনেট, গুগুলের মাধ্যমে। অনেক গ্রন্থ পাঠ করতে হয়। অরিন্দম বলে আপনার সাধনাকে কুর্ণিশ জানাই।

পরিশেষে আজ গােপালাবাবু তার একমাত্র কন্যা অপরূপার জন্মদিনের আয়ােজন করেছেন বিপুল আয়োজনে । আজ তিনি সকলের সম্মুখে অরিন্দম ও অপরূপার বিবাহের ঘােষণা করবেন অরিন্দমের বন্ধু সুব্রত সকল ব্যবস্থার দায়িত্বে। | অপরূপার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন আজকে। আজ অরিন্দম তার একেবারে নিজস্ব হবে। সারাদিন সে কল্পনার জাল বুনে চলেছে। আজ সে বাধাহীন উচ্ছাসে আনন্দিত। কখনও গাইছে কখনও নাচছে। বনের ময়ূরী বর্ষার জলে সিক্ত হয়ে যেরূপ পেখম তুলে নৃত্য করে সেই আনন্দের নৃত্যে। সন্ধ্যা সাতটার সময় অরিন্দম তার পিতামাতাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে গােপালবাবুর গৃহে উপিস্থত হলো। গোপালবাবুর ব্যবহারে এবং বিনম্র আচরণে তারা খুব আনন্দিত হলে আরও খুশী হলেন অপরূপাকে দর্শন করে। | সানাই বাজিয়ে উদ্বােধন করা হল আসরের। গান গাইলেন গােপালবাবু এবং তার

– আজ মিলনের পথে নেই কোন বাধা। জীবনের দিন আজ এসে গেছে রাজা।

অরিন্দম গানের মধ্যে ডুবে যায় কল্পনার সমুদ্রে। গােপালবাবু তার ফ্রেন্ড, অফার এ গাইড। সেই গােপালবাবব কন্যাকে সে আজ বিবাহ করতে চলেছে। একটা কথা অনুষ্ঠানের শেষে গোপালবাব অরিন্দমকে এবং অপরূপাকে ্পূর্ব পাশে নিয়ে তাদের আসন্ন বিবাহের পাকা কথা ঘােষণা করলেন। হাততালি বেজে উঠলাে। আজ অপর্ণার বিবাহ বিবাহ সিউড়ি শহরের বিখ্যাত পরিবারের প্রভাত ঘােষালের ছােটো পুত্র বাবুর সঙ্গে।সব সাজানো এবং শরণার্থীদের আপ্যায়ন কগ্রান্ত ব্যয় খরচ অশোক এবং শােভন দুই বন্ধুতে দায়িত্ব নিয়েছে। বরপক্ষ থেকে কোনাে দাবা নেই। তবু অশােকের পিতামাতা কন্যাকে সাজিয়ে দিয়েছেন। শোভনের ‘আজকে অন্য রূপ। সারাদিন সে আজ ব্যস্ত। এমনকি বাথিকার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারেনি। অশোক আহ্বান করছে। অশােকের নিজে। মাসী, পিসী ব্যতীত আছেন শােভনের বাড়ীর সকলে। অপর্ণার বাবা হিসাবে বীথিকা এবং তার পিতামাতা আর অরিন্দমের ভাবী শশুর এবং বধু হিসাবে গােপালবাবু এবং অপরূপা। অরিন্দম আজ চুড়িদার পাজামা পাঞ্জাবী আর অপরূপা লাল বেনারসী পড়ে এসেছে। যেন বিবাহের পূর্বে একবার মহড়া দিয়ে নিচ্ছে। অপর্ণার বান্ধবী বীথিকা আর দেবীকা দুজনেই কনে সাজাতে ব্যস্ত। এদিকে সুরেন্দ্র ক্যাটারার লাভপুর থেকে এসেছে। তাদের কাজকর্ম প্রায় শেষ। করে ফেলেছে। তাদের খাবার দাবারের আয়ােজন প্রায় শেষ। এখন বাকি শুধু বরের আগমন। বর এসে গেছে, বর এসে গেছে বলে চেঁচাতে লাগলাে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। বরকে কোলে করে তুলে বরাসনে বসালাে শােভন। বাবু ও শােভনের পরিচয় হতে বেশী সময় লাগলাে না। অপর্ণার আর একটি দাদা হিসাবে অশােক তাকে পরিচয় করিয়ে দিল। সুন্দর ব্যবহারে শােভন অভিভূত। অপর্ণার যােগ্য বর বাবু ঘােষাল। শােভনের মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠলাে। আজ অনেকদিন পর সে বিশ্বজয়ের মানসিকতা অর্জন করেছে। এমনিতে শােভন খুবই প্র্যাকটিক্যাল কিন্তু আজকের দিনে সে ভাবের আবেশে নিমজ্জিত। | দেবীকা ও বীথিকা মিলিতভাবে অপর্ণাকে প্রেজেন্ট করলাে একটি সুন্দর হারমােনিয়াম। অরিন্দম প্রেজেন্ট করলাে একজোড়া সােনার চুড়ি। গােপালবাবু দিলেন একটি দেওয়াল ঘড়ি। কিন্তু শােভনের প্রেজেন্ট সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয়। এক গােছা সাদা ফুলের তােড়া। অশােক আজ খুব কম কথা বলছে। শােভন এর কারণ বুঝতে পারছে না। কিন্তু অশােক আজ বেশী কথা বলতে চাইছে না। ভাবাবেগের ফলে হয়ত মনের বাসনা ভাষা হয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। সে আজকে শােভনকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। তাই সে শােভনকে এড়িয়ে চলছে। অশােক যখন দেবীকাকে আজকের সারপ্রাইজের কথা বললাে তখন থেকে দেবীকার মন ঠিক নেই। এ ব্যাপারটি বীথিকাও লক্ষ্য করেছে। সে বারবার দেবীকাকে খোঁচা দিতে ছাড়েনি। কিন্তু সঠিক কারণ বুঝতে পারেনি।যাইহােক বিবাহ কার্য সমাপ্ত হওয়ার পর বর কন্যা ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে সকলের সম্মুখে অশােকের পিতা অশােক এবং দেবীকার বিবাহের কথা ঘােষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আসরে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলাে। শােভন ও বীথিকা হতভম্ব, বিহ্বল হয়ে পড়েছে। তাদের মুখে কোনাে ভাষা নেই, শুধু পরস্পরের প্রতি দুজনের মৃদু হাসির ঝিলিক। | ঘােষণা পূর্বের পরেই শােভন অশােকের পিঠে সজোরে আঘাত করে তাকে আদরে সিক্ত করে তুলল। শােভনের চোখে অশ্রু অশােকের চোখে পড়ল শােভনকে অভয় দিয়ে অশাের আর একবার তার সঙ্গে কোলাকুলি করল। আজ তাদের বন্ধুত্বের দৃঢ় বন্ধন হল। এ বন্ধন জন্ম-জন্মান্তরেও অটুট থাকবে। রাত্রিতে যখন সবাই নিদ্রাচ্ছন্ন কেউ ঘরােয়া আসরের গল্পে মত্ততখন কিন্তু শােভন এবং বীথিকা অশােকদের দোতলা ছাদের উপর ঘনিষ্ঠ ভাবে বলে তাদের সুন্দর অবকাশ যাপন করছে। ছাতে পূর্ণিমার আলাে উদ্ভাসিত। বীথিকা তাজমহলের রাগী সেজে বসে আছে। আর সম্মুখে শােভন কল্পনা প্রবণ শিল্পীর মতাে যেন তুলি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আজ অপর্ণার বিবাহ হয়ে গেল। অশােক ও দেবীকা বন্ধনে আবদ্ধ হল। কিন্তু শােভন বীথিকার পরিণতি কি হবে? তাদের মিলনের পথে যেতে আর কত পথ অতিক্রান্ত করতে হবে। বীথিকা তার বান্ধবী অপর্ণার কাছে জেনেছে কি পরিমাণ ভালাে সে শােভনকে বেসেছে। শােভন কিন্তু অন্য মানসিকতা নিয়ে তাকে দেখেছে তাও জানে। কিন্তু বীথিকা তার ভালােবাসায় শ্রেষ্ঠ পাত্র শােভনকে কিন্তু তিরস্কার করতে ছাড়ে না। সে শােভনকে জানায় ভালােবাসা কোনদিন কোনাে বাধা মানে না। জলের স্রোতের মত এগিয়ে চলে। কিন্তু শােভন কি করে বােঝাবে বীথিকাকে কোন চোখে সে দেখে? সে যে তার মনের গহন বনের অধিবাসী। তার প্রত্যেকটি অণু পরমাণু শােভনের জন্ম জন্মান্তরের চেনা। বীথিকা বিহীন শােভন জল ছাড়া মাছের মত এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবে না। তবে তার কি ব্যবস্থা হবে? বীথিকা এই প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পায় না। কেবল শােভনের বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ে। শােভন বীথিকার মিলনের পথে আর কোনাে বাধা নেই। শােভন বীথিকার জীবনে শান্তি আসুক আর সারা পৃথিবী শান্তির পরিবেশ গড়ে তুলক।।

0 Comments