Uttam Ghosh

শ্রাবণ সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ বইমেলায় কিছুক্ষণ
কলমে : উত্তম ঘোষ
তারিখ : ১২-০৮-২০২৬
শ্রাবণের সন্ধ্যা। ব্রম্মপুত্র পাড়ে আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা। বাতাসে বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, চারপাশে নেমে এসেছে এক নরম বিষণ্নতা। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে, শহর প্রস্তুত হচ্ছে সন্ধ্যার আলো পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢুকে পড়ার জন্য। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে হঠাৎ চোখ আটকে গেল বইয়ের সারিতে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ বইমেলা। ময়মনসিংহ বিভাগীয় সরকারি গনগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণ। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে যেন হঠাৎ খুলে গেছে আলোর একটি জানালা।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। হাজারো স্মৃতি। কতদিন কেটেছে এই বই মেলায়। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা ইছামতী নদীর তীরে।

মনে হতো, এই বইয়ের পাতার ওপারে বুঝি অপেক্ষা করছে সম্পূর্ণ একটি নতুন পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ঢুকে পড়ার জন্য কোনো পাসপোর্ট লাগত না, কোনো দূরত্ব পেরোতে হতো না—শুধু একটি বই আর একটু কল্পনাশক্তিই যথেষ্ট ছিল।
সময়ের সঙ্গে মানুষ বড় হয়েছে, জীবন বদলেছে। বদলে গেছে পড়ার অভ্যাসও।
আজ আমরা কত কিছু পড়ি—মোবাইলের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী লেখা, অসংখ্য খবর, অগণিত তথ্য। চোখের সামনে প্রতিদিন শব্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে। কিন্তু সেই পড়ার মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে যায় গভীরতা। হারিয়ে যায় নীরবে একটি বাক্যের পাশে বসে থাকার সময়, একটি চরিত্রের সঙ্গে নিজের জীবনকে মিলিয়ে দেখার অবসর।
বই সেখানে অন্যরকম। বই আমাদের শুধু পড়ায় না; বই আমাদের থামায়। ভাবায়। প্রশ্ন করতে শেখায়। কখনো কখনো আমাদের নিজের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
ভ্রাম্যমাণ বইমেলার সবচেয়ে সুন্দর দিকটিও বোধহয় এখানেই—বই শুধু পাঠকের অপেক্ষায় কোনো নির্দিষ্ট ঘরে বসে থাকে না; বই নিজেই মানুষের কাছে চলে আসে।
ভাবলাম, জীবনে কত সন্ধ্যা আসে, কত সন্ধ্যা নিঃশব্দে চলে যায়। অধিকাংশ সন্ধ্যাই সময়ের হিসাব হয়ে থাকে। কিন্তু কিছু সন্ধ্যা থাকে—যারা সময়ের খাতায় নয়, মনের ভেতর লেখা হয়ে যায়।
আজকের এই শ্রাবণসন্ধ্যাও হয়তো তেমনই একটি সন্ধ্যা।
ময়মনসিংহের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ বইমেলায় তাই আজ শুধু বই দেখা হয়নি; দেখা হয়েছে মানুষের ভেতরের মানুষটিকেও।
অনুভব করেছি—বই এখনো মানুষকে থামাতে পারে। এখনো একটি বই নিঃসঙ্গ মানুষের পাশে বসতে পারে। এখনো একটি গল্প অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার সেতু তৈরি করতে পারে। এখনো একটি কবিতা কোনো বিষণ্ন সন্ধ্যার জানালায় আলো জ্বালতে পারে।
হয়তো এ কারণেই বইয়ের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
তখন মনে হলো—
শ্রাবণের সেই সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ বইমেলা শুধু একটি বইমেলা ছিল না; ছিল ব্যস্ত পৃথিবী থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য সরে দাঁড়িয়ে নিজের কাছে ফিরে আসার এক নীরব পথ।গনগ্রন্থাগারের প্রাঙ্গণ শ্রাবণের মেঘের নিচে, জ্বলছিল অসংখ্য বই—অসংখ্য ছোট ছোট আলোর মতো।
হয়তো পৃথিবী যতই বদলাক, বইয়ের কাছে ফিরে আসার এই পথটি কোনোদিন হারিয়ে যাবে না। বই হউক প্রাণের স্পন্দন আর বন্ধনের উৎসব।

1 Comment
  • Anonymous

    Excellent

    Reply · 1 hour ago